আমার সন্তান কেন থাকে না দুধে-ভাতে

সমাজ

০৮ জুলাই ২০১৯

মামুনুর রশীদ

এক সময় একটি আলোচনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল। বিষয়টি ছিল স্বাস্থ্য ও শিক্ষা নিয়ে। শিক্ষার আগে স্বাস্থ্য, নাকি স্বাস্থ্যের আগে শিক্ষা? কেউ কেউ মনে করেন, শিক্ষা হলে স্বাস্থ্যের ব্যাপারটি ঠিক হয়ে যাবে। মানুষ তার নিজের প্রয়োজনেই সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। আরেকটি আলোচনা এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল। তা হলো, শিক্ষা আগে, নাকি সংস্কৃতি আগে? এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তর আলোচনার অবকাশ আছে; তবে প্রথম আলোচ্য বিষয়টি নিয়ে কথা বলাটা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রথম প্রয়োজন সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম ও চারদিকে সুন্দর পরিবেশে প্রাকৃতিক আয়োজন। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত এই প্রয়োজনটি মেটানো রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। এই দায়িত্বটি শুরু হয় শিশুর জন্ম থেকে, যখন শিক্ষার প্রশ্নটি আসেই না। অতএব, মীমাংসাটি খুব দীর্ঘ আলোচনার বিষয় নয়। খাদ্যের ব্যাপারটি নিয়ে কথা বলতে গেলে হাজারো কথা আসে।

খাদ্যে ভেজাল এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ, বাজার ও চেইন স্টোরগুলোতে প্রতিদিনই খাদ্য সংক্রান্ত ভয়াবহ সব সংবাদ আমাদের কাছে পৌঁছে যায়। সবচেয়ে ভয়াবহ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, কলেজ হোস্টেল, ছাত্রছাত্রীদের আবাসিক হোস্টেল, সরকারি কর্মজীবীদের হোস্টেল- এসব স্থানে খাদ্যের ব্যবস্থা দুর্বল। খবরের কাগজে দেখলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় '৭১ হলের ক্যান্টিনে পচা মহিষের মাংস ও মাছ পাওয়া গেছে। হলের ভিপি ও হল কর্তৃপক্ষ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ও ক্যান্টিন ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যারা আছেন, তাদের অব্যাহতি দিয়েছেন। সারাদেশের ছাত্রছাত্রীদের খাদ্যের দায়িত্বে যেসব ক্যান্টিন আছে, সেখানে এ ধরনের তল্লাশি চালালে একই পরিস্থিতি দেখা যাবে। অস্বাস্থ্যকর, নোংরা পরিবেশে রান্না করা খাবার ফ্রিজে দীর্ঘদিন রাখা, পচে যাওয়া মাছ-মাংস, সবজি, বাসি খাবার এগুলো নিত্যদিনের ঘটনা।

ব্যক্তিমালিকানাধীন যেসব হোস্টেল আছে, সেখানে শিক্ষার্থীদের খাবার বাধ্যতামূলক। এর জন্য একটা ভালো টাকাও নেওয়া হয়। এখানে সিট ভাড়া বাবদ যে অর্থ নেওয়া হয়, তাতেও একটা ভালো মুনাফা করে থাকেন মালিকরা। উপরন্তু নিম্নমানের খাবার দিয়ে আরও বেশি মুনাফার ব্যবস্থা করেন তারা। একটি ছোট্ট ঘরে কোনো রকম ভেন্টিলেশন ছাড়া শুধু একটি ছোট্ট ফ্যান দিয়ে ঠাসাঠাসি করে কয়েকজনের থাকার ব্যবস্থা করা হয়। অনেক ছাত্রছাত্রীর জন্য একটিই টয়লেটের ব্যবস্থা। ফলে গোসল বা টয়লেট ব্যবহার করতে গিয়ে হুড়োহুড়ি লেগে যায়। পানির ব্যবস্থাও কোথাও কোথাও একেবারে অপর্যাপ্ত। এসব হল-হোস্টেলে থাকতে হয় মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানদের, যারা পরবর্তী সময়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেবে। ব্যক্তিমালিকানাধীন হোস্টেলগুলোর কিছু কিছু নিষ্ঠুর মালিক ইচ্ছামতো বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের ওপরেও নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। প্রায়ই পানির প্রবল সংকট দেখা দেয়। খুব সস্তায় মোটা চাল, সেই সঙ্গে প্রায়ই পচা মাছ-মাংস এবং ডালের নামে হলুদ পানির ব্যবস্থা সর্বত্রই। এই ব্যবস্থা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সরকারি কলেজের ছাত্রাবাসগুলোতেও। এই ব্যবস্থার ফলে একজন ছাত্রের সত্যিকার অর্থে মনোযোগী ছাত্র হয়ে ওঠা দুরূহ।

