কুমিল্লায় বিচারকের সামনেই আসামির হাতে আসামি খুন

১৬ জুলাই ২০১৯

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুমিল্লা

হামলাকারী আবুল হাসান

কুমিল্লায় একটি হত্যা মামলার বিচার কাজ চলাকালে বিচারকের খাস কামরায় এক আসামির উপর্যুপরি ছুরিকাঘাতে আরেক আসামি নিহত হয়েছেন। ঘাতক ও নিহত পরস্পর মামাতো-ফুফাতো ভাই ও একই হত্যা মামলার আসামি। গতকাল সোমবার সকাল সোয়া ১১টার দিকে কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ তৃতীয় আদালতের বিচারক বেগম ফাতেমা ফেরদৌসের আদালতে ওই ঘটনা ঘটে। নিহত ফারুক হোসেন (২৮) কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার কান্দি গ্রামের অহিদ উল্লার ছেলে। হামলাকারী আবুল হাসান (২৭) লাকসাম উপজেলার ভোজপাড়া গ্রামের শহিদ উল্লার ছেলে, পেশায় রাজমিস্ত্রি। ঘাতক হাসানকে আটক করেছে পুলিশ। ব্যবহূত ছোরাটিও উদ্ধার করা হয়েছে। মামলার সরকারি আইনজীবী এপিপি নুরুল ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার কান্দি গ্রামে হাজি আবদুল করিম হত্যার ঘটনা ঘটে। সোমবার ওই মামলার জামিনে থাকা আসামিদের হাজিরার দিন ধার্য ছিল। মামলাটির কার্যক্রম শুরু হলে আমি আদালতকে অবহিত করি যে, এই মামলার পাবলিক সাক্ষী প্রায় শেষের পথে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে সাক্ষ্য দিতে তলব করতে আদালতে আর্জি জানাই। ওই শুনানি করার  সময়ই সকাল সোয়া ১১টার দিকে ৪ নম্বর আসামি ফারুককে ছুরি নিয়ে তাড়া করে ৮ নম্বর আসামি হাসান। তখন ফারুক আত্মরক্ষার্থে বিচারকক্ষ সংলগ্ন বিচারকের খাস কামরায় ঢুকে পড়ে। সেখানেও হাসান প্রবেশ করে ফারুককে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে। টেবিলের ওপর রক্তের দাগ রয়েছে। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে তাকে ওই কক্ষের ফ্লোরে ফেলে আঘাত করা হয়। এ সময় আদালতে অন্য একটি মামলার কাজে আসা কুমিল্লার বাঙ্গরা থানার এএসআই ফিরোজ এগিয়ে গিয়ে হাসানকে বিচারকের খাস কামরা থেকে আটক করেন। এ সময় আদালত কক্ষে থাকা বিচারক, আইনজীবী ও অন্য আসামিদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সবাই ভয়ে ছোটাছুটি শুরু করেন। ওই আইনজীবী আরও জানান, ঘাতক হাসান তাদের দিকেও তেড়ে আসে। হাসানের উদ্দেশ্যই ছিল খুন করা। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুলিশ প্রশাসন থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ছিল না। আদালতে প্রকাশ্যে ছুরি নিয়ে আসামি ঢুকে পড়বে, বিচারকের খাস কামরায় ঢুকে অপরাধ করবে- এটা হতে পারে না। কারণ আদালত ও বিচারক কক্ষ নিরাপত্তার দায়িত্বে পুলিশ সদস্যরা নিয়োজিত থাকেন। আসামি ছুরি নিয়ে ঢুকেছে, এটা দেখার দায়িত্ব পুলিশের।

এদিকে, আহত ফারুককে দ্রুত কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

আদালতে যাওয়া সাংবাদিকদের উদ্দেশে বিচারক বেগম ফাতেমা ফেরদৌস বলেন, আমাদের সামনেই ছুরিকাঘাতের ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, আমার ওপরও হামলা হতে পারত।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানান, আসামিরা জামিনে ছিল। হাজিরা দিতে এসেছিল। ঘাতক হাসানের ধারণা, চলমান হত্যা মামলার আসামি হলেও সে নির্দোষ। নিহত ফারুকের কারণেই সে মামলার আসামি হয়েছে। ওই ক্ষোভ থেকেই হাসান সোমবার আদালতে হাজিরা দিতে আসার সময় ফারুককে ফোন করে বলেছে, আজ (সোমবার) অবশ্যই হাজিরা দিতে আসতে হবে। নতুবা জামিন বাতিল করে দেওয়া হবে। ফারুক বলেছে, আমি যেতে পারব না। তখন দু'জনের মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়। ওই উত্তেজনা নিয়েই দু'জন পৃথকভাবে আদালতে আসে। ঘাতক হাসান ফারুককে আঘাত করার জন্য কোমরে লুকিয়ে ছুরি নিয়ে আসে। যখন এজলাসের ভেতর দু'জন একত্রে দাঁড়িয়েছে তখনই ঘাতক হাসান ফারুককে ছুরিকাঘাত করতে ধাওয়া করে। এ পর্যায়ে প্রাণে বাঁচতে ফারুক দৌড় দেয়। কর্তব্যরত পুলিশও তাদের ধরতে ধাওয়া করে। দৌড়াতে দৌড়াতেই হাসান বিচারকের খাস কামরায় ঢুকে পড়ে। তিনি বলেন, নিহত ফারুকের গায়ে তিন-চারটি ছুরিকাঘাত করা হয়। হাসানকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার প্রাথমিক স্বীকারোক্তি নেওয়া হয়েছে। এসপি আরও বলেন, ওই হত্যা মামলাটির বিচার কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে ছিল। হয়তো আর কিছু দিনের মধ্যে রায় ঘোষণা করা হতো।

এদিকে, কুমিল্লার কোতোয়ালি থানার এএসআই ফিরোজ বাদী হয়ে এ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

এছাড়া জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) সাখাওয়াত হোসেনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।



© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)