আবরার হত্যা ও প্রশ্নবিদ্ধ ছাত্র রাজনীতি

সমকালীন প্রসঙ্গ

২২ অক্টোবর ২০১৯

মহিউদ্দিন খান মোহন

বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার ফাহাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডে দেশ-বিদেশে নিন্দা-প্রতিবাদের ঝড় উঠেছে। সর্বস্তরের মানুষ এ হত্যাকাণ্ডে প্রকাশ করেছে প্রচণ্ড ক্ষোভ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্বাধীন মতপ্রকাশের কারণে এ নির্মম হত্যাকাণ্ডে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে এ পৈশাচিক হত্যার যথোপযুক্ত বিচারের ব্যবস্থা তিনি করবেন, সে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন। ইতোমধ্যে আবরার হত্যায় জড়িত ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ হেফাজতে রিমান্ডে তারা একে একে স্বীকারোক্তিও দিচ্ছে। তাদের সেসব স্বীকারোক্তিতে প্রকাশিত হচ্ছে আবরারকে পিটিয়ে মারার নৃশংসতম ঘটনাচিত্র। অনিক সরকার নামে এক ছাত্রলীগ নেতা একাই আবরারকে ক্রিকেট স্টাম্প দিয়ে দেড়শ' আঘাত করেছে বলে স্বীকার করেছে। ভাবা যায়, কতটা উন্মত্ত হলে একজন সহপাঠীর শরীরে আরেকজন সহপাঠী এভাবে আঘাতের পর আঘাত করতে পারে! আমাদের সংবিধান মোতাবেক এ ধরনের অভিমত প্রকাশের অধিকার তার শতভাগ আছে। অথচ ওই মতপ্রকাশই হলো তার জন্য কাল। প্রাণ হারাতে হলো সহপাঠীদের নিষ্ঠুরতায়। আবরার দেশ ও সমাজ সম্পর্কে অন্য অনেকের মতো নির্লিপ্ত ছিল না। একজন সচেতন তরুণ হিসেবে সে মাঝেমধ্যে দেশের বিদ্যমান পরিবেশ-পরিস্থিতি সম্পর্কে ফেসবুকে লিখত। আর এতেই বুয়েট শাখা ছাত্রলীগ নেতাদের মনে সন্দেহ জাগে, সে হয়তো ইসলামী ছাত্রশিবিরের কর্মী। অথচ আবরারের মৃত্যুর পর গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, তার বাবাসহ পরিবারের সবাই বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থক। এমনকি নিহত আবরারের পড়ার টেবিলে পাওয়া গেছে বঙ্গবন্ধুর 'অসমাপ্ত আত্মজীবনী' বইটি।

