অভিন্ন নীতিমালা: কতটুকু গ্রহণযোগ্য?

০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ | আপডেট: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯

মো. গোলজার হোসাইন

মো. গোলজার হোসাইন

বাংলাদেশে স্বায়ত্তশাসিত সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ এবং পদোন্নতি সম্পর্কিত অভিন্ন (সমন্বিত) নীতিমালা বাস্তবায়ন নিয়ে বেশ তোড়জোড় চলছে।

পৃথিবীর কোনো দেশে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়োগ এবং পদোন্নতি সম্পর্কিত এরকম সমন্বিত নীতিমালা আমি খুঁজে পাইনি। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান এমনকি প্রতিবেশি দেশ ভারতেও নেই। আমেরিকার নামকরা হার্ভার্ড/স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বা এমআইটির নিয়োগ/পদোন্নতির সাথে আমেরিকারই ট্রয়/ওয়াল্ডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ/পদোন্নতির কোন মিল পাবেন না। যদি মিল থাকতো তাহলে হার্ভার্ড/স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় আজকের এই নামকরা অবস্থানে আসতোনা এবং শিক্ষক/ছাত্র/উচ্চশিক্ষা/গবেষণার ওপর ভিত্তি করে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোর র‌্যাঙ্কিং হতো না।

তাহলে এই সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ণকারীদের মাথা থেকে কেন এরকম একটি উদ্ভট চিন্তা বের হলো আমার জানা নেই। স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য তাদের নিজস্ব নিয়মে শিক্ষক নিয়োগ এবং পদোন্নতি দিবেন, গবেষণা করবেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিন্ন ভিন্ন নীতি থাকবে, এটিই বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সামঞ্জন্স্যপূর্ণ এবং স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ এবং পদোন্নতি সম্পর্কিত অভিন্ন নীতিমালার ধারনাটিই অবাস্তব এবং ভিত্তিহীন যা পৃথিবীর কোথাও নেই।

প্রস্তাবিত অভিন্ন নীতিমালায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করে দিয়েছেন। এটিও আমার জানা মতে- পৃথিবীর কোথাও নেই। অনেকেই বলেন, বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নিজের ল্যাব/অফিসে/ক্লাসে সময় না দিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার দেন। কিন্তু গণহারে এ কথা বলা সমীচীন নয়। সামগ্রিকভাবে হিসাব করলে ঢাকার বা বিভাগীয় শহরের হাতে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাক্সিমাম ৫-১০% শিক্ষক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকচার দেন। তাহলে এই তত্ত্ব তো আমরা দেশের বাকি ৯০% শিক্ষকের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে পারি না। এখন বাংলাদেশের একটি আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবের উদাহরণ দেই- বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি এবং হাইজিন বিভাগে প্রায় সপ্তাহে সাত দিনই সকাল ৮ টা থেকে শুরু করে অনেক সময় রাত ১০-১২ পর্যন্ত শিক্ষক/মাস্টার্স/পিএইচডি গবেষণা সম্পর্কিত কাজ করেন। তাহলে কিভাবে আপনি বাংলাদেশের প্রায় ৪৫টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা গবেষণাকে এক কাতারে ফেলবেন? তাদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করে দিবেন? আমি হলফ করে বলতে পারি, বিশ্বের কোথাও গবেষকদের কোন  কর্মঘণ্টা নেই।

আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলি, আমি অনেকদিন ভোর ৪ টায় ল্যাবে আসি এবং গবেষণার জন্য রাতে বাসায় ফিরতে পারিনি। গবেষণাকে কখনও সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রাখার উপায় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করে দেওয়া বোকামি/নির্বুদ্ধিতা ছাড়া আর কিছুই না। কি করে এরকম চিন্তাধারা অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নকারীদের মাথায় আসলো আমার বোধগম্য নয়।

অভিন্ন নীতিমালায় নিয়োগ/প্রোমোশনের জন্য ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের জার্নালে প্রকাশনার কথা বলা হয়েছে। আমি এটিকে দৃঢ় ভাবে সাধুবাদ জানাই। একটি যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত। কিন্তু মজার বিষয় হলো যারা এই নীতমালা করেছেন তাদের অনেকেরই পিএইচডি নেই/পিএইচডি থাকলেও একটি প্রকাশনাও ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের জার্নালে নেই (সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নহে)। গবেষণার অবকাঠামো বা বরাদ্দ যত ভালো থাকবে তত ভালো গবেষণা করতে পারবেন। গবেষণা প্রবন্ধ ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের জার্নালে প্রকাশনার জন্য চার্জ দিতে  হয় যা কমপক্ষে ৫০০-১০০০ ডলার দিয়ে শুরু।

