বিপিএলে মনে রাখার মতো ৫ ম্যাচ

০৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

লম্বা একটা জার্নি; শুরু হয়েছিল নতুন বছরের সূচনালগ্নে। শেষ হলো গতকাল। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে মাঠে গড়ানো চার-ছক্কার এই টর্নামেন্টে কেউ হেসেছে, কেউ হয়েছে হতাশ। কারও প্রাপ্তির পাল্লা হালকা, কারও আবার ভারী। কারও স্বপ্ন হয়েছে পূরণ, কারও হয়তো রয়ে গেছে অপূর্ণ। এমন অজস্র হর্ষ-বিষাদের মাঝেও ছিল ভালো লাগা, ছিল উপভোগ্য কিছু ম্যাচ, মন মাতানো কিছুক্ষণ। হোক না দিন শেষে জয়-পরাজয়। তারপরও কিছুটা হলেও ক্রিকেটের আসল সৌন্দর্য কাছ থেকে দেখা কিংবা ক্রিকেটের প্রেমে বুঁদ হওয়া। বিপিএলের ষষ্ঠ আসরে হয়ে যাওয়া তেমন পাঁচটি ম্যাচ নিয়ে আজকের এই প্রতিবেদন। যে ম্যাচগুলো বোধ হয় এখনও আপনার মনে দাগ কেটে আছে। এখনও চোখে ভাসছে ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলের দৃশ্য, কোনো আফসোস আর দীর্ঘশ্বাসের খণ্ডচিত্র। লিখেছেন

জহির উদ্দিন মিশু

১ রানের রোমাঞ্চ

সুনিল নারিন, কিয়েরন পোলার্ড, আন্দ্রে রাসেলের মতো তিন তারকা যখন ঢাকা ডায়নামাইটসের ডেরায়, তখন ১২৮ রান করা নিশ্চয়ই খুব কঠিন হওয়ার কথা না। তার ওপর বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসানের ঢাকা। কিন্তু সে ম্যাচে এমনসব সমীকরণ পাল্টে নতুন চমক দেখাল কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। তাতে অবশ্য ভিক্টোরিয়ান্সের বোলাররা বাহবা পাওয়ার দাবিদার। আরেকটু সহজ করে বললে মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। বল হাতে সেদিন দ্যুতি ছড়ান এই পেসার। যার সুবাদে মাত্র এক রান দূরে ডুবে যায় ঢাকার জয়ভেলা। বিপিএলের ৩৯তম ম্যাচ। আগে ব্যাট করে ১২৭ রান সংগ্রহ করে কুমিল্লা। মামুলি সংগ্রহ মাথায় নিয়ে ঢাকাও জবাব দিতে নামে খোশমেজাজে। কিন্তু কুমিল্লা এত সহজে হাল ছাড়লে তো! দুর্দান্ত বোলিং, ফিল্ডিংয়ে ঢাকাকে আটকে দেয়। একাধিকবার ম্যাচের মোড় ঘুরলেও শেষ ওভারে এসে যোগ হয় বাড়তি রোমাঞ্চ, বাড়তি উত্তেজনা। যে রোমাঞ্চের প্রণেতা সাইফউদ্দিন। শেষ ওভারে জিততে ১২ রান প্রয়োজন ছিল ঢাকার। যদিও তারকা ব্যাটসম্যানরা আগেই সাজঘরে ফিরেছেন। সে জন্য ভরসা দেওয়ার মতো একজন- আন্দ্রে রাসেল। মারকুটে একজন ব্যাটসম্যান। বল হাতে যেমন-তেমন, ব্যাট হাতে যে কতটা শক্তিশালী সেটা ক্রিকেটপ্রেমীরা ভালো করেই জানত। খোদ কুমিল্লাও টেনশনে পড়ে যায়। ১২ রান টি২০ ক্রিকেটে খুব একটা বড় কিছু নয়। কিন্তু সাইফউদ্দিন সেটাকে বড় করে দিলেন, খালি বড় নয়, পাহাড় বানিয়ে ফেলেন। প্রথম বলে রুবেল হোসেনকে ফিরিয়ে দেন সাইফউদ্দিন। পরের বলে এক রান নিয়ে রাসেলকে স্ট্রাইক দেন সাহাদাত হোসেন। পরের দুই বল খেয়ে বসেন রাসেল। এমন সময় ডট মানে উল্টো বোঝা বাড়ল। তবে পঞ্চম বলে সাইফউদ্দিনকে ছক্কা মেরে বোঝা অনেকটা হালকা করেন রাসেল। তারপরও শেষ বলে দরকার আরও ছয় রান। রাসেল মেরেছেন ঠিকই, তবে ছক্কা নয়, চার।



