বিশ্বকাপ ২০১৮

রুশ আখ্যানের সমাপ্তি

সেমিতে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়া

০৮ জুলাই ১৮ । ০০:০০ | আপডেট: ০৮ জুলাই ১৮ । ০৩:৩০

ক্রীড়া প্রতিবেদক

স্বাগতিক হিসেবে এবারের বিশ্বকাপ ঘিরে অনেক স্বপ্ন ছিল রাশিয়ার। শনিবার রাতে তা চুরমার হয়ে যায় টাইব্রেকারের দুর্ভাগ্যে- ফিফা

সোচির গ্যালারি সেজেছিল নানান রঙে। আরেকটি মহাকাব্যিক ম্যাচ দেখতে এসেছিলেন রাশিয়ান সমর্থকরা। কিন্তু নতুন কাব্য লিখতে পারেনি রুশরা। মুখে আলপনা আঁকা দর্শকদের চোখের পানি মিলেমিশে একাকার। রঙিন গ্যালারিতে শুধুই আর্তনাদ। স্বপ্নের এত কাছে গিয়েও স্বপ্নভঙ্গের কান্না। ৫২ বছর আগের রূপকথা ধরা দিয়েও দিল না। লেভ ইয়াসিন হতে পারলেন না ইগর আকিনফিভ। সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেনকে নকআউট করে বিশ্বকাপে যে রুশ বিপ্লব ঘটিয়েছেন ডেনিশ চেরিশভ-আর্তেম জুবারা, তা এক রাতেই থেমে গেছে লুকা মডরিচ-ইভান রাকিতিচদের ক্রোয়েশিয়ার কাছে পরাজয়ে। গতকাল আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের রোমাঞ্চ ছড়ানো শেষ কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটির নিষ্পত্তি হয় টাইব্রেকারে। যেখানে এদিন ভাগ্যবিধাতা বিমুখ করেছে রাশিয়াকে। টাইব্রেকারে স্বাগতিক রাশিয়াকে ৪-৩ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে ক্রোয়াটরা। নির্ধারিত ৯০ মিনিট ম্যাচটি ১-১ গোলে সমতায় ছিল। অতিরিক্ত ৩০ মিনিটেও দুই দল একটি করে গোল করে। শেষ পর্যন্ত টানা দ্বিতীয় ম্যাচে টাইব্রেকার ভাগ্য অনুকূলে যায় ক্রোয়েশিয়ার। আর ১৯৯৮ বিশ্বকাপের পর শেষ চারে উঠল দ্য ব্লেজার্সরা। ১১ জুলাই দ্বিতীয় সেমিফাইনালে  ইংলিশদের মুখোমুখি হবে ক্রোয়েশিয়া। দিনের প্রথম ম্যাচে সুইডিশদের ২-০ গোলে হারিয়ে ২৮ বছর পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ড।

রুশ বিপ্লব থেমে গেছে। কিন্তু থামেনি ইংলিশদের পথচলা। জার্মানি, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল, স্পেন ও ব্রাজিলের বিদায়ে ছন্দ হারায় ভদ্মাদিমির পুতিনের দেশের বিশ্বকাপটি। তবে ছন্দ হারায়নি সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড। নতুন প্রজন্মের হাত ধরে দুর্বার থ্রি লায়ন্সরা। সবুজ গালিচায় ইংলিশদের ১১ যোদ্ধা ছিল দুর্দান্ত। রঙিন জার্সিতে আলোকিত ছিলেন হ্যারি কেনরা। সামারা অ্যারেনায় কোয়ার্টার ফাইনালে দুরন্ত ইংল্যান্ডের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি সুইডেন। ১৯৬৬ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন। এরপর আরেকটি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল খেলতে ইংল্যান্ডকে অপেক্ষা করতে হয়েছিল ২৪ বছর। 'মিডিয়া' ফেভারিটের দলটি কখনই প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। বিশ্বকাপ মানেই ইংলিশদের জন্য ছিল হাহাকার। বিশ্বমঞ্চে এলেই থ্রি লায়ন্সরা খেই হারিয়ে ফেলে। বদলে গেছে এবারের দৃশ্যপট। রাশিয়ায় অন্য ইংল্যান্ডকেই দেখা গেছে। ১৯৯০ সালের পর বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে তারা।