আবরারের হত্যাকাণ্ডের পর তার অপরাপর সহপাঠীরা চুপ করে বসে থাকেনি। হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচার দাবিতে তারা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে মাঠে নেমে এসেছে। তাদের সে শান্তিপূর্ণ সর্বাত্মক আন্দোলনের কাছে শেষ পর্যন্ত মাথা নোয়াতে বাধ্য হয়েছে বুয়েট প্রশাসন। যে ভাইস চ্যান্সেলর আবরারের লাশ দেখতে আসেননি, তার জানাজায় শরিক হননি, সেই ভিসি অবশেষে তার কৃতকর্মের জন্য মাফ চেয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে। একই সঙ্গে তাদের উত্থাপিত সব দাবি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিতেও বাধ্য হয়েছেন। গত ১২ অক্টোবর বুয়েটের এক বিজ্ঞপ্তিতে শিক্ষার্থীদের যেসব দাবি মেনে নেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে বুয়েট প্রশাসন, সেগুলো হলো- এক. আবরার হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত সবাইকে সাময়িক বহিস্কার করা হয়েছে। মামলার তদন্ত শেষে চার্জশিটে যাদের নাম আসবে, তাদের স্থায়ীভাবে বহিস্কার করা হবে; দুই. এ হত্যা মামলার সব খরচ বুয়েট কর্তৃপক্ষ বহন করবে এবং তার পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দিতে বুয়েট কর্তৃপক্ষ বাধ্য থাকবে; তিন. বুয়েটে সব সাংগঠনিক-রাজনৈতিক সংগঠন এবং এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা; চার. র‌্যাগের নামে নির্যাতনের ঘটনা সংক্রান্ত অভিযোগ প্রকাশের জন্য একটি ওয়েব পোর্টাল তৈরি করা হবে; পাঁচ. সব হলের দুই পাশে প্রতিটি ফ্লোরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এসব প্রতিশ্রুতি ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ হয়তো কিছুটা প্রশমিত করবে। তবে প্রশ্নটা থেকেই যাবে যে, আজ বুয়েট প্রশাসন যেসব কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলছে, আগে কেন তারা এদিকটা নজরে আনেনি? সংবাদমাধ্যমের কাছে বুয়েট শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেছে যে, বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রতিটি ছাত্র হলে একটি করে টর্চার সেল আছে, যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ছাত্রলীগ। এসব কথা বুয়েট প্রশাসনের অজানা ছিল না। কিন্তু এক অজানা কারণে তারা একরকম চোখ বন্ধ করে ছিলেন। কারণ, বছরখানেক আগে দাইয়ান নাফিস প্রধান নামে আরও একজন ছাত্র একই ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছিল। সমকালের ১১ অক্টোবর সংখ্যায় সেই রোমহর্ষক কাহিনি তুলে ধরা হয়েছে। দাইয়ানের ঘটনার পর বুয়েট কর্তৃপক্ষের উচিত ছিল, এ ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া। কিন্তু তারা রা-শব্দটি করেননি? আবরারের চিরবিদায় ঘটল পৃথিবী থেকে আর তাকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ১৯ জনের শিক্ষাজীবনও ধ্বংস হয়ে গেল। এই মেধাবী মুখগুলোর জীবন ধ্বংসের দায় বুয়েট প্রশাসন এড়াবে কীভাবে?

আবরার নিহত হওয়ার পর ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে। ইতোমধ্যে বুয়েট প্রশাসন ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করেছে ক্যাম্পাসে। সাধারণ নাগরিকদের দাবি, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই এই হন্তারক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হোক। তবে দেশের ছাত্র সংগঠনগুলো এর বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, এ ক্ষেত্রে ছাত্রলীগ-ছাত্রদলের অবস্থান এক ও অভিন্ন। অন্যদিকে রাজনীতিসচেতন ব্যক্তিরা ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবিকে অবিবেচনাপ্রসূত বলে মনে করছেন। তারা এ ধরনের প্রস্তাবকে 'মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলা'র সঙ্গে তুলনা করছেন। তারা মনে করেন, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ নয়, বরং ক্লিনজিং অপারেশনের মাধ্যমে একে পরিশুদ্ধ করার ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। গ্যাংরিনের আক্রমণ থেকে পুরো দেহকে রক্ষার জন্য যেমন অস্ত্রোপচার করে আক্রান্ত কোনো অঙ্গ বা তার অংশবিশেষ বাদ দিতে হয়, তেমনি আমাদের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র রাজনীতিকে অপমৃত্যুর হাত থেকে বাঁচাতে একটি বড় ধরনের অপারেশন প্রয়োজন। এ বিষয়ে গত ১৩ অক্টোবর সমকালে প্রকাশিত দেশের চারজন বিশিষ্ট নাগরিকের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, 'ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয়, কলুষমুক্ত করতে হবে। নিয়মিত নির্বাচন করতে হবে বিশ্ববিদ্যালয় এবং হল সংসদে।' আর সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, 'ছাত্র রাজনীতির জন্য আবরার হত্যা হয়নি, টর্চার সেল হয়নি। হয়েছে ফ্যাসিস্ট দখলদারিত্বের কারণে।' সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেছেন, 'বর্তমানে যে ছাত্র রাজনীতি চলছে তা অসুস্থ। রোগ চিহ্নিত করে সঠিক ব্যবস্থা নিতে হবে।' অন্যদিকে বিশিষ্ট আইনজীবী ড. শাহ্‌দীন মালিক বলেছেন, 'শিক্ষার্থীদের অপরাধ থেকে নিবৃত্ত রাখতে আপাতত লেজুড়বৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ রাখাই শ্রেয়।' একই দিন অপর একটি দৈনিক এ বিষয়ে তুলে ধরেছে বিশিষ্ট নাগরিকদের অভিমত। পত্রিকাটি লিখেছে- বিশ্নেষকরা বলছেন, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ নয়, বরং তা সব মত ও দলের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে গণতন্ত্রের জন্য তা আরও বেশি সহায়ক হবে। এ বিষয়ে সাবেক মন্ত্রী ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন পত্রিকাটিকে বলেছেন, 'প্রশাসন যদি প্রশ্রয় দেয়, তাহলে ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে সমাধান হবে না, নিপীড়ন বন্ধ হবে না।' ডাকসুর সাবেক ভিপি ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আমান উল্লাহ আমানের অভিমত হলো, ৫২, ৬২, ৬৯সহ সব আন্দোলন ছাত্র নেতৃত্বের মধ্য দিয়েই, ছাত্রদের রাজপথে বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণেই সফল হয়েছে। সরকার সমর্থিত ছাত্র সংগঠন ছাত্র রাজনীতির নামে অপরাজনীতি করছে। গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে ভূলুণ্ঠিত করছে। তার মতে, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করে এর কোনো সমাধান হবে না। যারা ছাত্র রাজনীতিকে কলুষিত করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী মনে করেন, সত্যিকার অর্থে যেটা ছাত্র রাজনীতি, তা নিষিদ্ধ করা গণতন্ত্রের সংস্কৃতির বিরুদ্ধে। কেননা, এটা ভবিষ্যৎ নেতা তৈরির কারখানা। বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যেটা হচ্ছে, তা ছাত্র রাজনীতি নয়। বিশিষ্টজনের অভিমত থেকে এটা স্পষ্ট যে, একটি ঘটনা বা কোনো একটি ছাত্র সংগঠনের কারণে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ বা বন্ধ করে দেওয়া ইতিবাচক সিদ্ধান্ত হতে পারে না। বরং কারণ চিহ্নিত করে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