আমরা যারা ষাটের দশকের ছাত্র, তখন হল-হোস্টেলে খাদ্যের খরচ ছিল মধ্যবিত্তের আয়ত্তের মধ্যে। মোটামুটি একটা স্বাস্থ্যকর খাবার নিশ্চিত করেও মাসে একটি অত্যন্ত উপাদেয় ফিস্ট ও একটি ইমপ্রুভ ডায়েটের ব্যবস্থা করা হতো। ওই রাতে ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটা আনন্দদায়ক পরিবেশও সৃষ্টি হতো। সেসব রাতের স্মৃতি রোমন্থন করে আমরা এখনও আনন্দ পাই। সে সময় ঢাকায় কয়েকটি হোস্টেলের খাবার ছিল আমাদের জন্য খুব লোভনীয়। যেমন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলের খাবার এবং ওখানকার ক্যান্টিনে বিকেলে নাশতার চমৎকার ব্যবস্থাও ছিল। এখন ক্যান্টিনের খাবার রীতিমতো দুঃস্বপ্ন। খাদ্যও যে একটা বিনোদন- এটা ছাত্রছাত্রীরা ভুলেই গেছে। স্কুল-কলেজ- বিশ্ব্ববিদ্যালয়ে নানা কারণে আমার যাওয়ার সুযোগ হয়। সেখানে অপুষ্টিজনিত ছাত্রদের চোখ দেখলে ভীষণ ব্যথিত হই। চোখে কোনো আলো দেখতে পাই না। হয়তো কোনো শিক্ষার্থী অতি কৃশকায় আবার কেউ অতিরিক্ত স্থূল। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত ছাত্রছাত্রীরা অধিকতর ধনীর সন্তান; কিন্তু জাঙ্ক ফুড খেতে খেতে তারাও স্বাস্থ্যহীন হয়ে পড়ছে। গ্রামে এখনও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সামনে একটা খেলার মাঠ আছে; যদি সেখানে কোনো ভূমিদস্যুর চোখ না পড়ে। গ্রামের ছেলেরা খাদ্যের দিক থেকে অনেকটাই স্বাস্থ্যকর খাবারের সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু গ্রামের ভালো শাক-সবজি, মাছ-মাংস এখন আর গ্রামে থাকছে না। শহুরে ফড়িয়াদের কল্যাণে মুনাফার লোভের কারণে তা শহরে চলে আসছে।