শুধু আয়োজক হিসেবে নয়, টালমাটাল বিশ্বকাপের মাঠের লড়াইয়ে রাশিয়াও ছিল আলোচনায়। বিশ্বকাপে ৩২ দলের মধ্যে র‌্যাংকিংয়ে সবার নিচে থাকা দলটি নতুন ইতিহাস লিখে তিকিতাকার ছন্দে থাকা স্প্যানিশদের হারিয়ে। রূপকথার গল্পটাও নতুন করে লেখা শুরু করে রুশরা। তবে শেষটা হয়েছে বিষাদের। অথচ গল্পের শুরুটা হতে পারত অন্যরকম। শক্তিশালী ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে স্বাগতিকরা ছিল দুর্দান্ত। ক্রোয়াটদের আক্রমণের জবাবে পাল্টা আক্রমণ শানিয়ে ম্যাচটাকে জমিয়ে তোলে রাশিয়া। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের ম্যাচে তাই ব্যস্ত থাকতে হয়েছে দ্বিতীয় রাউন্ডে দুই দলের জয়ের নায়ক দুই গোলরক্ষককেই। এদিন শুরুতে নায়কের ভূমিকায় রাশিয়ান তারকা ডেনিশ চেরিশভ। ম্যাচের ৩১ মিনিটে তার চোখ ধাঁধানো শটেই সোচিতে ওঠে গগনবিদারী আওয়াজ। আর্তেম জুবার সঙ্গে বল দেওয়া-নেওয়া করেন চেরিশভ। বক্সের বাইরে থেকে বাঁ-পায়ের নিখুঁত শটে বল জালে জড়ান তিনি। ২৫ গজ দূর থেকে নেওয়া রাশিয়ান মিডফিল্ডারের শটটি গোলরক্ষক ড্যানিয়েল সুবাসিচ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখেছেন। এই বিশ্বকাপে সেরা কয়েকটি গোলের মধ্যে অবশ্যই চেরিশভের গোলটি অন্যতম। বিশ্বকাপে এটা চতুর্থ গোল তার।

লিড নেওয়ার পরই আরেকটি রুশ রূপকথায়ই দেখছিল সবাই। এবার ১৯৬৬-এর পুনরাবৃত্তির স্বপ্নও দেখাচ্ছিলেন ইগর আকিনফিভরা। ওই আসরে সেমিফাইনালে খেলেছিল তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন। তবে ক্রোয়েশিয়াও যে হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো দল নয়। রাশিয়ানদের স্তব্ধ করতে ক্রোয়াটদের সময় লেগেছে মাত্র ৭ মিনিট। মারিও মানজুকিচের দারুণ ক্রসে অরক্ষিত আন্দ্রে ক্রামারিচের হেড গোলরক্ষক আকিনফিভকে পরাভূত করে চলে যায় জালে। ৫৯ মিনিটে দ্বিতীয় গোলটা প্রায় পেয়েই যাচ্ছিল ক্রোয়েশিয়া। এবার তাদের হতাশ করে পোস্ট। বক্সের ভেতর থেকে ইভান প্যারিসিচের শট পোস্টে লেগে দিক পাল্টে চলে যায়। রাশিয়াও বসে থাকেনি। তারাও আক্রমণ করেছে। শেষ পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে আর কোনো গোল হয়নি। ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেই নায়কের ভূমিকায় ক্রোয়েশিয়ার কারলুকা। ম্যাচের ১০০ মিনিটে লুকা মডরিচের করা কর্নার থেকে উড়ে আসা বলে হেডের মাধ্যমে জালে পাঠান এ ডিফেন্ডার। নীরবতা নেমে আসে গ্যালারিতে। তবে লড়াই চালিয়ে যায় রাশিয়া। সেই লড়াইয়ে হেসেছে স্টানিসলেভ চেরচেশভের দল। নাটকের ম্যাচটি মহানাটকীয়তায় রূপ নেয় অতিরিক্ত সময়ের শেষ দিকে। ১১৫ মিনিটে অ্যালান জাগয়েবের ফ্রি কিক থেকে শূন্য লাফিয়ে উঠে যে হেড করেন মারিও ফার্নান্দেস তা কাঁপিয়ে দেয় ক্রোয়েশিয়ার জাল। কিছুক্ষণ আগেও যে গ্যালারি চুপ হয়েছিল, সেই দর্শকরা জেগে উঠেন দল সমতায় ফেরায়।

রোমাঞ্চ ছড়ানো ম্যাচটি নিষ্পত্তি ঘটে টাইব্রেকারে। যেখানে দু'দলের দুই গোলরক্ষকই সেরা। ডেনমার্কের বিপক্ষে তিনটি শট ঠেকিয়েছিলেন ক্রোয়েশিয়ার সুবাসিচ আর স্পেনের বিপক্ষে দুটি সেভ করেছিলেন রাশিয়ার আকিনফিভ। পেনাল্টি শুট আউটের স্নায়ু পরীক্ষায় আবারও দুর্দান্ত দুই গোলরক্ষক। রাশিয়ার সমোদেভের প্রথম শটটি ফিরিয়ে দেন ক্রোয়াট গোলরক্ষক সুবাসিচ। প্রথম শটে ক্রোয়েশিয়ার ব্রোজোভিচ গোল করেন। তবে কোবাচিচের দ্বিতীয় শটটি আকিনফিভ ঠেকিয়ে দিলে সমতায় চলে আসে লড়াইটি। কিন্তু অতিরিক্ত সময়ে গোল করে দলকে সমতায় ফেরানোর নায়ক ফার্নান্দেস বল বাইরে মারলে পেনাল্টি শুট আউটে পিছিয়ে পড়ে রাশিয়া। শেষ তিন শটে মডরিচ, ভিদা এবং রাকিতিচ গোল করলে সেমিফাইনালে ওঠার আনন্দে মেতে ওঠে ক্রোয়াটরা। ভিআইপি গ্যালারিতে থাকা ক্রোয়েশিয়ার প্রেসিডেন্ট কলিন্দা গ্রাবার-কিতারোভিচ নাচতে থাকেন। আর রাশিয়ানরা ভেঙে পড়ে হতাশায়। কাঁদতে কাঁদতে মাঠ থেকে বের হয়ে যান স্পেনের বিপক্ষে টাইব্রেকারে রাশিয়ার জয়ের নায়ক অধিনায়ক আকিনফিভ। তার সঙ্গে কেঁদেছে পুরো রাশিয়ানরা।

