বাংলাদেশের কবিতা এবং একজন কবি

বইয়ের ভুবন

১২ জুলাই ২০১৯

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী

আমি সাধারণত রাজনীতি নিয়েই লেখালেখি করি। সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে তেমন লিখি না। যদিও এককালে সাহিত্য চর্চাই করতাম। এখন মনে হয়, সাহিত্যিক পরিচয়টাও আমার পূর্ব জন্মের (অপিচ জন্মান্তর বলে কিছু থাকে)। এ জন্মে আমার পরিচয় সাংবাদিক এবং কলামিস্ট। আমাদের আঁতেল সাহিত্য সমালোচকরাও আমার পরিচয়টা সাহিত্যিকের তালিকা থেকে খারিজ করে দিয়েছেন। তারা উদিত সূর্যের পূজারি। বর্তমানের জ্বলন্ত সূর্যকেই প্রণাম জানিয়ে নিজেদেরও খ্যাতিমান করতে চান। সাহিত্যের এবং সাহিত্যিকদেরও যে একটা ইতিহাস আছে, অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আছে, তা জানার আগ্রহ ও পাণ্ডিত্যও তাদের নেই। তাই বাংলাদেশে সাহিত্যের সব শাখাই মোটামুটি সমৃদ্ধ; কিন্তু সমালোচনা সাহিত্য গড়ে ওঠেনি। এই সমালোচকদের উদ্দেশেই জীবনানন্দ দাশ লিখেছিলেন- 'বরং নিজেই তুমি লেখোনা'ক একটি কবিতা/বলিলাম ম্লান হেসে/ ছায়াপিণ্ড দিল না উত্তর।'

গৌড় চন্দ্রিকা থাক। আসল কথায় আসি। সম্প্রতি আমার হাতে বাংলাদেশের এক কবির কিছু সম্প্রতি প্রকাশিত কবিতার বই এসেছে। দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রুপা চক্রবর্তী। লজ্জা সহকারেই কবুল করছি, এই কবির নাম আমার জানা ছিল না। তার নাম মারুফুল ইসলাম। বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া। আমার চেয়ে বয়সে ৩০ বছরের ছোট। অর্থনীতিতে পিএইচডি। শিক্ষকতা করেছেন আবার সিভিল সার্ভিসেও ছিলেন। ভ্রমণ করেছেন এশিয়া, আফ্রিকা, উত্তর আমেরিকার বহু দেশ।

'কবিতা তোমায় দিলেম আজকে ছুটি' বলে কবিতার সঙ্গে সব সম্পর্ক এখনও একেবারেই চুকিয়ে দেইনি। মারুফুল ইসলাম কবিতা ছাড়াও এন্তার গান, ছড়া, প্রবন্ধ, সমালোচনা লিখেছেন, নানা ধরনের সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি শিশুসাহিত্যিকও। এমন একজন নন্দিত লেখকের নাম ও লেখার সঙ্গে আমার পরিচয়ই ছিল না, এটা ভেবে লজ্জা অনুভব করেছি। তার গদ্য লেখার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়নি; কিন্তু কবিতা পাঠ করে চমকিত হয়েছি। তিনি অসাধারণ নন; কিন্তু নিশ্চিতভাবেই একজন শক্তিমান কবি।

শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, সৈয়দ শামসুল হক, নির্মলেন্দু গুণ, ওমর আলী, রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, আবুল হাসান, তসলিমা নাসরিন, রফিক আজাদ প্রমুখ কবিদের পর মনে হয়েছিল, বাংলাদেশের কবিতায় একটা বন্ধ্যত্ব এসেছে। না, সেটা হয়নি। গত শতকের শেষের এবং বর্তমান শতকের শুরুর দশকেও কয়েকজন উল্লেখযোগ্য তরুণ কবির আবির্ভাব হয়েছে। তারা গত শতকের পঞ্চাশের দশকের কোনো কোনো কবির মতো চমক সৃষ্টি করে আবির্ভূত হননি; কিন্তু প্রচুর সম্ভাবনার আভাস দিচ্ছেন।

মারুফুল ইসলাম আশির দশকে লেখালেখি শুরু করেন। বিদেশে থাকি বলে আশির ও পরবর্তী দশকগুলোর কবিদের সঙ্গে আমার পরিচয় কম। মারুফুল ইসলামও তাই আমার কাছে অপরিচিত ছিলেন। কিন্তু তার কবিতার সঙ্গে জানাশোনার ব্যাপারে সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের লেখা আমার যথেষ্ট সহায়ক হয়েছে। তার কবিতায় শামসুর রাহমানের গভীরতা, আল মাহমুদের ছন্দ লালিত্য কিংবা নির্মলেন্দু গুণের ক্ষিপ্রতা ও চমক নেই। কিন্তু যা আছে তাই তাকে এক স্বতন্ত্র কাব্য ব্যক্তিত্ব দান করেছে।

