স্বাধীনতার ফ্রেম...

০৫ জুলাই ২০১৯

ফৌজিয়া খান

১৯৮৬ সাল। ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছি। পাবলিক লাইব্রেরিতে চলচ্চিত্র প্রদর্শনী হচ্ছিল। ওখানে দেখি আগামী (পরিচালনা :মোরশেদুল ইসলাম), হুলিয়া (পরিচালনা :তানভীর মোকাম্মেল)। দেখার পর কী অনুভূতি হয়েছিল এখন মনে করতে পারি না।

সত্যি কথা বলতে কি, বিকল্প চলচ্চিত্র, মূলধারার চলচ্চিত্র, চলচ্চিত্র আন্দোলন, স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাণ, বিনোদন বাণিজ্য- এসব শব্দবন্ধের সঙ্গে তখন কোনো পরিচয় ছিল না আমার!

অনেকের লেখায় পড়ি, তারা মা-খালাদের সঙ্গে ছোটবেলায় সিনেমা দেখেছেন। আমার তেমন কোনো স্মৃতি নেই। বাড়িতে সিনেমা নিয়ে কোনো বাতচিত শুনিনি।

আসলে তখন বয়স ষোলো মাত্র পেরোলো। বাড়ি থেকে স্কুল, স্কুল থেকে বাড়ি- এই-ই ছিল। মা গল্প-উপন্যাস পড়তেন, আমরা ভাইবোনেরাও তা-ই পড়তাম। মায়ের দৌড় বাংলা বই আর পত্র-পত্রিকায় সীমাবদ্ধ ছিল। হলে গিয়ে সিনেমা দেখার সুযোগ ও সামর্থ্য তার ছিল না।

তবে কোনো কিছুই আটকে থাকেনি। সাত পুরুষের কেউ কস্মিনকালে চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত না থাকলেও এর সঙ্গে আমার নাম একটুখানি জড়িয়ে গেছে! আর সেই সুযোগে নিজের সাজপোশাক 'সিনেমাটিক' করে তুলিনি অবশ্য। তবে চলচ্চিত্রের আলো হঠাৎ একদিন আমার জীবন নদীর বাঁকে এক ঝলক এসে পড়েছিল বলেই এখন লিখছি এই লেখা!

'আগামী' এবং 'হুলিয়া'র নাম করলাম বটে; এই ছবিগুলো চলচ্চিত্রে আমার নাম যুক্ত হওয়ার নিয়ামক নয়। নিয়ামক অন্যকিছু।

১৯৮৯ সাল। কলেজ শেষে ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কলা ভবন। আমি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ছাত্রী। কোনোমতে ক্লাস শেষ করেই টিএসসি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাফেটেরিয়া, হাকিম চত্বরে ছুটে যাই। জীবনযজ্ঞের নানা বিষয়ে তর্ক-বিতর্কে বন্ধুদের সঙ্গে দিনমান বুঁদ হয়ে থাকি। সঙ্গে চলে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো মানে স্বেচ্ছাসেবক হয়ে টুকটাক কাজ, খণ্ডকালীন সামান্য টাকার চাকরি। সবমিলিয়ে হাওয়ায় ভেসে ভেসে কাটছিল দিনগুলো। সেই সময়ে '৮৯ সালের শেষ বা '৯০-এর শুরুর দিকে আমি ফিল্ম দেখতে শুরু করি।

ধানমণ্ডির দুই নম্বর সড়কে তখন জার্মান কালচারাল সেন্টার। ওখানেই পাশের বাড়িতে ভারতীয় দূতাবাসের মিলনায়তন। ধানমণ্ডিতেই মিরপুর রোডের ওপরে আলিয়ঁস ফ্রঁসেসের ছোট্ট মিলনায়তন, আরেকটু ভেতরে গিয়ে ধানমণ্ডির সাত নম্বর সড়কে রুশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। সন্ধ্যাগুলো তখন প্রায়ই এসব মিলনায়তনের কোনো একটিতে কাটত আমার। সে সময় ফিল্ম সোসাইটিগুলো বিশেষ করে জহির রায়হান ফিল্ম সোসাইটি ভীষণ সক্রিয়। ওদের বেশির ভাগ স্ট্ক্রিনিং হতো জার্মান কালচারাল সেন্টারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শেষে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডার পরিধি বাড়িয়ে ধানমণ্ডির সেইসব মিলনায়তনের কোনোটিতে ঢুকে পড়তাম।

