জয়েনিং ফোর্সেস-সমকাল গোলটেবিল আলোচনা

একটি শিশুও যেন সহিংসতার শিকার না হয়

১৬ নভেম্বর ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

শনিবার রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে জয়েনিং ফোর্সেস-সমকাল আয়োজিত গোলটেবিল আলোচনায় অতিথিদের সঙ্গে আয়োজকরা-সমকাল

দেশে শিশুমৃত্যু, পোলিও, শিক্ষা ও বাল্যবিয়ের নানা সূচকে অগ্রগতি হয়েছে। তবু ঘরে-বাইরে শিশুর ওপর সহিংসতা থেমে নেই। বাল্যবিয়ের পাশাপাশি নির্মম হত্যা-নির্যাতনের শিকারও হচ্ছে অনেক শিশু। শিশুর জন্য বাসযোগ্য দেশ গড়তে হলে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে। আর একটি শিশুও যেন সহিংসতার শিকার না হয়।

শনিবার বিকেলে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৩০ বছর উদ্‌যাপন উপলক্ষে এ বৈঠকের আয়োজন করে দৈনিক সমকাল এবং শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করছে এমন ছয়টি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ জয়েনিং ফোর্সেস। সংস্থাগুলো হলো- এডুকো, প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল, সেভ দ্য চিলড্রেন, এসওএস চিলড্রেনস ভিলেজ বাংলাদেশ, তেরে দাস হোমস এবং ওয়ার্ল্ড ভিশন।

বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা। সঞ্চালনা করেন সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফি।

বৈঠকে শিশু অধিকার ও তাদের বর্তমান প্রেক্ষাপটের নানা চিত্র তুলে ধরেন বক্তারা। আলোচনায় যেমন শিশু অধিকার রক্ষায় অনেক অর্জনের কথা উঠে এসেছে, তেমনি আলোচিত হয়েছে ভয়াবহ কিছু চিত্রও। গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরের বরাতে বলা হয়, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দেশে ৬৯৭ শিশু ধর্ষণ ও ২৮৫ শিশু হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। ৫৯ শতাংশ মেয়ে ১৮ বছরের এবং ১৮ শতাংশকে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় ১৫ বছরের আগেই।

ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেন, জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ ঘোষণার ১৫ বছর আগেই বঙ্গবন্ধু শিশু অধিকার আইন করেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশুর জীবনমান উন্নয়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। মাতৃমৃত্যু কমাতে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিসহ নানা খাতে সাফল্যের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী একাধিক আন্তর্জাতিক পুরস্কারও পেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে বাল্যবিয়ের হার শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে। পাশাপাশি ২০৩০ সালের মধ্যে যেন দেশে শিশুর প্রতি সহিংসতা সম্পূর্ণ বন্ধ করা যায়, সে লক্ষ্যেও নানারকম উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরের বছরগুলোর বিভিন্ন পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ২০০৭ সালে ১৮ বছরের নিচে বাল্যবিয়ের হার ছিল ৭৪ শতাংশ, ২০১৭ সালে সেটি কমে হয়েছে ৪৭ শতাংশ। ২০০৫ সালে ১৫ বছরের নিচে বাল্যবিয়ের হার ছিল ৩২ শতাংশ, ২০১৭ সালে এটি ছিল মাত্র ১০ দশমিক ৭ শতাংশ। ১২ বছরের ব্যবধানে এ ক্ষেত্রে সাফল্যই সরকারের লক্ষ্যপূরণের প্রেরণা।

পারিবারিক সহিংসতার বিষয়ে তিনি বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, পারিবারিক সহিংসতা বেড়েছে। বাবা অথবা মা তার সন্তানকে মেরে ফেলছে। আবার সন্তানও তার বাবা-মাকে মেরে ফেলছে। নৈতিক বিপর্যয় ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। সরকারের একার পক্ষে এটি নিরোধ করা সম্ভব না। সমন্বিত উদ্যোগে মিলেমিশে কাজ করতে হবে।

