এই দেশ ধর্ষকের দেশ নয়

সমকালীন প্রসঙ্গ

১০ জুলাই ২০১৯

আবদুল মান্নান

সব দেশ বা জাতির একটা নিজস্ব পরিচয় বা আইডেন্টিটি থাকে। সেই পরিচয় সে দেশের মানুষই সৃষ্টি করে। অর্থাৎ মানুষের কর্ম দ্বারা দেশটি পরিচিতি লাভ করে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে যখন দেশটি পূর্ব পাকিস্তান বা পূর্ব বাংলা হিসেবে পরিচিত ছিল, তখন এই দেশটি বহির্বিশ্বে পরিচিত ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অভাব-অনটন, ক্ষুধা, দারিদ্র্যপীড়িত দেশ হিসেবে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে দেশটি পরিচিতি লাভ করল একটি লড়াকু জাতির দেশ হিসেবে, যার মুক্তি ও স্বাধীনতার জন্য দেশটির কৃষক-শ্রমিক, ছাত্র-জনতা, পুলিশ আর বাঙালি সেনাবাহিনী নিজেদের জীবন উৎসর্গ করতে কার্পণ্য করেনি। দেশ স্বাধীন হলে বিদেশে বাংলাদেশ বললে তেমন একটা কেউ দেশটি কোথায় তা চিনত না। তখন বিদেশ থেকে অনেকের আসা চিঠির ঠিকানায় লিখা থাকত 'বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া'। ১৯৭৬ সালে আমি প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রে গেলে শিকাগো শহরে এক ট্যাক্সিচালক আমার কাছে জানতে চাইল, আমি ভারতীয় কি-না? উত্তরে জানালাম- না, বাংলাদেশি। সে কিছুতেই বুঝতে পারল না বাংলাদেশ আবার কোথায়? তাকে বলি, কয়েক বছর আগে আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করে আমাদের দেশ স্বাধীন করেছি এবং সেই যুদ্ধে তোমাদের দেশের সরকার পাকিস্তানকে সমর্থন করেছে। সঙ্গে সঙ্গে সে বলে উঠল 'ও, মুজিব কান্ট্রি!' তখন শেখ মুজিব, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, জাতির পিতা আমাদের দেশের আইডেন্টিটি। সে আরও বলল, 'তোমরা তোমাদের নেতাকে হত্যা করেছ।' মনে হলো, ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে 'মুজিব কান্ট্রি' রাতারাতি 'কিলার কান্ট্রি' হয়ে গেছে।

১৯৭৫ সালের পর দেশটি পালা করে শাসন করল দু'জন সেনা শাসক। মাঝখানে বিচারপতি সাত্তারের সংক্ষিপ্ত শাসনকাল। তখন আমাদের পরিচয়, আমরাও পাকিস্তানের ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা বা লিগেসি রক্ষা করে সেনা শাসকদের দেশে পরিণত হয়েছি। ৯০-এর গণআন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে এরশাদের পতন হলে খালেদা জিয়ার শাসনকাল শুরু হয়। তার আমলে বাংলাদেশ তেমন কোনো পরিচয়ে পরিচিত হতে পারেনি। তখনও বাংলাদেশ বিদেশি সাহায্য আর দয়াদাক্ষিণ্যে নির্ভরশীল দেশ। দেশটা কোনো রকমে চলছে আর কি! ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা সরকার গঠন করলে ধীরে ধীরে বাংলাদেশের আবার নিজস্ব একটি পরিচয় গড়ে উঠতে শুরু করে। যে দেশটির পরিচয় হয়ে উঠেছিল বিচারহীনতার দেশ হিসেবে, সেই দেশে শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিচারকার্য শুরু করে ওই অপবাদটা ঘুচাতে সক্ষম হন। ২০০১ সালে খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে সেই বিচারকার্য বন্ধ করে দিলে বাংলাদেশ আবার তার পূর্বাবস্থায় ফিরে যায়।