বিনে পয়সায় ধ্রুপদ সব সিনেমা দেখেছি। পৃথিবীর সেরা নির্মাতাদের ছবি। প্রায় প্রতিদিন ফিল্ম সোসাইটির প্রদর্শনী দেখতে যাই। প্রায় শতভাগ ছেলে দর্শকের মধ্যে বেশির ভাগ প্রদর্শনীতে আমি তখন একমাত্র নারী দর্শক! বসি সব সময় একেবারে প্রথম সারির আসনে! ফিল্মের অ, আ কিছুই জানি না; বাংলা ছাড়া অন্য ভাষা জানি না- ক্ষতি কি! ইংরেজি সাবটাইটেল পড়ে কোনোমতে ছবির কাহিনী বুঝে নিই। আসলে, তখন বুঝবার জন্য তো ছবি দেখতাম না। মিলনায়তনের আলো নিভে গেলে চোখের সামনে পর্দায় রূপায়িত জীবনের সঙ্গে নিজের ভেতরের অতি সংগোপনে থাকা অজানা আমিটা কোনো কোনো মুহূর্তে কথা বলে উঠত। তারই টানে ছবি দেখতে ছুটে যাওয়া।

পর্দায় দেখানো বাস্তবতার সঙ্গে নিজের নিভৃত নির্জন কথোপকথন বিশ্ব চলচ্চিত্রের প্রতি আমার অজানা ভালোবাসাকে ক্রমে পোক্ত করেছে। বলতে দ্বিধা নেই, বিশ্ব চলচ্চিত্রের সুস্থ ধারাটির সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলতে অজান্তেই ঋণী হয়ে আছি ফিল্ম সোসাইটি আন্দোলনের সক্রিয় কর্মীদের কাছে। তখন ছবি দেখেছি ভালোবেসে, দেখার আনন্দটুকুই ছিল সব। এর বাইরে অন্য কিছু জানবার সুযোগ হয়নি, প্রয়োজনও পড়েনি। ফিল্মের কোনো বই তখনও পড়িনি। দেশে তখন কোনো ফিল্ম স্কুল ছিল না। একাডেমিক্যালি ফিল্ম পড়ুয়া কাউকে কাছ থেকে দেখিওনি। নিজে ফিল্ম পড়ব- এটা ভাবারও কোনো কারণ ছিল না।

চলচ্চিত্রম-এর সদস্য নূরুল আলম আতিক ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সহপাঠী। ফার্স্ট ইয়ারের পর আতিক আর ক্লাস করেনি, পরীক্ষাও দেয়নি। তবে হাকিম চত্বরে নিয়মিত আসত, ছিল আমাদের বিশাল আড্ডামহলের নিয়মিত সদস্য। তখন আশিক মুস্তাফাও (ফুলকুমার চলচ্চিত্রের নির্মাতা, ঢাকায় এখন আলোচিত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একজন রুবাইয়াত হোসেনের স্বামী) আমাদের আড্ডায় নিয়মিতদের একজন। আশিক তখনও ফিল্ম নিয়ে মাতেনি, ওর তখন কবিতাতেই পুরো মনোযোগ। নূরুল আলম আতিক আর আশিক মুস্তাফার প্ররোচনাতেই ভারতের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট, পুনেতে অ্যাপ্লাই করি। ততদিনে আমি মাস্টার্সের ছাত্রী। ১৯৯৪ সাল।

দল বেঁধে অ্যাপ্লাই করা হলো, পরীক্ষার জন্য ডাক পেলাম। ঢাকার ধানমণ্ডিতে ভারতীয় হাইকমিশনের সাংস্কৃতিক উইংয়ের অফিসে পরীক্ষা হলো। ভাবলে এখন হাসি পায়, পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে বন্ধুদের কাছ থেকে কিছু তালিম নেওয়ারও চেষ্টা করেছিলাম! পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখি সেইসব তালিম কোনো কাজেই আসেনি। প্রশ্নপত্র অতি সহজ- আইকিউ টেস্ট জাতীয় প্রশ্ন এবং ইংরেজি ভাষায় কিছু লেখার ব্যাপার ছিল। পরীক্ষা কিন্তু 'ফিল্ম বিষয়ে মূর্খ' আমার খারাপ হলো না! নিয়তির পরিহাস, কয়েক মাস পরে ১৯৯৫ সালে কোনো একদিন ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া, পুনে থেকে ফ্যাক্স পেলাম- 'ইউ আর সিলেক্টেড'। ফ্যাক্স- কারণ তখনও ইন্টারনেট চালু হয়নি, ই-মেইলের প্রচলন হয়নি।