মুস্তাফিজ শফি বলেন, গণমাধ্যমে শিশু নির্যাতনের একটি খবরও যেন প্রকাশ করতে না হয়। সবাই মিলে অংশগ্রহণের মাধ্যমে আমরা সমাজকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাব, যেখানে একটি শিশুও নির্যাতনের শিকার হবে না। আমাদের চাওয়া একটাই- শিশু তার অধিকার পাবে। বাসযোগ্য দেশ ও সমাজ পাবে। সরকার, আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সংস্থা, গণমাধ্যম সবাই মিলে সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করলে সেটি সম্ভব।

সাবেক সংসদ সদস্য মাহজাবিন খালেদ বলেন, শিশুদের জন্য আলাদা করে বাজেট করলেই হবে না, তাদের জন্য সব রকমের চ্যালেঞ্জ বাস্তবায়ন করা জরুরি। দেশ যেমন উন্নত হচ্ছে, সে সঙ্গে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জও তৈরি হচ্ছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ চাই।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আকরাম-আল-হোসেন বলেন, দেশে ৬৫ হাজার ৬২৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে; ২০০৫ সালে ছিল ৩৭ হাজার ৬৭২টি। দুই হাজার জনবসতি এবং দেড় কিলোমিটারের মধ্যে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকলেই সরকার সেখানে স্কুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়। দেশে ঝরে পড়ার হারও উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০০৮ সালে ৩৯ দশমিক ৩ শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়ত, এখন তা ১৮ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে।

তিনি আরও বলেন, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় রোধে সরকার আন্তরিক। সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিতে নানামুখী উদ্যোগ রয়েছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর এলাকায় স্ব-স্ব মাতৃভাষায় পাঠদান ও পাঠ্যপুস্তকের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা। এ জন্য ৬৫ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়েছে।

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব (কার্যক্রম অধিশাখা) খাদিজা নাজনীন বলেন, সমাজে যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে, অবহেলিত ও বঞ্চিত, তাদের সবাইকে নিয়ে সরকার কাজ করছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় শেখ রাসেল শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র গড়ে তোলা হয়েছে। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য রয়েছে স্কুল। প্রায় এক লাখ এতিম শিশুকে নিয়মিত ভাতা প্রদান করা হচ্ছে। বেদে ও হিজড়া সম্প্রদায়ের শিশুদের জন্যেও রয়েছে নানারকম সুবিধা। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা, আমরা এমন একটি দেশ গড়তে চাই যেখানে শিশুরা উন্নত জীবন পাবে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের উপ-পরিচালক ও শিশু অধিকার বিষয়ক কমিটির সদস্য সচিব রবিউল ইসলাম বলেন, শিশুশ্রম থেকে মুক্ত করে শিশুদের শিক্ষার দিকে ধাবিত করা হলেও শিক্ষাজীবন শেষে তাদের চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকে গেছে। শিক্ষাব্যবস্থা ও সিলেবাসে ঘনঘন পরিবর্তন এলে শিশুদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। শিশুদের প্রতি সহিংসতা রোধে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।

অস্ট্রেলীয় হাইকমিশনের ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন প্রোগ্রাম ম্যানেজার এম আই নাহিল বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে অস্ট্রেলিয়া শিশুদের শিক্ষা ও সামগ্রিক দিকগুলো গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। শিশুদের ওপর শারীরিক শাস্তির বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা নাজমুল হুদা শামীম বলেন, শিশু, নারী ও প্রতিবন্ধীবান্ধব নগর গড়তে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তবে দেশে কর্মজীবী বাবা-মা বাড়ায় শিশুদের বেড়ে ওঠার নানা দিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে। শিশুদের জন্য ডে কেয়ার সেন্টার নীতিমালা খুবই দরকার।

