জলাবদ্ধতার রাজনৈতিক অর্থনীতি

চট্টগ্রাম

১১ জুলাই ২০১৯

ড. মইনুল ইসলাম

চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা সমস্যা প্রকৃতপক্ষে গুরুতর সংকটে পরিণত হয়েছে গত তিন দশকে নগরীর আকার-আয়তন ও জনসংখ্যার দ্রুত প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলায় ব্যর্থতার কারণে। বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশক পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরীতে পানি নিস্কাশন ব্যবস্থা যে বড় বড় খাল ও নালাগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় ছিল যথাযথ। পানি অতি দ্রুত কর্ণফুলী নদীতে নেমে যেতে পারত। অবশ্য অতিবৃষ্টির সময় ষাটের দশকেও চট্টগ্রামের কিছু এলাকায় পানি জমে যেত স্বল্প সময়ের জন্য; কিন্তু জলাবদ্ধতা হতো না। বরং ওই সময় খালগুলোতে অনেক দূর পর্যন্ত দিনে নিয়মিত দু'বার জোয়ার-ভাটা হওয়ায় ওগুলোর মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য নৌপরিবহন ব্যবস্থা চালু ছিল। জল-দূষণেরও সমস্যা তাতে বাড়তে পারত না। ষাটের দশকে যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তখন ঢাকার জলাবদ্ধতার সমস্যা দেখে মাঝেমধ্যে সহপাঠীদের ঠাট্টা করতাম এই বলে, আমাদের চট্টগ্রাম এ সমস্যায় ভুগবে না। চট্টগ্রামে বার্ষিক বৃষ্টিপাত যদিও সিলেটের পর দেশের অন্যান্য জেলার চেয়ে অনেক বেশি; তবুও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা কখনও গুরুতর সমস্যা হয়ে উঠতে পারে- সেটা আমাদের উপলব্ধিতে আসেনি তখনও। কিন্তু আশির দশক থেকে খাল ও নালাগুলোর দু'পাশে জবরদখলের সংস্কৃতি ক্রমেই বাড়তে শুরু করে। গত চার দশকে নগরীর দ্রুত বিকাশের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রায় সব খাল এখন সরু নালায় পরিণত হয়েছে জবরদখলের শিকার হয়ে। তার সঙ্গে যুক্ত গ্রিনহাউস ইফেক্ট ও গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের কারণে বঙ্গোপসাগর ও কর্ণফুলী নদীর পানির স্তর বৃদ্ধির অবিরাম ও ক্রমবর্ধমান প্রবণতা। ফলে এখন চট্টগ্রাম নগরীর চাক্তাই, খাতুনগঞ্জ, হালিশহর ও আগ্রাবাদ এলাকার ক্রমবর্ধমান অংশ অমাবস্যা ও পূর্ণিমার আগে-পরে সপ্তাহখানেক ধরে নিয়মিত জোয়ারের পানিতে ডুবে যাচ্ছে। আর বর্ষাকালে মূষলধারে বৃষ্টি হলেই এখন নগরীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা সমস্যা ভয়াবহ পর্যায়ে চলে যাচ্ছে বেশ কয়েকবার। ৭ জুলাই যখন কলামটি লিখতে শুরু করেছি, তখন নগরীর নিচু এলাকাগুলো আষাঢ় মাসের নিম্নচাপজনিত মৌসুমি ভারি বৃষ্টিতে হাঁটু থেকে কোমরপানিতে ডুবে রয়েছে। নগরীর বেশ কয়েকটি এলাকায় নৌকা চলছে।

