নাজাতের পথ জবানের হেফাজত

১২ জুলাই ২০১৯

মেহেদী হাসান সাকিফ

বাকশক্তি আলল্গাহর অনেক বড় একটি নিয়ামত। বান্দার বহুবিধ প্রয়োজন পূরণের জন্যই আলল্গাহ এই নিয়ামত দান করেছেন। মানুষের মনের দুঃখ-কষ্ট, হাসি-কান্না, আনন্দ-উলল্গাসের ক্ষেত্রেও এই জবানই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। যিনি কোনো কারণে জবানের এই নিয়ামত হারিয়েছেন, তিনিই কেবল বুঝতে পারেন, এই নিয়ামতের কদর কতটুকু! অথচ আমরা প্রতিনিয়ত জবানের প্রতি নির্বিচারে জুলুম করে যাচ্ছি। জবানকে আলল্গাহর নাফরমানিমূলক কাজে ব্যবহার করছি। রাসুল (সা.) বলেন, বান্দা চিন্তাভাবনা ছাড়া এমন কথা বলে, যার কারণে সে (পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্ব পরিমাণ) জাহান্নামের অতলে নিক্ষিপ্ত হয় (বুখারি :৬৪৭৭)।

সঠিক কাজে জবানের ব্যবহার, অন্যায়, অসত্য ও হারাম থেকে জবানকে বিরত রাখা আলল্গাহপ্রাপ্তির সহজ উপায়। এক কথায় জবানের হেফাজত মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কোরআনের ১৮তম পারায় সুরা মুমিনুনের শুরুতে মহান আলল্গাহতায়ালা খাঁটি মুমিন মুসলমানের সাতটি গুণের কথা উলেল্গখ করেছেন। তার মধ্যে দ্বিতীয় গুণ হচ্ছে, যারা মুমিন তারা অনর্থক কথাবার্তায় নির্লিপ্ত। আয়াতে 'লাগউন' শব্দের অর্থ অনর্থক কথা অথবা কাজ, যাতে ধর্মীয় কোনো ফায়দা নেই। এর অর্থ উচ্চস্তরের গোনাহ, যাতে ধর্মীয় ফায়দা তো নেই, বরং ক্ষতি বিদ্যমান। এ থেকে বিরত থাকা, বেঁচে থাকা ওয়াজিব। প্রিয় নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, মানুষ যখন অনর্থক বিষয়াদি ত্যাগ করে, তখন তার ইসলাম সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে পারে। এ কারণেই আয়াতে একে কামেল মুমিনের বিশেষ গুণ সাব্যস্ত করা হয়েছে। আলল্গাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, 'যখন দুই ফেরেশতা ডানে ও বামে বসে তার আমল গ্রহণ করে, ওই সময়ে সে যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই গ্রহণ করার জন্য তার কাছে সদা প্রস্তুত প্রহরী রয়েছে' (সুরা কাফ :১৭-১৮)। অর্থাৎ মানুষ যে কথাই উচ্চারণ করে, তাই পরিদর্শক ফেরেশতা রেকর্ড করে নেয়। হজরত হাসান বসরি ও হজরত কাতাদাহ (রহ.) বলেন, এই ফেরেশতা মানুষের প্রতিটি বাক্য রেকর্ড করে। তাতে কোনো গোনাহ অথবা নেকি থাকুক বা না থাকুক। হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, 'কেবল সেসব বাক্য লিখিত হয়, যেগুলো সওয়াব বা শাস্তিযোগ্য। অবশ্যই তোমাদের ওপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছে। আমল, লেখক ও সম্মানিত ফেরেশতাগণ' (সুরা ইনফিতর : ১০-১১)। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত- প্রিয় নবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, 'যে ব্যক্তি আলল্গাহ ও পরকালকে বিশ্বাস করে, তার উচিত সে যেন প্রতিবেশী ও মেহমানকে সম্মান করে এবং উত্তম কথা বলে, না হয় চুপ থাকে' (বুখারি, মুসলিম, তিরমিজি, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমদ)।

