ক্রিকেট ও আমাদের ছেলেরা

ভ্রমণ

১২ জুলাই ২০১৯

আনোয়ারা সৈয়দ হক

যখন মেডিকেল কলেজের ছাত্রী ছিলাম তখন স্টেডিয়ামে বসে পাকিস্তানের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট খেলা অনেক দেখেছি বন্ধুদের সঙ্গে। সেই দিনগুলো যেন উৎসবে ভরা থাকত। সকালবেলা বন্ধুরা মিলে পাউরুটি দিয়ে স্যান্ডউইচ বা পরোটা দিয়ে আলুভাজি টিফিনক্যারিতে ভরে নিয়ে যেতাম স্টেডিয়ামে। রোদ ঝলমল দিনে সকলের সঙ্গে বসে হৈ হৈ করে খেলা দেখার আনন্দ অন্যরকম।

খেলা কিছুই বুঝতাম না। শুধু আনন্দ বুঝতাম। আর পাকিস্তান জিতলে খুশি হতাম। কারণ আমরা তখন ছিলাম পাকিস্তানি। বাংলাদেশ বলে যে কোনো দেশ চোখে কোনোদিন দেখব এবং সেই দেশে নিজেরা বসবাস করব- এই কল্পনাও আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ছিল না।

ব্রিটিশ আমলে জন্ম আর পাকিস্তান আমলে বড় হওয়া আমাদের মতো মানুষের কাছে আর কী বা আশা করা যেত!

আমরা যে পূর্ব পাকিস্তানি নই, আমরা যে পূর্ববাংলার মানুষ- এই বোধ বা সচেতনতা পূর্ববাংলার রাজনীতিবিদরাই আমাদের মতো জনগণের ভেতরে প্রথম সৃষ্টি করেন। বঙ্গবন্ধু যখন বললেন, 'পূর্ববাংলা শ্মশান কেন?' তখুনি যেন নড়েচড়ে বসলাম।

তারপর যখন হলো ভাষা আন্দোলন, তখন বেশ ছোট, তবু একটু মাতৃভাষার প্রতি মমতার দৃষ্টিতে দৃষ্টিক্ষেপণ করলাম। কিন্তু পাকিস্তানের ভেতরে বসেই এইসব চিন্তাভাবনা ঘোরাফেরা করত।

সেইসব দিনে ক্রিকেট খেলা হলে, পাকিস্তান যেন জেতে, এই কল্পনা করতাম। কিন্তু একটা জিনিস খুব খটকা লাগত, যখন দেখতাম আমাদের বাঙালিরা কেউ সেই খেলায় কোনো অংশগ্রহণ করত না। মাঝে মাঝে দেখতাম পাকিস্তানি খেলোয়াড়রা খেলতে খেলতে পিপাসার্ত হলে একটা লোক দৌড়ে মাঠে এনামেলের জগ হাতে নেমে তাদের পানি খাওয়াত। আর বাঙালিরা খেলা দেখতে দেখতে উল্লসিত হয়ে বলত, ওই দ্যাখ, ওই লোকটা একজন বাঙালি!

তখন আমাদের বয়স আঠারো-উনিশের বেশি না।

সেইসময় শুনতাম পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের ক্রিকেট খেলায় নেওয়া হয় না এই কারণে যে, তারা চেহারায় ছোটখাটো, শরীরে দুর্বল এবং মাথায়ও ক্রিকেট খেলার মতো একটি জটিল খেলা তারা ঠিকমতো বুঝতে পারে না। আর সেই ব্যাখ্যা শুনে আমরাও যেন মনে মনে সেটা মেনে নিয়েছিলাম! তখন তো বুঝিনি এই খেলার সঙ্গে অর্থের কী সব যোগাযোগ! এবং পূর্ববাংলাকে শোষণ করবার জন্যে এটাও ছিল এক এক গভীর ষড়যন্ত্র। সরল বাঙালি মানুষ ছিলাম আমরা।

এখন আর আমরা সরল নই। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত এবং রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর আমাদের টনক নড়েছে। এবং প্রতিবেশী ভারত থেকে পৃথিবীর অনেক বড় বড় ক্রিকেট খেলোয়াড়ের ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ এবং মুখনাড়া শুনে শুনে আজ আমরা বিশ্বক্রিকেটের মাঠে অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলংকা, নিউজিল্যান্ড, সাউথ আফ্রিকা, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ইংল্যান্ড বা ভারতের মুখোমুখি।

এসব আমাদের গৌরবের দিন। এবং এই গৌরব চোখে দেখেই আমি আজ পরলোকের পথে যাত্রা করছি।

মনে একটা স্বপ্ন ছিল, যেন মৃত্যুর আগে এবং বিগত সেঞ্চুরি শেষ হবার আগেই যেন আমি পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের দেখি তারা বাংলাদেশের কাছে হার মানছে। ঈশ্বর সেটিও আমাকে দেখবার সুযোগ দিয়েছেন। ১৯৯৯ সালেই টেলিভিশনের পর্দায় ইংল্যান্ডের মাঠে আমি বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানকে হারতে দেখেছি।