প্রশ্নটি সবার মনেই উঠেছে- আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র রাজনীতিতে এমন অবক্ষয় সৃষ্টি হলো কোত্থেকে? কারা ছাত্র সংগঠনগুলোকে অপরাধকর্মে প্রবৃত্ত হতে আশকারা দিচ্ছে? এ প্রশ্নে সবার আঙুল রাজনৈতিক নেতৃত্বের দিকেই যে উঠবে, তাতে সন্দেহ নেই। রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি অংশ নিজেদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য ছাত্র সংগঠনগুলোকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে চলেছেন। তারা ছাত্রনেতা বা কর্মীদের আদর্শিক শিক্ষা দিতে পারছেন না। দেবেনই-বা কীভাবে? যেখানে তাদের অবস্থানই আদর্শ থেকে যোজন যোজন দূরে, সেখানে কর্মীদের আদর্শের পাঠ তারা কীভাবে দেবেন? গত ৯ অক্টোবরের সমকালে বিশেষ লেখায় সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল মন্তব্য করেছেন, 'এখনও পর্যন্ত এসব অপরাধের সঙ্গে যুক্ত যাদের নাম, তারা সবাই কিন্তু দাবি করে, তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক। আবরার হত্যাকাণ্ডের পর প্রশ্ন জাগে, বঙ্গবন্ধুর কোন আদর্শের পরিচয় রাখছে অপরাধীরা জাতির কাছে?' সুলতানা কামালের প্রশ্নের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। কেননা বঙ্গবন্ধু তাঁর সারাজীবনের রাজনীতি দিয়ে যে আদর্শের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তার মর্যাদা কি তাঁর কথিত এ অনুসারীরা রক্ষা করতে পারছে? বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ছাত্র রাজনীতিকে কলুষমুক্ত করার কথা বলেছেন। কিন্তু কীভাবে, কাদের দ্বারা? যারা নিজেরাই নিমজ্জিত দুর্গন্ধময় পঙ্কে, তারা কীভাবে ছাত্রদের করবে কলুষমুক্ত। অনেকেই মনে করেন, এ জন্য দরকার একটি সামাজিক আন্দোলন; যেখানে শামিল হতে হবে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন প্রতিটি মানুষকে। সমাজ, রাষ্ট্র সবখান থেকে ছুড়ে ফেলে দিতে হবে দুর্নীতিবাজ ও সমাজবিরোধীদের।

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্নেষক


© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)