নাটকে বাজেট স্বল্পতা, কী বলছেন প্রযোজকরা?

১৮ জুলাই ২০১৯ | আপডেট: ১৮ জুলাই ২০১৯

বিনোদন প্রতিবেদক

প্রযোজক নওয়াজেশ আলী খানম, মোস্তফা কামাল সৈয়দ, শাহরিয়ার শাকিল ও নির্মাতা-প্রযোজক সাগর জাহান

টিভিতে প্রতিদিন এক ঘণ্টা, ধারাবাহিক সব মিলিয়ে প্রায় ৩০টি নাটক প্রচার হয়। তারকাসমৃদ্ধ এসব নাটকে নেই আগের সেই জৌলুস। কেন? উত্তর খুব সহজ। নেই গল্প, নেই শিল্পীদের অভিনয়ে কোনো প্রাণ। নাটকের এ বেহাল দশার অন্তরালে যে সমস্যাটি বারবার সামনে এসেছে, তা হলো 'বাজেটস্বল্পতা'। এখন নাটকের বাজেট কত? বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন নাটকের প্রযোজক নির্মাতারা। 

নওয়াজেশ আলী খান

একটি ভালো নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে ভালো গল্প নির্বাচন প্রথম শর্ত। দুঃখজনক হলেও সত্য, ভালো গল্প সংগ্রহে আমাদের এখনও কোনো গবেষণা প্রক্রিয়া নেই। অথচ বিভিন্ন চ্যানেলে প্রতিদিন কত নাটক প্রচারিত হচ্ছে! ভালো নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে অভিনেতার অভিনয় দক্ষতা, চরিত্রের পূর্ণ পরিস্ম্ফুটনের প্রস্তুতি, প্রয়োজনীয় সময় প্রদান জরুরি। ভালো নাটকের ক্ষেত্রে আলো ও শব্দের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ঝকঝকে ছবি আর শব্দ নাটকের গুণগত মান বৃদ্ধি করে। বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির যে উন্নয়ন ঘটেছে, তার পরিপূর্ণ ও যথাসম্ভব প্রয়োগ নির্মাতাকে সফল করতে বিশেষ অবদান রাখতে পারে। নাটকের জন্য আবহ সঙ্গীতের প্রয়োজনীতা অপরিসীম। পোশাক নাটকের জন্য একটি বিশেষ দিক। রূপসজ্জা নাটকের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চরিত্রের প্রয়োজনে ভালো রূপসজ্জাকরের ভূমিকা শিল্পীর জন্য বিশেষ জরুরি।

মোস্তফা কামাল সৈয়দ

বাস্তব জীবনের একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের যেমন মিল থাকে না, তেমনি একটি নাটকের গল্পের সঙ্গেও অন্যটির গল্পে থাকতে হবে ভিন্নতা আর অভিনবত্ব। নাটকে থাকতে হবে জীবনের নানবিধ উপাদান, প্রেম-ভালোবাসা, স্নেহ, স্বার্থহীনতা, কৃতজ্ঞতাবোধ, মূল্যবোধ সৃষ্টি, ক্ষমা করার মানসিকতা, প্রেরণাসহ শিক্ষণীয় নানা বিষয়। তাই তো একটি নাটকে থাকে নায়ক-নায়িকা, খলনায়ক-নায়িকা, শিশুসহ একাধিক সহযোগী চরিত্র। শিল্পীরা হলেন নাটকের অলঙ্কার। যাকে যত সঠিক স্থানে ব্যবহার করা যাবে, সে অলঙ্কারই তত ভালো লাগবে। একটি ভালো নাটক হতে পারে শিক্ষণীয়, অর্থবহ ও বার্তাবাহক। ভালো নাটক নির্মাণে যেমন যথেষ্ট ও প্রয়োজনীয় অর্থ প্রয়োজন, তেমনি শুধু অর্থোপার্জন নাটক নির্মাণ, অভিনয় ও প্রচারের মূল লক্ষ্য হতে পারে না।

শাহরিয়ার শাকিল

অনেকেই বলছেন এখনকার নাটকের মান পড়ে গেছে, নাটক কেউই দেখছে না। আমি এ বিষয়গুলোর সঙ্গে একমত নই। নাটকের মান পড়েনি। দিন যাচ্ছে শিল্পী কলাকুশলীদের সম্মানী বাড়ছে, সে তুলনায় টিভি নাটকের বাজেট বাড়ছে না। টেলিভিশনের বাজেট না থাকার পরও অনেক নির্মাতা ভালো কাজ করছেন। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যে তরুণরা ভালো কাজ করছেন। তবে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর নাটক প্রচারের ক্ষেত্রে গ্রেড নির্ধারণ উচিত। এখন আমাদের দেশের টেলিভিশনগুলোয় ধারাবাহিক নাটকের প্রচার বেশি হচ্ছে। হাতেগোনা কয়েকটি চ্যানেল ছাড়া প্রায় প্রতিটি চ্যানেলে এখন এক ঘণ্টার নাটক প্রচার হয় বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক। এসব নাটক খুব যে দর্শক দেখছে না তা ঠিক নয়। এখনও ভালো নাটক প্রচার হলে ভালো রেসপন্স পাচ্ছি। সত্যি বলতে কী- চ্যানেল বেড়েছে, অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন এবং বিদেশি চ্যানেলের অনুপ্রবেশ সব মিলিয়ে দেশীয় নাটকের প্রতি দর্শকের আগ্রহ কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশের নাটকের কলাকুশলীরা অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে ভালো কাজ করছেন।