জলাবদ্ধতা সংকটের প্রকৌশলগত জ্ঞান আমার সীমিত হলেও বিষয়টা নিয়ে লেখার জন্য এতদ্‌সম্পর্কীয় প্রকৌশলগত টেকনিক্যাল লিটারেচার বিশদভাবে পড়ার পর বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এ সম্পর্কে প্রকাশিত লিটারেচার রিভিউ করে আমার ধারণা হয়েছে, ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের ইউএনডিপির অর্থায়ন এবং ইউএনসিএইচএসের তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন ১৯৯৫-২০১৫ মেয়াদের জন্য প্রণীত চট্টগ্রাম নগরীর মাস্টারপ্ল্যান প্রকল্পের অংশ হিসেবে যে ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান রচিত হয়েছিল, তা বাস্তবায়নে যথাযথ মনোযোগ না দেওয়াতেই গত ২৪ বছরে জলাবদ্ধতা সমস্যাটি এত গুরুতর সংকটে পরিণত হয়েছে। ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের দায়িত্ব চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নাকি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের, তা ১৯৯৫-২০১৫- এই ২০ বছরেও কোনো সরকার চূড়ান্তভাবে নিষ্পন্ন করেনি। ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানের পাঁচটি পর্যায়ের মধ্যে প্রথম পর্যায়টি নাকি জরুরি ভিত্তিতে সম্পন্ন করার সুপারিশ করা হয়েছিল, যা করা হলে জলাবদ্ধতা সমস্যার অনেকখানি সমাধান হয়ে যেত। কিন্তু ২০১৫ সালে ওই মাস্টারপ্ল্যানের সময়সীমা অতিক্রান্ত হয়ে গেলেও ওই প্রথম পর্যায়ের একটি প্রকল্পও গৃহীত হয়নি, সম্পন্ন তো দূরের কথা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাস্টারপ্ল্যান নাকি দেওয়াই হয়নি! এই ২০ বছরে বিচ্ছিন্নভাবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন কোটি কোটি টাকা খরচ করে নানা প্রকল্প গ্রহণ এবং সম্পন্ন করলেও ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানের সুপারিশে অন্তর্ভুক্ত একটি কাজও সম্পন্ন করেনি। ফলে টাকাগুলো স্রেফ অপচয় হয়েছে। এমনকি চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ কারও সঙ্গে আলোচনা না করে মহেশখালের মুখে বাঁধ দেওয়ায় জলাবদ্ধতা সমস্যা মারাত্মক আকার ধারণ করেছিল। পরে ওই বাঁধ ভেঙে ফেলতে হয়েছে। অপচয় আর কাকে বলে! হয়তো দুটি সংস্থাকেই ড্রেনেজ সমস্যা সমাধানের দায়িত্ব সুনির্দিষ্টভাবে বাটোয়ারা করার প্রয়োজন ছিল, যা এখনও করা হয়নি। এমনও হতে পারে, এই দুটি সংস্থার বৈরী সম্পর্ক ও সার্বক্ষণিক টানাপড়েন ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নকে ১৯৯৫-২০১৫ এই পুরো ২০ বছর ধরে আটকে রেখেছিল। পুরনো মাস্টারপ্ল্যানের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় হয়তো আরেক দফা মাস্টারপ্ল্যান করার তোড়জোড় চলছে। দেখা যাচ্ছে, চট্টগ্রাম ওয়াসাও ড্রেনেজ প্রকল্প গ্রহণের জন্য সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের কাছে জোর দেনদরবার শুরু করেছে। তারা প্রকল্প প্রস্তাব প্রণয়ন করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রেরণ করেছে মর্মে খবরও প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। এটি চট্টগ্রাম নগরীর ড্রেনেজ সম্পর্কে বৈদেশিক সাহায্যে প্রণীত পঞ্চম প্রকল্প প্রস্তাব। আগের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের যেখানে হদিস মিলছে না, সেখানে আরও একটি নতুন প্রস্তাব কেন? আর তখন যেহেতু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ছিলেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, তাই সিডিএ এবং সিটি করপোরেশনের সম্পর্ক একেবারেই বৈরী ছিল বিএনপি সরকারের মেয়াদের ওই সময়টায়। পরবর্তী সময়েও ড্রেনেজ ও জলাবদ্ধতা নিরসনে আমরা চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কোনো তৎপরতাই দেখতে পাইনি ১৯৯৫-২০১৫ সময়ে। বর্তমান মহাজোট সরকারের আমলে সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম ২০০৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সরকারের কাছ থেকে প্রভূত প্রকল্প-অর্থায়ন আকর্ষণ করতে সমর্থ হলেও তাদেরই প্রণীত ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়নের কোনো জোরালো উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলে শোনা যায়নি। বরং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলমের সময় বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত যে খাল খনন প্রকল্পটি সিটি করপোরেশনের প্রকল্প হিসেবে একনেকে ২০১৪ সালে পাস হয়েছিল, তার বাস্তবায়ন শুরুর প্রাক্কালে হঠাৎ প্রকল্পটির দায়িত্ব সিডিএকে অর্পণ করা হয়েছিল। এখন সেনাবাহিনীর প্রকৌশল কোরের সহায়তায় জলাবদ্ধতা নিরসনে যে ৫৬৫৭ কোটি টাকার মেগা প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য সিডিএকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, সেখানে সুপরিকল্পিতভাবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে। অথচ ড্রেন পরিস্কার রাখার দায়িত্ব চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের। ফলে এ বছরও এ দুই সংস্থার কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব ও ক্ষমতার টানাপড়েন জলাবদ্ধতা সমস্যাকে আরও সংকটজনক করে তুলছে।

ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানের অনেক সুপারিশ বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন জনের লেখায় প্রকাশিত হয়েছে। প্রকৌশলী আলি আশরাফের বই 'চট্টগ্রাম নগরীর পরিকল্পিত উন্নয়ন :সমস্যা ও সম্ভাবনা' থেকে আমরা জানতে পারছি, চট্টগ্রাম নগরীর জন্য প্রথম ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানটি ১৯৬৯ সালে প্রণীত হয়েছিল মার্কিন কনসালট্যান্ট ফার্ম জন আর স্নেল অ্যান্ড কোম্পানির মাধ্যমে। তারা পতেঙ্গার চট্টগ্রাম নেভাল একাডেমি থেকে কালুরঘাট ব্রিজ পর্যন্ত কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে ৩৪টি খালের সংযোগ আছে, উল্লেখ করেছিল। সম্প্রতি চট্টগ্রাম ওয়াসার নিয়োজিত কনসালট্যান্ট গ্রন্টমিজ এ/এস ওই একই এলাকায় ২২টি খাল খুঁজে পেয়েছে; বাকি ১২টি খাল গায়েব হয়ে গেছে। ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মাস্টারপ্ল্যানটি প্রণীত হয়েছে কনসালট্যান্ট ফার্ম বিনি অ্যান্ড পার্টনার্সের নেতৃত্বে, যে প্ল্যানের প্রথম পর্যায়ে প্রধান প্রধান যে প্রকল্প সম্পন্ন করতে বলা হয়েছিল সেগুলো ছিল : ১. বহদ্দারহাট থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত ৬০ ফুট প্রশস্ত খাল খনন; ২. পাহাড়তলী-নাসিরাবাদ রেলওয়ে ট্র্যাকের পাশ দিয়ে একটি নতুন খাল খনন; ৩. চাক্তাই খাল, মহেশখালসহ অনেক খালের মুখে টাইডাল রেগুলেটর ও ফ্ল্যাপ গেট নির্মাণ; ৪. প্রতিটি বড় নালা ও খালের সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত স্থানে যথাযথ সংখ্যক সিল্ট ট্র্যাপ বা বালুর ফাঁদ নির্মাণ এবং ওইসব ফাঁদে আটকে পড়া বালু ও পলি নিয়মিতভাবে অপসারণের ব্যবস্থা. ৫. নালা ও খালের ওপরের সড়কের ব্রিজ ও কালভার্টগুলোর উচ্চতা বৃদ্ধি; ৬. নগরীর উত্তর ও উত্তর-পূর্বের পাহাড়ে উপযুক্ত স্থান বাছাই করে বাঁধ দিয়ে অতিবৃষ্টির পানি ধরে রাখতে বেশ কয়েকটি জলাধার প্রতিষ্ঠা এবং ৭. কয়েকটি খালকে সংযুক্ত করে নতুন খাল খনন। এ মাস্টারপ্ল্যানে চট্টগ্রাম নগরীকে ১২টি বিভাগে ভাগ করে প্রতিটি বিভাগের জন্য বিস্তারিত ড্রেনেজ প্ল্যান প্রণীত হয়েছিল, যেগুলোর বর্ণনা দেওয়া এই কলামে অপ্রয়োজনীয়।

বস্তুত জলাবদ্ধতা সংকট সমাধানের অযোগ্য কোনো সমস্যা নয়। আসল সমস্যা হলো, দেশের ক্ষমতাসীন মহল এবং চট্টগ্রামের স্থানীয় রাজনীতির ঐক্যবদ্ধ ও পরিকল্পিত সমাধানের প্রয়াসের সীমাহীন ব্যর্থতা, সমন্বয়ের প্রকট অভাব এবং প্রকল্পের অর্থ নয়ছয় করার লজ্জাকর বাস্তবতা। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে ড্রেনেজ সমস্যা সমাধান প্রক্রিয়ার বাইরে রেখে দিলে কাজের কাজ কিছুই হবে না। তাই চলমান মেগা প্রকল্পের সুনির্দিষ্ট অংশ বাস্তবায়নে সিটি করপোরেশনকে সম্পৃক্ত করা সময়ের দাবি। আমাদের প্রত্যাশা, এবারের মেগা প্রকল্পটি আগামী বর্ষার আগে যদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সবচেয়ে জরুরি প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করতে সমর্থ হয়, তাহলে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতার অনেকখানি নিরসন হবেই। আমরা অপেক্ষায় রইলাম।

অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক
অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]