আলিস-চমক

আলিস আল ইসলাম, নামটা সে দিনের আগে হয়তো খুব অল্প লোকেই জানত। জানবে কী করে। নেট বোলার হিসেবে নজর কাড়েন এই আলিস। সেখান থেকে বিপিএলে নাম লেখানো। আর প্রথম ম্যাচেই কি-না চমকে দেন সবাইকে। বিপিএলের হ্যাটট্রিকম্যানদের কাতারে চলে আসেন। যার সুবাদে ঢাকা ডায়নামাইটসও ম্যাচটা জিতে নেয় দুই রানে। বিপিএলের নবম ম্যাচ। মিরপুরের সেই লড়াইয়ে টুর্নামেন্টর বিগ টু- রংপুর রাইডার্স আর ঢাকা। আগে ব্যাট করতে নেমে ৯ উইকেটে সাকিবরা সংগ্রহ করে ১৮৩ রান। চার-ছক্কার এই ফরম্যাটে নিঃসন্দেহে এটা চ্যালেঞ্জিং একটা সংগ্রহ। কিন্তু প্রতিপক্ষ যখন রংপুর, তখন এই চ্যালেঞ্জ টপকে যাওয়া খুব একটা কঠিন হওয়ার কথা নয়। সেভাবে এগোচ্ছিল রংপুর। ১৭ ওভারে ৪ উইকেট খুইয়ে জমা করে ১৫৮ রান। সে ক্ষেত্রে জিততে হলে শেষ ১৮ বলে রংপুরের প্রয়োজন ছিল ২৬ রান। একেবারে মামুলি। কিন্তু ১৮ নম্বর ওভারে বল করতে আসা আলিস রীতিমত ভড়কে দেন সবাইকে। চতুর্থ বলে সেট ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ মিঠুনকে ফিরিয়ে দেন সাজঘরে। পরের বলে রংপুরের ক্যাপ্টেন মাশরাফি বিন মুর্তজাকে বিদায় করেন। তিন নম্বর বলে ফরহাদ রেজাকে মাঠছাড়া করে বাঁধভাঙা উল্লাসে মাতেন আলিস। ততক্ষণে চারদিক থেকে তাকে ঘিরে উদযাপন করেন সতীর্থরা। নিজের প্রথম টি২০ ম্যাচ, সেখানেই কি-না হ্যাটট্রিক।



