সাক্ষাৎকার: ড. ইশরাত ইসলাম

ঢাকা নিয়ে পরিকল্পনা আছে বাস্তবায়ন নেই

০৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | Updated ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

ড. ইশরাত ইসলাম অধ্যাপনা করছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগে। তিনি জাপানের কিয়োটোর রিৎসু মেকান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন ২০০৮ সালে। নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনায় তার অবদান উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তিনি ভূমিকম্প, ঢাকার জলাভূমির ভবিষ্যৎ, পরিবেশসহ অন্যান্য বিষয় নিয়েও কাজ করেছেন। সমকালের সঙ্গে তিনি নগর পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলেন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ  করেছেন- তাসলিমা তামান্না

সমকাল :ঢাকা দেশের রাজধানী ও সবচেয়ে বড় শহর। তারপরও বসবাসের দিক দিয়ে এটি বিশ্বের অনুপযোগী শহরের মধ্যে এগিয়ে আছে। ঢাকার এ অবস্থার কারণ কী?

ইশরাত ইসলাম :ঢাকা হচ্ছে জাদুর শহর। যতই সমস্যা থাকুক, এখানে মানুষ জীবিকার সন্ধানে আসে। তবে এই শহরটা সবার ভালোবাসার শহর কি-না, সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। কারণ যখনই একটা ছুটির সময় হয়, তখনই সবাই যার যার শিকড়ের কাছে চলে যায়।

সমকাল :জীবিকার টানে এলেও শহরটাকে ভালোবাসতে পারে না কেন? অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠার কারণেই এটি কি আকর্ষণ তৈরি করতে পারছে না?

ইশরাত ইসলাম :অনেক সময় ঢাকাকে অপরিকল্পিত শহর বলা হয়। কিন্তু ১৯৫৯ সাল বা তার আগে ১৯১৭ সালে স্কটিশ পরিকল্পনাবিদ স্যার প্যাট্রিক গেডেস ঢাকা শহরের পরিকল্পনার কথা বলে গেছেন। ১৯৫৯-এ ঢাকার মাস্টার প্ল্যান, ১৯৯৫-এ স্ট্রাকচার প্ল্যান, এর পর ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান হয়েছে। আরেকটা পরিকল্পনা শেষের পথে। এ কারণে এটাকে অপরিকল্পিত শহর বলা ঠিক হবে না। এর মূল সংকট পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়িত হয় না।

সমকাল : পরিকল্পনা বাস্তবায়ন না হওয়ার

কারণ কী?

ইশরাত ইসলাম :পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করার জন্য কিছু টুল্‌স বা হাতিয়ার লাগে। ট্যাক্সেশন নীতি, আইনের প্রয়োগ; এগুলো ঠিকমতো না হলে পরিকল্পনা ঠিকমতো বাস্তবায়িত হবে না। পরিকল্পনায় যা বলা হয়, তা পূরণ করতে হলে আইনের সাহায্য নিতে হবে। দেশে জলাধার আইন আছে, কিন্তু এর কোনো প্রয়োগ নেই। ঢাকা শহরের বেশিরভাগ বাড়িঘর নিয়মকানুন মেনে তৈরি হয়নি। অথচ ইমারত বিধিমালা, বিল্ডিং কোড আছে। এখন পর্যন্ত যেসব পরিকল্পনা হয়েছে সবই কিন্তু আইনগত দলিল। সেই পরিকল্পনা পালন করা না হলে, সেটা আইন লঙ্ঘন। কিন্তু এ জন্য কেউ দোষী হয়নি, কারও সেভাবে শাস্তিও হয়নি। আইন ভাঙা যেন একটা সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সবাই ধরে নিয়েছে- এভাবেই বিষয়গুলো চলতে থাকবে।

সমকাল :আইন না মানার সংস্কৃতির পেছনে একটি কারণ কি আবাসনের ওপর তীব্র চাপ? ঢাকা শহরমুখী জনস্রোতের চাপ কমানোর উপায় কী?

