সাংস্কৃতিক বোদ্ধা

১৬ মার্চ ২০১৯

আসিফ

১৯৮৮ সাল। বই খুঁজে বেড়ানোর দিনগুলো। কর্মক্লান্ত এক সন্ধ্যায় দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত সাময়িকীর একটি সংখ্যা (২০ অক্টোবর, ১৯৮৮) চোখের সামনে দেখতে পাই। ক্লান্ত চোখে পত্রিকার সাময়িকীটা নিয়ে নড়াচড়া করি। বিশাল একটি প্রবন্ধের দিকে বিরক্তিভরে তাকাই। শিরোনামটি 'বিজ্ঞানীর' শব্দ দিয়ে শুরু হয়েছিল। সেটাই কিছুটা উৎসাহ জোগালো মনোযোগে। একটি প্যারা পড়ার পর আরেকটি প্যারা যেন টেনে ধরল; আর ছুটতে পারলাম না। যেমন- সেখানে প্রথম প্যারায় লেখা রয়েছে :আপনার সংস্কৃতি বড়, তারটি ছোট- ভালোবেসে তাকে কিছু জায়গা ছাড়বেন আপনি? বড় বলে এই অহঙ্কার আসে কোথা থেকে- সংস্কৃতি কি জায়গাজোড়া ভল্যুমেট্রিক ঘটনা, না ছড়িয়ে পড়া কাপড়ের মতো আয়তনভিত্তিক বর্গমিটারের ব্যাপার?... আবার দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের একটা জায়গায় আছে :অঙ্ক করবার একটা ঘোর আছে, শিল্প গড়বারও ঠিক তাই থাকে, নিজের ভিতর নিজে ডুবে যাবার ঘোর।

আকর্ষণ অনুভব করলাম, আমার মনোযোগও বেড়ে গেল। প্রবন্ধে এক পদার্থবিজ্ঞানীর কথা বলা হচ্ছে, যিনি বর্তমানে লুকাসিয়ান প্রফেসর পদে আসীন। এই আসনে নিউটনও ছিলেন। ... আমি আঁটোসাঁটো হয়ে বসি। পড়তে থাকি গভীর মনোযোগে। তারুণ্যের প্রারম্ভে ওই সন্ধ্যায় হালকা ফ্যানের বাতাসে আমি যুক্ত হয়েছিলাম অসাধারণ এক অভিজ্ঞতার। রুদ্ধশ্বাসে সম্পূর্ণ পাঁচ হাজার চারশ' শব্দের প্রবন্ধটি শেষ করলাম। এবার প্রথম প্রবন্ধের শিরোনামের দিকে তাকালাম, 'বিজ্ঞানীর নৈঃসঙ্গ' আর লেখক হচ্ছেন ওয়াহিদুল হক। এই প্রবন্ধের মাধ্যমে লেখকের সঙ্গেও পরিচয় ঘটেছিল। পরিচয় ঘটেছিল 'চেতনা ধারায় এসো' বইটির সঙ্গে। তারই কল্যাণে চিনতে পেরেছিলাম দুটি অসাধারণ চরিত্র: জ্যোতির্বিদ ইয়ান শেলটন ও পদার্থবিদ স্টিফেন হকিং।

একটি লেখায় বিজ্ঞান, ইতিহাস, সঙ্গীত আর রাজনীতি এভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে পারে, তার জ্বলন্তু উদাহরণ ছিল এটি। প্রবন্ধটি ভীষণভাবে উদ্দীপ্ত করেছিল। পরে জেনেছিলাম, তিনি রবীন্দ্রকাব্য ও সঙ্গীতচর্চায় নিবেদিতপ্রাণ এক নিরলস কর্মী ও শিক্ষক ছিলেন। এ দেশের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিকবোদ্ধা হিসেবে পরিগণিত হয়েছিলেন। উল্লেখ্য, পহেলা বৈশাখ আমাদের জাতীয় উৎসবে রূপ দেওয়ার স্বপ্নদ্রষ্টাদের মধ্যে তিনি ছিলেন নেতৃস্থানীয়। আজ এ দেশে রবীন্দ্রসঙ্গীতের যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা তার মূলে আছেন তিনি। এ বিষয়ে প্রয়াত নিসর্গবিদ দ্বিজেন শর্মা বলেছিলেন, "পূর্বোক্ত বাঙালির আত্মপরিচয়গত বিভ্রান্তি যাঁরা ঘুচিয়েছেন: যেমন 'যেসব বঙ্গেতে জন্মে হিংসে বঙ্গবাণী' কবিতার লেখক আবদুল হাকিমের মতো মনীষীদের সাথে চিরদিন উচ্চারিত হতে থাকবে ওয়াহিদুল হকের নামও।"

তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠ মাড়াননি, হেলায়-ফেলায় বিএ পাস করেছিলেন। পরিণত হয়েছিলেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের অচ্ছেদ্য অংশে। সংস্কৃতি ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায় ওয়াহিদুল হককে 'স্বাধীনতা পুরস্কার-২০১০' (মরণোত্তর) প্রদান করা হয়। তার প্রকাশিত বইগুলো হচ্ছে- 'গানের ভিতর দিয়ে', 'সংস্কৃতিই জাগরণের প্রথম সূর্য', প্রবন্ধ সংগ্রহ, 'ব্যবহারিক বাংলা উচ্চারণ অভিধান সংস্কৃতির ভুবন'। ২০০০-০১ সালে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ থেকে গুণী বাঙালি হিসেবে দু'জনকে পুরস্কৃত করা হয়; ওয়াহিদুল হক ছিলেন তাদের একজন। রাজনীতি, সংস্কৃতি, গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ইতিহাস, চিত্রকলাসহ অনেক বিষয়ে তার উৎসাহ সমান ছিল। এ উৎসাহের মধ্য দিয়ে নিজেকে যেমন বিকশিত করতে চেয়েছিলেন, অন্যকেও করে গেছেন উদ্বুদ্ধ। এ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে এ দেশে সাংস্কৃতিক চর্চার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছায়ানটকে দাঁড় করিয়েছেন। সংস্কৃতিকে বিজ্ঞান, শিল্পকলা, সাহিত্যে একীভূতরূপে দেখেছেন। বিজ্ঞান বোধহীন সমাজে প্রযুক্তির সম্প্রসারণ কীভাবে মানুষকে নিষ্ফ্ক্রিয় করে দেয়, সে বিষয়ে নিজে সজাগ ছিলেন, অন্যকে সতর্ক করে গেছেন। আজ ওয়াহিদুল হকের জন্মদিন। তার প্রতি রইল আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]