মানসিক উদ্বেগ মোকাবেলা করতে হলে

মানসিক স্বাস্থ্য দিবস

১০ অক্টোবর ২০১৯

ডা. মোহিত কামাল

উদ্বেগের কারণে মনে যাতনা বাড়ে। সংকট বাড়ে। জীবনযুদ্ধে পিছিয়ে যেতে থাকে
মানুষ। অথচ এ বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান আলোকিত করতে পারে ভুক্তভোগীকে; উদ্বেগ
মোকাবেলায় শক্তি জোগাতে পারে তার মনে। প্রয়োজন সচেতনতার, মানসিক
স্বাস্থ্যের পরিচর্যা। আর তাই এবার বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের ডাক
এসেছে মনের স্বাস্থ্যের উন্নয়নের প্রতি নজর দেওয়ার। বিষণ্ণতা ও উদ্বেগ
মোকাবেলা করে আত্মহত্যার মতো জটিল সংকট থেকে মানুষকে বাঁচানোর প্রতি মানবিক
হওয়ার। কিন্তু কখনও কখনও আমরা তা মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হই। ব্যর্থ হলে
চলবে না। বিষণ্ণতাকে যেমন মোকাবেলা করতে হবে, উদ্বেগকেও তেমনি ছাড় দেওয়া
যাবে না। মনে রাখতে হবে, উদ্বেগ স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্যের
বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে উদ্বেগের কারণেও। উদ্বেগ নিয়ন্ত্রণ করে মানসিকভাবে
ভালো থাকার জন্য দুটি বিষয় জানা বিশেষ প্রয়োজন :প্রথম কাজ হচ্ছে, চিন্তনের
ত্রুটি এবং এড়িয়ে চলা নীতি বা অ্যাভয়ড্যান্স বিহেভিয়র ধরতে পারা। চিন্তন
হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া বা স্তম্ভ। চিন্তনের
ত্রুটি বিষণ্ণতা কিংবা উদ্বেগ তৈরি করে রাখতে পারে মনে। মনের স্বাস্থ্যে ধস
নামিয়ে দিতে পারে। এমন কয়েকটি উদাহরণ তুলে ধরা হলো :'আমি পরিস্থিতি
মোকাবেলা করতে পারছি না- আমি ব্যর্থ। আমি নিশ্চিত যে সবাই ভাবছে, আমি একটা
স্টুপিড। অন্যেরা কোনো কাজ করতে আমার মতো এত সমস্যা ভোগ করে না- আমাকে দিয়ে
কিছুই হবে না। মানুষ কখনোই কাঁদে না। 'বাস তাড়াতাড়ি এসে না পৌঁছলে আমি
গোলমাল করব, আমার হার্ট অ্যাটাক  হয়ে যাবে।'


নেতিবাচক অযৌক্তিক চিন্তা এবং অযৌক্তিক বিশ্বাস হচ্ছে চিন্তনের ত্রুটির
দুটি ধরন। এ ত্রুটি মনে অযৌক্তিক ভয় জাগিয়ে রেখে ক্ষতি করে দিতে পারে
কর্মদক্ষতার। মনের অবস্থা যাতনাময় করে তুলতে পারে। কারণ এসব চিন্তা ভুল ও
অবাস্তব। ভুলে ভরা চিন্তা আমাদের আকাঙ্ক্ষা বা চাহিদাকে অবাস্তব অবস্থানে
টেনে নিয়ে যায়, বাড়িয়ে দেয় অযৌক্তিক চাহিদার চাপ। ফলে সবসময় মনের মধ্যে
গোপন নৈরাশ্য কাজ করে। এই নিবন্ধে আমরা কেবল স্থায়ী উদ্বেগ মোকাবেলার কৌশল
সম্বন্ধে আলোচনা করব। মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির জন্য বিষয়টি
গুরুত্বপূর্ণ।