ইশরাত ইসলাম :বিকেন্দ্রীকরণই এর প্রধান উপায়। মানুষ সেখানেই আসবে, যেখানে সুযোগ-সুবিধা বেশি থাকবে। প্রধানত কাজের সুবিধার জন্যই মানুষ ঢাকা আসছে। উন্নত শিক্ষা, ভালো স্বাস্থ্যসেবা পেতেও সবাইকে ঢাকায় আসতে হচ্ছে। অথচ দেশে ৬৪টি জেলা আছে। সেখানে কত মানুষ আছে, কী ধরনের সুবিধা দিলে তারা ঢাকায় আসবে না, এগুলো গবেষণার বিষয়।

সমকাল :শহরে যেসব প্লট বরাদ্দ করা হচ্ছে, তার অধিকাংশই মধ্যবিত্ত ও ধনীদের জন্য। শহরে তো দরিদ্র মানুষও বসবাস করছে। তাদের আবাসনের জন্য কী ব্যবস্থা হতে পারে?

ইশরাত ইসলাম :ঢাকায় কিছু ছিন্নমূল মানুষ আছে। তবে বেশিরভাগই কোনো না কোনো ব্যবস্থা করে কোথাও থাকছে। যেমন- গার্মেন্টে কাজ করা একটা মেয়ে আরও দু'জন মেয়ের সঙ্গে একটা ঘরে থাকছে। রুমের আকৃতি হয়তো ১০ ফুট বাই ১০ ফুট। অর্থাৎ তার জায়গার চাহিদা খুবই কম। দুর্ভাগ্যজনক হলো, আমাদের আবাসন খাত এই সামান্য জায়গাও সুলভ করে তুলতে পারছে না। গবেষণায় দেখা গেছে, আনুষ্ঠানিক আবাসিক এলাকার চেয়ে বস্তিতে প্রতি বর্গফুটে ভাড়া বেশি। আবার যে বস্তিতে তারা ভাড়া থাকছে, সেগুলো হয়তো কেউ একজন দখল করে আছে। জমিটা সরকারের হলেও সরকারি কোষাগারে সেই ভাড়াটা যাচ্ছে না। অথচ এই জমিগুলো থেকেই কিছু প্রকল্প করা যায়, যেগুলো হবে ভাড়াভিত্তিক। গার্মেন্ট কিংবা শিল্প-কারখানার সঙ্গেও এই ব্যবস্থাগুলো হতে পারে। অফিসগুলো কিছু ডরমিটরি ভাড়া নেবে তাদের কর্মচারীদের জন্য। এর পর কর্মীর সামর্থ্য অনুযায়ী বাড়ি ভাড়াটা কেটে নিতে পারে। এ ধরনের প্রকল্পের জন্য উদ্যোগ ও সদিচ্ছা দরকার।

সমকাল :আমরা তো বরং ভাড়া আবাসনের

চাহিদা মেটানোর বদলে প্লট বরাদ্দভিত্তিক প্রকল্প

বেশি দেখছি।

ইশরাত ইসলাম :সরকারি উদ্যোগে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের প্লট দেওয়া সরকারের বন্ধ করা উচিত। এ ব্যবস্থায় গরিব মানুষের জমি নিয়ে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তদের বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কমে জমিটা দিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটা খুবই অনৈতিক। উন্নত দেশে সরকার প্রথম বাড়ির জন্য ঋণ সুবিধা দেয়। কিন্তু দ্বিতীয়বারের ক্ষেত্রে মালিককে উচ্চ কর দিতে হয়। আমাদের এখানে যার জমি আছে. তার আবার ফ্ল্যাটও আছে। এক ব্যক্তি ১০ কাঠার বেশি জমির মালিকানা নিতে পারবে না, নিলেও উচ্চ পরিমাণে কর দিতে হবে- এমন নিয়ম করা গেলে একজনেরই এত জমি-বাড়ি থাকত না। করপোরেট হিসাবেও জমির একটা পরিমাণ ঠিক করা দরকার। জমিটা কিনে ১০ বছর রেখে বিক্রি করে যত টাকা আয় হয়, তার একটা বড় অংশ কর পরিশোধ করার নিয়ম থাকলে সবার জমি কিনে ব্যবসা করার প্রবণতা কমত।

সমকাল :ভাসানটেকে তো নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ প্রকল্প করা হয়েছিল। কিন্তু এগুলোর অধিকাংশই যাদের পাওয়ার কথা, তারা পায়নি। এর সমাধান কী?