২০০১-০৬ মেয়াদে বাংলাদেশ বহির্বিশ্বে পরিচিত হয়ে ওঠে সন্ত্রাস আর জঙ্গিবাদ লালনের উর্বর ক্ষেত্র হিসেবে। বাংলাদেশের জন্য এটি অনেকটা কালো অধ্যায়। ২০০৪ সালে বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে গ্রেনেড নিক্ষেপ ঘটনার পর ভারতের প্রখ্যাত সাংবাদিক হিরণ্ময় কার্লেকার 'বাংলাদেশ- দ্য নেক্সট আফগানিস্তান' নামক একটি গ্রন্থ লিখে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন- বাংলাদেশে যেভাবে জঙ্গিবাদ আর সন্ত্রাসবাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তাতে মনে হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে, বাংলাদেশ আফগানিস্তানের মতো একটি তালেবানি রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের কাছে পাচার করার জন্য ১০ ট্রাক অস্ত্র আটকের ঘটনা। খালেদা জিয়ার এই মেয়াদে বিদেশে বাংলাদেশের আরেকটি পরিচয় স্পষ্ট হয়ে উঠল- বাংলাদেশ 'মি. টেন পার্সেন্ট'-এর দেশ। অর্থাৎ বাংলাদেশে যে কোনো ধরনের ব্যবসা করতে হলে খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানকে ১০ পার্সেন্ট ঘুষ না দিয়ে কোনো ব্যবসা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সঙ্গে ব্যবসা আছে, এমন সব দেশের রাষ্ট্রদূতরা তাদের নিজ নিজ দেশে এই মর্মে সংবাদ পাঠালেন- তারেক রহমানকে বড় অঙ্কের টাকা ঘুষ না দিলে ব্যবসা করা যায় না। এমন সব সংবাদ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে। এ বিষয়ে ব্রিটেনের প্রখ্যাত ইকোনমিস্ট পত্রিকা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে একটি বড় প্রতিবেদন প্রকাশ করে। বিষয়টি ছিল বাংলাদেশে জার্মানির সিমেন্স কোম্পানি ব্যবসা পাওয়ার জন্য তারেক রহমানকে ঘুষ দেওয়ার বিবরণ। বাংলাদেশের একটি ইতিবাচক পরিচিতি রাতারাতি তারেক রহমানের কারণে বদলে যায় এবং বিদেশে এই বিশ্বাস গেড়ে বসে- বাংলাদেশ এমন একটা দেশ যেখানে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতি আর অস্ত্র চোরাচালান একেবারে ওপেন সিক্রেট। পঞ্চাশ আর ষাটের দশকে ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপিন্স ও উগান্ডায় এমন একটা সংস্কৃতি চালু হয়েছিল।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা আবার ক্ষমতায় এলে বাংলাদেশের পরিচয় ক্রমে ক্রমে বদলে যেতে শুরু করে। দেশটি দ্রুত হয়ে ওঠে উন্নয়নের একটি রোল মডেল। শেখ হাসিনা প্রমাণ করেন- বিদেশি সাহায্য ছাড়াও একটি দেশ চলতে পারে। এক পদ্মা সেতুর অর্থায়ন জটিলতা কাটিয়ে উঠতে শেখ হাসিনার সাহসী পদক্ষেপে বাংলাদেশের সম্মানের পারদ কয়েক ধাপ ওপরে উঠে যায়। একটি খাদ্য ঘাটতির দেশ থেকে বাংলাদেশ খাদ্য উদ্বৃত্তের দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। যে দেশটি দান-খয়রাত বা রিলিফের ওপর নির্ভর করত, সেই দেশ কোনো কোনো দেশকে ছোট আকারের রিলিফ দেওয়া শুরু করে তাদের কোনো আপদ-মোকাবেলায় সাহায্য করতে। একটি স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নেতৃত্বে উন্নয়নশীল দেশের সিঁড়িতে পদার্পণ করে। লক্ষ্য- ২০২১ সালে বাংলাদেশ উন্নত দেশের কাতারে শামিল হবে।

