'সহজ মানুষ' হওয়ার প্রেরণা

শিক্ষা

০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বিনয় মিত্র

গত ১৭ ডিসেম্বর ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডব্লিউইএফ) কর্তৃক 'গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-১৮' প্রকাশ হয়েছে। এতে মোট চারটি মূল সূচক (নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষায় অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্য ও আয়ু, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন) বিবেচনায় নিয়ে ১৪৯টি দেশের নারী-পুরুষের সমতার চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সার্বিক বৈশ্বিক র‌্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৮তম, শ্রীলংকা ১০০তম, নেপাল ১০৫তম, ভারত ১০৮তম, পাকিস্তান ১৪৮তম।

এ তো গেল নারী-পুরুষ সংক্রান্ত সামাজিক অগ্রগতির তুলনামূলক চিত্র। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাথাপিছু গড় আয় ও আয়ু বৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা, জীবনমানের ক্রমউন্নয়নসহ আরও অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ লক্ষণীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। এসব ইতিবাচক খবর আমাদের আনন্দিত করে, গর্বিত করে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ছেলেমেয়ের সমতা রক্ষা করা এটা যেমন আমাদের মানসিক-বিবর্তনের ক্রমউজ্জ্বলতার উদাহরণ, তেমনি জীবনমান এবং স্বাস্থ্য-সচেতনতার অন্যতম একটি উদাহরণ হলো, ভারত যেখানে তার জনগোষ্ঠীর ৫০ শতাংশকে স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন ব্যবস্থায় আনতে পারেনি, সেখানে একই ক্ষেত্রে আমাদের অগ্রগতি ১০০ শতাংশের কাছাকাছি প্রায়। বিশ্ব পুঁজিবাজারে আমাদের অবস্থান নিয়ত সংহত হচ্ছে এবং আমরা জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির লাগামহীন ঘোড়াটির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ধনে-মানে-শিক্ষায় অবিরাম আলোকিত ও দ্যুতিত হয়ে চলেছি। আমাদের নগরগুলো ক্রমেই মহানগর হয়ে উঠছে, গ্রামগুলোকে স্পর্শ করছে নগরের তরঙ্গ। আকাশছোঁয়া অট্টালিকার পাশাপাশি নিত্যনতুন তৈরি হচ্ছে অভিজাত বিপণিবিতান, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় এবং মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। আমাদের শিক্ষাপাড়ায় পাশ্চাত্য প্রভাবিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে, এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিক্ষা ব্যয়ও। প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ (গুটিকয়েক বিশ্ববিদ্যালয়), যেখানে ভর্তি হওয়ার সময় এককালীন গুনতে হয় ১৫-২০ লাখ টাকা, সেখানে শিক্ষার্থী ভর্তির ব্যাপক প্রতিযোগিতা দেখে মনে হতে পারে, বাঙালি অভিভাবকের উল্লেখযোগ্য অংশই 'লাখপতি', যারা সন্তানের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণকল্পে অঢেল অর্থ ব্যয় করার সক্ষমতা অর্জন করেছেন। প্রশ্ন হলো, শিক্ষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের যে অগ্রগতি, এর অন্তর্গত স্বরূপ কী? শিক্ষার যে আলোয় আমরা দ্যুতিত হচ্ছি, এটা কি আলেয়ার দ্যুতি? জ্যোৎস্না দ্যুতি? নাকি সূর্য জ্যোতি?