ইউনিসেফের সোশ্যাল পলিসি স্পেশালিস্ট আজিজুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ হলো জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদে সর্বপ্রথম সই করা ২২টি দেশের একটি। কিন্তু সে অনুযায়ী এ দেশে শিশুদের সহিংসতা প্রতিরোধে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। শিশু অধিকারে একজন ন্যায়পাল দরকার।

ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আফসান চৌধুরী বলেন, তিন দশক ধরে শিশুদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি জনগণ না নড়লে উন্নয়ন হয় না। শিশুদের যৌন নির্যাতন নিয়ে কাজ করতে গেলেও প্রবল বাধা আসে। আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও অনেক অর্জনও রয়েছে। সমন্বয়ের বিষয়েও কিছু ঘাটতি রয়ে গেছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্ক পিয়ার্স বলেন, বাল্যবিয়ে বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা সহজ হবে।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ডেপুটি কান্ট্রি ডিরেক্টর লরা ক্রাডিয়া বলেন, শিশু অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের নানা অর্জন রয়েছে সত্যি, কিন্তু বাজেটসহ নানা বিষয়ে শিশুদের বিষয়ে আরও গভীরভাবে ভাবতে হবে। কারণ, চলতি বছরের আট মাসে শিশুদের ওপর সহিংসতার যে চিত্র উঠে এসেছে, সেটি সত্যিই উদ্বেগজনক।

টিডিএইচ লুসানের কান্ট্রি ডিরেক্টর ক্রিস্টাইন জিইথেন ইপ্পেসেন বলেন, শিশুদের নানা উন্নতি ও অগ্রগতি থমকে দেয় বাল্যবিয়ে। এ বিষয়ে সরকারের আরও জোরালো ভূমিকা চাই।

টিডিএইচ ইতালির কান্ট্রি ডিরেক্টর ভ্যালেন্টিনা লুচেসি বলেন, বাল্যবিয়ের শিকার মেয়েরা দ্রুতই নানামুখী চাপের শিকার হয়। এটা তার জীবনকে এলোমেলো করে দিতে পারে। উত্তরবঙ্গে এ ধরনের বহু ঘটনা রয়েছে। এখনই সময় বাল্যবিয়ে বন্ধে ফলপ্রসূ উদ্যোগ গ্রহণ করা।

টিডিএস নেদারল্যান্ডসের কান্ট্রি ডিরেক্টর মাহমুদুল কবির বলেন, শিশুশ্রম বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে। শিশুদের ওপর চলমান সহিংসতা বন্ধে নীতিমালায় সংশোধন এনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

ওয়ার্ল্ড ভিশনের প্রোগ্রাম ডিরেক্টর চন্দন ডেজ গোমেজ বলেন, দেশের নানা স্তরে শিশুদের জন্য একাডেমি ও নানা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে শিশুদের অবস্থান কোথায়? শিশুদের তুলে আনতে হবে। তাদের মতামত গ্রহণ করতে হবে।

এডুকোর কান্ট্রি ডিরেক্টর জনী এম সরকার বলেন, শিশুদের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। উপকূল, হাওর, পার্বত্য এলাকার শিশুদের উন্নয়নে বিশেষভাবে মনোযোগ দিতে হবে।

এসওএস চিলড্রেন ভিলেজ ইন্টারন্যাশনাল ইন বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডিরেক্টর গোলাম আহমেদ ইসহাক বলেন, অনেক শিশু জন্মের পর থেকেই মা-বাবার স্নেহবঞ্চিত। শিশুর সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য একটি পরিবার এবং মা-বাবা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারহীন শিশুদের বিকল্প উপায়ে মায়ের স্নেহে বেড়ে তুলতে তারা কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।

এডুকোর অ্যাডভাইজার সৈয়দ মোতলাবুর রশীদ বলেন, এসডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য মনিটরিংয়ের মাধ্যমে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সম্ভব। ছোট ছোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে সহিংসতা শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: [email protected] (প্রিন্ট), [email protected] (অনলাইন)