ইশরাত ইসলাম :ভাসানটেক প্রকল্প কাদের জন্য করা হয়েছিল- এটা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। একজন সাধারণ মানুষ ৫০০ বর্গফুটের একটা ফ্ল্যাট কিনতে পারে না। ওই মানুষটার জন্য চার লাখ টাকা জোগাড় করাও কঠিন। তার সামর্থ্যের সীমা অনুযায়ীই আবাসনের জোগান দেওয়া উচিত। সে হয়তো বাড়িটা ভাড়া নেবে। এমন প্রকল্পের আওতায় বাড়িটা কাকে দেওয়া হচ্ছে, সে কোথা থেকে এসেছে- এই তথ্যগুলোর জন্য আলাদা মনিটরিং সেল দরকার।

সমকাল : ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইশতেহারে এবার 'আমার গ্রাম-আমার শহর' শিরোনামে বিশেষ অঙ্গীকারে গ্রামে শহরের সুবিধা দেওয়ার কথা উল্লেখ করেছে। এ বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

ইশরাত ইসলাম :গ্রামে শহরের সুবিধা দিতে গিয়ে যদি গ্রামকেই শহর করে ফেলা হয়, সেটা আমাদের চাওয়া নয়। গ্রামের মানুষদের পানি, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা- এ সুবিধাগুলো দিতে হবে। গ্রামের সঙ্গে শহরের যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত বা বিপণনের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক কৃষকের ক্ষেতের ফসল ক্ষেতেই থেকে যায়। গ্রামে যদি কিছু শিল্প-কারখানা বা হিমাগারের ব্যবস্থা থাকে, তাহলে মানুষ কৃষি উৎপাদন বাড়াতে পারবে। গ্রামের মানুষ তাদের প্রয়োজনে স্বচ্ছন্দে শহরে আসবে। নিজেদের উৎপাদন দিয়ে শহরকে সহযোগিতা করবে। গ্রাম-শহরের মধ্যে একটা বিনিময় থাকবে।

সমকাল :নতুন ঢাকার কথা আমরা অনেক সময় বলে থাকি। পূর্বাচলে নতুন শহর তৈরির পরিকল্পনা চলছে। এতে মূল ঢাকার চাপ কতখানি কমবে বলে মনে করেন?

ইশরাত ইসলাম :পূর্বাচলে ১০ লাখ মানুষের থাকার জন্য নকশা করা হয়েছে। ওই এলাকার ঘনত্ব অনুযায়ী সেখানে তিন বা চারতলার বেশি ভবন হওয়া উচিত নয়। ওখানে যদি পাঁচ কাঠার প্লটে আট-দশতলা করা হয়, তাহলে অনেক মানুষ ওখানে থাকবে। তখন যে সুবিধাগুলো এখানে দেওয়া হয়েছে, সেটা আবার ওখানকার জনসংখ্যার জন্য অপ্রতুল হয়ে যাবে। পূর্বাচলের আশপাশে এখন প্রচুর বেসরকারি আবাসন আসছে। সেখানে যে রাস্তা করা হচ্ছে এখনকার বাস্তবতায় সেটা যথেষ্ট মনে হতে পারে। কিন্তু ওখানে যখন সবাই থাকা শুরু করবে, তখন আশপাশের ডেভেলপাররা পূর্বাচলের সুবিধাটা নিতে চাইবে। পরিবহন ব্যবস্থা, ভূমি ব্যবহার, পূর্বাচলের বাইরে কতগুলো প্রজেক্ট আছে, কত মানুষ থাকবে এবং রাস্তাগুলোর ওপর কেমন চাপ পড়বে- ওগুলো নিয়ে আরও গবেষণা করা দরকার। কারণ সবাই নিজের অংশটা নিয়েই গবেষণা করে। কিন্তু সব প্রকল্পের সম্মিলিত ফলাফল কী হবে, সেটা নিয়ে কেউ ভাবে না।

সমকাল :সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

ইশরাত ইসলাম :ধন্যবাদ।

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: ad.samakalonline@outlook.com