কোথাও নেই ওসি মোয়াজ্জেম!

১৪ জুন ২০১৯

 দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

 দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

কোথাও কেউ নেই- এটি প্রয়াত বহুমুখী প্রতিভাধারী ব্যক্তিত্ব হুমায়ূন আহমেদের বিখ্যাত ধারাবাহিক টেলিভিশন নাটক। ওই নাটকে একটি চরিত্রে অভিনয় করে আসাদুজ্জামান নূর টেলিভিশন দর্শকদের মধ্যে অভাবনীয় ঔৎসুকের সৃষ্টি করেছিলেন। শুধু এই চরিত্রে অভিনয়কারীই নয়, নাটকটির প্রত্যেকটি চরিত্রই প্রাণবন্ত করে তুলেছিলেন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ও নাটকটির কাহিনীকার এবং পরিচালকও সমাজ বাস্তবতার চিত্র পরিস্ফুটনে-নির্দেশনা দান করে যথাযথভাবে উপস্থাপনে দর্শক মন জয় করতে সমর্থন হন। 'কোথাও নেই ওসি মোয়াজ্জেম'- শিরোনামে লেখাটি লিখতে বসে সেই নাটকটির নাম মনে এলো।
ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দোর্দণ্ড প্রতাপশালী, দুশ্চরিত্র, দুর্নীতিবাজ, শিক্ষক নামের পাষণ্ড অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ-উদ-দৌলার পালিত গুণ্ডা বাহিনীর অন্যতম সহায়ক শক্তি তৎকালীন সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম। নুসরাত জাহান হত্যাকাণ্ডের মর্মন্তুদ ঘটনার বড় দায় যে ওসি মোয়াজ্জেমের, তা এখন আর অস্পষ্ট নয়। বিপদাপন্ন নুসরাত যখন তার সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন, তখনই যদি ওসি যথাযথ ব্যবস্থা নিতেন, তাহলে এ রকম বীভৎসতা-পৈশাচিকতা দেশবাসীকে প্রত্যক্ষ করতে হতো না। ওসি মোয়াজ্জেম কেন নুসরাতকে রক্ষা করতে তৎপর হননি, কেন তার অভিযোগ আমলে নিয়ে প্রতিকারে নিষ্ট হননি, এই রহস্য উন্মোচনেও সময় লাগেনি। ওসি মোয়াজ্জেম ওই অধ্যক্ষের এবং ঘাতকচক্রের সহযোগীর ভূমিকা পালন করে গোটা পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি বিনষ্ট করেন এবং তাদের জন্য কলঙ্কচিহ্ন এঁকে দেন। ওসি মোয়াজ্জেম অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ অন্য দুস্কর্মকারীদের পৃষ্ঠপোষক হওয়ার কারণ-প্রেক্ষাপটও অস্পষ্ট থাকেনি। অর্থের কাছে বিবেক বিক্রিকারী এমন ওসি মোয়াজ্জেমের সংখ্যা অনাকাঙ্ক্ষিত-অনভিপ্রেত হলেও কম নয়।

ওই পৈশাচিক ঘটনার সঙ্গে ক্ষমতাসীন মহলের স্থানীয় একজন বলবান নেতার সম্পৃক্ততারও রহস্য উন্মোচিত হয় এবং তাকে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি সাংগঠনিকভাবে ত্বরিত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এটি আমাদের রাজনীতির অধ্যায়ে আশাব্যঞ্জকতা যুক্ত করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- ওসি মোয়াজ্জেমের খুঁটির জোর কি এতই শক্ত যে, তার টিকিটি পর্যন্ত আজও ছোঁয়া গেল না! সমাজে এই সত্যই যেন প্রতিষ্ঠিত হলো যে, নেতা ধরা গেলেও অভিযুক্ত ওসিকে ধরা এত সহজ নয়। ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে শুধু নুসরাত জাহানকে উল্টো বৈরী পরিস্থিতিতে ঠেলে দেওয়াই নয়, একই সঙ্গে ভিডিও চিত্রধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপত্তিকর ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। সাইবার ট্রাইব্যুনাল থেকে জারি হয় গ্রেফতারি পরোয়ানা এবং এরপরই তিনি লাপাত্তা।

