বাংলাদেশে পরমাণু চিকিৎসা

স্বাস্থ্যসেবা

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

রুশো তাহের

শক্তির অপার উৎস পরমাণু। কিন্তু এই উৎসের সঙ্গে মানবজাতির প্রথম পরিচয় ঘটে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ভয়ানক ধ্বংসযজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। এই ধ্বংসযজ্ঞতা এত তীব্র ও অকল্পনীয় ছিল যে, খোদ পরমাণু বিজ্ঞানীরাও নির্বাক হয়ে যান। বস্তুত এরপর থেকে পারমাণবিক শক্তিকে শান্তিপূর্ণ কাজে লাগিয়ে মানবকল্যাণের প্রচেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেন বিজ্ঞানীরা। গবেষণার ফলে পরমাণুর অপার শক্তির উৎসকে শান্তিপূর্ণ কাজে প্রয়োগের বাতায়ন খুলে যায় বিজ্ঞানীদের সামনে। আর এই শক্তির নানামুখী শান্তিপূর্ণ ব্যবহারে ক্রমান্বয়ে পৃথিবীর চেহারাই বদলে যাচ্ছে। এর অন্যতম একটি দৃষ্টান্ত হচ্ছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে চিকিৎসায় পরমাণু শক্তির ব্যবহার। বাংলাদেশও এ ক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। বস্তুত বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীন পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে নানা দুরারোগ্য ব্যাধি শনাক্তকরণ ও চিকিৎসায় প্রয়োগ করা হচ্ছে পরমাণু শক্তি।

বাংলাদেশের প্রথম পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রটি স্থাপিত হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে ১৯৬১ সালে। কেন্দ্রটির বর্তমান নাম ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস। ঢাকার শাহবাগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস রয়েছে। এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস এবং স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে দুটি, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, সিলেট, রাজশাহী, দিনাজপুর, রংপুর, খুলনা, বরিশাল, ফরিদপুর, বগুড়া, কুমিল্লা ও কক্সবাজারে একটি করে সর্বমোট ১৪টি ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস রয়েছে। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় পাঁচ লাখ রোগীকে স্বল্প ব্যয়ে আধুনিক ও উন্নততর চিকিৎসাসেবা প্রদান করা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ২০২০ সালের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হবে আরও ৮টি নতুন ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস। বস্তুত এর মাধ্যমে দূরদূরান্তের রোগীদের দোরগোড়ায় পারমাণবিক চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেবে সরকার।

পরমাণু চিকিৎসা যেহেতু একটি বিশেষায়িত চিকিৎসা ব্যবস্থা, সেহেতু সেগুলোতে ব্যবহূত হয় বিশেষায়িত যন্ত্র, যেমন- পেট সিটি, স্পেক্ট সিটি, স্পেক্ট গামা ক্যামেরা ও বিভিন্ন ধরনের হরমোন অ্যানালাইসিস সংক্রান্ত যন্ত্রপাতি। এ ছাড়াও কেন্দ্রগুলোতে অন্যান্য যন্ত্র, যেমন- অত্যাধুনিক আলট্রাসাউন্ড, কালার ডপলার, বিএমডি প্রভৃতি ব্যবহূত হয়। এসব যন্ত্রপাতির সাহায্যে থাইরয়েড, ব্রেইন, বোন, কিডনি, লিভার, ব্রেস্ট, হার্ট, ফুসফুসসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রোগ দ্রুত ও সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায়। ফলে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসা যথাসময়ে করা সম্ভব হয়। সংশ্নিষ্ট পরমাণু চিকিৎসকদের মতে, পারমাণবিক চিকিৎসায় বিশেষত ক্যান্সার রোগের উপসর্গ প্রকাশ পাওয়ার আগেই পূর্বাভাস প্রদান করা সম্ভব। ফলে এই দুরারোগ্য ব্যাধির চিকিৎসা আগেভাগে শুরু করা যায়। এছাড়া শিগগিরই পরমাণু শক্তি কমিশনের নিজস্ব 'সাইক্লোট্রোন' নামক যন্ত্র ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস স্থাপিত হতে যাচ্ছে। যার মাধ্যমে ঢাকায় অবস্থিত পেট সিটির প্রয়োজনীয় রেডিও ফার্মাসিউটিক্যালের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হবে। অদূর ভবিষ্যতে সাভার, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহে পেট সিটি সুবিধাসহ আরও তিনটি সাইক্লোট্রোন স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। এতে একাধারে যেমন জনগণ দেশের মধ্যেই আধুনিক চিকিৎসাসেবার সুযোগ পাবে, তেমনি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে।

