এস কে সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে দুদকের মামলা

অভিযোগ টাকা আত্মসাতের

১১ জুলাই ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

ঋণ জালিয়াতি করে পে অর্ডারের মাধ্যমে নিজের হিসাবে স্থানান্তর করে ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে চার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আলোচিত সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

গতকাল বুধবার দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন বাদী হয়ে কমিশনের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১ এ মামলা করেন। আইন অনুযায়ী দুদক এ মামলাটি তদন্ত করে আদালতে চার্জশিট দেবে।

সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সিতে তার ভাই অনন্ত কুমার সিনহার নামে কেনা বাড়িতে অবস্থান করছেন। সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় ও কিছু পর্যবেক্ষণের কারণে আলোচিত সাবেক এই প্রধান বিচারপতি ২০১৭ সালের অক্টোবরের শুরুতে ছুটিতে যান। ১০ নভেম্বর তিনি সিঙ্গাপুর থেকে কানাডা যাওয়ার পথে সেখানকার বাংলাদেশ হাইকমিশনে রাষ্ট্রপতি বরাবর পদত্যাগপত্র জমা দেন। রাষ্ট্রপতি তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন ১৪ নভেম্বর।

দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি বিশেষ টিম সিনহার বিরুদ্ধে অভিযোগ অনুসন্ধান করে। টিমের অন্য দুই সদস্য হলেন- দুদকের সহকারী পরিচালক গুলশান আনোয়ার প্রধান ও উপসহকারী পরিচালক সিলভিয়া ফেরদৌসী।

এজাহারে বলা হয়, অবৈধ প্রকৃতি, উৎস ও অবস্থান গোপন করে পাচারে সংঘবদ্ধ থেকে আসামিরা দণ্ডবিধি-১৮৬০ এর ৪০৯, ৪২০, ১০৯ ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন-১৯৪৭-এর ৫(২) এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন-২০১২-এর ৪(২), (৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

এজাহারে বলা হয়, মো. শাহজাহান ও নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা ২০১৬ সালের ৬ নভেম্বর তারিখে ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখায় পৃথক ২টি চলতি হিসাব খোলেন। পরদিন ৭ নভেম্বর উভয়ে পৃথকভাবে দুই কোটি করে মোট চার কোটি টাকার ব্যবসা বৃদ্ধির ঋণ আবেদন করেন। তারা ব্যাংক হিসাব ও ঋণ আবেদনে রাজধানীর উত্তরার ১০ নম্বর সেক্টরের ১২ নম্বর রোডের ৫১ নম্বর বাড়ির ঠিকানা ব্যবহার করেন। এই বাড়িটি এস কে সিনহার ব্যক্তিগত বাড়ি বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ঋণের জামানত হিসেবে রণজিৎ চন্দ্র সাহার স্ত্রীর সাভারের ৩২ শতাংশ জমির তথ্য দেওয়া হয়েছে। তারা দু'জন সিনহার পূর্বপরিচিত ও ঘনিষ্ঠজন।

ঋণ আবেদন দুটি পাওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ঋণ প্রস্তাব তৈরি করেন ফারমার্স ব্যাংকের গুলশান শাখার ম্যানেজার মো. জিয়াউদ্দিন আহমেদসহ শাখার লুৎফুল হক ও শাফিউদ্দিন আসকারী তাতে স্বাক্ষর করেন। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের নিয়ম-নীতি অনুসরণ করা হয়নি; কোনো যাচাই-বাছাইও করা হয়নি। এর পর জিয়াউদ্দিন আহমেদ ঋণ প্রস্তাব সরাসরি ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যান। প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটির কর্মকর্তা স্বপন কুমার রায় সেগুলো কোনো যাচাই ছাড়াই অফিস নোট তৈরি করে তাতে স্বাক্ষর করেন। পরে এগুলো নিয়ে যাওয়া হয় ক্রেডিট প্রধান গাজী সালাহউদ্দিনের কাছে। তিনিও ঋণ প্রস্তাব যাচাই ছাড়াই ব্যাংকের তৎকালীন এমডি এ কে এম শামীমের কাছে নিয়ে যান। ব্যাংকের ঋণ পলিসি অনুযায়ী এমডির প্রস্তাব দুটি অনুমোদন করার ক্ষমতা না থাকলেও তিনি কোনো নির্দেশনা না দিয়ে ঋণ প্রস্তাব দুটি অনুমোদন করেন।

