এক উৎসব রাতে

১৮ জুন ২০১৯ | আপডেট: ১৮ জুন ২০১৯

সুমন্ত আসলাম

সাত-আট-নয় কিংবা দশ-এ কয়টা বেশি রান আমরা ওয়েস্ট ইন্ডিজকে দিতেই পারতাম। তাতে তাদের লাভ হতো না, আমাদের হতো। 

বৃষ্টিটা ইংল্যান্ডে হয়নি, বাংলাদেশে হয়েছে। অবশেষে থামতে থামতেও থামল না। ঝিরিঝিরি নেমেছে। অফিস শেষ। বাড়ি ফিরছি গাড়িতে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে মুদির দোকান, টিভির দোকান, চায়ের দোকান, নানা কিছুর দোকান। সব জায়গায় টিভি চলছে। স্বশব্দে। গর্জনে।

মানুষ টিভি দেখছে ভিড় করে। একটু পর পর চিৎকার। কখনো কখনো-ইশ! মিরপুরের মিল্কভিটা রোডে এসেই থেমে গেল গাড়িটা। সামনে তাকিয়ে দেখি আরো অনেক গাড়ি। থেমে আছে সেগুলোও। জানালার কাচ নামিয়ে তাকিয়ে আছে সবাই টিভির দিকে। 

রান দরকার ৪।

লিটন দাস ব্যাট করলেন। বল গড়িয়ে মাঠের কিনারা। ৪। গাড়ি আর চলে না। আনন্দে বিভোর সবাই। উচ্ছলতায় স্ট্যাচু। হতবিহ্বল। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। মাথায় জমে থাকা বৃষ্টির পানি মুছতে মুছতে এক রিকশাওয়ালা বললেন, ‘কী অইত ওয়েস ইন্ডিরে আর দশা রান দিলে। আমাদের পোলাটা ছেনচুরি কইরতে পারত।’ পাশ থেকে আরেকজন বললেন, ‘একই খেলায় দুইজনের সেন্টচুরি হইত!’ কোনো কেনো পাওয়া আমাদের কিছুটা বেদনায় ডুবিয়ে দেয়। আজ দিল।

২.

মিরপুর ১২ নম্বরে বিখ্যাত একটা মাংসের দোকান আছে-রাজ্জাকের মাংসের দোকান। খুব ভালো মাংস বিক্রি হয় এখানে। জিনিস যেহেতু ভালো, দাম তার তাই একটু বেশি। 

কোনো আনন্দময় ঘটনা ঘটলেই এই দোকানের আশপাশ থেকে দুটো ঘটনা শুরু হয়-এক. শব্দ শুরু হয়, মিছিল শুরু হয়, থালা-বাটি দিয়ে মূর্ছনা তৈরি হয়। দুই. রাজ্জাকের দোকানের মাংসের বিক্রি বেড়ে যায়। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো-ওই মাসের দোকান কেন্দ্রিক বেশ কয়টা মোটা-তাজা কুকুরও লাফাতে থাকে তখন, লেজ নাড়াতে থাকে, দৌড়াতে থাকে এদিক-ওদিক।

রাত এগারটা পেরিয়ে গেছে। কুকুরগুলো বৃষ্টি ভয়ে ঝিমাচ্ছে। মানুষও তেমন কিছু নেই রাস্তায়। একে তো খেলা, তার ওপর বৃষ্টি। হঠাৎ পাশের গলি থেকে দশ-বারোটা ছেলে বাংলাদেশ বাংলাদেশ বলে বেরিয়ে এলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে উৎসবমুখর হয়ে উঠল পরিবেশটা। ঘুম ভেঙে গেল কুকুরদের। ঘুম ভেঙে গেল ওদের পাশে দোকানের বারান্দায় শুয়ে থাকা রাবেয়ারও। 

