'ফিরে দেখা একাত্তর' ও একজন যোদ্ধার গল্প

২৩ এপ্রিল ২০১৮ | আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০১৮

মিছিল খন্দকার

''যারা একাত্তর দেখেছে- তাদের প্রত্যেকেরই একটা 'গল্প' আছে। কারণ, একাত্তর ছিল জনযুদ্ধ। এ যুদ্ধে কেউ দর্শক ছিল না। সৈনিক, ছাত্র, মজুর ও রাজনৈতিক কর্মীরা অস্ত্র হাতে লড়েছেন। কলম হাতে লড়েছেন সাংবাদিক- লেখক-বুদ্ধিজীবী। শিল্পীর কণ্ঠে গান ছিল, ছিল অভয়বানী। গ্রামবাংলার কিষাণের আঙিনা পরিণত হয়েছিল ঘরছাড়া-তাড়া খাওয়া মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে, মুক্তিযুদ্ধের দুর্গে...''

এটি লেখক ও সিনিয়ির সাংবাদিক আবু সাঈদ খানের 'ফিরে দেখা একাত্তর' বইয়ের ভূমিকার একটি অংশ। লেখকের মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ ছিল। ১৯৬৭ সালে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায়ই তিনি পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে মিছিলে অংশ নেন। একাত্তরের মে মাসে ফরিদপুরের মধুপুর থেকে ভারতের উদ্দেশে রওনা হন সহযোদ্ধাদের সঙ্গে। উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং। 

এদিকে লেখকের পরিবার তখন ফরিদপুরের গ্রামের বাড়িতে। তার বাবা তখন হয়ে উঠেছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় হিন্দুসহ অসহায় মানুষের আশ্রয়স্থল। তার বাড়ি-ঘর-উঠান হয়ে গিয়েছিল 'তাড়া খাওয়া মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র'। 

বইয়ের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় আছে, '২ মে ফরিদপুরের মধুখালীর ব্যাসপুর থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। বিপদশঙ্কুল ১৫০ কিলোমিটার পথ হেঁটে চার দিনের মাথায় ভারতের মাটি স্পর্শ করলাম। এই প্রথম বাংলাদেশের সীমানার বাইরে গমন। জায়গাটির নাম মহিষবাথান। সীমান্তের কোনো চিহ্ন নেই। একটি খাল, তাতে হাঁটুজল। আমরা খাল পেরিয়ে ওপাড়ে যখন পৌঁছাই তখন দুপুর।...'

এর পরের পৃষ্ঠায়ই লিখেছেন, 'এপার বাংলা-ওপার বাংলা, মাঝে কোনো ছেদ নেই। নিরবচ্ছিন্ন সবুজের মেলা। প্রকৃতির এ নিয়মকে ভ্রুকুটি হেনে লাল পেনসিল দিয়ে বিভাজন রেখা টেনেছিলেন র‌্যাডক্লিফ সাহেব।...'

এভাবে বইটিতে মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিংয়ে অংশ নিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভারতে প্রবেশ করা লেখকের চোখে একে একে উঠে এসেছে দুই বাংলা দেশভাগের অসাড়তা, পাকিস্তানের শুরু থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি বৈষম্য-নীপিড়ন, এসবের বিরুদ্ধে বাঙালির ফুঁসে ওঠা, ৬৬ এর ছয় দফা, উনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সত্তরের নির্বাচন ও নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ।

বইটি লেখা সাম্প্রতিক সময়ে। এটি প্রকাশ পেয়েছে ২০১৮ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায়। তার মানে মুক্তিযুদ্ধের প্রায় পাঁচ দশক পরে বইটি লেখা হয়েছে। আর এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধকে দেখার একটা ভিন্নমাত্রা যোগ হয়েছে এ বইয়ে।  যার সঙ্গে নামেরও রয়েছে চমৎকার সাযুজ্য- 'ফিরে দেখা একাত্তর'।

বইয়ের শুরুর দিকে লেখক ও তার সহযোদ্ধাদের আশ্রয় দেওয়া ভারতীয়এক পরিবারের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সহযোহিতাপ্রবণ মনোভাব ও তাদের পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। যেমন- 'দহলিজে পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে আলাপ হচ্ছে। একজন বললেন, মুসলমানরা মিলে যাবে, হিন্দুরা কচুকাটা হবে। ভূপেনবাবু বললেন, এটি হিন্দু-মুসলমান রায়ট না। পূর্ববাংলার স্বাধীনতা যুদ্ধ এখন পাকিস্তানিদের হটাতে বাঙালিরা একজোট হয়েছে। হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে আগের দূরত্ব নেই। বললেন, আমাদের বাড়িতে বীরেনের শ্যালক তার ৮-১০ জন বন্ধু নিয়ে এসেছিল, দু'জন ছাড়া সবাই মুসলিম...।' এভাবে মুক্তিযুদ্ধ যে ছিল ধর্ম-বর্ন নির্বিশেষে বাঙালির মুক্তির আন্দোলন একজন ভারতীয় বাঙালির বয়ানে সেটি ফুটে উঠেছে।