সবকিছু ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু গত কিছুদিন ধরে দেশে অনেকটা মহামারী আকারে ধর্ষণের মতো একটি সামাজিক ব্যাধি যেন সবকিছু ওলট-পালট করে দিচ্ছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ধর্ষণের ঘটনা ঘটে দক্ষিণ আফ্রিকায়। ভারত আছে চতুর্থ স্থানে। ২০১৫ সালে ভারতে ৩৪ হাজার ছয়শ' ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। আর ভারতের রাজধানী দিল্লিতে প্রতিদিন ছয়জন ধর্ষণের শিকার হয়েছে। দিল্লি হঠাৎ হয়ে গেল ধর্ষণের রাজধানী। যুক্তরাষ্ট্র ছিল তৃতীয় স্থানে। ১১৮টি দেশের মধ্যে ধর্ষণের হার বৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৪১তম। শিশু ধর্ষণে বিশ্বের প্রথম ৪০টি দেশের মধ্যে শীর্ষে আছে পাকিস্তান আর দ্বিতীয় স্থানে মিসর। বাংলাদেশ এই তালিকায় নেই। কিন্তু বছর দু'একের আলামত দেখে মনে হচ্ছে, বাংলাদেশ এই তালিকায় উঠে আসতে বেশি সময় নেবে না। ৮ জুলাই দৈনিক সমকাল সংবাদ দিচ্ছে, গত ছয় মাসে দেশে ৪৯৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৩ জন। ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ২০৩ শিশু খুন হয়েছে। মোট ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৬৩৯টি; তার মধ্যে মামলা হয়েছে মাত্র ৪৩২টি (কালের কণ্ঠ, ৮ জুলাই)। এর বাইরে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে ১২০ জন। এটি যেসব ঘটনা পুলিশের কাছে রিপোর্ট করা হয়েছে, তার একটা হিসাব। এর বাইরে কত রয়ে গেছে, তা জানা সম্ভব নয়। ছয় মাস বয়সী শিশু থেকে ২৫ বছরের যুবতী, কেউ বাদ যাচ্ছে না। স্বামীর সামনে স্ত্রী, ভায়ের সামনে বোন- কেউ রেহাই পাচ্ছে না। এর বাইরে আছে বলাৎকার। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, এসব অপরাধের অনেকটাই সংঘটিত হচ্ছে দ্বীন শিক্ষার নামে প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায়, যেখানে অভিভাবকরা তাদের সন্তানকে রেখে যান পবিত্র ধর্মে দীক্ষা নেওয়ার জন্য। তেঁতুল হুজুর নামে খ্যাত আল্লামা শফী ফতোয়া দিয়েছেন, মেয়েদের শিক্ষা মেয়েদের হাতে ছেড়ে দিলে এসব ঘটনা ঘটত না। কিন্তু তিনি তো নারীশিক্ষারই বিরোধী। আর তিনি বলেননি, ছেলেদের মাদ্রাসায় যেসব বলাৎকারের ঘটনা ঘটছে, তার কী হবে। তাকে প্রধানমন্ত্রী অনেক সম্মান আর ছাড় দিয়েছেন। কিন্তু তিনি যে তার যোগ্য নন- তা তার কথাবার্তায় পরিস্কার।

অনেকের মতে, দেশে ধর্ষণ নামের এই ব্যাধি দূর করার একমাত্র উপায় অপরাধীকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া। কিন্তু আমাদের আইনের ফাঁকফোকর আর দীর্ঘসূত্রতার কারণে হয় এসব অপরাধের বিচার হয় না অথবা অনেক সময় অপরাধী আইনের ফাঁকফোকর গলে বের হয়ে আবারও একই রকমের অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে যখন এই অপরাধীদের কেউ ক্রসফায়ারে নিহত হয়, তখন সাধারণ মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়ে। এটি আইনের শাসনের জন্য মোটেও ভালো লক্ষণ নয়। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পেতে একমাত্র উপায় হচ্ছে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অপরাধীর দ্রুত শাস্তির বিধান, আর ধর্ষণ অথবা বলাৎকারের একমাত্র শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড। এই বিচার অনূ্যন ছয় মাসের মধ্যে শেষ করতে হবে। ভারতের দু'একটি ঘটনা ঘটেছে যেখানে ধর্ষককে জনসমক্ষে সাধারণ মানুষ পিটিয়ে মেরে ফেলেছে। এমন ঘটনা বাংলাদেশে ঘটলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। যথেষ্ট হয়েছে। দেশের মানুষ মুজিব কান্ট্রিকে আবার ফেরত চায়। বিশ্বে বাংলাদেশ একটি ধর্ষকদের দেশ হিসেবে পরিচিত হোক- তার জন্য একাত্তরে ৩০ লাখ মানুষ রক্ত দেয়নি।

বিশ্নেষক ও গবেষক

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]