ঈদে বাড়ি ফেরা

স্টেশনেই ১৪ ঘণ্টা

ট্রেনে নজিরবিহীন সিডিউল বিপর্যয়, সড়কে যানজট

১১ আগস্ট ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

ট্রেন আসতে দেরি। কমলাপুর রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা - সাজ্জাদ নয়ন

লালমনিরহাটগামী 'লালমনি ঈদ স্পেশাল' ট্রেনটির গতকাল শনিবার কমলাপুর ছাড়ার কথা ছিল সকাল সোয়া ৯টায়। তবে সকাল তো নয়ই; দুপুর, বিকেল কিংবা সন্ধ্যায়ও এটি যাত্রা শুরু করতে পারেনি। অবশেষে ট্রেনটি ঢাকা ছেড়ে যায় রাত সোয়া ১১টায়, অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের ১৪ ঘণ্টা পরে। একইভাবে সকাল ৯টার 'রংপুর এক্সপ্রেস' ঢাকা ছাড়ে রাত ১১টায়। এই দীর্ঘ সময় যাত্রীদের স্টেশনেই কাটাতে হয়, পোহাতে হয় চরম  দুর্ভোগ।

এভাবেই ঈদের খুশি কেড়ে নিয়েছে ভোগান্তির ঈদযাত্রা। ঘরমুখো লাখো মানুষ আগের দু'দিনের মতো গতকালও দুর্ভোগে নাকাল হয়েছেন। মহাসড়কে ভোগান্তির ভয়ে যারা ট্রেনে ভরসা রেখেছিলেন, তারা পড়েন নজিরবিহীন সিডিউল বিপর্যয়ের খপ্পড়ে।

সিডিউল বিপর্যয় এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে বেশ কিছু ট্রেন গতকাল ঢাকা থেকে ছেড়েই যায়নি। সেগুলো আজ রোববার ছাড়তে পারে। ট্রেনের আশায় প্ল্যাটফর্মে অন্তহীন অপেক্ষায় দিন কাটে যাত্রীদের।

রাজশাহীগামী 'ধূমকেতু এক্সপ্রেসে'র যাত্রী আবু সাঈদ আলম বলেন, সকাল ৬টায় ট্রেনটি ছাড়ার নির্ধারিত সময়। পরিবার-পরিজন নিয়ে ভোর সাড়ে ৫টায় কমলাপুর স্টেশনে আসেন। এসে জানতে পারেন, দুপুর সাড়ে ১২টায় ট্রেন ছাড়বে। ছয় ঘণ্টা প্ল্যাটফর্মে শুয়ে-বসে কাটান। সাড়ে ১১টার দিকে খবর নিয়ে জানতে পারেন, বিকেল ৫টায় ট্রেন ছাড়বে। আরও পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে- এ সংবাদে ক্ষুব্ধ আবু সাঈদ। তিনি বলেন, আগে জানিয়ে দিলেই হতো ট্রেন ১১ ঘণ্টা লেট হবে। তার বাসা মিরপুরে। কমলাপুর থেকে মিরপুর গিয়ে আবার স্টেশনে আসা কষ্টকর। তাই স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে স্টেশনে বসে থাকা ছাড়া আর উপায় নেই।

এদিকে চট্টগ্রাম ও সিলেট মহাসড়কের যাত্রীরা স্বাচ্ছন্দ্যে গন্তব্যে যেতে পারলেও বরিশাল ও খুলনা মহাসড়কের যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন ফেরিতে। ময়মনসিংহ মহাসড়কের যাত্রীদের ভোগান্তি সইতে হয়েছে গাজীপুরের ভাঙাচোরা সড়কে।

তবে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, মহাসড়কে যানজটের তথ্য নেই। তবে গাড়ি চলছে ধীরগতিতে। মন্ত্রীর দাবি, 'বাংলাদেশের মানুষ ঈদযাত্রার দুর্ভোগকে দুর্ভোগ হিসেবে মনে করে না। তারা একে ঈদ আনন্দের অংশ হিসেবে মনে করে।' তবে যাত্রীরা বলেছেন, তারা অতিষ্ঠ।

ঈদযাত্রায় ঢাকার কমলাপুর থেকে প্রতিদিন ৩৭টি আন্তঃনগর ট্রেন ছাড়ছে। চট্টগ্রাম, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, মোহনগঞ্জ ও জামালপুরগামী ট্রেনগুলো তুলনামূলক স্বস্তিদায়ক ছিল। নির্ধারিত সময়ের এক-আধ ঘণ্টা পর কমলাপুর ছাড়ে এই রুটের ট্রেনগুলো। খুলনা, রংপুর, রাজশাহী ও পঞ্চগড়গামী ট্রেনগুলোর বিলম্বের তুলনায় এক-আধ ঘণ্টা কিছুই নয়।

গতকাল 'ধূমকেতু', 'সুন্দরবন', 'বনলতা', 'পদ্মা', 'একতা', 'দ্রুতযান', 'পঞ্চগড় এক্সপ্রেস'সহ উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের সব ট্রেন দুই থেকে আট ঘণ্টা দেরিতে ছাড়ে।

