৩৫৫ কোটি টাকার ধাক্কা

৩৪ বছর পর বিপুল অর্থ ব্যয়ে ধ্বংস করা হচ্ছে সাড়ে তিন কোটি টাকায় কেনা প্রাণঘাতী সেই রাসায়নিক ডিডিটি পাউডার

১২ জুলাই ২০১৯ | Updated ১২ জুলাই ২০১৯

তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম

দীর্ঘদিনের চেষ্টার পর অবশেষে ধ্বংস করা হচ্ছে 'প্রাণঘাতী' সেই ডাইক্লোরো ডাইফিনাল ট্রাইক্লোরোইথেন (ডিডিটি) পাউডার। প্রায় ৩৪ বছর ধরে অবহেলায় সংরক্ষণের পর 'পেস্টিসাইড রিস্ক রিডাকশন ইন বাংলাদেশ' নামে একটি প্রকল্পের আওতায় ধ্বংস করা হচ্ছে আমদানি করা নিম্নমানের এক হাজার টন ডিডিটি পাউডার। এটা ধ্বংসে আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে জাতিসংঘের গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটিজ (জিইএফ) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)।

মশা নিধনের মাধ্যমে ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে পাবলিক হেলথ প্রকল্পের আওতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ১৯৮৫ সালে এরশাদ সরকার আমলে পাকিস্তান থেকে ডিডিটি পাউডার আমদানি করেছিল। কিন্তু পাউডার নিম্নমানের বলে প্রমাণিত হয় পরীক্ষায়। পরবর্তী সময়ে জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর হওয়ায় বিশ্বব্যাপী এ ধরনের বিষাক্ত পাউডার ব্যবহার বন্ধ ঘোষণা করা হলে এটা আর ব্যবহার করা হয়নি বাংলাদেশেও। তখন সাড়ে তিন কোটি টাকায় আমদানি করা পাউডার এখন ধ্বংস করতে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৩৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে জিইএফ দিচ্ছে ৭০ কোটি ১০ লাখ টাকা এবং এফএও দিচ্ছে ৬৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা। অবশিষ্ট ২১৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকা সরকারিভাবে জোগান দেওয়া হবে। আমদানির পর থেকে ৫০০ টন ডিডিটি পাউডার চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে অবস্থিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় ঔষধাগার (ঢাকা) নিয়ন্ত্রিত সহকারী পরিচালক (স্বাস্থ্য) পোর্ট ক্লিয়ারেন্স (চট্টগ্রাম) কার্যালয় সংলগ্ন ৪, ১১, ১২ ও ১৩ নম্বর গুদামে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে অধিদপ্তরের তিনটি মেডিকেল সাব-ডিপোতে ফেলে রাখা হয়েছে আরও ৫০০ টন। সব মিলিয়ে এক হাজার টন ডিডিটি পাউডার রয়েছে।

সংশ্নিষ্টরা বলছেন, ডিডিটি পাউডার ধ্বংসে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত উন্নত প্রযুক্তি রয়েছে নেদারল্যান্ডস, ফ্রান্স ও জার্মানিতে। বিশেষ পদ্ধতিতে জাহাজে করে যে কোনো একটি দেশে নিয়ে এই পাউডার ধ্বংস করা হবে। এর আগে 'পেস্টিসাইড রিস্ক রিডাকশন ইন বাংলাদেশ' প্রকল্পের পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হবে এবং তার তত্ত্বাবধানে আহ্বান করা হবে আন্তর্জাতিক দরপত্র।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিডিটি পাউডারের কারণে মানবদেহে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন দুরারোগ্য ব্যাধির সৃষ্টি হয়। ফলে পাউডার সরিয়ে নেওয়ার পর যেসব গুদামে এটা সংরক্ষণ করা হয়েছিল সেসব গুদাম জীবাণুমুক্ত করা হবে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পোর্ট ক্লিয়ারেন্স (চট্টগ্রাম) কার্যালয় সংলগ্ন ৪, ১১, ১২ ও ১৩ গুদামে তালাবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে পাউডার। বস্তাভর্তি করে রাখা হলেও এগুলোর বেশিরভাগই ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় ভয়ে কেউ সহজে গুদামগুলোর দিকে পা দেন না।

পোর্ট ক্লিয়ারেন্স (চট্টগ্রাম)-এর সহকারী পরিচালক (স্বাস্থ্য) পদ থেকে সবে অবসর নেওয়া ডা. ঈসা চৌধুরী দীর্ঘদিন চট্টগ্রামে ডিডিটি পাউডার তদারক করেছেন। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'পাকিস্তান থেকে আমদানির পর থেকে ডিডিটি পাউডারের বস্তাগুলো বিশেষ সতর্কতায় চট্টগ্রামে চারটি গুদামে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। এগুলো জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। ফলে পরিবেশ অধিদপ্তর জাতিসংঘের গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটিজ এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সার্বিক সহযোগিতায় ওগুলো ধ্বংসের চেষ্টা চালিয়ে আসছিল। কিন্তু নানা জটিলতায় তা দীর্ঘায়িত হয়।'

বর্তমানে পোর্ট ক্লিয়ারেন্স (চট্টগ্রাম)-এর সহকারী পরিচালক (স্বাস্থ্য) পদে দায়িত্বরত মো. হুমায়ুন কবির বলেন, 'ডিডিটি আমদানির পর থেকেই চারটি গুদামে রাখা হয়েছে। এগুলো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর জেনেও এর আশপাশে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে অফিস করতে হচ্ছে। পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় বিশেষ কোনো প্রয়োজন ছাড়া গুদামগুলোর দরজা খোলা হয় না।'

জানা যায়, পাকিস্তান থেকে আমদানির পর ডিডিটি পাউডারের মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। তা পরীক্ষা করে দেখতে ১৯৮৫ সালের ১৯ মার্চ জেনেভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় পাঠানো হয় নমুনা। ঢাকায় টেস্টিং ল্যাবরেটরিতেও এগুলোর নমুনা পরীক্ষা করা হয়। দুটি পরীক্ষাতেই এসব পাউডার নিম্নমানের বলে প্রমাণিত হয়। এরপর ডিডিটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স এক্সচেঞ্জ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডকে পাউডার পরিবর্তন করে দিতে বলা হলে সে সময় তারা তা না করে উল্টো এ নির্দেশনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে। মামলায় হেরে যাওয়ার পর সরকারই জনস্বার্থে পাউডার ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে সহযোগিতার হাত বাড়ায় জাতিসংঘের সংশ্নিষ্ট বিভিন্ন সংস্থা।

সবশেষে 'পেস্টিসাইড রিস্ক রিডাকশন ইন বাংলাদেশ' নামের প্রকল্পের মাধ্যমে পাউডার ধ্বংসে গত ২০ জুন এফএওর সঙ্গে একটি চুক্তিও করেছে সরকার।



© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]