ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের আস্ম্ফালন

প্রতিবেশী

০৯ জুন ২০১৯

সাব্বির আহমেদ

আগের থেকে বেশি শক্তি নিয়ে জিতেছে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি। পরাজিত হয়েছে কংগ্রেসসহ ডজন দুয়েক প্রধান অসাম্প্রদায়িক এবং ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল। বিজেপির এ বিজয় ২০১৪ সালের চেয়ে বড়। '১৪ সালে তারা জোটসহ জিতেছিল ৩৩৬ আসন, এবার জিতেছে ৩৫২ আসন। শুধু জোটগতভাবেই নয়, বেড়েছে দলীয় আসনও। ২৭০টি আসন পেলেই যেখানে সরকার গঠন করা যায় সেখানে বিজেপি একাই পেয়েছে ৩০৩ আসন। ২০১৪ সালে বিজেপির একক আসন ছিল ২৮২। এবার দলের আসন বেড়েছে ২১টি, জোটের ১৬টি। বিজেপির এই ভূমিধস বিজয়ের পেছনে রয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদের দৃঢ়ীকরণ এবং সংখ্যাগুরুর জয়জয়কার। সংখ্যাগুরুর জয়জয়কারে ঢাকা পড়েছে সংকুচিত হওয়া অর্থনীতি, কৃষক অসন্তোষ, বিমান ক্রয়ে দুর্নীতি।

এবারের নির্বাচনে কংগ্রেস জোটগতভাবে পেয়েছে ৯৩ আসন, যা ২০১৪ সালে ছিল ৬০। বেড়েছে ৩৩ আসন। কংগ্রেস একা পেয়েছে ৫২ আসন, যা '১৪ সালে ছিল ৪৪; বেড়েছে ১২টি আসন। ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল- টানা দশ বছরের সরকার পরিচালনার পর কংগ্রেসের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল ২০১৪ সালে নির্বাচনে বিরোধীদের প্রধান প্রচারণা। সে প্রচারণায় ধসে পড়েছিল শতবর্ষী দলটি। এবারে অনেকে আশা করেছিলেন যে, বিজেপির দুর্বলতাগুলো তুলে ধরে কংগ্রেস তার মিত্রদের নিয়ে ভারতে ফিরিয়ে আনবে ধর্মনিরপেক্ষতার রাজনীতি। কয়েক মাস আগে রাজ্য পর্যায়ের নির্বাচনে হিন্দের হৃদয় ভূমির কয়েকটি রাজ্যে কংগ্রেসের জয় সে আশা জোরালোও করেছিল। বাস্তবে আশা পূরণ হয়নি। গত নির্বাচনের তুলনায় ভালো ফল করলেও ঠেকানো যায়নি বিজেপির তোলা উগ্র হিন্দুত্ববাদী সুনামি। কেউ কেউ বলছেন, এ পরাজয়ের দায় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী এবং তার বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর। তাদের নেতৃত্বের দুর্বলতা এ পরাজয়ের প্রধান কারণ। পরাজয়ের দায় মাথা পেতে নিয়ে দলের সভাপতির পদ ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন রাহুল গান্ধী। রাহুলের সে প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতারা। তারা মনে করেন, রাহুলের নেতৃত্বেই কংগ্রেস তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। গান্ধী ডাইন্যাস্টির বর্তমান প্রতিনিধিদের ওপর দায় চাপিয়ে বিজেপির উত্থানের কারণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। কংগ্রেসের এই পরাজয়ের কারণ উগ্র হিন্দুত্ববাদের নবউত্থান। যত মত, তত পথ- দর্শনের ভারতকে নানাত্ববাদের প্রগতির পথে ফিরিয়ে আনতে এখন অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে কংগ্রেসসহ সব অসাম্প্রদায়িক দলকে।

বিগত পাঁচ বছর ভারত শাসন করেছেন 'গুজরাটের কসাই' নামে কুখ্যাত, উগ্র হিন্দুত্ববাদী নেতা নরেন্দ্র মোদি। ভারতের ক্ষমতার চূড়ায় ওঠার আগে তিনি দু'বার বসেছেন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে। তার মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময়ই মহাত্মা গান্ধীর গুজরাটে হয়েছে নিকৃষ্টতম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। সে দাঙ্গায় বলি হয়েছে দুই হাজারের বেশি মানুষ। ভারতের আদালতে মোদির বিচার না হলেও আমেরিকা মোদিকে কালো তালিকাভুক্ত করে তার আমেরিকা ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। মোদির মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় তিনি প্রশাসনিক সংস্কার করে প্রশাসনে গতিশীলতা এনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটিয়েছিলেন। সেখান থেকেই তার দিল্লির পথে জয়যাত্রা। উন্নয়নের গল্প বলে ভারতের পুঁজিবাদীরা, সুশীলেরা আর মেইনস্ট্রিম মিডিয়া মোদিকে জিন্দাবাদ দিতে দিতে দিল্লির মসনদে বসিয়েছিলেন। মোদি জিতলে জিতে যায় পুঁজিবাদ, দাম বেড়ে যায় শেয়ারবাজারের।