আমার তখন মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষা চলছে। আটটি কোর্সের মধ্যে দুই কোর্সের পরীক্ষা দিয়েছি। কিন্তু সিনেমার এমন লোভ! মাস্টার্স পরীক্ষা ফেলে পুনেতে চলে গেছি। বাড়িতেও বাধা দিল না কেউ। মেয়ে ভারত সরকারের বৃত্তি পেয়ে পড়তে বিদেশ যাচ্ছে- যে কোনো সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বিষয়টা গর্বের ছিল।

যা হোক, আমি পুনেতে গেলাম; গেলাম- যেন-বা আগুনে ঝাঁপ দিলাম!

সত্যি, এখন পেছন ফিরে তাকালে নিজেকে আগুনে ঝাঁপ দেওয়া পতঙ্গই মনে হয়! বছর পাঁচেক বিভিন্ন ফিল্ম সোসাইটির দেখানো ছবি দেখবার ঝুলি সম্বল করে বাংলা সাহিত্যের ছাত্রী চলে গেছি ফিল্ম পড়তে! হিন্দি জানি না এক বর্ণ, ইংরেজি বলবার অভ্যাস নেই। এখন ভাবলে অবাক লাগে, কী করে অমন দুঃসাহস করেছিলাম!

পারছি না! পারছি না! পারছি না! প্রথম তিন মাস কাটল এমন হুতাশনের মধ্য দিয়ে। পারতে হবে ভেবে পরের তিন মাসে মন শক্ত করলাম। চলচ্চিত্র তৈরির অ, আ শেখার চেষ্টায় বাকি দেড় বছর কাটালাম।

শিখতে তো পারিও নাই পুরোটা। তা না হলে এখনও নতুন কোনো কাজে হাত দিয়ে কেন মনে হয়- শূন্য থেকে করছি শুরু?

১৯৯৭ সালের জানুয়ারি। ফিরে এলাম ঢাকায়। মনে একরাশ স্বপ্ন। তখন ভেবেছি, চলচ্চিত্র সম্পাদনায় প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা আমাদের দেশীয় চলচ্চিত্রের কাজে লাগবে। আর আমারও রুটি-রুজির ব্যবস্থা হবে। ততদিনে আমি মূলধারা, বিকল্পধারা- কথাগুলো শিখে গেছি। বিকল্পধারায় থাকব, পিওর সিনেমা করব এমন কোনো দিব্যি আমার ছিল না। মনে পড়ছে, সিনিয়রদের পরামর্শে একদিন এফডিসির এডিটরস গিল্ডের অফিসে গেছি। পেশাদার চলচ্চিত্র সম্পাদক হতে হলে তাদের সদস্যপদ লাগবে। দেখলাম আমার বেশভূষা, কথাবার্তা, শব্দচয়ন ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপক দুশ্চিন্তায় পড়ে গেছেন এডিটরস গিল্ডের তখনকার সভাপ্রধান। তাঁর নামটা এখন আর মনে নেই। তিনি বললেন, তুমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছ, পুনেয় পড়েছ- তুমি কী করে এফডিসির পরিবেশে কাজ করবে! বয়সে তরুণ আমি। অভিজ্ঞতার ঝুলি প্রায় শূন্য। বুঝে উঠতে পারছি না, উনারা কেন এমন ভাবছেন। তখনও জানি না, এফডিসিতে শিক্ষিত(!) নারী চলচ্চিত্রকর্মীর উপস্থিতি কোন ধরনের অস্বস্তি তৈরি করতে পারে! যা হোক, এফডিসিতে নির্মিত চলচ্চিত্র সম্পাদনা করার সুযোগ কিংবা দুর্ভাগ্য তখন হয়নি।