মারুফুল ইসলামের কবিতায় প্রতীক নির্মাণ, শব্দ চয়নে ও শব্দ আবিস্কারে উত্তর আধুনিকতার আভাস আছে। তার কবিতা আধুনিক; কিন্তু হাজার বছরের বাংলা কবিতার ঐতিহ্যমণ্ডিত। লালন থেকে রবীন্দ্রনাথ অত্যন্ত প্রকটভাবে উপস্থিত। বাংলা কবিতার ও গানের যে বিশেষত্ব, চর্যাপদ, মনসামঙ্গল, মৈমনসিংহ গীতি, ভারত চন্দ্র ও রবীন্দ্রনাথ, নজরুলকে অতিক্রম করে সুভাষ-সুকান্ত ও শামসুর রাহমান পর্যন্ত পৌঁছেছে, তা হলো সমাজ-বাস্তবতা। তাকে মারুফুল ইসলাম তার কবিতায় সযত্নে ধরে রেখেছেন। কবি মঙ্গলাচরণ চট্টোপাধ্যায়ের কবিতার মতো তাতে শিল্পরস ব্যাহত হয়নি।

ত্রিশের দশকে বাংলা কবিতায় নান্দনিকতার নামে একটা উগ্র সমাজ নির্লিপ্ততা দেখা দিয়েছিল। বুদ্ধদেব বসুর কবিতায় বর্তমানের বাস্তবতাকে আড়াল করে একটা ঐন্দ্রজালিক মনোজগৎ ও দেহবন্ধনা (তৎকালীন পশ্চিমা কবিদের অনুসরণে) সৃষ্টির এবং শিল্প সর্বস্বতার নামে রবীন্দ্র-উত্তর বাংলা কবিতায় আধুনিক যুগসৃষ্টির চেষ্টা হয়েছিল। অন্যদিকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর সামাজিক ভাঙনের যুগে অতি বাস্তবতার নামে কবিতায় বিপ্লব ও বিদ্রোহের উদ্বোধন করা হয়। প্রেমেন্দ্র মিত্র, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, সুকান্ত প্রমুখ ছিলেন চল্লিশের এই কবি গোষ্ঠী।

কিন্তু দেখা গেল, রবীন্দ্রনাথকে অতিক্রম করে বাংলা কবিতা ও এগোয় না। কবিতায় শিল্পরস সৃষ্টি বা সামাজিক বাস্তবতা প্রকাশ কোনো ক্ষেত্রেই নয়। ত্রিশের কবিদের অন্যতম জীবনানন্দ দাশের কবিতার বইয়ের নাম রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে ধার করা-'সাতটি তারার তিমিরে'। বুদ্ধদেব বসুর গল্পের নামও তাই 'ঘরেতে ভ্রমর এলো'।

আধুনিক কবি হওয়ার দেমাগে মারুফুল ইসলাম এই রবীন্দ্র ঐতিহ্য, এমনকি লালনকেও অগ্রাহ্য করেননি। তার 'নতুন করে পাব বলে' কবিতার বইটির প্রত্যেকটি কবিতার শেষ পঙ্‌ক্তিটি রবীন্দ্রনাথের। মারুফুলের আধুনিক কবিতা তাকে আত্মস্থ করেছে বিস্ময়করভাবে। তার 'সাইকি' কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলোও বর্তমানের আঙ্গিকে পুরনোর পুনর্নিমাণ। সমাজের একটি অন্তর্লীন ফল্পুধারাকে তিনি আধুনিক যুগে তুলে এনেছেন সম্পূর্ণ নতুন করে।

কবিতার একটি বিশেষ ধরন পানতুম। এই বিশেষ ধরনের কবিতা রচনাতেও কবি বিস্ময়কর শক্তির পরিচয় দিয়েছেন তার 'পানতুম' কবিতা গ্রন্থের কবিতাগুলোতে। তার কবিতার স্বকীয়তা এই কবিতায় বিশেভাবে ধরা পড়ে। 'ধনতন্ত্র', 'মুক্তবাজার' নিয়েও তিনি কবিতা লিখেছেন। কিন্তু কবিতার রস কোথাও ক্ষুণ্ণ হয়নি। তার 'ষড়যন্ত্র' কবিতায় বর্তমানের বাস্তবতা চমৎকারভাবে কাব্যরসে মণ্ডিত হয়ে প্রকাশ পেয়েছে।