ব্যস, তারপর আমার আর কিছু দেখার শখ ছিল না।

কিন্তু না; শখের যে মৃত্যু নেই- এই প্রমাণও পেলাম। যে জন্যে ইংল্যান্ডের মাঠে গিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সাউথ আফ্রিকার খেলা দেখে এলাম। আমাদের বাংলাদেশ সেখানে জিতল। সে যে কী আনন্দ, তা ক্রিকেটপ্রেমীরা বুঝবেন।

যারা প্রেমিক নন, শুধু বাঙালি, তারাও বুঝবেন।

শুধু আফসোস থেকে গেল- বাংলাদেশ ক্রিকেটকে সেমি ফাইনালে বা ফাইনালে দেখার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলাম। জেতা বা না জেতা বড় কথা নয়; ফাইনালে ওঠার ক্ষমতা যে বাংলাদেশের আছে- সেটিই যথেষ্ট। তবে এটাও বলে রাখি, একদিন না একদিন বিশ্বক্রিকেটের ট্রফি আমাদের বাংলায় এসে হাজির হবে। এবং সেদিন হয়তো বেশি দূরেও নয়।

তবে তার জন্যে দেশটিকে সুস্থির থাকতে হবে। কারণ বিশ্বে এখন যুদ্ধ একটাই। আর সেটি হলো ট্রফি জেতার যুদ্ধ। সে জন্যে বিশ্বক্রিকেট খেলার সময় কদাপি নিজের পরিবার সঙ্গে নেওয়া উচিত নয়! এ পৃথিবীতে যত বড় বড় যুদ্ধ হয়েছে কেউ ফ্যামিলি নিয়ে যুদ্ধের ময়দানে যায় না; হোক এটা খেলার যুদ্ধ, তবু এই যুদ্ধই এখন প্রকৃত সিম্বলিক যুদ্ধ এ পৃথিবীতে। ফ্যামিলি নিয়ে যাওয়া মনে শপিং, ফ্যামিলি নিয়ে যাওয়া মনে বেড়ানো, ফ্যামিলি নিয়ে যাওয়া মনে স্ত্রী বা কন্যার ন্যাগিং। এটা হবেই হবে, ভারবাল না হলেও ননভারবাল হবে, বন্ধু-স্ত্রীদের সঙ্গে মনে মনে কম্পিটিশন হবে; ভারবাল না হলেও ননভারবাল হবে।

অন্যসময় যত ইচ্ছে বেড়ানো হোক, কিন্তু বিশ্বকাপ মানে হলো এমআরসিপি বা এফআরসিএস পরীক্ষা! শরীর এবং মনের দুটোরই পরীক্ষা। সেখানে বেড়ানো নয়, সেখানে শুধু পড়া, পড়া আর পড়া।

তেমনি এখানে শুধু প্রশিক্ষণ, আর প্রশিক্ষণ, আর অন্য সময় অপরের খেলা অবলোকন।

যতই বোরিং মনে হোক জীবন, তবু যুদ্ধের সময় ফ্যামিলি সঙ্গে নয়! প্রথম বিশ্বযুদ্ধ বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কোনো সৈনিকেরা তাদের স্ত্রী বা পরিবার নিয়ে কি যুদ্ধক্ষেত্রে গেছে? কেউ না!

তবে হ্যাঁ, একসময় রাজা-বাদশাহরা বড় বড় যুদ্ধের সময় তাদের পরিবারদের সঙ্গে রাখত। কারণ হারলে তারা নিজেদের রাজ্যই হারিয়ে ফেলত, সেই ভয়ে তারা সঙ্গে সঙ্গে ফ্যামিলি রাখত। তবে সেসব হতো প্র্রিহিস্টোরিক যুগে। এখন আমরা আধুনিক যুগে বাস করছি। এখন আমরা যুদ্ধের ময়দানে যাচ্ছি ক্রিকেট খেলতে। সেখানে আমরা খেলোয়াড়দের স্ত্রী বা সন্তানদের ছবি দেখতে চাই না। আমরা তাদের ভালোবাসি, স্নেহ করি, তবুও না!

কারণ এই খেলার সঙ্গে দেশের জনগণের সেন্টিমেন্ট জড়িত। যেদিন বাংলাদেশ হারে, সেদিন রান্নাঘরে রান্না করা বন্ধ হয়ে যায়! কথাটা সিম্বলিক অর্থে হলেও, সত্য কথা। খেয়ে বসে শুয়ে জনগণের ভালো লাগে না! কারণ এইসব খেলার সঙ্গে দেশের আপামর জনগণের ইগো জড়িত।

ফ্যামিলি ল্যাংবোটের মতো সঙ্গে ঘুরলে খেলোয়াড়ের মনোযোগ ডাইভারটেড হয়; বিশেষ করে বিদেশের আবহাওয়ায়।

তাই ক্রিকেট বোর্ডের যারা হর্তাকর্তা-বিধাতা, তাদের কাছে আবেদন করি এ ব্যাপারে তারা যেন চিন্তাভাবনা করেন।

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]