আলী বশির

টিভি নাটকের দর্শক কমে যাওয়ার বিভিন্ন কারণ আছে। প্রথম কারণটা হলো মনস্তাত্ত্বিক- এটাই প্রথম কারণ বলে আমি মনে করি। আমরা যারা টিভি নাটক প্রযোজনা ও পরিবেশন করি, লিখি, বানাই, অভিনয় করি বা যারা চ্যানেলের অনুষ্ঠান বিভাগে কাজ করি তাদের কেউই আর নাটককে শিল্প হিসেবে নিচ্ছি না। সবাই এটাকে জীবিকার মাধ্যম হিসেবে দেখছি। মুনাফা খুঁজছি নাটকের ভেতর, কত অল্প দিয়ে কত বেশি পাওয়া যায়। শিল্প যখন কেবল জীবিকার মাধ্যম হয়, তখন সে শিল্প দর্শক বর্জন করবেই। এখন একটি টিভি নাটকের জন্য যে পরিমাণের বিনিয়োগ করা হয়, তা বেশিরভাগ সময় ফিরে আসে না। আমাদের দেশের নাটকের মান কমছে না। বাজেট স্বল্পতার কারণে নাটকের মধ্যে বিভাজন হয়ে গেছে। বিভিন্ন গ্রেড চলে আসছে। চ্যানেলগুলো বাজেট কম দিচ্ছে, আবার প্রচুর নাটকও চাচ্ছে। তাহলে তো ভালো নাটক পাওয়া যাবে না। ভালো নির্মাণের জন্য ভালো বাজেট দিতে হবে। ভালো বাজেট হলেই আমরাও ভালো কাজ করতে পারব।

শিহাব শাহীন

কনটেন্ট যদি ভালো হয় তাহলে মানুষ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। মান যদি ঠিক থাকে, কনটেন্ট ভালো হলে দর্শক বাইরে যেতে পারবে না। এখন মুক্তবাজার অর্থনীতির সময়। এই অবস্থায় দর্শককে আটকে রাখা যাবে না। তবে সব পাখি ঘরে ফেরে। ফিরে আসতে হয়। আমাদের দর্শকরাও বিভিন্ন চ্যানেল ঘুরে নিজেদের সংস্কৃতিতে এসে ঘুমাতে চায়। কিন্তু তাকে আমরা ঘরে ফিরতে দিই না। দর্শক যখন ঘরে ফিরতে চায়, তখন বিজ্ঞাপনের অত্যাচারে অপরিকল্পিত অনুষ্ঠানের কারণে আর ঘরে ফিরতে পারে না। তখন তারা অপসংস্কৃতি নিয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। এখন আমাদের উচিত ভালো গল্পের নাটক ও টেলিছবির নির্মাণ। আমি নিজে ভালো গল্প আর ভালো বাজেট ছাড়া কাজ করি না। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর উচিত গড়পড়তা নাটক ও টেলিছবি প্রচার না করে ভালো কাজ প্রচার করা। তাহলেই দেশের টেলিভিশন দর্শক বাড়বে।

অনিমেষ আইচ

আজও নতুন একটি গল্প নিয়ে কাজ করতে গেলে ভয় পাই। টিভি চ্যানেল থেকে সরাসরি কাজ নিয়ে সেই কাজের বাজেট কিছুটা হলেও বেশি থাকে। কিন্তু যখন সেই কাজটি কোনো প্রযোজক বা প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে নেওয়া হয়, তখন তারা আমাদের যে পরিমাণ টাকা দেন তা দিয়ে ভালো একটি নাটক তৈরি কঠিন হয়ে যায়। এত প্রতিকূলতা পাড়ি দিয়ে একটা নাটক দর্শকের কাছে এসে পৌঁছায়। তবে নাটক দেখার সেই 'ক্রেজি দর্শক' কমে গেছে। ফলে নাটকের বাজেট বাড়াতে হবে। এ জন্য চ্যানেল, এজেন্সি এবং নির্মাতাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। ভালো বাজেটের পাশাপাশি পরিচালকেরও অভাব আছে। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর দায়িত্ব নিয়ে এ কাজ করার কথা। অথচ বেশিরভাগ চ্যানেলেই কোনো ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর নেই। এটা নিয়ে অনেক চিন্তা-ভাবনা করতে হবে। 

সাগর জাহান

আমাদের কাজের মধ্যে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। মানসম্মত কাজ দিতে পারছি না বলেই হয়তো দর্শক কমে যাচ্ছে। একটা নাটক বানাতে হলে একজন ভালো পরিচালক লাগে। ভালো গল্প, ভালো শিল্পী এবং বাজেটও লাগে। এগুলোর যে কোনো একটাতে সমস্যা হলেই পুরো নাটকের ওপর প্রভাব পড়বে। আমাদের সব উপকরণের সঠিক প্রয়োগ হচ্ছে না বলেই নাটকের মান কমছে এবং দর্শকও স্বাভাবিক নিয়মে কমে যাচ্ছে। তা ছাড়া বিদেশি সিরিয়াল বা চ্যানেলকে দোষ দেওয়ার আগে আমি বলব, আমাদের কাজের মান বাড়াতে। আমরা যদি ভালো কাজ দিতে পারি, তাহলে দর্শক আমাদেরটাই গ্রহণ করবে। ভালো কাজের জন্য একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা দরকার। আমি মনে করি, এখন আমাদের চ্যানেলগুলোর ভাবার সময় চলে এসেছে। এখন না ভাবলে কখন ভাববেন? 

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: [email protected] (প্রিন্ট), [email protected] (অনলাইন)