'বদর কমান্ডার' ফরিদ ফের আলোচনায়

সিলেট-৫

০৪ ডিসেম্বর ১৮ । ০০:০০

চয়ন চৌধুরী, সিলেট ও কাওছার আহমদ, কানাইঘাট

অষ্টম ও নবম জাতীয় নির্বাচনে সিলেট-৫ (কানাইঘাট-জকিগঞ্জ) আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হয়েছিলেন জামায়াত নেতা মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী। ২০০১ সালে বিএনপির সমর্থনে এমপি হলেও দ্বিতীয় দফায় ফরিদ উদ্দিন পরাজিত হন। ২০০৮ সালে নির্বাচনের পর একাত্তরে ফরিদ উদ্দিনের ভূমিকার বিষয়টি সামনে আসে। সেই সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নিলে আলোচনায় আসেন ফরিদ উদ্দিন। ২০১০ সালে ৪০ জন শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীর তালিকা করে সরকার, যাতে ২৪ নম্বরে তাকে রাখা হয়।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে অভিবাসন (ইমিগ্রেশন) পুলিশকে একটি তালিকা দেওয়া হয়। সে তালিকায় যথারীতি ফরিদ উদ্দিনের নাম ছিল। এ ছাড়া বিভিন্ন দূতাবাসে ৪০ যুদ্ধাপরাধীর তালিকা পাঠায় সরকার। পাঁচ বছর আগে বিএনপির সঙ্গে জামায়াত নির্বাচন প্রতিহত করতে আন্দোলনে নামে। ফলে ফরিদ উদ্দিন দশম সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হননি। এক দশক পর এই জামায়াত নেতা ফের সিলেট-৫ আসনে প্রার্থী হয়েছেন। নিজ দলের নিবন্ধন বাতিল হওয়ায় এবার তিনি বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করতে চান।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের তোড়জোড়ের মধ্যে গত মাসের শেষদিকে ফরিদ উদ্দিনের যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ এক সাক্ষাৎকারে ফরিদ উদ্দিনকে সরাসরি 'আলবদর বাহিনীর কমান্ডার' বলে অভিহিত করেন। জকিগঞ্জের বাসিন্দা মাসুক উদ্দিন জানান, মুক্তিযুদ্ধের সময় জামায়াত নেতা ফরিদ উদ্দিন সিলেট শহরতলি খাদিমনগরের আলবদর বাহিনীর ৩১ পাঞ্জাব হেড কোয়ার্টারে যোগ দিয়ে কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। মাসুক উদ্দিন আরও বলেন, একাত্তরে

তিনি সিলেট এমসি কলেজে বিএ পাস কোর্সে এবং ফরিদ উদ্দিন একই কলেজে বাংলা অনার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। যুদ্ধ শুরু হলে তিনি ভারতে গিয়ে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। একাত্তরে তিনি মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের দায়িত্বে ছিলেন। অন্যদিকে ফরিদ উদ্দিন দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আলবদর বাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ৩/৪ বছর ফরিদ উদ্দিন আত্মগোপনে ছিলেন বলে জানান মাসুক উদ্দিন।

সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিনের এই সাক্ষাৎকার সিলেটের স্থানীয় একটি অনলাইনে প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ভাইরাল হয়। সিলেট-৫ আসনে এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন মাসুক উদ্দিন। এ অবস্থায় মাসুক উদ্দিনের লন্ডন প্রবাসী ছেলে তামিম আহমদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দেন। গত ২৪ নভেম্বর দেওয়া স্ট্যাটাসে তিনি মাসুক উদ্দিন ও ফরিদ উদ্দিনের ছবি দিয়ে লেখেন, 'আশা করি নির্বাচনে লড়াই হবে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মাসুক উদ্দিন আহমদ ও আলবদর কমান্ডারের মধ্যে...।'

সিলেট-৫ আসনে বিতর্কিত এই জামায়াত নেতার পাশাপাশি ধানের শীষে নির্বাচন করতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন মামুনুর রশীদ ও শরীফ আহমদ লস্কর। জোটের শরিক দলের নেতা হিসেবে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না বিএনপি নেতারা। তবে ভেতরে ভেতরে এই আসনটি কলঙ্কমুক্ত করতে তারা এবার 'আলবদর বাহিনীর কমান্ডার' ফরিদ উদ্দিনকে চাইছেন না। কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলা এবং পৌর বিএনপির অন্তত ৭ জন নেতা সমকালকে বলেছেন, ফরিদ উদ্দিনকে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। এবার তিনি জোটের প্রার্থী হলে দুই উপজেলা বিএনপি সাংগঠনিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

সিলেট-৫ আসনের সাবেক এমপি ও সিলেট জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবদুল কাহির চৌধুরী সমকালকে বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ নিশ্চয় জেনে-শুনে ফরিদ উদ্দিনকে আলবদর কমান্ডার বলেছেন। জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও কানাইঘাট উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, মুক্তিযুদ্ধে ফরিদ উদ্দিনের অবস্থান জামায়াত নেতাদের ভালো করে জানা আছে। কানাইঘাট উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমির মাওলানা আবদুল করিম বলেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় ফরিদ উদ্দিনের ভূমিকা কী ছিল, তার জানা নেই।

এ প্রসঙ্গে মাওলানা ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী সমকালকে বলেন, ১৯৮৬ সাল থেকে কানাইঘাট-জকিগঞ্জ উপজেলায় শত শত সভা-সমাবেশ করেছি। কেউ কখনও যুদ্ধাপরাধী বলেনি বা বাধা দেয়নি। ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালেও নির্বাচন করেছি। তখনও কেউ অভিযোগ আনেনি। এ ব্যাপারে থানায় কোনো জিডি পর্যন্ত নেই। প্রায় ৮ বছর আগে শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই সরকারের সময়ে কত তালিকা হয়েছে! দুই নম্বরি থেকে দশ নম্বরি পর্যন্ত তালিকা; এর কোনো ভিত্তি নেই।







© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com