বাংলাদেশ গবেষণা বরাদ্দ খুবই অপ্রতুল এবং নগণ্য সংখ্যক শিক্ষক পেয়ে থাকেন। দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৪০০০-১৫০০০ শিক্ষকের ১০% শিক্ষক গবেষণা বরাদ্দ পাচ্ছে কি/না আমি সন্ধিহান। তাহলে দেশের ১০% শিক্ষককে গবেষণা বরাদ্দ দিয়ে ১০০% শিক্ষককে তো বলতে পারেন না, ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের জার্নালে প্রকাশনা করে প্রমোশন নিন। সুতরাং সবার আগে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার অবকাঠামো সম্পূর্ণ করে সার্বজনীন (১০০% শিক্ষককে) মিনিমাম স্ট্যান্ডার্ড গবেষণা বরাদ্দ দিয়ে, পরে গবেষণা বা ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের জার্নালে প্রকাশনা চাওয়া যেতে পারে।

অনেকেরই ধারণা, দেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইচ্ছেমত হরহামেশা নিয়োগ/প্রোমোশন দেওয়া হয়। অনেককেই বলতে শুনেছি- এই ধারণার উপর ধারণা করেই অভিন্ন নীতিমালার চিন্তা করা। এটিও সকল ক্ষেত্রে সত্য নয়। আমি নাম উল্লেখ করেই বলতে পারি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স লেভেল টপ ৭% এর বাইরে কোন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয় না। পিএইচডি এবং পিয়ার রিভিউ জার্নালে নির্দিষ্ট সংখ্যক গবেষণা প্রবন্ধ না থাকলে ১৪-১৫ বছরেও অনেকে প্রফেসর হতে পারেন না। সুতরাং, এইভাবে অভিন্ন নীতিমালা না করে প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জানতে চাওয়া যেতে পারে, আপনারা কিভাবে শিক্ষক নিয়োগ/প্রোমোশন দিচ্ছেন? আন্তর্জাতিকভাবে কিভাবে নিয়োগ/প্রোমোশন দেয়া হয়? আন্তর্জাতিক মানের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ/প্রোমোশন দেওয়ার জন্য কি কি অবকাঠামো/গবেষণা বরাদ্দ প্রয়োজন? এর জন্য প্রয়োজনে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ২০ জন গবেষক যারা বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি/পোষ্টডক করেছেন, তাদের নিয়ে একটি কমিটি করে দেন।

হার্ভার্ড/স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষক এনে কমিটিতে রাখেন। খুঁজে বের করুন, কেন বাংলাদেশ গবেষণায় পিছিয়ে আছে। কোথায় সমস্যা? বিশ্বমানের উচ্চশিক্ষা/গবেষণার জন্য কি কি প্রয়োজন, বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোন কোন অবকাঠামোর কমতি আছে। সেগুলো নিয়ে ইউজিসি/সরকারের সাথে আলোচনা করেন। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা অবকাঠামো আন্তর্জাতিক মানের করে দেন। তখনই ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টরের জার্নালে প্রকাশনাসহ  শিক্ষক নিয়োগ/প্রোমোশনের আন্তর্জাতিক মানের কথা বলতে পারবেন। তবে সেটি কখনোই সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন হতে পারে না, পারবে না।

পরিশেষে, বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে গবেষণা অবকাঠামো/বরাদ্দ সম্পূর্ণ না করে হঠাৎ করে একটি অযৌক্তিক অভিন্ন নীতিমালা যা বিশ্বের কোন দেশে নেই, সকলের উপর চাপিয়ে দেওয়ার কোন অর্থ হয় না। উপরন্তু চাপিয়ে দেয়া হবে বঙ্গবন্ধুর দেয়া 'বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসন' পরিপন্থী। বঙ্গবন্ধু খুবই বিচক্ষণ নেতা ছিলেন। উনি জেনেশুনেই বিশ্ববিদ্যালয় গুলোকে স্বায়ত্তশাসন দিয়েছেন, যেন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তাল মিলিয়ে উচ্চশিক্ষা/গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু ১৯৭৫ এ ইতিহাসের নিকৃষ্টতম হত্যকাণ্ডের পরে সামরিক শাসনসহ স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও পর্যাপ্ত গবেষণা সংক্রান্ত অবকাঠামোর অভাবে আমরা গবেষণায় পিছিয়ে আছি। বরং আজ বঙ্গবন্ধুর দেয়া স্বায়ত্তশাসন খর্ব করার পায়তারা চলছে।

যাই হোক, ইতিমধ্যে এই অভিন্ন নীতিমালার বিরুদ্ধে প্রায় সবকটি বিশ্ববিদ্যালয় অবস্থান নিয়েছে। ইউজিসি/সরকারের উচিত হবে, এখনই অভিন্ন নীতমালা স্থগিত করে উপরের ৪ নং প্যারায় উল্লেখিত পথে হাঁটা। আর যদি এই অভিন্ন নীতিমালা নিয়ে পুনরায় অগ্রসর হতে চায়, তাহলে দেশের প্রায় ৯৫-৯৯% শিক্ষক মেনে নিবেন না, সকলেই আন্দোলনে নামবেন, বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে অস্থিতিশীল পরিবেশ  তৈরি হবে, সেশনজটের সম্ভাবনা বাড়বে। যার ইমপ্যাক্ট সমগ্র দেশেও পড়তে পারে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ব্যহত হতে পারে। তখন এর দায়ভার কিন্তু অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নকারীদেরই নিতে হবে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: [email protected] (প্রিন্ট), [email protected] (অনলাইন)