আসুন প্রিয় পাঠক, দোলা নামক এক তরুণীর চলার পথে নানা দিকে একবার তাকিয়ে
দেখি আমরা। দোলা জীবনের সব ক্ষেত্রে সফল। ডিজাইনার হিসেবে জনপ্রিয়তার
তুঙ্গে অবস্থান করছেন তিনি। প্রফেশনালি সাকসেসফুল। ভালো স্বামী পেয়েছেন।
শ্বশুরবাড়ির লোকজন ভালো। তারা দোলাকে কখনোই 'বউ' সম্বোধন করেন না। বলেন
'মেয়ে'। চার বছর হলো বিয়ে হয়েছে তার। এই চার বছরে তিনি একদিন শ্বশুরবাড়ি তো
পরদিন থাকছেন বাবার বাড়ি। যখন যা চেয়েছেন, তা-ই পেয়েছেন।
অর্থ-বিত্ত-সম্মান কোনো কিছুরই অভাব নেই। দোলার মনে চিন্তা আসে : 'কতটা
সুখী তিনি! ভবিষ্যতে এই সুখ থাকবে তো। কোনো কষ্ট যদি আসে জীবনে! ওরে বাবা!
মোটেই তা সইতে পারব না। কোনো কষ্টই আমি সইতে পারব না।'



বর্তমানে
সুখী দোলার মাথায় ভর করছে অগ্রিম দুশ্চিন্তা, 'যদি কষ্ট আসে! কী হবে! না,
তার চেয়ে মরে যাওয়াই ভালো।' অবাস্তব কষ্টের দুশ্চিন্তায় ডুবে থাকছে দোলা।
ফলে মেজাজ বিগড়ে থাকে তার। হুটহাট চড়া মেজাজ দেখান। অনিয়ন্ত্রিত আবেগের
বিস্টেম্ফারণ ঘটে। এত সুখে থেকেও কি তিনি সুখী? অযৌক্তিক অগ্রিম কষ্টের কথা
ভেবে ভেবে কি তিনি বর্তমান মুহূর্তটাকে যাতনাময় করে তুলছেন না? হ্যাঁ,
উদ্বেগের উপসর্গ সবসময় চেপে রাখে দোলাকে; যদিও আপাতদৃষ্টিতে তার সফলতা সবাই
দেখছে। অথচ আগাম অযৌক্তিক চিন্তা তার মনকে শঙ্কাকুল করে রাখে। ভবিষ্যতে কী
ঘটবে, অগ্রিম ভাবার কি কোনো প্রয়োজন আছে? নেই।


মানুষের জীবনে ভবিষ্যতে অনেক কিছু ঘটতে পারে। যা ঘটবে তাকে মোকাবেলা করার
শক্তি অর্জন করে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, আরও আশাবাদী হতে হবে। কিন্তু না।
দোলার আশার মধ্যেও কোনো ফাঁক নেই। আশাবাদী তিনি। কিন্তু 'যদি কষ্ট আসে,
কীভাবে সইব'- এই চিন্তা একেবারেই নেতিবাচক। একেবারেই অবাস্তব, অযৌক্তিক।
এভাবে অযৌক্তিক অগ্রিম দুশ্চিন্তা ও ভুল বিশ্বাস মানুষের মনে সার্বক্ষণিক
উদ্বেগের উপসর্গ জাগিয়ে রাখতে পারে। আমরা কী ভাবছি, কী চিন্তা করছি, তার
ওপর নির্ভর করে উদ্বেগ। যেমনটি দেখলাম দোলার মধ্যে।


দোলাদের কী করা উচিত? নেতিবাচক চিন্তা শনাক্ত করে তা ইতিবাচক করার কৌশল
রপ্ত করা উচিত। অবাস্তব-অযৌক্তিক চিন্তাভাবনা ও ধারণাকে তাদের চ্যালেঞ্জ
করা উচিত। বাস্তবতার আলোকে এসব ধারণা মেপে দেখা উচিত। নেতিবাচক চিন্তাটা কি
প্রকৃতই বাস্তব? এসব প্রশ্ন জাগানো উচিত মনে। মনে রাখতে হবে, নেতিবাচক
চিন্তা অথবা ভুল চিন্তা করা আনন্দময় সফল জীবনের পথে বড় বাধা। এ ধরনের
চিন্তা মানুষকে ভুল পথে টেনে নেয়। জীবনকে ব্যর্থতায় ভরিয়ে তোলে। মানসিক
স্বাস্থ্যের সর্বনাশ করে ছাড়ে। সুতরাং দোলার মতো চিন্তা থেকে সবাই সাবধান।
এড়িয়ে চলা নীতিকে বলে অ্যাভয়ড্যান্স বিহেভিয়র।