আমাদের জাতিসত্তার স্বরূপ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আফসোস করে বলেছিলেন, 'রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি'- বস্তুত কবির এই আক্ষেপের জায়গাটি আমরা কি অতিক্রম করতে পেরেছি? আমরা কি 'মানুষ' হয়ে উঠতে পেরেছি? এ প্রশ্নের উত্তর বেশ জটিল বৈকি; সভ্যতার পরিমাপক হিসেবে যে কয়টি অনুষঙ্গকে বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়, এর মধ্যে আছে :ব্যক্তি ও সামাজিক নীতিবোধের স্বরূপ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার গুণগত প্রকৃতি, জনরুচি ও জনচেতনার চরিত্র, পরমত ও পরধর্ম-সহিষুষ্ণতা, নারীর প্রতি রাষ্ট্র বা পুরুষতন্ত্রের দৃষ্টিভঙ্গির স্বরূপ ইত্যাদি। বস্তুত এসব ক্ষেত্রে উন্নত বিশ্বের তুলনায় আমাদের অবস্থান, সেটা অনেক বেশি হতাশাজনক, কোনো কোনো ক্ষেত্রে লজ্জাজনকও বৈকি। গত কয়েক বছরে আমাদের দেশে শিক্ষার হার ব্যাপকভাবে বেড়েছে, তবে শিক্ষার গুণগত মান এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সততা ও নৈতিকতার মান যে শোচনীয়ভাবে হ্রাস পেয়েছে, এতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বাজার অর্থনীতির যুগে শিক্ষাকেও আমরা বাজারি পণ্য হিসেবে গণ্য করেছি। ফলে এতেও যুক্ত হয়েছে মুনাফা অর্জনের প্রবৃদ্ধি। তাই হয়তো শিক্ষা এখন চড়া দাম দিয়ে কিনতে হয়- কখনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কোচিং সেন্টার থেকে, কখনওবা শিক্ষকের নিজেরই দোকান থেকে, প্রাইভেট পড়ার মাধ্যমে। নিতান্ত শৈশবকাল থেকে যৌবনাবধি বারবার 'পরীক্ষা' নামক মহাযজ্ঞের আয়োজন করে একটা শিক্ষাজীবনকে আমরা এমনভাবে বিন্যস্ত করে রেখেছি, যাতে 'জ্ঞান' অর্জন নয়, সর্বাধিক নম্বরপ্রাপ্তি এবং জোছনালোকিত সনদপ্রাপ্তিই শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-আমলা হতে প্রণোদনা দেয়, কাউকে 'সহজ মানুষ' হতে, কাউকে কবি-সাহিত্যিক-খেলোয়াড়-চিত্রকর হতে উদ্দীপ্ত করে না। আমাদের মধ্যে যারা কবি-সাহিত্যিক, খেলোয়াড় বা চিত্রকর, তারা এটা হয়েছেন নিজের আগ্রহে, নিজের প্রচেষ্টায়; এতে শিক্ষাব্যবস্থার কোনো প্রভাব নেই। যেহেতু সনদসর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থায় সততা-মানবিকতা-নৈতিকতা, পরমত ও পরধর্ম-সহিষুষ্ণতা ইত্যাদি বৃত্তিচর্চা উপেক্ষিত থাকে, তাই বোধহয় ওইসব সুকুমার বৃত্তিচর্চার ক্ষেত্রে আমাদের অশিক্ষিত এবং উচ্চশিক্ষিতের মধ্যে ইতরবিশেষ পার্থক্য দেখা যায় না। বঙ্গ সমাজে বহুকথিত একটা অভিযোগ হলো, আমাদের মধ্যে যারা ডাক্তার- মানুষের জীবন নিয়ে যাদের নিরন্তর কারবার, তারা কেবল টাকা চেনে। তবে ডাক্তাররাই যে কেবল অর্থলিপ্সায় সকাতর, এমন নয়- যে কোনো পেশাজীবী ইঞ্জিনিয়ার-উকিল-ব্যারিস্টার, শিক্ষক-আমলা-আইনরক্ষক, সবাই 'যেনতেন প্রকারেণ' বাড়তি অর্থ-উপার্জনে সদামগ্ন। এখানে অবশ্য ফাঁক ও ফাঁকির চমকপ্রদ একটা তত্ত্ব আছে। তত্ত্বটি হলো, যেসব চাকরিতে বাড়তি আয়ের সুযোগ কম বা একেবারেই নেই অর্থাৎ যারা সুযোগের অভাবে 'সৎ' থাকতে বাধ্য, তারা সশব্দে 'সততার' ঢাক বাজিয়ে যান।