রাবেয়াকে পাগলী বলে সবাই। আমি বলি বুদ্ধিমান। রাত-দিন সব সময় শুয়ে থাকা ওর খাবারের অভাব হয় না। কথায় কথায় অকথ্য গালি আর সবসময় কোনো না কোনো খাবার মুখে তার। 

এদিক-ওদিক তাকাল রাবেয়া। প্রথমে কিছু বুঝতে পারল না-এই রাত-বিরাতে চিৎকার কীসের, এতো আনন্দ করছে কেন পোলাপান! মিনিট খানেক। সব বুঝে যায় সে। চল্লিশ পেরুনো রাবেয়া হাত বাড়ায় তার পুটলির দিকে। সিঁড়ির ধাপে অবহেলায় পড়ে থাকা ওটার ভেতর থেকে গোল পাউরুটি বের করে কয়েকটা। তারপর স্পষ্ট করে ডাক দেয়-আয়, আয় হারামজাদারা।

সাত-আটা কুকুর নিমিষে এসে হাজির। চিমসে, বাসি, কুঁচকে যাওয়া পাউরুটিগুলো ছিটিয়ে দেয় সে ওদের দিকে। হামলে পড়ার আগে ওরা এক পলক রাবেয়ার দিকে তাকায়। সে আগের চেয়ে শব্দ করে বলে, ‘খা কুত্তার বাচ্চারা। খায়া দূর হ।’

লেজ নাড়াতে নাড়াতে পাউরুটি খেতে থাকে কুকুরগুলো। এরই মাঝে একটাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে রাবেয়া। কুকুরের ঘাড়ের লোমে মুখ ঘঁষতে ঘঁষতে বলে, ‘আজ আর আমার চোক্ষে ঘুম নাই। আজ আমি সারা রাইত নাচমু। যাত্রার মাগিদের মতো নাচমু।’

পরনের শাড়িটা ছড়িয়ে দিয়ে নাচার প্রস্তুতি নেয় রাবেয়া। টনটনে মাশরাফি-সাকিব-লিটনদের চোখেও ঘুম নেই। কিন্তু তারা জানল না, দেখল না- দেশের কোনো একটা আনন্দে কেবল সুস্থ মানুষ না, অনেক অসুস্থ মানুষও ঘুমায় না। আনন্দ করে তারা। দেশের আনন্দে নিজের জমানো খাবারগুলো বিলিয়ে দেয় পশুদের।

৩.

বাসায় ঢুকেই দেখি-মহা আনন্দ উৎসব। মেয়ে দৌড়ে এসে সামনে দাঁড়াল। চোখ নাচিয়ে বলল, ‘বাবা, একটা জিনিস খেয়াল করেছো-আমাদের দেশ বিশ্বের দশটা ধনী দেশের একটা না। দশটা সুন্দর দেশের একটা না। দশটা সেরা শিক্ষিতের দেশের একটা না। এমনকি ভালো মানুষে ভরা দশটা দেশেরও একটা না। কিন্তু দশটা সেরা ক্রিকেট খেলোয়াড়ের একটা। আমার আজ ঘুম আসবে না।’

থেমে গিয়েছিল বৃষ্টি। আবার শুরু হলো। জানালার গ্রিল চেপে ধরে আমার মেয়েটা আকাশের দিকে তাকায়। আমি তাকাই ওর দিকে। একটা প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে আমাদের দেশে-যারা দেশকে ভালোবাসতে বাসতে মরে যাবে, কিন্তু কোনো অন্যায় করবে না কখনো। আমাদের মহান স্রষ্টা পাশ ফিরে অন্য দেশের দিকে তাকাবে তখন। তিনি বুঝে যাবেন-এ দেশটা পবিত্র হয়ে উঠেছে, পূণ্য ছড়িয়ে পরেছে এর চারপাশে, এদিকে আর নজর দেওয়ার দরকার নেই তার।

আজ রাতে ঘুম আসবে না সম্ভবত আমারও।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)