মুসলিম নারীকে আশ্রয় দিয়ে একঘরে পুরোহিতের পরিবার!

১৬ জুলাই ২০১৯ | আপডেট: ১৬ জুলাই ২০১৯

অনলাইন ডেস্ক

সন্তান কোলে সখিনা বিবি। পাশে সুুভাষবাবুর স্ত্রী ইলা

বিশ্ব জুড়ে যেখানে সাম্প্রদায়িকতার অস্থিরতা চলছে সেখানে ভিন্ন ধর্মের এক নারীর প্রতি মানবতা দেখিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন এক পুরোহিত পরিবার। আর তাতেই গ্রামবাসীর রোষানলে পড়েছে তারা। গোটা পরিবারকে গ্রামবাসীরা একঘরে করে রেখেছে। বন্ধ হবার জোগাড় পুরোহিতের রোজগারের উপায়ও। খবর আনন্দবাজারের

সম্প্রতি এই ঘটনাটি ঘটেছে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের চোঁয়াতে। সুভাষ রায়চৌধুরী নামের ওই পুরোহিত বাড়িতে বাড়িতে পূজা করে নিজের সংসার চালাতেন।কিছুদিন আগে স্বামীর বাড়ি থেকে এক কাপড়ে বিতারিত এক নারী সখিনা বিবিকে দুই নাবালক সন্তানসহ রাস্তায় অসহায়ভাবে বসে থাকতে দেখে আশ্রয় দেন তিনি। এতেই বাঁধে বিপত্তি।সখিনা ও তার সন্তানরা মুসলিম হওয়ায় গ্রামের অন্যরা বিষয়টা ভালো চোখে দেখেনি। এখন যেখানেই তিনি পূজা করতে যাচ্ছেন সবাই তাকে ফিরিয়ে দিয়ে বলছেন, ‘না, ঠাকুরমশাই, আপনাকে আর আসতে হবে না!’

এ প্রসঙ্গে সুভাষ রায়চৌধুরী বলেন, ‘ঘর-হারা একটা মেয়ে রাস্তায় এভাবে ঘুরছে, চোখ সইল না। তাই মুসলিম হলেও দুটি নাবালক বাচ্চা-সহ তাকে ঘরে ঠাঁই দিয়েছি। আমার কাছে ওটাই যে সব চেয়ে বড় ধর্ম’।

বাবার কথার সঙ্গে একমত পোষন করলেন সুভাষবাবুর কন্যা কাকলীও। বিবাহ বিচ্ছেদের পরে বাবার বাড়িতেই থাকেন তিনি। মুলত কাকলীই ওই মুসলিম নারীকে সন্তানসহ বাড়িতে নিয়ে এসেছিলেন।তাতে সম্মতি ছিল তার বাবার। কাকলী বলেন, ‘আশ্রয়হীন এক নারী, তাকে দেখেও চোখ বুজে থাকব?’ তিনি আরও বলেন, ‘বাবাকে এসে বললাম, সখিনাকে আমাদের বাড়িতে একটু জায়গা দাও না। বাবা রাজি হতেই নিয়ে এসেছি’। দুঃখের সঙ্গে কাকলী জানান, শুধুমাত্র সখিনা আর তার সন্তানদের সাহায্য করার অপরাধে গ্রামের লোকেরা তাদের একঘরে করে রেখেছে।

সুভাষবাবুর স্ত্রী ইলা বলেন, ‘আমরাতো এর মধ্যে কোনও অন্যায় দেখিনি। দুটি ছোট বাচ্চা ছেলে-মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো একটা মেয়েকে আশ্রয় দিয়েছি’। তার প্রশ্ন, ধর্ম কি মানবতার চেয়েও বড়?

গ্রামের লোকেরা সুভাষ রায়চৌধুরীকে একঘরে করলেও সখিনার পরিবার এখন রায়চৌধুরী পরিবারের অংশ হয়ে ওঠেছে। ছেলে-মেয়ে দুটিকে ভর্তি করা হয়েছে স্থানীয় প্রাথমিক স্কুলে। কাকলী, ইলাদেবীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে ঘরের কাজ করছেন সখিনাও। 

সখিনা জানান, পুরুতমশাইয়ের বাড়িতে থাকলেও নিজের ধর্ম নিয়ে কখনই কোনও বাঁধা পাননি তিনি। সখিনা বলেন, ‘এক বারের জন্যও আমার ধর্ম নিয়ে আপত্তি তোলেননি সুভাষবাবু। রোজা রাখতেও বাঁধা দেননি’।

সখিনা কিংবা পুরোহিত পরিবারের মধ্যে মানবতার এমন মেলবন্ধন তৈরি হলেও তা মানতে পারছেন না গ্রামের মাতব্বরা। চোঁয়া গ্রামের এক মাতব্বর বলেন, ‘ভিন্ন ধর্মের মানুষকে ঘরে রেখে কি পূজা করা যায়’?

গ্রামের মাতব্বরদের বিরোধীতা সত্ত্বেও হার মানেননি সুভাষবাবু। তিনি বলেন, ‘মেয়ের উপর অত্যাচার হলে কী হয় সেটা আমি জানি। তাই সখিনাকে এ বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছি’। নিজের সিদ্ধান্তে অটল মানবদরদী এই পুরোহিত বলেন, ‘যত দিন না সখিনা ও তার ছেলেমেয়েদের কোনও ব্যবস্থা হয় এখানেই থাকবে তারা’।

সুভাষবাবুর এই উদারতার কথা পৌছেছে স্থানীয় প্রশাসণের কাছে। স্থানীয় এক বিডিও কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ অসামান্য সাহস দেখিয়েছেন সুভাষবাবু। আমরা সরকারের পক্ষে ওই পরিবারকে সবরকম সহযোগিতা করব।‘ তিনি আরও বলেন, ‘ওই গ্রামে গিয়ে আমরা কথা বলব, মানুষকে বোঝাব। তাদেরকে বলবো, এটাই তো প্রকৃত ধর্ম’।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: [email protected] (প্রিন্ট), [email protected] (অনলাইন)