পুনেতে পৃথিবীর তাবৎ ক্ল্যাসিক কাহিনীচিত্র দেখে অভ্যস্ত ছিলাম। প্রামাণ্যচিত্রের সঙ্গে পরিচয় হয়নি বললে মিথ্যে বলা হবে না। ঢাকায় প্রথম কাজ পেলাম দুটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের। প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ ছিল সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা। তবুও ক্রমে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ আমার পেশা হয়ে উঠল, পরিচয়ের অংশ হলো।

অগ্রজ চলচ্চিত্র নির্মাতা, বাংলাদেশে প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান শিক্ষক মানজারেহাসীন মুরাদ নিজ উদ্যোগে আগ্রহী তরুণ-তরুণীকে নানাভাবে চলচ্চিত্র নির্মাণে সহযোগিতা করেন, উৎসাহ জোগান। তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় আমারও রুটি-রুজির সাময়িক ব্যবস্থা হলো। যোগ দিলাম স্টেপস্‌ টুয়ার্ডস্‌ ডেভেলপমেন্টের অডিও ভিজ্যুয়াল সেন্টারে। বাংলাদেশে সামাজিক বিষয়ে প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাণে পথিকৃৎ উন্নয়ন সংস্থা। এনজিওগুলো মূলত অডিও-ভিজ্যুয়াল করে নিজেদের কর্মসূচি ডকুমেন্টেশনের জন্য। স্টেপস্‌ই একমাত্র ব্যতিক্রম। আর এটা সম্ভব হয়েছিল মানজারেহাসীন মুরাদ ওখানে ছিলেন বলেই। ওখানে আমি ১৯৯৯ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত পূর্ণকালীন চাকরি করেছি। ওখানে বানিয়েছি প্রামাণ্যচিত্র, টিভি প্রোগ্রাম। ২০০৬ সালে চাকরি ছেড়ে দিই। তারপর থেকে স্বউদ্যোগে কাজ করছি।

আমার কাজের বড় জায়গা জুড়ে আছে নারী। এমন নয় যে শুরুতেই ঠিক করে নিয়েছিলাম এ-ই হবে আমার বিষয়। করতে করতে এটা হয়েছে। স্টেপস্‌-এর এভি সেন্টারে যোগ দেওয়ার পর 'অন্য অনুভব' নামে একটি প্রামাণ্যচিত্রের দায়িত্ব পাই। এই ছবির জন্য প্রথমে অ্যাসাইন করা হয়েছিল সামির আহমেদকে (চলচ্চিত্র সম্পাদক)। শুটিংয়ের পর একদিন সম্পাদনায় বসে পরে সামির আর কাজটি না করায় 'অন্য অনুভব' আমার কাছে আসে। বাংলাদেশের ছয় চিত্রশিল্পীর ক্যানভাসে নারী হিসেবে তাদের অভিজ্ঞতার প্রকাশ খুঁজে দেখা ছিল এর বিষয়।

ছয় পেইন্টার এক বাংলাদেশের মানুষ। ব্যক্তিগত জীবনে ছয়জনের জীবন ছয় রকম। নারী হিসেবে তাদের কমন কিছু অভিজ্ঞতা আছে। সামিরের করা ফুটেজ দেখে প্রয়োজনীয় আরেক দফা শুটিং শেষে সম্পাদনায় বসে দেখি, সচেতন এবং অবচেতনে তারা নিজের কথাই বলে চলেছেন তাদের আঁকা ছবিতে!

আমি পেইন্টার নই। ফিল্মমেকার এখনও হয়ে উঠছি। (বয়স প্রায় পঞ্চাশ। আর হওয়া হবে কি-না, কে জানে!) মাঝেমধ্যে লেখালেখি করি। যা কিছুই করতে যাই ব্যক্তি অভিজ্ঞতা এসে ভর করে। এটা দুর্বলতা মনে হতো, প্রকাশে দ্বিধা ছিল। 'অন্য অনুভব'-এর নির্মাণ অভিজ্ঞতায় এই দ্বিধা দূর হয়। এজন্য 'অন্য অনুভব' (২০০১) এখনও বিশেষ হয়ে আছে।