ভালো কথা বলা, কম কথা বলা ও নীরব থাকাই হচ্ছে আলল্গাহপ্রেমিকদের স্বভাব। বর্তমান এই টেকনোলজির যুগে সমাজ জীবন এখন অনেক পাল্টে গেছে। সোজা কথায় বলতে গেলে আমাদের জীবনের অস্তিত্ব ও উপস্থিতি রিয়েল লাইফ আর ভার্চুয়াল লাইফে বিভক্ত হয়ে গেছে। দুই ধরনের সমাজে এখন আমাদের বসবাস। জবানের হেফাজতের ইসলামী নির্দেশনাগুলো আমাদের রিয়েল লাইফ বা বাস্তব জীবনে যতটুকু প্রযোজ্য, ভার্চুয়াল লাইফ বা আন্তর্জালিক জীবনেও ঠিক ততটুকুই প্রযোজ্য।

ভার্চুয়াল লাইফের নমুনা হিসেবে এখানে ফেসবুকের কথাই বলি। এই একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের অনেকের জীবনের বাঁকে এনেছে নানা ধরনের পরিবর্তন। এই জগৎটির একটি বড় সুবিধা হলো, এখানে মন্তব্য প্রকাশে মানুষ থাকে পুরোপুরি স্বাধীন। যাকে যা ইচ্ছা বলা যায়। কেউ যেহেতু কারও সামনে থাকে না, তাই চক্ষুলজ্জা বলতে যে একটা জিনিস কাজ করে রিয়েল লাইফে, এখানে এসে তা অনেকের ক্ষেত্রেই হাওয়া হয়ে যায়। আবার সামনাসামনি থাকলে মুখে লাগাম রেখে কথা বলার একটা বাধ্যবাধকতা থাকে। কিন্তু ফেসবুকে সেটার বালাই থাকে না। ফলে সামনাসামনি হলে যার সামনে কথা বলতেই সাহস হতো না, এখানে তাকে মনের মাধুরী মিশিয়ে যাচ্ছেতাই বলে দিতে পারছে মানুষ। এসব কারণে দেখা যাচ্ছে, বাস্তব জীবনে যে লোকটি কখনও কটুবাক্য ব্যবহার করেন না, এখানে এসে তিনিও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন অনেক সময়।

গিবত, কুৎসা, বদনামি, তাচ্ছিল্য ইত্যাকার নানা মন্দাচার থেকে অনেকেই বাস্তব জীবনে সতর্ক ও সচেতন থাকলেও ভার্চুয়াল জীবনে এসবকে থোড়াই কেয়ার করে। এ ধরনের মানসিকতা থেকেই ট্রলবাজি আর পারস্পরিক কামড়াকামড়ির উৎপত্তি। অথচ কোরআন কত শক্তভাবে বলেছে- হে ইমানদারগণ, কোনো সম্প্রদায় যেন অপর কোনো সম্প্রদায়কে বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর কোনো নারীও যেন অন্য নারীকে বিদ্রূপ না করে। হতে পারে তারা বিদ্রূপকারীদের চেয়ে উত্তম। আর তোমরা একে অপরের নিন্দা করো না এবং তোমরা একে অপরকে মন্দ উপনামে ডেক না। ইমানের পর মন্দ নাম কতই না নিকৃষ্ট! আর যারা তওবা করে না, তারাই তো জুলুমকারী (সুরা হুজরাত, আয়াত-১১)।

ইমাম ইবনে কাইয়ুম (রহ.) বলেন, আশ্চর্যের কথা যে, মানুষের পক্ষে হারাম খাদ্য থেকে দূরে থাকা, চুরি, মদ্যপান থেকে নিজেকে সংযত রাখা সহজ; কিন্তু তার পক্ষে নিজের জিহ্বার স্পন্দনকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়। জবানের যথেচ্ছা ব্যবহার নিয়ন্ত্রণকারী দুনিয়াতেই সবার শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি হিসেবে অধিকৃত হয়। আর পরকালে রাসুল (সা.) তাকে জান্নাতের গ্যারান্টি দিয়েছেন। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে তার জবান ও লজ্জাস্থান হেফাজতের জামানত দিতে পারবে, আমি তার জান্নাতের জামিন হবো (সহিহ বুখারী হাদিস নম্বর :৬৪৭৭)। সুতরাং আমাদের সবার উচিত, জবানের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করে দুনিয়া ও আখিরাতের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ লাভ করা।

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]