শেখ হাসিনার সরকার এ দেশের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরমাণু শক্তি কমিশনের বিভিন্ন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও আধুনিকায়ন ও বিশ্বমানে নিয়ে যাওয়ার জন্য ইতিমধ্যে অনেক কাজ সম্পন্ন করেছে এবং বর্তমানে অনেক উন্নয়ন  প্রকল্পের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। ফলে এসব বিশেষায়িত পারমাণবিক চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো

থেকে রোগীদের সেবার পরিধি ও মান অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও অনেক গুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।

ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস দেশের একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে চিকিৎসকদের নিউক্লিয়ার মেডিসিনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি (এমডি নিউক্লিয়ার মেডিসিন) পড়ার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ছাত্ররা তাদের শিক্ষা কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রশিক্ষণের জন্য নিয়মিতভাবে এই ইনস্টিটিউটে আসেন। এই ইনস্টিটিউটের সহায়তায় অনেকে তাদের গবেষণাকর্ম সম্পন্ন করেন।

নিউক্লিয়ার মেডিসিন আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিশেষ শাখা যেখানে চিকিৎসা বিজ্ঞানের পাশাপাশি পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, গণিত, ইলেকট্রনিক্সসহ অন্যান্য বিষয়ের গবেষণালব্ধ জ্ঞানের সন্নিবেশ ঘটে থাকে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই বিশেষায়িত শাখার উন্নয়নের জন্য এবং রোগীদের উন্নততর ও আধুনিক সেবা প্রদানের জন্য পরমাণু শক্তি কমিশনের ইনস্টিটিউটগুলোতে বিভিন্ন ধরনের গবেষণার সুযোগ রয়েছে।

বর্তমানে মানবদেহের রোগ নির্ণয়ের জন্য মলিবডেনাম-৯৯/টেকনিসিয়াম-৯৯ এম জেনারেটর সাভারস্থ পরমাণু শক্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে উৎপাদনপূর্বক দেশের সব নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেন্টার এবং বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে সরবরাহ করে দেশের চাহিদা পূরণ করছে। এ ছাড়াও মানবদেহের রোগ নির্ণয় ও নিরাময়ে স্বল্প ব্যয়ে বাল্ক্ক আয়োডিন-১৩১ দ্রবণ ডিসপেন্স করে বিভিন্ন নিউক্লিয়ার মেডিসিন সেন্টারে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে।

পরমাণু চিকিৎসা মানবজাতির জন্য এক আশীর্বাদস্বরূপ, যা পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের প্রকৃষ্ট এক উদাহরণ। দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও পথপরিক্রমায় বাংলাদেশের পরমাণু চিকিৎসা আন্তর্জাতিক মানে উত্তীর্ণ হয়েছে। পারমাণবিক শক্তিকে শান্তিপূর্ণ কাজে প্রয়োগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক, বিশেষত আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার কিছু গাইড লাইন অনুসরণ করতে হয়। বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের পরমাণু চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বাংলাদেশের পরমাণু চিকিৎসা কেন্দ্রগুলোতে সেবাগ্রহীতা ও চিকিৎসকদের রেডিয়েশন ডোজ আন্তর্জাতিক গাইড লাইন মেনেই নির্ধারণ করা হয়েছে। তাই দেশের আপামর জনগণ বিশ্বমানের ও অত্যন্ত সহজলভ্য (যেহেতু সরকার এ ক্ষেত্রে প্রচুর ভর্তুকি দিয়ে থাকে) এ চিকিৎসাসেবাটি নির্ভয়ে ও স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে গ্রহণ করতে পারে।

বিজ্ঞান লেখক ও গবেষক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)