একা বদ্ধ রুমে থাকতে ভয় পায় নীলাভ। একা থাকলে অজানা আতঙ্ক চেপে ধরে তাকে।
তাই একা থাকতে পারে না সে। সবসময় কাউকে না কাউকে তার সঙ্গে থাকতে হয়।
তারুণ্যে ভরপুর দুরন্ত নীলাভের জীবনে আর কোনো সমস্যা নেই। তবে সবসময় একজন
সঙ্গীর চিন্তায় বিভোর থাকে সে। কখনোই একা থাকে না বদ্ধঘরে। একা থাকা এড়িয়ে
চলে। এটিই অ্যাভয়ড্যান্স বিহেভিয়র। এ ক্ষেত্রে সমস্যাটি দূর করার জন্য একা
থাকার অভ্যাস গড়ে তুলে তার ভয়ের উৎসটি সামাল দিতে হবে। তবেই তার উদ্বেগের
উপসর্গ কমে আসবে।


যে পরিস্থিতি মনে জটিল স্ট্রেস চাপিয়ে দেয়, সেই পরিস্থিতিতে এলে তাৎক্ষণিক
কী কী উপসর্গ ভোগ করে রোগী? কোন ধরনের চিন্তায় আক্রান্ত হয় তা নিচের তালিকা
অনুযায়ী মেপে দেখা যেতে পারে:'উদ্বেগের মাত্রা বেড়ে সংকটজনক পরিস্থিতি
তৈরি করে। উদ্বেগ একই রকম থাকে। প্রাথমিক অবস্থায় অ্যাংজাইটি তীব্রতর থাকে,
ধীরে ধীরে তা কমে আসে।' অধিকাংশ রোগী প্রথম ফলটি ভোগ করে। কিন্তু তৃতীয়
ফলটিই অধিকাংশ ক্ষেত্রে সঠিক।


গবেষণায় দেখা গেছে, তীব্র উপসর্গ দ্রুতই কমে আসে। কারণ উদ্বেগের তীব্রতা
দীর্ঘ সময় বজায় থাকতে পারে না। এখানে উদ্বেগের উচ্চমাত্রা বা তীব্রতার কথা
বলা হচ্ছে। মনে রাখতে হবে বিষয়টি। এই তথ্য 'দুটি সত্য' আমাদের সামনে তুলে
ধরছে। 'সত্য দুটি' উদ্বেগের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ওষুধরূপে প্রয়োগ করে
সমস্যা জয় সহজ করা যেতে পারে। ভয় দূর করতে এর প্রয়োগ ছাড়া বিকল্প সহজ পথ
পাওয়া কঠিন।


মূল সত্য হলো- ১. ভয়-জাগানিয়া প্রেক্ষাপট এড়িয়ে চললে সেসব প্রেক্ষাপট
মোকাবেলা দিন দিন জটিল হতে থাকবে। মানসিক স্বাস্থ্য ধসে যাবে, ভয় স্থায়ী
হয়ে যাবে। জীবনযাপন কঠিন থেকে কঠিনতর হতে থাকবে; ২. ভয়ের স্থান দ্রুত ত্যাগ
করলে কখনোই নিজের মন থেকে উদ্বেগের উপসর্গ বিলীন হবে না। বরং
অ্যাভয়ড্যান্স বিহেভিয়রই ভয় জাগিয়ে রাখার ডেঞ্জার সিগন্যাল হিসেবে কাজ
করবে। চিকিৎসায় প্রধান শর্ত অ্যাংজাইটির তীব্রতর উপসর্গ কমে আসা পর্যন্ত
উদ্বেগ-জাগানিয়া অবস্থা-অবস্থান থেকে পালিয়ে আসা চলবে না।


বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের (২০১৯) মূল কথা- 'মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন
ও আত্মহত্যা প্রতিরোধ'। এ জন্য প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা
বাড়ানো, অজ্ঞতা ও ভুল ধারণা দূর করা। কুসংস্কারের বাধা অতিক্রম করা। উদ্বেগ
দূর করা, আত্মহত্যাপ্রবণতা প্রতিরোধ করা। জীবনমান উন্নত করা।


কথাসাহিত্যিক; পরিচালক, জাতীয়
মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট
[email protected]



© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: [email protected] (প্রিন্ট), [email protected] (অনলাইন)