সুপার ওভারে সুপার লড়াই

সুপার ওভার আর ফ্রাইলিঙ্ক। বিপিএলের ইতিহাস হয়তো এই বাক্যটা অনেক দিন ধরে রাখবে রেকর্ডবুকে। সুপারওভারের সঙ্গে এই নামটা যোগ করলে লড়াইটাও যে সুপার হয়ে যায়। কারণ সেই ম্যাচের রোমাঞ্চটা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন এই ফ্রাইলিঙ্ক। তাতে চিটাগং ভাইকিংস যেমন রাতভার তাকে নিয়ে পার্টি করেছে, খুলনা টাইটান্সও না জানি তাকে নিয়ে কতক্ষণ ভেবেছিল। ১১তম ম্যাচ, মিরপুর শেরেবাংলায় টস জিতে খুলনাকে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ ভাইকিংস দলনেতা মুশফিকুর রহিমের। খুলনা একেবারে মন্দ ব্যাটিং করেনি। টেনেটুনে ১৫০ পার করে। টার্গেট বড় না হওয়ায় চিটাগং হয়তো জয়ের ব্যপারে একটু নিশ্চিন্তই ছিল। কিন্তু ২২ গজে নেমে বুঝল কত ধানে কত চাল! খুলনার বোলারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে শেষ পর্যন্ত জয়ের বন্দরে নোঙর করার আগে থেমে যায় চিটাগং ভাইকিংস। তাও আবার স্কোর সমান করে। যার সুবাদে বিপিএল দেখল প্রথম সুপার ওভার। ছয় বলের সেই লড়াইয়েও দারুণ দ্বৈরথ জমিয়ে দিলেন রবি ফ্রাইলিঙ্ক। সুপারওভারে ১১ রান তোলে চিটাগং। ১২ রানের লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নামে খুলনা। বোলিং করার দায়িত্ব ফ্রাইলিঙ্কের কাঁধে। ব্যাটিংয়ে মালান ও কার্লোস ব্রাথওয়েট। প্রথম বল রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে খেলে এক রান আদায় করেন ব্রাথওয়েট। দ্বিতীয় বলে মালান ফ্রাইলিঙ্ককে হাঁকান বাউন্ডারি। পরের বলে যোগ করেন আরও দুই রান। সে ক্ষেত্রে প্রথম তিন বল থেকে আনায়াসে সাত রান জমা করে খুলনা। চতুর্থ বল; সজোরে চালাতে গিয়ে ব্যাটে-বলে খুব একটা মেলেনি। তারপরও রান নিতে হবে। কিন্তু অতিরিক্ত ঝুঁকি নিলে যা হয়, শেষ পর্যন্ত রানআউট। অবশ্য অপর প্রান্তে থাকা ব্রাথওয়েট কাটা পড়েন। পাঁচ নম্বর বল থেকে উইকেটে আসা নতুন ব্যাটসম্যান স্টার্লিং আরও দুই রান করেন। ফলে জেতার জন্য ছয় নম্বর বল থেকে খুলনার প্রয়োজন ছিল তিন রান। স্নায়ুঠাসা মুহূর্ত, গ্যালারি থেকে ভেসে আসছে করতালি। ডাগআউটে দাঁড়িয়ে দুই দলের খেলোয়াড়দের বুকে দুরু দুরু কাঁপন। তারই মাঝে উল্লাসের ঘনঘটা। চিটাগং ভাইকিংসের ক্রিকেটাররা ফ্রাইলিঙ্ককে নিয়ে সে কী উদযাপন!



