বাংলাদেশের নামে জমা বেড়েছে সুইস ব্যাংকে

২০১৮ সালে জমা ৫ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা

২৮ জুন ২০১৯ | আপডেট: ২৮ জুন ২০১৯

বিশেষ প্রতিনিধি

সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশের নামে জমা থাকা অর্থের পরিমাণ
বেড়েছে। ২০১৮ সাল শেষে সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকে বাংলাদেশের বিভিন্ন
ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নামে তহবিলের পরিমাণ ৬২ কোটি ২৫ লাখ সুইস ফ্রাঁ।
বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৫ হাজার ৩৫৪ কোটি টাকা (প্রতি ফ্রাঁ সমান ৮৬
টাকা), যা ২০১৭ সালের তুলনায় ২৮ শতাংশ বেশি।


গতকাল সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি)
'ব্যাংকস ইন সুইজারল্যান্ড-২০১৮' নামে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে
বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নামে সে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় জমা থাকা
দায় ও সম্পদের পরিসংখ্যান রয়েছে। প্রতিবেদনটি বিশ্নেষণে দেখা যায়,
বাংলাদেশের নামে মোট দায় অর্থাৎ ব্যাংকগুলোতে জমা ৬১ কোটি ৭৭ লাখ সুইস
ফ্রাঁ। এর সঙ্গে সম্পদ ব্যবস্থাপকের মাধ্যমে আরও ৪৮ লাখ সুইস ফ্রাঁ বিনিয়োগ
হিসেবে রয়েছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের নামে সুইস ব্যাংকগুলোতে জমার পরিমাণ
ছিল ৪৮ কোটি ১৩ লাখ সুইস ফ্রাঁ বা ৪ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা। ২০১৬ সালে ছিল ৬৬
কোটি ফ্রাঁ। তার আগের বছর ছিল ৫৫ কোটি ফ্রাঁ। ২০১৪ সালে সুইস ব্যাংকগুলোতে
বাংলাদেশের নামে জমা ছিল প্রায় ৫১ কোটি ফ্রাঁ।


সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোতে থাকা অর্থের মধ্যে একটি অংশ পাচার হয়ে থাকে
বলে সন্দেহ করা হয়। সাধারণত ধারণা করা হয়, নির্বাচনের বছরে অর্থ পাচার
বাড়ে। ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছে। এ
বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, সুইজারল্যান্ডের
ব্যাংকগুলোতে বাংলাদেশের নামে থাকা অর্থের বেশিরভাগই বাণিজ্যকেন্দ্রিক। এ
দেশের ব্যাংকগুলোর পাওনা হিসেবে যা উল্লেখ করা হয়। গ্রাহকের আমানত হিসাবে
যে অর্থ থাকে তার মধ্যে বিদেশে চাকরি করেন এমন বাংলাদেশিদের অর্থও রয়েছে।
গ্রাহক আমানতের একটি অংশ পাচার হতে পারে বলে সন্দেহ করা হয়।


কয়েক বছর ধরে সুইস ব্যাংকে টাকার পরিমাণ নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে সংবাদ
প্রকাশিত হচ্ছে। ২০১৭ সালে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশিদের টাকা নিয়ে গণমাধ্যমে
প্রচারিত সংবাদকে 'অতিশয়োক্তি' বলে দাবি করেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল
আবদুল মুহিত। জাতীয় সংসদে মুহিত বলেছিলেন, বাংলাদেশ ও সুইজারল্যান্ডের
মধ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে যে লেনদেন হয়, তা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, বাস্তবে
এটি মোটেই অর্থ পাচার নয়। তবে কিছু অর্থ পাচার হয়। সেটি যৎসামান্য। ব্যক্তি
খাতে অনেক বাংলাদেশি নাগরিক যারা বিদেশে কাজ করছেন অথবা স্থায়ীভাবে
অবস্থান করছেন, তাদের হিসাবও অন্তর্ভুক্ত আছে।


অর্থ পাচার নিয়ে গবেষণা করেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ও
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক মইনুল
ইসলাম। মতামত জানতে চাইলে তিনি সমকালকে বলেন, সুইস ব্যাংকে পুঁজি পাচার
নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে এখন বিশ্বের অনেক দেশেই সুইস ব্যাংকের সহজ বিকল্প
হয়ে গেছে। সুতরাং সুইজারল্যান্ডে কতটুকু জমা থাকল তা দিয়ে বাংলাদেশ থেকে
পুঁজি পাচারের প্রবণতাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। বাংলাদেশ থেকে এখন
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে সুইজারল্যান্ডের চেয়ে বেশি
পাচার হচ্ছে।


সুইজারল্যান্ডের ব্যাংকগুলোয় বিভিন্ন দেশের বিপরীতে 'দায়' অথবা 'গ্রাহকের
কাছে দেনা' খাতে থাকা অর্থকে এসএনবি সংশ্নিষ্ট দেশগুলো থেকে রাখা গচ্ছিত
অর্থ হিসেবে বিবেচনা করে। বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান যদি নিজের
বদলে অন্য দেশের নামে অর্থ গচ্ছিত রেখে থাকে, তাহলে তা এই হিসাবের মধ্যে
আসেনি। একইভাবে সুইস ব্যাংকে গচ্ছিত রাখা মূল্যবান শিল্পকর্ম, স্বর্ণ বা
দুর্লভ সামগ্রীর আর্থিক মূল্যমান হিসাব করে এখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
অনেক দেশের নাগরিকই মূল্যবান এসব সামগ্রী সুইজারল্যান্ডের বিভিন্ন ব্যাংকের
ভল্টে রেখে থাকেন।


ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল
ইন্টিগ্রিটির (জিএফআই) রিপোর্টে বাংলাদেশের টাকা পাচারের তথ্য রয়েছে।
জিএফআইর তথ্য মতে, ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন দেশে ৯১০ কোটি ডলার বা
প্রায় ৭৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বেশি মূল্য ও
পরিমাণ দেখানো (ওভার ইনভয়েসিং) ও রফতানির ক্ষেত্রে কম মূল্য ও পরিমাণ
দেখানোর (আন্ডার ইনভয়েসিং) মাধ্যমেই প্রায় ৮০ ভাগ অর্থ পাচার হয়। জিএফআইর
হিসাবে ১০ বছরে বাংলাদেশ থেকে ৪ লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: [email protected] (প্রিন্ট), [email protected] (অনলাইন)