খুলনাগামী 'চিত্রা এক্সপ্রেসে'র ঢাকা ছাড়ার কথা ছিল গতকাল সন্ধ্যা সোয়া ৭টায়। কিন্তু ট্রেনটি গতকাল ঢাকাতেই ফেরেনি। আজ ছাড়তে পারে ট্রেনটি। আজকের সন্ধ্যার চিত্রা এক্সপ্রেসের কী হবে, তার জবাব নেই রেলওয়ের কাছে।

ট্রেনের এমন নজিরবিহীন সিডিউল বিপর্যয়ে ক্ষুব্ধ যাত্রীরা বলছেন, বাসের দুর্ভোগ এড়াতে রাত-দিন লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট কেটেছিলেন। এখন ট্রেনেও দুর্ভোগ। তারা কোথায় যাবেন! কীভাবে বাড়ি যাবেন! স্টেশন ম্যানেজারের কক্ষে যাত্রীরা দলবেঁধে গিয়ে ক্ষোভের কথা জানান।

দুপুর ১২টার দিকে কমলাপুর স্টেশনে দেখা যায়, প্ল্যাটফর্মে বসার বেঞ্চে এক তিল জায়গা নেই। মাটিতে পত্রিকা, চাদর, কাঁথা বিছিয়ে শুয়ে-বসে আছে অসংখ্য মানুষ। সবচেয়ে দুর্ভোগে ছিল শিশুরা। গরমে তারা নাকাল। অপ্রতুল টয়লেটের কারণে দুর্ভোগ পোহান নারী যাত্রীরা।

কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার আমিনুল হক জানিয়েছেন, প্রতিটি ট্রেন যাত্রীতে কানায় কানায় পূর্ণ। বাড়তি যাত্রীর কারণে ট্রেন পূর্ণ গতিতে চলছে না। এ কারণে ট্রেন গন্তব্যে যেতে বিলম্ব করছে। যাত্রী ওঠানামার কারণে প্রতিটি স্টেশনে বাড়তি সময় লাগছে। এতে ট্রেন ঢাকায় ফিরতেও দেরি করছে। এ কারণে সময়সূচি মানা যাচ্ছে না।

উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গে ট্রেনে নজিরবিহীন সিডিউল বিপর্যয়ের জন্য গত শুক্রবার দুপুরে টাঙ্গাইলে 'সুন্দরবন এক্সপ্রেসে'র দুর্ঘটনাকে দায়ী করেন আমিনুল হক। এ দুর্ঘটনায় সাড়ে তিন ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকাতেই এত বিলম্ব হচ্ছে বলে দাবি করেন স্টেশন ম্যানেজার। তিনি জানান, যাত্রীরা চাইলে টিকিট ফেরত দিতে পারবেন। পুরো টাকা ফেরত দেওয়া হবে।

প্রায় অভিন্ন অবস্থা ছিল উত্তরবঙ্গে ১৬ জেলার বাসের যাত্রীদের। বাসের অপেক্ষায় তাদের দিন কাটে গাবতলী, শ্যামলী, কল্যাণপুরের বাস কাউন্টারগুলোতে। গাবতলীর হানিফ পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার মোশাররফ হোসেন জানান, গত শুক্রবার দিনের বেলায় যেসব বাস ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গে রওনা করে, সেগুলো যানজটের কারণে পথে আটকা ছিল। অধিকাংশ বাস শনিবার গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছায়। সেগুলো গতকাল দুপুর পর্যন্ত ঢাকা ফেরেনি। বিকল্প বাস দিয়ে সেবা দেওয়া হচ্ছে। যেখানে বিকল্প দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না, সেখানে যাত্রীদের বাসের অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

ঢাকা-গাইবান্ধা রুটের এস আর পরিবহনের যাত্রী নিজামউদ্দিন জানিয়েছেন, সকাল ৮টায় বাস তার ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু দুপুর ১টায় ছাড়তে পারে বলে কাউন্টার থেকে জানানো হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে তিনি কাউন্টারে বসে আছেন।

ডাক বিভাগের কর্মকর্তা লিংকন মো. লুৎফরজ্জামান সরকার জানিয়েছেন, গত শুক্রবার দুপুর পৌনে ১টায় তার রংপুরগামী বাস ছাড়ার কথা ছিল। কিন্তু ছাড়ে ৩টা ১০ মিনিটে। ১৯ ঘণ্টায় রংপুরে পৌঁছান। তিনি জানান, বঙ্গবন্ধু সেতুর দুই প্রান্তেই যানজট।

আগের দু'দিনের মতো গতকালও মাওয়া ও পাটুরিয়া ঘাটে পারাপারে গাড়ির দীর্ঘ সারি ছিল। ফেরির সিরিয়াল পেতেই তিন থেকে চার ঘণ্টা লেগে যায়। নদী পার হতে পাঁ?চ ঘণ্টা লাগে। এ কারণে খুলনা ও বরিশাল মহাসড়কের বাসেও বাড়তি সময় লাগছে। বাস ঢাকা ফিরছে দেরিতে। বিলম্বের এ চক্রে ভোগান্তি হচ্ছে যাত্রীদের। ঢাকা-যশোরের যাত্রী আবদুল্লাহ বিন আলী সমকালকে জানান, গত শুক্রবার ছয় ঘণ্টা বিলম্বে তার বাস ছাড়ে। যশোর যেতে সময় লেগে যায় ১৪ ঘণ্টা। শুধু ফেরি পার হতেই গেছে পাঁচ ঘণ্টা।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: [email protected] (প্রিন্ট), [email protected] (অনলাইন)