এজাহারে আরও বলা হয়, ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ঋণ দুটি অনুমোদনের জন্য নথি উপস্থাপন করা হলে নথির নোটাংশে হাতে ইংরেজিতে লেখা হয়, "ঞযঁং ভড়ৎ যব যধং নববহ ৎবপবরারহম ংঁপয ংঁঢ়ঢ়ড়ৎঃ ভৎড়স গৎ. ঝ.শ. ঝরহযধ, ঈযরবভ ঔঁংঃরপব ঐড়ঁংব, কধশৎধরষ, উযধশধ." "অহফ :ড় ঈড়হঃরহঁব ঝয়ঁধৎব ঁঢ় নঁংরহবংং গৎ. ঝ. ক. ঝরহযধ." পরে এই নোটের বদলে নতুন নোট তৈরি করে তাতে সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাসহ এমডি স্বাক্ষর করেন। ঋণ প্রস্তাব দুটি মঞ্জুর হওয়ার পরদিন ২০১৬ সালের ৮ নভেম্বর চার কোটি টাকার পৃথক দুটি পে অর্ডার এস কে সিনহার নামে ইস্যু করা হয়। পরে এই টাকা সিনহার নামে সোনালী ব্যাংকের সুপ্রিম কোর্ট শাখার হিসাব নং : ৪৪৩৫৪৩৪০০৪৪৭৫-এ পে অর্ডারের পরদিন ৯ নভেম্বর জমা হয়।

পরে সাবেক বিচারপতি সিনহা বিভিন্ন সময়ে অস্বাভাবিক ক্যাশ ও চেক/পে অর্ডারের মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যক্তির মাধ্যমে এ হিসাব থেকে টাকা তোলেন। অন্য একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকের উত্তরা শাখায় তার আপন ভাইয়ের নামের ৪০০৮১২১০০০৪৯০৪২ হিসাবে দুটি চেকের মাধ্যমে ২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর এক কোটি ৪৯ লাখ ছয় হাজার ও ৭৪ লাখ ৫৩ হাজার টাকা স্থানান্তর করা হয়।

পরে এই হিসাব থেকে বিভিন্ন সময়ে ক্যাশ/চেকের মাধ্যমে ওই টাকা তোলা হয়। আসামি রণজিৎ চন্দ্র সাহা ব্যাংকে উপস্থিত থেকে ঋণ আবেদন দ্রুত অনুমোদনের জন্য প্রধান বিচারপতির নাম উল্লেখ করে প্রভাব খাটান। ঋণ আবেদনকারী নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা রণজিৎ চন্দ্র সাহার ভাতিজা ও মো. শাহজাহান রণজিৎ চন্দ্র সাহার ছোটকালের বন্ধু। প্রাথমিক অনুসন্ধান অনুযায়ী, তারা দু'জনই গরিব ও দুস্থ। তারা কখনও ব্যবসা-বাণিজ্য করেননি বা তাদের কোনো ব্যবসা নেই। সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা রণজিৎ চন্দ্র সাহার মাধ্যমে তাদের ভুল বুঝিয়ে ব্যাংকের কাগজপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন।

মামলার অন্য দশ আসামি হলেন- ফারমার্স ব্যাংকের সাবেক এমডি এ কে এম শামীম, সাবেক সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট গাজী সালাহউদ্দিন, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট স্বপন কুমার রায়, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও সাবেক শাখা ব্যবস্থাপক মো. জিয়াউদ্দিন আহমেদ, ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট শাফিউদ্দিন আসকারী, ভাইস প্রেসিডেন্ট মো. লুৎফুল হক, টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীর যদুনাথপুরের মো. শাহজাহান, একই গ্রামের নিরঞ্জন চন্দ্র সাহা, সাভারের শ্রীমতী সান্ত্রী রায় (সিমি) ও শ্রী রণজিৎ চন্দ্র সাহা।



© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)