শিশু ধর্ষণ

বসুন্ধরা কি কাঁপবে না

০৯ জুলাই ২০১৯

দেশে ছয় মাসে প্রায় পাঁচশ' শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে- এ তথ্য বিশ্বাস করতেই যেন কষ্ট হয়। অথচ এ এক রূঢ় বাস্তবতা। রীতিমতো পরিসংখ্যানের বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে! বস্তুত সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে 'সহজ শিকার' শিশু ধর্ষণের মাত্রা কতটা বেড়ে গেছে; সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমই তার দুর্ভাগা সাক্ষী। বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরিচালিত সমীক্ষা থেকে জানাচ্ছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন মাসে ৪৯৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে অর্ধশতাধিক গণধর্ষণ! ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনাও কম নয়। আলোচ্য সমীক্ষায় স্বভাবতই জুলাই মাসের অঘটনগুলো স্থান পায়নি। আমরা দেখছি, গত শুক্রবার রাজধানীর ওয়ারীতে শিশু সায়মাকে কী নৃশংসভাবে প্রাণ হারাতে হয়েছে! প্রায় পাঁচশ' শিশু ধর্ষণের শিকার হওয়ার খবরের সঙ্গেই সমকালে প্রকাশ হয়েছে- মাত্র ৭ বছর বয়সের এই শিশুকে তারই খেলার সাথীর চাচা কীভাবে ধর্ষণ ও হত্যা করেছে। নারায়ণগঞ্জ ও নেত্রকোনায় পিতৃতুল্য শিক্ষক একের পর এক যৌন নিপীড়ন চালিয়েছে তার কন্যাতুল্য শিশু-ছাত্রীদের ওপর। এই আশঙ্কা অমূলক নয়, আরও অনেক ঘটনা হয়তো সংবাদমাধ্যমে আসেনি। কিন্তু প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমে নতুন নতুন যেসব ঘটনার খবর আসে, সেগুলোই আমাদের সেই পুরনো প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়- এ কেমন বর্বরতা সমাজকে গ্রাস করছে? কণ্ঠশিল্পী ভূপেন হাজারিকা তার 'মানুষ মানুষের জন্যে' গানে বলেছিলেন, দানব কখনও যদি মানব হয়ে ওঠে, তাহলে আমরা লজ্জা পাব কি-না। কিন্তু আমরা গভীর উদ্বেগ ও বেদনার সঙ্গে দেখছি, মানবিকতার উৎকর্ষ সাধন দূরে থাক; পশুত্বের স্বাভাবিক প্রবৃত্তিও হারিয়ে ফেলে মানুষ শিশু ধর্ষণ করছে। এমনকি নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীদের হাতেও যেভাবে শিশু ধর্ষণের খবর পাওয়া যাচ্ছে, সেটাকে নিছক পৈশাচিক বললেও কম বলা হয়। দুর্ভাগ্যবশত সাম্প্রতিককালে এ ধরনের পৈশাচিক নজিরই আমাদের দেখতে হচ্ছে। ছয় দশক আগে সাংবাদিক ও লেখক আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী তার একুশের গানে লিখেছিলেন, 'শিশুহত্যার বিক্ষোভে আজ কাঁপুক বসুন্ধরা'। ফুলের মতো নিষ্পাপ, পৃথিবীর পঙ্কিলতা থেমে মুক্ত শিশুদের হত্যা কিংবা হত্যার পর ধর্ষণ নিশ্চয়ই বর্বরতার আরও নিকৃষ্ট মাত্রা। এত ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় এখনও বসুন্ধরা নিশ্চয়ই কাঁপছে; কিন্তু মানুষের বিবেকে নাড়া পড়ছে কি? রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারক, সমাজপতি, বুদ্ধিজীবী ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন নাগরিকদের সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে। শিশু ধর্ষণে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে সবাইকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বানের পাশাপাশি সামাজিকভাবেও সবাই মিলে আমাদের শিশুদের নিরাপত্তা বিধানের আহ্বান জানাই। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চয়ই জরুরি; একই সঙ্গে এটাও শনাক্ত করতে হবে- ধর্ষণের মনস্তত্ত্ব এভাবে সর্ববিস্তারী হয়ে উঠছে কেন? সমকালে প্রকাশিত এ সংক্রান্ত প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা পারিবারিক দায়িত্বশীলতা হ্রাস, মাদকাসক্তি, পর্নোগ্রাফির বিস্তার, মূল্যবোধের অবক্ষয়ের কথা বলেছেন। আমরা দেখতে চাইব, বিষয়গুলো রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজও গভীরভাবে ভাবছে।

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]