বইটিতে লেখকের পারিবারিক আবহ ও কলেজে সংগ্রামমুখর সময়ে স্বাধীকার আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার কথা আছে। এভাবে একে একে তার ও তার পরিবারের স্বাধীনতাযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ও ফরিদপুর অঞ্চলের মানুষের যুদ্ধের প্রস্তুতি, যুদ্ধ ও বীরত্ব, ওই অঞ্চলে পাক হানাদারদের নৃশংসতা প্রত্যক্ষ চিত্র ফুটে উঠেছে লেখকের নিপুন বয়ানে।  

বইয়ে ফরিদপুর শহরে ২৬ মার্চ সকালের ঘটনা উল্লেখ করে লেখক লিখেছেন, '২৬ মার্চ সকাল থেকে সিনেমা হলের (অরোরা টকিজ) উল্টোদিকে অবস্থিত আওয়ামী লীগ অফিসের ভেতরে-বাইরে তখন ভিড়। আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা সবাই আছেন। আমরা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে কোনো নির্দেশনা পাইনি। কিন্তু কী করতে হবে তা আমাদের কাছে স্পষ্ট ছিল। আমাদের সামনে ছিল ৩ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ঘোষণা ও ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেওয়া নির্দেশনা।' এভাবে ২৫ মার্চের নারকীয় কালরাতের পর সারাদেশ সশস্ত্র যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হয়েছিল, যার একটি চিত্র ফরিদপুরের বর্ণনার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে।

এক সাহসী যোদ্ধার বর্ণনা আছে এভাবে, 'লোকমুখে তখন করিমপুরের সাহসী কৃষক মোহন শেখের গল্প। আকাশে যখন পাকসেনাদের হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছে তখন ভয়ে সবাই পালাচ্ছে। মোহন ঢাল-শড়কি নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন। সবাই বলল, ঢাল শড়কি নিয়ে কোথায় যাচ্ছো? মোহন বললেন, ওদের উচিত শিক্ষা দেব। স্বজনরা পথ আগলে দাঁড়াল। সবাইকে সরিয়ে ছুটে গেলেন। হেলিকপ্টার স্থির দাঁড়িয়ে, ছত্রীসেনা নামানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। মোহন তখন এক হাতে ঢাল, আরেক হাত দিয়ে হেলিকপ্টারকে লক্ষ্য করে শড়কি নিক্ষেপ করার জন্য প্রস্তুত হলেন। হেলিকপ্টার থেকে নিক্ষিপ্ত এক ঝাঁক গুলি মোহনের বুক ঝাঁঝরা করে দিল।' লেখকের এমন বয়ানে একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ বীরত্ব আমাদের হাজার হাজার মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। 

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কলকাতা থেকে একটি পত্রিকা প্রকাশ ও সম্পাদনা করেছিলেন আবু সাঈদ খান। নাম 'উত্তাল পদ্মা'। প্রবাসী সরকারের কাছে এজন্য অনুমতি আনতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদেও সঙ্গে সাক্ষাতের বর্ণনার মধ্য দিয়ে লেখকের অপূর্ব বয়ানভঙ্গিও পরিচয় মিলবে এ বইয়ে। পত্রিকাটি বের করার আগে তিনি সংগৃহীত খবরাখবর পৌঁছে দিতেন 'জয় বাংলা' পত্রিকায় ও 'স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্রে'। এভাবে রণাঙ্গনের খবর প্রকাশ ও প্রচারের মধ্য দিয়ে লেখকের সাংবাদিকতায় হাতেখড়ি। সেসবের বর্ণনাও উঠে এসেছে। 

বইটিতে একাত্তরের দিকে ফিরে তাকানো হলেও জাতীয় ঘটনার রূপরেখার মধ্যেই বিস্তারিত ও বিস্তৃত হয়ে ওঠে বৃহত্তর ফরিদপুরে স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট ও ঘটনাপ্রবাহ। লেখক যখন তার ওপার বাংলার নদীয়ায় শরণার্থী প্রবেশপথ, কল্যাণীতে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প কিংবা কলকাতায় থিয়েটার রোডে বাংলাদেশের যুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের ঘটনা বর্ণনা করেন তখনও ফরিদপুরের সঙ্গে সংযোগ রেখে চলেন। 

মূলত এ বইয়ে একজন সচেতন যোদ্ধার চোখে একাত্তরে একটি অঞ্চলের ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন বয়ানে উঠে এসেছে। একই সঙ্গে বইটি পাঠককে একাত্তর সম্পর্কে বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসের দ্বার খুলে দেবে।

ফিরে দেখা একাত্তর। লেখক: আবু সাঈদ খান।  প্রচ্ছদ: রবীন আহসান। প্রকাশক: শ্রাবণ প্রকাশনী। মূল্য: ৩৫০ টাকা।


© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: [email protected] (প্রিন্ট), [email protected] (অনলাইন)