পরপর দুই টার্ম কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জোটের নেতা হিসেবে মনমোহন সিং ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার সময়ে শত চেষ্টা করেও সুসম্পর্ক বজায় রাখতে পারেননি আমেরিকার সঙ্গে। ছোট বুশের শাসনামলে আমেরিকার সঙ্গে পারমাণবিক লেনদেনের চুক্তি করে তিনি বিরাগভাজন হন নিজ জোটসঙ্গী সিপিআই (এম)-এর। আমেরিকার সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করায় জোট ছেড়ে দেয় সিপিআই (এম); রাজনৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে মনমোহন সরকার। পরবর্তী সময়ে হিলারি ক্লিনটনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমলে নিজ দেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে গিয়ে আমেরিকার সঙ্গে মনমোহন সিং সরকারের সম্পর্ক তিক্ততার চরমে পৌঁছায়। রাশিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, ব্রাজিল ও চীনের সঙ্গে জোট বেঁধে ভারত আমেরিকার একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেয়। প্রতিক্রিয়ায় আমেরিকা ভারতের অভ্যন্তরে কংগ্রেসবিরোধী আবহাওয়া সৃষ্টি করে সেখানকার পুঁজিপতি এবং সুশীল সমাজের সহযোগিতায়। দেশজুড়ে কংগ্রেস সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ চরমে ওঠে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন আন্না হাজারে। ভারতের প্রধান মিডিয়াগুলো এমনভাবে আন্না হাজারেকে উপস্থাপন করেন যেন তিনি স্বর্গ থেকে নেমে আসা দেবতা। তাকে অনুসরণ করলেই ভারতের প্রধান সমস্যা দুর্নীতির সমাধান হয়ে যাবে। বাস্তবে দেখা গেল আন্না হাজারে নন, তার প্রতিবাদের ধারাবাহিকতায় নেতা বনে যান কেজরিওয়াল। হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কেজরিওয়ালের  আম আদমি পার্টি পরবর্তী নির্বাচনে জিতে শাসনভার পায় দিল্লির।

২০১৪ সালের নির্বাচন ঘনিয়ে এলে আমেরিকা বুঝে ফেলে যে কংগ্রেস ধরাশায়ী হয়েছে বটে, তবে আম আদমি দিয়ে কংগ্রেস ঠেকানো যাবে না; দরকার বিজেপিকে। বিজেপির উগ্র হিন্দুত্ববাদী চরিত্র ভুলে যায় আমেরিকা। তুলে নেওয়া হয় নরেন্দ্র মোদির ওপর থেকে দশ বছরের পুরনো নিষেধাজ্ঞা। পুঁজিপতি, সুশীল, মিডিয়া নিয়ে জয়জয়কার তোলে মোদি নেতৃত্বের। বিজেপির সঙ্গে বনিবনা হয়ে যায় আমেরিকার; ভারত তলিয়ে যেতে শুরু করে মধ্যযুগীয় বর্বরতায়। ২০১৪ সালে মোদির ক্ষমতারোহণের পর্ব থেকে দিন দিন সাম্প্রদায়িক হয়ে উঠতে থাকে মহাত্মা গান্ধীর অসাম্প্রদায়িক ভারত। অসাম্প্রদায়িক ভারতীয়রা দেখতে পান, ভারতে মানুষের চেয়ে গরুর দাম বেশি। উগ্র হিন্দুত্ববাদ জাগিয়ে তুলতে হাজার বছর আগে ভারতে বিমান আবিস্কারের গল্পসহ বহু অবৈজ্ঞানিক গল্প ছাড়েন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

নরেন্দ্র মোদির বিগত পাঁচ বছরের শাসনামলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী হয়নি। কৃষক ভুগেছে, নেমেছে রাজপথে; বেকারত্ব বেড়েছে, মানুষ আরও দরিদ্র হয়েছে, ফ্রান্স থেকে বিমান কেনার ক্ষেত্রে বড় দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ লাগিয়ে নাস্তানাবুদ হয়েছে। তবুও ভারতের জনগণ মোদির উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপিকে আরও বেশি ভোট দিয়ে, আবারও ক্ষমতায় পাঠিয়েছে। এই প্রকাণ্ড বিজয়ের নিশ্চিত ফলাফল হবে বিজেপি, শিবসেনা আর আরএসএসের আস্ম্ফালন- সংখ্যালঘু নির্যাতন, হত্যা; ভারত থেকে মুসলিম বিতাড়ন। প্রগতির পথে অনেকখানি এগিয়ে যাওয়া ভারতের পিছিয়ে পড়ার গতি হবে ত্বরান্বিত।