স্টেপসেই 'অন্য অনুভব'-এর পর পরপর দুটি প্রামাণ্যচিত্র বানাই। জাতীয় রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বিষয়ে বানিয়েছিলাম 'অভিযাত্রিক' (২০০২) আর স্থানীয় সরকারে গ্রামীণ নারীর অংশগ্রহণ বিষয়ে 'যেতে হবে দূর, বহুদূর' (২০০৩)। ছবি হিসেবে এগুলো আহামরি হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এই দুটি ছবি করতে গিয়ে ক্ষমতাকাঠামো, পুরুষতন্ত্র এবং নারীর প্রান্তিকতা বিষয়ে একরকম ধারণা হয়। উপলব্ধি করি, রাজনীতি সবকিছুর মূলে। রাজনীতি ঠিক না হলে সমাজের অন্য কোনো কিছু ঠিক হয় না। ছাত্রকালে রাজনীতিবিমুখ ফৌজিয়ার রাজনৈতিক সচেতনতার মূলে আছে 'অভিযাত্রিক' আর 'যেতে হবে দূর, বহুদূর'-এর নির্মাণ অভিজ্ঞতা।

শরীরের সঙ্গে শরীরের সম্পর্ক- সেইখান থেকে জীবনের প্রবাহ। আবার নিজ শরীরের জন্যই নারী 'অন্য', সমাজে তার দ্বিতীয় লিঙ্গের জীবন। এই শরীর আর সম্পর্ক নিয়ে আছে ট্যাবু, আড়ালের আবডাল, সম্পর্কে ঘুণপোকা। আমার বানানো 'আমাকে বলতে দাও' (২০০৬), 'যে গল্পের শেষ নেই' (২০১৩-২০১৪), 'তাসের ঘর' (২০১৮)- তিনটি প্রামাণ্যচিত্রে এই কথাগুলোই বলার চেষ্টা করেছি। প্রামাণ্যচিত্রকর ফৌজিয়ার আগ্রহের কেন্দ্রে আছে শরীর ও সম্পর্ক।

ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধ আমার শ্বাস-প্রশ্বাসের জায়গা। এখন পর্যন্ত বানিয়েছি চারটি প্রামাণ্যচিত্র: 'সে কথা বলে যাই' (২০০৯), 'কোথায় পাবো তারে' (২০১০), 'রাখবো বহমান' (২০১৮)। চতুর্থটির সম্পাদনা চলছে। মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানোর শোক, মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে আমাদের যূথবদ্ধতা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছি বছরব্যাপী একটি টেলিভিশনে প্রচারিত দৈনিক প্রামাণ্য অনুষ্ঠান 'কান্দে আমার মা' (২০০৯) বানাতে গিয়ে। উত্তাল সত্তরে জন্ম নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অস্বীকার করা সময়ে বড় হয়ে ওঠা আমি আমার দেশের ইতিহাসের পাঠ নিয়েছি এই কাজগুলো করতে করতে।

আমার বুকের মধ্যে একটা ঘুণপোকা সারাক্ষণ খুনখুনিয়ে কাঁদে। মন খারাপের গান আমার রক্তে বয় অবিরাম। এই নিজেকে চিনতে অনুঘটকের কাজ করল ২০০৫ সালে ছোট বোনের স্বেচ্ছামৃত্যু। মনের স্বাস্থ্য নিয়ে ভাবনা শুরু হলো। আর সব কাজের সঙ্গে যুক্ত হলো মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে টেলিভিশন অনুষ্ঠান নির্মাণ। বাংলাদেশ টেলিভিশনে করতে গেলাম 'আমাদের মন' (২০০৮)। অনুষ্ঠানের চেহারা যেমন করতে চাই বিটিভির ব্যবস্থাপনায় পলিটিক্যাল খুঁটি ছাড়া বাইরের মানুষের জন্য তা করতে পারা কঠিন। 'আমাদের মন'কে মনের মতো না করতে পেরে আমার মন খারাপ বাড়ল। আটটি পর্ব করার পর অনুষ্ঠানটি নিজেই বন্ধ করে দিই। তবে আজ যখন বিভিন্ন টেলিভিশনে মন ও মনের স্বাস্থ্য নিয়ে অনেক অনুষ্ঠান দেখি- দেখি সমাজ এ বিষয়ে সরব হয়েছে- তখন ভাবতে খুব ভালো লাগে যে এই বিষয়ে টিভি অনুষ্ঠান করা শুরু করেছিলাম 'আমি'।