গ্রামের কৃষক একেবারেই কম মূল্যে বিক্রি করে দিচ্ছে এবং ঢাকায় তা অনেক দামে বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু কৃষকের তৈরি খাদ্যেও ঢুকে গেছে নানা ধরনের কীটনাশক, সার ও ফরমালিন জাতীয় রাসায়নিক। সম্প্রতি দেখা গেল, হাজারীবাগে ট্যানারির বর্জ্য থেকে হাজার হাজার টন গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি এবং মাছের খাদ্য তৈরি হচ্ছে। এই খাবার খেয়ে যে পশু ও অন্যান্য প্রাণী বড় হচ্ছে, সেগুলো যখন মানুষ খাবে, তখন নানা ব্যাধি বিশেষ করে ক্যান্সারের জন্ম হবে। ওইসব ছাত্রাবাসে এসব বিবেচনার করার কোনো লোক নেই। ফলে ছাত্রদের মেধার ক্ষেত্রে একটা বড় ধরনের অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের সময় হোস্টেল ও হলে আবাসিক ছাত্রদের জন্য যে খাদ্য ব্যবস্থাপনা কমিটি ছিল, তাতে ছাত্রদের প্রতিনিধিত্ব ছিল এবং মাসে মাসে তার পরিবর্তন হতো। ফলে ছাত্রদের খাদ্য ব্যবস্থাপনায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকত। এখন সে ব্যবস্থা আছে কি-না জানি না। তবে না থাকলে অবিলম্বে এ রকম একটি ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি। ব্যক্তিমালিকানাধীন যেসব হোস্টেল আছে, তার ওপর সরকারি নজরদারি প্রয়োজন।

কিছুদিন আগে দেখেছিলাম, ভ্রাম্যমাণ আদালত এসব হোস্টেলকে জরিমানা করছেন। জরিমানা করলেই পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাতেও যদি সমস্যার সমাধান না হয়, তবে দ্রুত বন্ধ করে দেওয়ার বিধান থাকতে হবে। শিক্ষা যেমন জরুরি; ছাত্রদের স্বাস্থ্যও তেমনি জরুরিভাবে দেখা প্রয়োজন। খাবারে কষ্ট দিয়ে, ভেজাল খাবার খাইয়ে, পচা-বাসি খাবার গ্রহণে বাধ্য করে মেধার উন্নতি সম্ভব নয়। আমাদের দেশে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রচুর ছাত্র; কিন্তু সে তুলনায় আবাসিক ব্যবস্থা একেবারেই অপ্রতুল। আমাদের পূর্বপুরুষ জনসংখ্যা ও শিক্ষাব্যবস্থার কথা বিবেচনা করে কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করেনি। বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে নতুন নতুন বিভাগ চালু হয়েছে; কিন্তু সেই সঙ্গে আনুপাতিক হারে আবাসনের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে কিছু ব্যক্তি হোস্টেল দিয়ে ছাত্রদের আবাসন সমস্যার কিঞ্চিৎ সমাধান করেছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। আবাসন ব্যবস্থার সঙ্গে অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ের খাদ্যের ব্যবস্থা করে মুনাফার পথকে সুগম করেছে। বাংলাদেশের ছাত্রছাত্রীরা যথেষ্ট মেধাবী। তাদের জন্য আবাসন ও খাদ্যের যদি উপযুক্ত ব্যবস্থা করা যেত, তবে দেশ পরিচালনার কাজে যারা নিয়োজিত হবেন, তাদের মেধাগত যথার্থ উন্নতি হতে পারত।

আমাদের দেশের সাধারণ ও মাঝারি মানের ছাত্ররাও বিদেশে গিয়ে বড় বড় সাফল্য দেখিয়েছে। এর কারণ সেখানকার জীবনযাপনের পরিবেশ, সুষম খাদ্য ও কাজ করার যথোপযুক্ত সুযোগ। আমরা এর কোনোটারই ব্যবস্থা করতে পারছি না; যদিও উন্নয়নের মহাসড়কে গিয়ে দাঁড়িয়েছি। বিষয়টি শুধু রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে চলবে না। কারণ সমস্যাটি ব্যাপকভাবে সামাজিক ও রাজনৈতিক। গুরুত্বপূর্ণ এই সামাজিক, রাজনৈতিক বিষয়টিতে রাজনীতিবিদ, অভিভাবক, বুদ্ধিজীবী ও অবশ্যই শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসতে হবে। অন্যথায় এভাবে চলতে থাকলে এক অরাজক পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য ও শিক্ষা দুটিই এক গভীর অনিশ্চয়তার দিকে যাত্রা করবে।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]