ওসি মোয়াজ্জেম কি সীমান্ত অতিক্রম করে কোথাও চলে গেছেন, নাকি দেশেই গা ঢাকা দিয়ে রয়েছেন- এসব প্রশ্নের প্রাসঙ্গিকতার পাশাপাশি বড় প্রশ্ন হলো, করিতকর্মা পুলিশ কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম কি এরই মধ্যে যথেষ্ট সুযোগ-সুবিধা পাননি? নুসরাত হত্যাকাণ্ড দেশের বিবেকবান প্রত্যেকটি মানুষের হূৎপিণ্ডে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। সরকারের নির্বাহী প্রধান প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং দ্রুততার সঙ্গে নিহত নুসরাতের পরিবারের পাশেই শুধু দাঁড়াননি, এই বর্বরোচিত ঘটনার দৃষ্টান্তযোগ্য প্রতিকারেরও প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। অভিযুক্ত ১৬ জনের বিরুদ্ধে পুলিশও ইতিমধ্যে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। কিন্তু ওসি মোয়াজ্জেমকে পুলিশ খুঁজে পাচ্ছে না! ওসি মোয়াজ্জেমের প্রতি পুলিশ বিভাগের দায়িত্বশীলদের মনোভাব নিয়েও ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। একজন ওসির গ্রেফতারি পরোয়ানা নিয়ে পুলিশের লুকোচুরির অভিযোগ জনমনে পুলিশ সম্পর্কে আস্থার সংকট আরও প্রকট করে তুলেছে। কেন তাকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির আগেই নিরাপত্তা হেফাজতে নেওয়া হয়নি, কেনই-বা সাময়িক বরখাস্ত পর্যন্ত করা হয়নি- এই প্রশ্নগুলোর সৃষ্টি হয়েছে দায়িত্বশীলদের কার্যকারণেই।

রংপুর রেঞ্জে সংযুক্ত করে প্রকৃতপক্ষে তাকে নিরাপদে সোনাগাজী থেকে সরিয়ে নেওয়া হলো। এরপর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির পরপরই সাক্ষ্য দেওয়ার নাম করে তাকে আবার ঢাকায় আসার সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া- এসবই তো বিস্ময়ের। গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে কী করে একজন ওসি অন্য মামলায় সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য অনুমতিপ্রাপ্ত হন, তাও বোধগম্য নয়। এই যে বিধি লঙ্ঘনসহ দুস্কর্মকারী একজন ওসিকে রক্ষার এত কসরত এর মাজেজাটা কী? ওসি মোয়াজ্জেম ঈদের ছুটি ভোগ করারও অবকাশ পেলেন! বর্তমান ডিজিটাল জমানায় গ্রেফতারি পরোয়ানা ও এ সংক্রান্ত অন্য বিষয় সম্পর্কে যেসব অজুহাত দাঁড় করানো হলো, তা কি যুক্তিযুক্ত? কেন পুলিশ বিভাগ এত বড় একটি ঘটনার অন্যতম একজন অভিযুক্ত, যিনি পুলিশ বিভাগেরই দায়িত্বশীল একজন সদস্য, তাকে আইনের আওতায় নিতে দায়িত্ব পালনে এত গাফিলতি কিংবা সদিচ্ছার অভাব দেখাল? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কয়েকদিন আগে বলেছেন, 'একটু সময়' লাগলেও তাকে বিচারের মুখোমুখি হতেই হবে। আমরা মন্ত্রীর কথায় আশ্বস্ত হয়েছি বটে; কিন্তু একই সঙ্গে এ প্রশ্নও রাখি- 'একটু সময়'-এর সীমারেখা কতদূর পর্যন্ত? একজন ওসি যিনি চরম অমানবিক-বর্বরোচিত-পৈশাচিক একটি ঘটনার সহযোগী হিসেবে অভিযুক্ত, তাকে রক্ষায় ইতিমধ্যে যা ঘটল তাতে কী প্রতীয়মান হয়? ওসি মোয়াজ্জেমের শক্তির উৎস কোথায়? পুলিশ বিভাগ প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কী ব্যাখ্যা দেবে এই লজ্জাজনক ঘটনার? প্রশ্নের পাহাড়, কিন্তু সদুত্তর কোথায়!