'অন্য অনুভব'-এ ছয় চিত্রশিল্পীকে নিয়ে কাজ করেছি। ভিস্যুয়াল সব প্রায় এক রকম! বৈচিত্র্যে নতুনত্ব এবং তার মধ্যে বিষয় ও চরিত্রের অনিবার্য ঠাসবুনন তৈরি করা চলচ্চিত্র নির্মাতার, বিশেষত প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতার কঠিনতম কাজের একটি। 'অন্য অনুভব'-এর সম্পাদনার টেবিলে দৃশ্যবৈচিত্র্য তৈরি করতে গলদগর্ম যখন সেইরকম সময়ে ঢাকা থিয়েটারের নাটক 'বনপাংশুল' দেখি। আড়াই ঘণ্টার ওই নাটকের মঞ্চ পরিবেশনায় শিমূল ইউসুফ প্রায় পুরোটা সময় জুড়ে মঞ্চে- তাঁর অভিনয় জুড়ে আছে নৃত্য ও গীত। ভিজ্যুয়ালি ব্যাপক বৈচিত্র্য সম্ভব। আমার মাথায় এলো একটা প্রামাণ্যচিত্রের ভাবনা।

কোনো অর্থায়ন মেলেনি আমার। নিজের ভাত খাওয়ার টাকায় বানালাম 'গঠিত হই শূন্যে মিলাই' (২০০৭।) ছবির বিষয় হয়ে উঠল বাংলা মঞ্চনাটকের অভিনয় রীতি এবং এই রীতির জাজ্বল্যমান শিল্পী শিমূল ইউসুফ।

ষ এরপর ২৮ পৃষ্ঠায়নারীর জীবনকে নানা দিক থেকে দেখতে চেয়েছিলাম বাংলা ছোটগল্পের চরিত্রগুলোর দৃশ্যায়ন করে। তেরোটি নারী চরিত্রপ্রধান ছোটগল্পের চিত্রায়ণের একটি পরিকল্পনা করেছিলাম। তিনটি গল্প থেকে বানালাম মাসি পিসি (মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়), নাহার বেগমের শেষ দিনগুলি (রাশিদা সুলতানা), নিজ কলমোহনায় ক্লারা লিন্ডেন (শাহাদুজ্জামান)। আমার যা আছে তা-ই নিয়েই শুরু করলাম। শুটিংয়ে গিয়ে দেখি অভিনয়শিল্পীদের মর্জি আর দক্ষতার ওপর অনেকটুকু নির্ভর করে প্রডাকশন ভালো করা যাবে কি যাবে না। ফলে তিনটি গল্প দৃশ্যায়নের পর ক্ষান্ত দিলাম টেলিভিশনের জন্য ছোটগল্প দৃশ্যায়নের ওই ভাবনায়।

আমার ব্যাপারটা কূল-কিনারাহীন সমুদ্রে স্রোতের বিপরীতে একলা একটা ডিঙি নাও বেয়ে চলা। সব অর্থেই। ওটা প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে করা যায় কিছুটা। কিন্তু ফিকশনে সম্ভব নয়। চলচ্চিত্রপ্রেমী ভেতরের আমিটা শিল্প-অশিল্পের দোলাচলে দুলছে- এই এখনও। স্বপ্ন, স্বপ্নভঙ্গ এবং আবার নতুন স্বপ্ন গড়ার মধ্য দিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণে নিজেকে থিতু করার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মধ্য দিয়ে নিজের ভেতরে আমার নিত্য ভাংচুর চলে, চলে নিজেকেও ক্রমশ নির্মাণ-বিনির্মাণের প্রক্রিয়া।

পেছন ফিরে তাকালে দেখি, ১৯৯৭ থেকে ২০১৯- দীর্ঘ বাইশ বছরের যাত্রা। এই যাত্রায় ছোট-বড়, প্রামাণ্য-কাহিনী, নিজের টাকায়-অন্যের টাকায় সব মিলিয়ে চল্লিশের বেশি অডিও-ভিজ্যুয়াল উপকরণ আমার নামের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বয়সে আমি গঠনের চেয়ে এখন ক্ষয়ের দিকে আছি। ক্ষয়টাকে মেনে নিলে অন্ধকারকে আহ্বান করতে হয়। এখনও করছি না ওটা।