মারুফুল ইসলামের কবিতার একটা বড় বৈশিষ্ট্য, বাস্তবতাকে অগ্রাহ্য করে কবিতায় শিল্প-সৌন্দর্য গড়ার আগ্রহ তার কবিতায় নেই। আবার শিল্প-সৌন্দর্যকে বাতিল করে ইশতেহার জাতীয় কবিতা রচনার প্রবণতাও তার মধ্যে নেই। তিনি এ ক্ষেত্রে বিস্ময়কর মেধার পরিচয় দিয়েছেন। লিখছেন আত্মজৈবনিক কবিতা; কিন্তু তার প্রতীক ও ব্যঞ্জনাগুলো আটপৌরে নয়। বহু নতুন শব্দ ও প্রতীক তিনি আবিস্কার করেছেন; যা তার নিজস্ব এবং যা তাকে কবি হিসেবে, স্বতন্ত্র ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরেছে। দেশের রাজনীতির প্রগতিশীল ধারার প্রতিও তার কবিতার আনুগত্য লক্ষ্য করার মতো।

মারুফুল ইসলামের কাব্য-দর্শনের একটা প্রমাণ পাওয়া যায় তার 'দূরের স্টেশন' কবিতায়-'স্থির বিশ্বাসের ভেতরেও কেঁপে ওঠে আমার হৃদয়/বিকেলের অবসরে ডাকে মধুকণ্ঠী দূরের স্টেশন/অগোচরে ঝরণারা কোথায় ছুটে যায় জানে না পাহাড়/ সীমার ভেতরে থাকি তবু হাতছানি দেয় সীমাতীত।'

রবীন্দ্রনাথেরও কাব্য-দর্শন ছিল 'সীমার মাঝে অসীম তুমি'। মারুফুল ইসলাম রবীন্দ্র-উত্তরকালের কবি। কিন্তু তাকে তিনি আত্মস্থ করেছেন। আত্মস্থ করেছেন দেশকালপাত্রের বাস্তবতাকে; কিন্তু তার বর্ণনা হয়েছে শিল্পোত্তীর্ণ কবিতা।

এর একটা উদাহরণ দেই তার 'স্বাধীনতা' কবিতা থেকে- 'প্রাণসংহারী চিত্র নাট্য প্রস্তুত ছিল পাকিস্তানি হানাদারদের/সোনার বাংলা ছিল প্রাণের আবেগে স্পন্দিত/আমরা ছিলাম মন্দ্রিত জয় বাংলা জপমন্ত্রে/একটি কণ্ঠের আহ্বানে/স্বপ্ন আর প্রত্যাশার এমন যুগলবন্দী কবে আর বেজে উঠেছে/কোটি কোটি কণ্ঠের সেতার সরোদে।'

এই কবিতায় দেশের স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু উঠে এসেছেন। কিন্তু কবিতাটি কবিতাই রয়েছে। রাজনৈতিক ইশতেহার হয়নি।

তার বর্ণনাত্মক কবিতায় প্রতীক রচনাও অনবদ্য।

'ডোরা কাটা বাঘ মশাল জ্বালায় বনে/হৃদয়ের ঝড়ে কালবোশেখির নাম/কে নয়ন তুলে তাকায় ইশান কোণে/ঘুম ভেঙে পাই সুনীল মেঘের খাম।'

মারুফুল ইসলাম একজন শিশুসাহিত্যিকও। তার 'মুঠোর ভেতর রোদ', 'পুতুল পুতুল মূর্ছনা', 'পুতুলের নাম টিয়ানা', 'শুকনো পাতার নূপুর', 'কমলাফুলির টিয়ে' ইত্যাদি অসাধারণ শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ। একটি নির্মল শিশুমন ভেতরে নিয়ে তিনি ছড়াগুলো লিখেছেন, তা বোঝা যায়। আধুনিক কবিতাকে অনেকে দুর্বোধ্য বলে অভিযোগ করেন। বিষুষ্ণদের কবিতা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, 'ওর কবিতার মানে আমাকে কেউ বোঝাতে পারলে তাকে শিরোপা দেব।' মারুফুল ইসলামের কবিতা সম্পর্কে এই অভিযোগ কেউ তুলতে পারবেন না। তার কবিতার বৈশিষ্ট্য এই যে, তা সহজেই পাঠক মনে প্রবেশ করতে পারে। তার কবিতায় প্রেম-প্রণয় অনুপস্থিত নয়, প্রকৃতিও নয়। ভালোভাবে উপস্থিত। তিনি বর্তমানের একজন শক্তিশালী কবি। রোমান্টিসিজম ও রিয়ালিজমের ভেতর একটা সমন্বয় সাধন করতে পেরেছেন। তার কবিতাই আমাকে বহুদিন পর কবিতা সম্পর্কে লিখতে অনুপ্রাণিত করেছে।

লন্ডন, ৫ জুলাই শুক্রবার, ২০১৯

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]