আগের কোয়ার্টারে সুইডেনের বিপক্ষে শুরু থেকেই ইংল্যান্ড ছিল আক্রমণাত্মক। তবে বল পজিশনে এগিয়ে থাকলেও গোল করার মতো ভালো সুযোগ তৈরি করতে পারছিল না তারা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকটা গুছিয়ে ওঠে ইংলিশরা। সুইডেনের রক্ষণভাগে বারবার হানা দেয় থ্রি লায়ন্সরা। ম্যাচের ১৯ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে হ্যারি কেনের বুলেটগতির শট পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে গেলে হতাশায় ডুবে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। হ্যারি কেন-অ্যাশলে ইয়ংদের আক্রমণগুলো প্রতিহত হয়ে যায় সুইডিশ গোলরক্ষক রবিন ওলসেনের দৃঢ়তায়। বেশিক্ষণ গোলপোস্ট আগলে রাখতে পারেননি ওলসেন। ম্যাচের ৩০ মিনিটে প্রাপ্ত কর্নারকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যায় ১৯৬৬-এর বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা। অ্যাশলে ইংয়ের কর্নার থেকে লাফিয়ে উঠে দারুণ হেডে গোল করেন হ্যারি ম্যাগুইর। লিড নেওয়া ইংল্যান্ড গতিময় ফুটবল উপহার দিতে থাকে। তবে মাঝে মাঝে কাউন্টার অ্যাটাকে ইংলিশ রক্ষণে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে সুইডিশরা। কিন্তু গোল করার মতো সুযোগ তৈরি করেননি এমিল ফর্সবার্গরা। বিরতির ঠিক আগে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলের রাহিম স্টার্লিং। অফসাইডের ফাঁদ এড়িয়ে উড়ে আসা বল খুঁজে নেয় তাকে। ডি-বক্সের ভেতর গোলরক্ষককে কাটিয়ে যে শট নেন তাতে কোনোমতে হাত লাগান সুইডেন গোলরক্ষক ওলসেন। আবারও বল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যে শটটি নিয়েছিলেন স্টার্লিং, তা সুইডিশ এক খেলোয়াড় প্রতিহত করেন।

বিরতির পর ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করে জেন অ্যান্ডারসনের দল। সতীর্থের ক্রস থেকে মার্কাস বার্গের হেড বাঁ-দিকে ঝাঁপিয়ে অসাধারণভাবে ঠেকান ইংল্যান্ড গোলরক্ষক জর্ডান পিকফোর্ড। দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে একটু ধাক্কা খেলেও এরপর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণটা নিয়ে নেয় ইংলিশরা। ম্যাচের ৫৪ মিনিটে আবারও নায়ক হওয়ার সুযোগ হারান স্টার্লিং। বক্সের ভেতর থেকে ম্যানচেস্টার সিটির এ ফরোয়ার্ডের শট পোস্টের ওপর দিয়ে চলে যায়। তিন মিনিট পর আবারও গোলের আনন্দে ভাসে ইংলিশ শিবির। এবার নায়ক ডেলে আলি। বক্সের সামান্য বাইরে থেকে প্রথম গোলদাতা ম্যাগুইর ক্রস খুঁজে নেয় টটেনহাম হটস্পারের এ মিডফিল্ডারকে। অফসাইডের ফাঁদ ভেঙে হেডের মাধ্যমে গোল করেন আলি। ম্যাচটি মূলত তখনই শেষ হয়ে যায় সর্বশেষ ১৯৯৪ বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে খেলা সুইডেনের। তবে একটু পর আবারও সুইডেনকে হতাশায় ডোবান কলম্বিয়ার বিপক্ষে দ্বিতীয় রাউন্ডে ইংল্যান্ডের জয়ের নায়ক গোলরক্ষক পিকফোর্ড। ভিক্তর ক্লসেনের শট প্রতিহত করেন তিনি। আর ৭১ মিনিটে তো নিশ্চিত গোল থেকে দলকে বাঁচান এভারটনের এই গোলরক্ষক। বক্সের মধ্য থেকে মার্কাস বার্গের বাঁ পায়ের শট কর্নারের বিনিময়ে ফিরিয়ে দেন পিকফোর্ড।

বাকি সময়ে গোল পরিশোধ করতে পারেনি সুইডেন। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই জেগে ওঠে সামারার গ্যালারি। হ্যারি কেনদের নাম ধরে স্লোগান দিতে থাকে ইংলিশ সমর্থকরা। অপরপ্রান্তে কান্নায় ভেঙে পড়ে সুইডিশরা।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com