পালাবদলের ঘুম!

০৯ জুলাই ২০১৯

মাহফুজুর রহমান মানিক

দিনের কর্মব্যস্ততা শেষে রাত আসে বিশ্রামের জন্য। রাতের ঘুম আবার পরদিন কাজের শক্তি জোগায়। মানুষের বাঁচার জন্য তাই জরুরি বিষয়গুলোর মধ্যে বাসস্থান অন্যতম। সুন্দর আবাসন, ভালো ঘুম মানুষকে প্রফুল্ল রাখে, কাজে মনোযোগী করে, জীবনবোধে ইতিবাচক পরিবর্তন আনে। ছাত্রজীবনের প্রধান কাজ পড়াশোনা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানচর্চা, পড়াশোনা ও গবেষণার পরিবেশ নির্বিঘ্ন করতেই রয়েছে আবাসন ব্যবস্থা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলার অন্যতম কারণ হলো যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক। সেখানে শিক্ষার্থীরা হলের সঙ্গে সংযুক্ত এবং তাদের আবাসন নিশ্চিত করা হয়। একইভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করত। এখনও সব শিক্ষার্থী কোনো না কোনো হলের সঙ্গে সংযুক্ত। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এখন শিক্ষার্থীর তুলনায় আবাসন সুবিধা খুব কম। অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে হলের বাইরে থাকতে হয়। আবাসিক হলগুলোতে যে আসন রয়েছে, তার তুলনায় অনেক বেশি শিক্ষার্থী হলগুলোতে থাকছেন। ফলে সেখানে আবাসন সুবিধা একেবারেই অপ্রতুল। সে বিষয়টিই উঠে এসেছে সোমবার প্রকাশিত একটি দৈনিকের প্রতিবেদনে। 'পালা করে কেউ ঘুমায় রাতে, কেউ বা দিনে' শিরোনামের প্রতিবেদনটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কবি জসীম উদ্‌দীন হলের শিক্ষার্থীদের এমন দুর্দশা উঠে এলেও এটি আসলে গোটা বিশ্ববিদ্যালয়েরই চিত্র। হলটিতে আবাসিক সুবিধা রয়েছে ৩৮৭ জনের। অথচ থাকছেন ১০০০ শিক্ষার্থী। সেখানে রয়েছে ১০টি গণরুম, যেখানে ৪ জনের রুমে থাকছেন ২০/২৫ জন শিক্ষার্থী। স্বাভাবিকভাবেই এসব কক্ষে রাতের বেলায় সবার একসঙ্গে ঘুমানো অসম্ভব। তাই তাদের ঘুমাতে হয় পালা করে। কেউ রাতে ঘুমান, কাউকে ঘুমাতে হয় দিনে। ফলে রাতে হয়তো কাউকে ঘুরেফিরে, বসে কিংবা কষ্ট করে পড়াশোনা করে কাটাতে হয়। একজন প্রতীক্ষায় থাকেন কখন তার সহপাঠী উঠবে, সেও একটু ঘুমাবে।

এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় সব হলের চিত্র। প্রায় ১০ বছর আগে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে আমারও সে চিত্র দেখার সুযোগ হয়েছে- কীভাবে একজন শিক্ষার্থী রাতে ঘুমের জায়গা না পেয়ে হলের বারান্দা, মসজিদ কিংবা হলের ছাদে ঘুমান; কী রকম মানবেতর জীবন যাপন করতে হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের আবাসিক শিক্ষার্থীদের। এটি সত্যিই দুঃখজনক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শিক্ষাঙ্গন, যেখানে শিক্ষার্থীরা তীব্র প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ভর্তির সুযোগ পান, সেখানে ভর্তি হয়েই আবাসিক শিক্ষার্থীদের অবর্ণনীয় ভোগান্তির মধ্যে পড়তে হয়। দশকের পর দশক ধরে এভাবেই চলে আসছে। তার বিপরীতে প্রশাসনের ভূমিকা সামান্যই। অন্যদিকে এ সংকটকে পুঁজি করে হলগুলোতে গড়ে উঠেছে লেজুড়বৃত্তির ছাত্র রাজনীতি। মূলত হলগুলোতে কারা থাকবে, কীভাবে থাকবে, সে নিয়ন্ত্রণ হল প্রশাসনের হাতে নেই- এ অভিযোগ নতুন নয়। এও পুরনো অভিযোগ- সেসব নিয়ন্ত্রণ করেন ছাত্রনেতারাই। প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীদেরও তাই হলে থাকতে ঘুরতে হয় তাদের পেছনে। দু'এক বছর না গেলে হলে সিট নামক সোনার হরিণ ধরা যায় না! আমাদের মনে আছে সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের বারান্দায় হাফিজুরের মৃত্যুর মর্মন্তুদ ঘটনা। এভাবেই দেশের সেরা মেধাবীদের একাংশ শিক্ষার প্রতি আগ্রহ হারায়!

আবাসিক হলে একটা সিটের জন্য বিশেষ করে গ্রাম থেকে আসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যে কত ত্যাগ শিকার করতে হয়, তা ভুক্তভোগীমাত্রই জানেন। সেখানে পালাবদল করে ঘুম বলা চলে তুচ্ছই!

[email protected]

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]