প্রশ্ন হলো, কাজে ফাঁকি দেওয়া, ঘুষের বিনিময়ে কাজ করা, মিথ্যাচার করা- এসব যে অন্যায় এবং অনৈতিকতাদুষ্ট, এ বোধ কি আমাদের মধ্যে নেই? অবশ্যই আছে এবং সেটা আছে কেবল মুখের কথায়, প্রাত্যহিক কর্মচর্চায় নেই। বেঁচে থাকার প্রয়োজনে কেউ কেউ দুধে পানি মেশায়, কেউ কেউ চালে কাঁকড় মেশায়, কেউ চুরি-ছিনতাইও করে; কিন্তু উচ্চশিক্ষিত এবং উচ্চ পদবির লোকজন বাঁচার প্রয়োজনে নয়, লোভের বশবর্তী হয়ে অনৈতিকতাকে প্রশ্রয় দেয়। এদের শিক্ষা আছে, নীতি নেই, প্রাণ আছে, বিবেক নেই; কিন্তু কেন? এর কারণ বোধ হয় শিশুশিক্ষায় অঙ্ক-ইংরেজি-ধর্ম আছে, কিন্তু 'নীতিশাস্ত্রের' স্থান নেই। বস্তুত শিশুশিক্ষায় যদি 'নীতিবিদ্যা'কে গুরুত্ব দেওয়া হতো, যদি সনদি শিক্ষা অপেক্ষা মানসিক-বৃত্তির বিকাশকে প্রাধান্য দেওয়া হতো, তা হলে জাপানি শিশুদের মতো আমাদের শিশুরাও 'মিথ্যা', 'প্রতারণা', 'অসততা' ইত্যাদিকে তীব্রভাবে ঘৃণা করতে শিখত এবং পরিণত বয়সে তারাও কাজ ফাঁকি, ঘুষ-দুর্নীতি ইত্যাদিকে সযত্নে এড়িয়ে চলত। এখানে একটা বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন, নৈতিক শিক্ষা আর ধর্মশিক্ষা কোনোভাবেই এক জিনিস নয়। মহামতি লেখক তলস্তয় অভিমত রেখেছিলেন, ধর্মের রয়েছে তিনটি উপাদান। এর মধ্যে একটি- যার নাম 'নৈতিক বিধান' কেবল এটাই 'নৈতিক শিক্ষা'র সঙ্গে সম্পর্কিত এবং এ উপাদানটি পৃথিবীর সব ধর্মই অভিন্নভাবে ধারণ করে আছে; যেমন চুরি না করা, মিথ্যা না বলা, হিংসা না করা, মানুষের সেবা করা ইত্যাদি। বস্তুত উন্নত দেশগুলো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রারম্ভিক পর্যায়ে তাদের শিশুদের এই 'নৈতিক শিক্ষা' প্রদান করে থাকে। অন্যদিকে ধর্মের অন্য দুটি উপাদান- 'ধর্মতন্ত্রের দর্শন' এবং 'ধর্মতন্ত্রের আচার-অনুষ্ঠান' ধর্মভেদে ভিন্ন ভিন্ন হয় এবং অনুন্নত দেশগুলোর শিশুশিক্ষায় এ দুটি উপাদানকেই বেশি গুরুত্ব প্রদান করা হয়ে থাকে। ধর্মশিক্ষা ও নৈতিক শিক্ষার মধ্যে তত্ত্বগত এবং ভাবগত দিক থেকে যে বড় রকমের পার্থক্য আছে, এটা অনেকেই বুঝতে পারেন না। দুঃখজনক বিষয় হলো, আমরা জীবনের সর্বক্ষেত্রে পশ্চিমকে অনুকরণ বা অনুসরণ করে চলেছি, করছি না কেবল শিক্ষাব্যবস্থায়।

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার হালহকিকত মোটেও আশাপ্রদ নয়। শিশুশিক্ষায় নৈতিক শিক্ষা অপেক্ষা ধর্মশিক্ষার গুরুত্ব বেশি; মানবধর্ম অপেক্ষা প্রচলিত ধর্ম-আদর্শের চর্চা বেশি। এ জাতীয় শিক্ষায় জ্ঞান অর্জন উপেক্ষিত, মুক্তবুদ্ধিচর্চার দ্বার রুদ্ধ, কর্মমুখী শিক্ষার সুযোগও সীমিত। এখানে মনন ও বোধের বিকাশ অপেক্ষা জোছনা আলোকিত সনদের গুরুত্ব বেশি। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষে আমাদের ছেলেমেয়েরা 'চাকুরে' হয়, পরকালমুখী ধার্মিক হয়; কিন্তু 'মুক্তচিন্তক' বা মানবতাবাদী মানুষ হয় না। এরা সনদ দ্যুতিত হয় কিন্তু জ্ঞানদীপ্ত হয় না। বস্তুত আমরা যদি প্রথাগত ও সনদসর্বস্ব শিক্ষাধারাটিকে অব্যাহত রাখি, যদি আমাদের শিক্ষায় নৈতিকতা, মেধা ও মুক্তবুদ্ধিচর্চার স্বাধীন আবহের জন্ম দিতে না পারি, তাহলে জ্ঞান-বিজ্ঞান-যুক্তি ও দর্শনদীপ্ত বিশ্বসমাজ থেকে আমরা যে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ব, এতে আর সন্দেহ কী।

লেখক ও গবেষক

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: ad.samakalonline@outlook.com