রঙ বদলের

খেলা







পুরো আসরে মাঝে মধ্যেই ঝলক দেখায় খুলনা, তাও আবার ব্যাট হাতে। কিন্তু বেশিরভাগ দিন শেষে তাদের কপালে জুটেছিল হতাশা! যদিও পুরো ম্যাচের ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলেছে। কখনও কুমিল্লার দিকে, কখনও আবার খুলনার দিকে ঝুঁকে ছিল ম্যাচের ভাগ্য। তেমন একটা ম্যাচ হয়েছিল সিলেটে। বিপিএলের কুড়িতম ম্যাচ সেটি। প্রতিপক্ষ অন্যতম ফেভারিট কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। যাদের বোলিং লাইনআপ সেরাদের একটি। তারপরও দৌড়টা ভালোই দিয়েছিল মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের দল। আগে ব্যাট করে ৭ উইকেটে ১৮১ রান সংগ্রহ করে তারা। লড়াকু একটা স্কোর, তবু শেষ ওভারের নাটকীয়তায় ভেস্তে গেল সব আশা। ভিক্টোরিয়ান্স জিতল তিন উইকেটে। দিনটা অবশ্য তামিম ইকবালের ছিল। ওপেনিংয়ে নেমে ৪২ বলে ৭৩ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন দেশসেরা এই ওপেনার। এরপর বাকিরা মিলে অবশিষ্ট কাজটা করে দেন। যদিও শেষ ম্যাচে গিয়ে চূড়ান্ত একটা লড়াই হয়। উইকেট হাতে থাকলেও জয়ের জন্য ছয় বলে আট রান প্রয়োজন ছিল কুমিল্লার। এটা মোটেও কঠিন কিছু নয়। কিন্তু প্রথম দুই বল যাওয়ার পর কিছুটা চাপ বেড়ে যায়। কার্লোস ব্রাথওয়েটের করা শেষ ওভারের প্রথম তিন বলে কুমিল্লা তোলে দুই রান। কিন্তু পেরেরা থাকায় বোধ হয় বাঁচা গেল। পর পর দুটি বাউন্ডারি হাঁকিয়ে দুই বল হাতে থাকতেই কুমিল্লাকে জিতিয়ে দেন পেরেরা।



রান উৎসবের দিন

২৩৯; পুরনো সব রেকর্ড ভেঙে নতুন করে লেখা। বিপিএলে ২০১৩ সালে ২১৭ রান করেছিল ঢাকা। যেটা ছিল সর্বোচ্চ সংগ্রহ। এবার সেই রেকর্ড ভাঙে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স। চট্টগ্রামে খুলনা টাইটান্সের বিপক্ষে তারা জমা করে ২৩৭ রান। কিন্তু সেটাও স্থায়ী হয়নি। একই ভেন্যুতে চিটাগং ভাইকিংসের বিপক্ষে রংপুর রাইডার্স তোলে ২৩৯ রানের দাপুটে সংগ্রহ। তাও আবার ৪ উইকেট খুইয়ে। বিপিএলের ৩০তম ম্যাচ। বলা যায় রান উৎসবের দিনও। একই দিনের প্রথম ম্যাচে সিলেট সিক্সার্সও কম রান তোলেনি। ১৮০ করেছিল তারা। পরের ম্যাচে তো পোয়াবারো। আগে ব্যাট করতে নামা রংপুর যেন হয়ে গেল রানের মেশিন। যে মেশিনের দুই চালক অ্যালেক্স হেলস ও রিলে রুশো। দু'জনই সেঞ্চুরি হাঁকান। অবশ্য শুরুটা হয়েছিল বাজে। ছয় রানের মাথায় ক্রিস গেইলকে হারায় রংপুর। এরপর আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি রংপুরকে। হেলস আর রুশো মিলে রানের চাকা ঘোরান ঝড়েরগতিতে। ৪৮ বলে ১০০ রান করেন হেলস। তার এই বিধ্বংসী ইনিংসে ছিল ১১ চার ও ৫ ছক্কা। এরপর তিনে ব্যাট করতে নামা রুশোর শতক পূর্ণ করতে লাগে হেলসের চেয়ে তিন বল বেশি। তিনি বাউন্ডারি হাঁকান ১৪টি। সেঞ্চুরি করে হেলস প্যাভিলিয়নে ফিরলেও টিকে থাকেন রুশো। শেষ পর্যন্ত নিজের উইকেট জিইয়ে রেখে মাঠ ছাড়েন তিনি। ২৪০ রান জিততে হলে করতে হবে চিটাগংকে। বোধ হয় মাঠে নামার আগেই পরাজয় কাঁধে ভর করে তাদের। যদিও লড়াই করেছে চিটাগং। তবে সে লড়াই পারেনি টার্গেটের কূলকিনারা করতে। ৮ উইকেটে ১৬৭ রান সংগ্রহ করে চিটাগং।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)