বিজেপির এ জয়কে ব্যক্তি মোদির জয় বলে অভিহিত করেছেন অনেক পর্যালোচক। দ্য হিন্দুতে প্রকাশিত একটি মতামতের শিরোনাম- 'নরেন্দ্র মোদি : যিনি তার দলের চেয়ে বড় নেতা'। লেখাটির এক জায়গায় বলা হয়েছে অমিত শাহ মোদির যোগ্য সহযোগী। তিনি নির্বাচনের কৌশল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রেখেছেন, নিজ দল এবং সহযোগী সংগঠনগুলোকে ঐক্যবদ্ধ রেখে নির্বাচনী প্রচারণায় যথার্থভাবে কাজে লাগিয়েছেন। তবে মোদির অনুপস্থিতিতে অমিত শাহ তেমন কিছুই করতে সক্ষম হবেন না। দলের চেয়ে বড় নেতার সমস্যা হলো, নেতার অবর্তমানে দলে টিকে থাকাই কঠিন হয়। বিজেপি অত দুর্বল দল নয়। তার রয়েছে শিবসেনা, বজরং দলের মতো থিংক ট্যাঙ্ক; সুষমা স্বরাজ, অরুণ জেটলির মতো বেশ কয়েকজন শক্তিশালী নেতা, যারা আগামী দিনে উগ্র হিন্দুত্ববাদের নেতৃত্ব দিতে পারবেন। তাদের মোকাবেলা করতে নতুন করে ঢেলে সাজতে হবে প্রগতিশীল দলগুলোর। ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ পরপর দুই নির্বাচনে বিশেষ করে নতুন ভোটারদের মধ্যে যথেষ্ট আবেদন সৃষ্টি করতে পারেনি। উচ্চশিক্ষিত নতুনরা গত নির্বাচনে মোদির অর্থনৈতিক উন্নয়নের গল্পে ভুলেছিল। এবার তারা হতাশ হয়েছে। হতাশ আছে কৃষকসহ নিম্ন আয়ের অনেকে। মোদি সব রকমের প্রচলিত এবং বাস্তব সমস্যাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক ইস্যুকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদকে সামনে এনে জিতে গেছেন। এ জেতা দীর্ঘস্থায়ী হবে না, যদি তার বিরোধীরা বাস্তব সমস্যাগুলো সামনে নিয়ে এসে তার প্রতিকারের যথার্থ সমাধান জনগণের সামনে তুলে ধরতে পারে।

উগ্র জাতীয়তাবাদ শুধু ভারতে নয়, ছড়িয়ে পড়ছে ইউরোপ-আমেরিকাতেও। ব্রেক্সিট, ট্রাম্প, এরদোয়ান, সালভিনি, ভিক্টর ওরবান, মেরিন লি পেন- উগ্র জাতীয়তাবাদের নবউত্থানের ফসল। সোভিয়েত ইউনিয়ন-পরবর্তী সময়ে রিগ্যান-থ্যাচার প্রচলিত তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি দেশে দেশে চরম অর্থনৈতিক বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। সোভিয়েত-আফগান যুদ্ধ থেকে পশ্চিমাদের শুরু করা ইসলামী জঙ্গিবাদ দেশে দেশে ধ্বংস ডেকে এনেছে; ইসলামের বিরুদ্ধে অন্যান্য ধর্মানুসারীরা ক্ষিপ্ত হয়েছে। সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীজুড়ে। একদিকে বেড়েছে অসহনশীলতা, ভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের প্রতি ঘৃণা; অন্যদিকে তথাকথিত মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে চরম শোষণ। দরিদ্র, ক্ষিপ্ত, সাম্প্রদায়িক হয়েছে নিচুতলার মানুষ। সমস্যা সৃষ্টির কারিগর মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আস্থা হারিয়ে সাধারণ মানুষ সমাধান খুঁজেছে অন্য কোথাও। সত্যিকারের প্রগতিশীল ও গণমুখী রাজনীতির অভাবে তারা খুঁজে পেয়েছে উগ ্রজাতীয়তাবাদ, আশ্রয় নিয়েছে সেখানে।

উগ্র জাতীয়তাবাদ কোনো কালে, কোনো দেশে প্রগতি আনেনি; সাময়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করে দীর্ঘমেয়াদে দেশকে, সভ্যতাকে পিছিয়ে দিয়েছে। ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদের উত্থানের প্রভাব থেকে রক্ষা পাওয়ার কথা নয় প্রতিবেশী বাংলাদেশের। এর প্রভাবে এখানকার মৌলবাদীরা আস্ম্ফালন শুরু করে দিতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। তা থেকে রক্ষা পেতে হলে এখনই নিতে হবে প্রতিষেধক টিকা। কার্যকর টিকা আমাদের সরকারের কাছে আছে তো? থাকলে, তা সঠিকভাবে প্রয়োগ করার সামর্থ্য হবে তো? না হলে এখানেও আস্ম্ফালন করবে জামায়াত, হেফাজত, চরমোনাই, সায়েদাবাদী, ইত্যাদি; দেশ হবে আফগান, আমরা হবো তালেবান।

চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: ad.samakalonline@outlook.com