একুশের স্মৃতি-৭

১৫০ মোগলটুলীতে বহুতল মার্কেট

০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

দীপন নন্দী

গত শতাব্দীর চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি ব্যাপক পরিবর্তন আসে বাঙালি মুসলমানের রাজনীতিতে। এ পরিবর্তনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখেন তৎকালীন জেলা শহর ঢাকার ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে স্থাপিত মুসলিম লীগ পার্টিহাউসের নেতাকর্মীরা। উপমহাদেশ বিভক্তির আগে ঢাকার ১৫০ মোগলটুলীতে স্থাপিত হয়েছিল 'ওয়ার্কার্স ক্যাম্প' ও মুসলিম লীগ পার্টিহাউস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের পথ বেয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও এটি বিরোধী রাজনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চকবাজার থেকে খানিকটা এগিয়ে অবস্থিত ১৫০ মোগলটুলী ভবন ছিল পঞ্চাশ ও ষাট দশকের প্রগতিশীল ছাত্র-যুবক ও রাজনৈতিক কর্মীদের মিলনকেন্দ্র।

কিন্তু কালের আবর্তনে সাড়ে তিন দশক আগে এ ভবনও হারিয়ে গেছে। চকবাজারের আরও দশটি ভবনের মতো এটিতেও গড়ে উঠেছে বহুতল মার্কেট। তবে ভাষা আন্দোলনের সময় এখানকার পরিস্থিতি ছিল অন্যরকম। এখান থেকে তখন একটি সুশৃঙ্খল কর্মী বাহিনী গড়ে তোলা হয়, যারা ভাষা আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কার্যক্রম চালান। ঢাকায় গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন, গণতান্ত্রিক যুবলীগ ও আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় ১৫০ মোগলটুলীর নেতাকর্মীরা ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময়েও মুক্তিযোদ্ধাদের গোপন ঘাঁটি ও যোগাযোগ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে এ ভবন।

ঢাকা শহরের আদি অধিবাসী আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, ভাষাসংগ্রামী শওকত আলী ছিলেন ১৫০ মোগলটুলীর মূল তত্ত্বাবধায়ক। বাড়িভাড়া থেকে শুরু করে সার্বক্ষণিক পার্টির কর্মীদের খাওয়াদাওয়া ইত্যাদি সব ব্যবস্থাই করতেন তিনি।

১৫০ মোগলটুলী প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' বইয়ে লিখেছেন, 'মোগলটুলীতে যুবলীগের (পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির যুব সংগঠন) অফিস ছিল। আমরা বোর্ডটা নামিয়ে দিলাম। এর মধ্যেই তারা মেনিফেস্টো ছাপিয়ে ফেলেছে। অফিসেও নিয়ে এসেছে। শওকত মিয়াই এই অফিসের কর্তা। তিনি হুকুম দিলেন যুবলীগের সবকিছু এখান থেকে নিয়ে যেতে। কে নেবে? কাউকেও দেখা গেল না। পুলিশ অফিসে তল্লাশি দিল। আমাদের নামও আইবি খাতায় উঠল। ১৫০ নম্বর মোগলটুলী থেকে পাকিস্তানের আন্দোলন হয়েছে, সেই লীগ অফিসেই এখন গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারীরা পাহারা দিতে শুরু করল গোপনে গোপনে। আমরা শহীদ সাহেবের (হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী) ভক্ত ছিলাম। এটাই আমাদের দোষ। আমরা সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য যাতে বজায় থাকে, সে চেষ্টাই করতে থাকলাম।'

ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও ঐতিহাসিক ছয় দফার অন্যতম প্রণয়নকারী বাহাউদ্দীন চৌধুরী ২০০৮ সালে দৈনিক জনকণ্ঠের ঈদসংখ্যায় এক নিবন্ধে লিখেছেন, 'ঢাকায় গণতান্ত্রিক কর্মী সম্মেলন, গণতান্ত্রিক যুবলীগ ও আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠায় ১৫০ মোগলটুলীর নেতাকর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সংবিধানের মূলনীতি কমিটি আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, মেডিকেল স্কুলের আন্দোলনসহ সরকারবিরোধী সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনের কর্মী বাহিনী গড়ে ওঠে প্রধানত ১৫০ মোগলটুলীর নেতাকর্মীদের দিয়ে। বাঙালি মুসলমানদের রাজনীতিতে মধ্যযুগীয় ফিউডাল চিন্তাচেতনা ও নেতৃত্ব থেকে আধুনিকতামনস্ক মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত, পেশাজীবী শিক্ষিতদের উদার রাজনীতির অভ্যুদয়ে ১৫০ মোগলটুলী অবিস্মরণীয় অবদান রেখেছে।'

১৯৭৫ সালে শওকত আলীর মৃত্যু ঘটে। তার পরিবার এর পরও কয়েক বছর এখানে বসবাস করেছেন। পরে তারা বাসাটি বিক্রি করে দেন। নতুন স্বত্বাধিকারী বাড়িটি ভেঙে ফেলে। সেখানে গড়ে ওঠে হায়দার মার্কেট। ছয়তলা এ মার্কেটের বর্তমান কেয়ারটেকার নান্নু মোড়ল সমকালকে জানান, ভাষা আন্দোলনের সময় তার বাবা শুক্কুর মোড়ল এ বাড়ির কেয়ারটেকার ছিলেন। তার কাছ থেকেও তিনি শুনেছেন, এ স্থানের ভবনটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

শওকত আলীর ছেলে মহিউদ্দিন আল আমান সমকালকে বলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের খবর শোনার মাত্র তিন দিন পর স্ট্রোক করে তার বাবা মারা যান। এর পর তাদের পরিবারের ওপর নানা চাপ আসতে থাকে। এমন প্রেক্ষাপটে আড়াই বছরের মাথায় বাড়িটি ছেড়ে দেন তারা। অন্তত একটি স্মৃতিফলক কিংবা ভাস্কর্য করে হলেও এ স্থানটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বর্তমান প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তিনি।



© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]