বাস্তবতা প্রামাণ্যচিত্রের অন্যতম প্রধান উপাদান। পৃথিবীর দেশে দেশে যুগে যুগে প্রামাণ্য চলচ্চিত্রের অন্যতম এই উপাদানকে ঘিরেই অবিশ্বাস্য সব ঘটনা ঘটেছে। মনে পড়ছে ফরাসি চিত্রনির্মাতা অ্যালা রেনে নির্মিত ছবি নাইট অ্যান্ড ফগ-এর কথা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলার জার্মান বাহিনীর শৌর্যের প্রমাণ হিসেবে যুদ্ধের নৃশংসতার চিত্র ধারণ করেছিল। অবিশ্বাস্য মর্মবিদারক সেইসব চিত্র ব্যবহার করে যুদ্ধের পরে নির্মিত হয়েছে যুদ্ধবিরোধী অসাধারণ প্রামাণ্যচিত্র নাইট অ্যান্ড ফগ।

আসলে প্রত্যক্ষ বাস্তবতার অন্তরালে অন্য যে বাস্তব সেই বাস্তব খুঁড়ে সভ্যতার ইতিহাস বিনির্মাণের দুঃসাহসী দায়িত্ব প্রামাণ্যচিত্রকরকে নিতে হয়। বাস্তবের অন্দরমহলে আলো ফেলে আনতে হয় তার আত্মার রূপ।

নিজের জন্যে স্থির করে নিয়েছি 'স্বাধীন প্রামাণ্য চলচ্চিত্র নির্মাতা'র অভিধা। চলচ্চিত্র ইতিহাসের শুরু থেকেই নানান কারণে সংগঠিত হয়ে নানারকম অ্যাক্টিজমের মধ্য দিয়ে বিশ্ব চলচ্চিত্রকে বিকশিত করেছেন স্বাধীন নির্মাতারা। তাঁদের সেই উত্তরাধিকারকে ধারণ করেই বাস্তবতার সৃজনশীল প্রকাশের মধ্য দিয়ে এই ডিজিটাল সময়ে নিজের কথা বলতে চাই- চাই নিজের নির্মাণ, ক্রমাগত বিনির্মাণ।

আদর্শ আর স্বপ্নহীন হয়ে গেছে পৃথিবী, ধর্ম ধর্মের জায়গায় নেই, পরিবার নেই পরিবারের প্রয়োজনীয় ভূমিকায়, সম্পর্কগুলো নেই সম্পর্কের মধ্যে, কমিটমেন্ট নেই, আবার পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়াও নেই। ভার্চুয়াল রিয়ালিটির এই যুগে নিজেদের কমফোর্ট জোনে আবদ্ধ হওয়া এই সময়ে মানুষের সঙ্গে মানুষের গভীর থেকে গভীরতর সংযোগ অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। দৃশ্য এবং শব্দ- এই দুই পায়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সিনেমাই মনে হয় জরুরি এই কাজটি সবচেয়ে ভালোভাবে করতে পারে।

গোষ্ঠীতন্ত্রের বাইরে থাকা আমি মনে মনে রোল মডেল করে নিয়েছি সদ্যপ্রয়াত চলচ্চিত্র নির্মাতা ফ্রান্সের আগাসে ভার্দা (অমহবং ঠধৎফধ) এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনাস মেকাসকে (ঔড়হধং গবশধং)।

তৃতীয় বিশ্বের দেশ বাংলাদেশের নাগরিক আমি। এখানে প্রামাণ্যচিত্রের সামাজিক-রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। এই কথা বিবেচনায় রেখে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের কঠিন রূঢ় বাস্তবতার ভেতর দিয়ে ক্রমশ চারপাশটাকে আরও বেশি গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করে চলেছি। আর এই চেষ্টায় মানবিক সমাজ বিনির্মাণে ভূমিকা রাখার চেষ্টা যেন জারি রাখতে পারি এমনটাই এই আমার আকাঙ্ক্ষা।

ি




[মূল লেখাটি বেঙ্গল ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত কালি ও কলম পত্রিকায় ২০১১ সালের একটি সংখ্যায় ছাপা হয়েছিল। কালের খেয়ার আহ্বানে সমকাল পত্রিকার জন্য লিখতে বসে ওই লেখাটির পরিমার্জনা করে প্রায় নতুন একটা লেখা হয়ে উঠল।]

© সমকাল 2005 - 2019

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭ (প্রিন্ট পত্রিকা), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) । ইমেইল: [email protected]