ওসি মোয়াজ্জেমের ভূমিকা এই ঘটনার প্রথম থেকেই এত বিতর্কিত ছিল যে, মানুষ তা কিছুতেই ভুলতে পারছে না। ইতিমধ্যে গণমাধ্যমে এ ব্যাপারে তার যে নেতিবাচক কর্মফিরিস্তি প্রকাশিত-প্রচারিত হয়েছে, তাও বিস্ময়কর। আরও বিস্ময়কর, ওসি মোয়াজ্জেম যখন এ ঘটনাটি নিয়ে নয়ছয় করছিলেন, তখন ফেনীর পুলিশ সুপার এর প্রতিকার না করে সায় দিয়েছেন। একজন পুলিশ সুপারের এমন কর্মকাণ্ড শুধু অদক্ষতা-অযোগ্যতারই সাক্ষ্য বহন করে না, বহুবিধ প্রশ্ন দাঁড় করানোর পাশাপাশি গোটা পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণকারী হিসেবেও চিহ্নিত করে। সম্প্রতি সরকারের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রথমে বললেন, পলাতককে খুঁজে পাওয়া সহজ নয়। পরে বললেন, ওসি মোয়াজ্জেম শিগগিরই ধরা পড়বেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, অপরাধের সঙ্গে যেই জড়িত থাকুক, তাকে শাস্তি পেতে হবে। এসবই স্বস্তির কথা। আমরা তাদের আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে চাই। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতা আমাদের নিয়ে যায় বক্রচিন্তার পথে। এ দেশের পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সাফল্যের খতিয়ান কম বিস্তৃত নয়। তাদের অর্জনও কম নয়। একই সঙ্গে অর্জনের বিসর্জনের মতো দৃষ্টান্তও আছে। পুলিশ রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সংস্থা। বন্ধু হওয়ার বদলে কোনো কোনো সময় পুলিশ আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় সর্বাগ্রে প্রয়োজন মানুষের আস্থা অর্জন। পুলিশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের প্রয়োজনে পুলিশকেই ভূমিকা নিতে হবে। বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে আসতে হবে।

ইংরেজি পুলিশ শব্দটির প্রতিটি অক্ষরের আলাদা অর্থ আছে। পুলিশকে পোলাইট হতে হয়। হতে হয় ওবিডিয়েন্ট। লায়াল ও ইন্টেলিজেন্ট হতে হয়। কারেজাস, এফিসিয়েন্ট হতে হয়। পুলিশ বাহিনীর ক'জন এই শব্দগুলো ও এর তাৎপর্যের প্রতি সুবিচার করতে পারছেন? ওসি মোয়াজ্জেম হয়তো পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার অপেক্ষায় আছেন। আমাদের পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বহু স্পর্শকাতর মামলার দুর্ধর্ষ আসামিকে দক্ষতা-দ্রুততার সঙ্গে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছেন- এমন দৃষ্টান্ত আছে ভূরি ভূরি। কিন্তু ওসি মোয়াজ্জেমের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছে কেন? ওসি মোয়াজ্জেম কি এই ভূখণ্ডের কোথাও নেই?

সাংবাদিক

deba_bishnu@yahoo.com

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)