হরিশংকরের বাড়ি

গল্প

০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

পলাশ মজুমদার

কোথায় যাবেন আপনি?

আচমকা এমন প্রশ্ন শুনে বিস্টম্ফারিত চোখে ফিরে তাকাই। আমার ডান পাশের সিটে বসা একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক প্রশ্ন করছেন আমাকে। 

বয়স হলেও বেশ শক্তপোক্ত শরীর লোকটির। চুলগুলো শুধু সাদা। একেবারে ধবধবে। সামনের পাটির দাঁত নেই বললেই চলে। একটি চোখের দৃষ্টিও ঝাপসা মনে হলো। তবে চেহারার আভিজাত্য যে কারও চোখে অনায়াসে ধরা পড়ে। 

কিছুটা অপ্রতিভ হয়ে উত্তর দিই, প্রথমে কলকাতা। তারপর চেন্নাই। 

বেড়াতে, না চিকিৎসার জন্য?

বেড়াতে। কয়েকজন বন্ধু মিলে যাচ্ছি। মাসখানেক ধরে কেবল দক্ষিণ ভারতে ঘুরব।

বাহ্‌! তো মহাশয়ের কী করা হয়?

কলেজে পড়াই।

তার মানে, আপনি একজন শিক্ষক। 

আমার সম্মতিসূচক ভাব দেখে এবার বলেন, কিছু মনে না করলে আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে পারি।

অবশ্যই। বলুন কী জানতে চান?

সব সময় কি এভাবে ঘুরে বেড়ান? 

সুযোগ পেলে ঘুরতে বের হয়ে যাই। ধরুন, বছরে দুবার। সত্যি বলতে কি, ঘোরাঘুরি আমার নেশা। কাছে-দূরে যে কোনো জায়গা হলেই হলো।

ভালো। খুব ভালো লাগল শুনে। কত কিছু জানা যায় দেশে-বিদেশে বেড়ালে! না হয় মানুষ অজ্ঞই থেকে যায়। আমার এ অভ্যেসটা কখনও ছিল না। থাকলে বোধ হয় ভালো হতো! কিছুই তো দেখা হলো না। অথচ দেখুন, ধন-দৌলতের পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে জীবন শেষ হয়ে গেল। এখন সেই কষ্টার্জিত সম্পদের ওপর শকুনের দৃষ্টি। আজ চোখ বুজলে কাল পঞ্চভূতে সব লুটেপুটে নেবে। শরিকদের মধ্যে বিবাদ উঠবে চরমে; কার থেকে কে বেশি নেবে- শুরু হবে এই প্রতিযোগিতা। শেষপ্রান্তে এসে মনে হচ্ছে, বৃথা দিন পার করলাম! কিছু করিনি যেন জীবনে! 

বেশ করুণ শোনায় সহযাত্রী বৃদ্ধের কথা। 

লোকটির কথার টানে ফেনীর ভাষার আঞ্চলিকতা স্পষ্ট। বুঝতে পারি যে আমাদের ওদিকের লোক; তা টের পেতে না দিয়ে সৌজন্যবশত আমিও প্রশ্ন করি, আপনি যাচ্ছেন কোথায়?

ভেলোরে। 

কেন?

চিকিৎসার জন্য। বয়স হয়েছে- দেখে নিশ্চয় বুঝতে পারছেন। শরীরে বাসা বেঁধেছে নানা রকম রোগ। একটার চিকিৎসা করলে আরেকটা প্রবল হয়ে ওঠে। আর পারি না। মনে হয়, আয়ু আর বেশিদিন নেই; যম যে কোনোদিন দুয়ারে কড়া নাড়বে। তবে মন চায় না পৃথিবী ছেড়ে যেতে। জীবনের প্রতি আমার বড্ড মায়া।

লোকটার কথা কেমন যেন দার্শনিকের মতো শোনায়। আচ্ছা, তিনি কি রবীন্দ্রনাথ পড়েছেন? দেখে তো তা মনে হয় না। অথচ ভাবনা প্রায় আমার মতো। তবে কি সব ধরনের মানুষের ভেতরে কিছু দার্শনিকতা থাকে। অকস্মাৎ তাকে আপনজন মনে হলো। আমি এবার প্রশ্ন করি, আপনি কি একা যাচ্ছেন?

না। এই বয়সে কি গিন্নি একা ছাড়ে? সঙ্গে আমার ছোট ছেলে সুজয় আছে।  

কী করে সুজয়?

আমাদের স্বর্ণের বিজনেস। দশ বছর ধরে আমি অবসর-জীবন যাপন করছি। এখন সবকিছু সুজয় আর তার দাদারা মিলে দেখাশোনা করে।

লোকটাকে বাচাল মনে হলেও আমার কথা বলতে খারাপ লাগছে না। আমার ধারণা, প্রতিটি বৃদ্ধ এক একজন কালের সাক্ষী। ইতিহাস আমার বরাবরই প্রিয় বিষয়; ইচ্ছে করে লোভনীয় বিষয় ছেড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস নিয়ে পড়েছি; এ জন্য অনেক কটু-কাটব্যও শুনতে হয়েছে; অনেক বন্ধু দূরে সরে গেছে। থাক, সেসব কথা।

আমার কাছে এই প্রবীণরা তো এক একটি জীবন্ত ইতিহাস। অজানা কিছু জানার অভিপ্রায়ে আমিও তাঁর প্রতি একটু কৌতূহলী হই। বেশ জমে ওঠে আলাপচারিতা। 

ত্রিপুরার আগরতলা বিমানবন্দরের লাউঞ্জে হরিশংকর বণিকের সঙ্গে আমার এভাবে পরিচয়। আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি শুনে কথা বলতে আরও বেশি উৎসাহী হয়ে ওঠেন তিনি; জানতে চান বিভিন্ন বিষয়ে। দেশের সাম্প্রতিক পরিস্থিতিসহ রাজনীতি-অর্থনীতি- কিছু বাদ গেল না। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করেন আমার জীবন-বৃত্তান্ত। যখন জানতে পারলেন যে আমার বাড়ি ফেনীর পরশুরামে, তখন টেনে জড়িয়ে ধরেন বুকের মধ্যে। আমি একটু অপ্রস্তুত হলেও আন্তরিকতার উষ্ণতা অনুভব করি। 

তারপর তিনি আমাকে একে একে জিজ্ঞেস করেন, আপনার কী নাম? বাড়িতে কে কে আছে? আপনাদের বাড়ি পরশুরামের কোন গ্রামে? এ রকম আরও কত প্রশ্ন...

আমার উত্তর শুনে বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন তিনি; আমার বাবা কাকা জ্যাঠা সবার নাম বলে যেতে লাগলেন অনর্গল। আমার জ্যাঠা নাকি তাঁর বড়দার বন্ধু ছিলেন। আমার বাবা আর নেই শুনে কেঁদে ফেলেন প্রায়; জানান, আমার বাবা ছিলেন তাঁর ছেলেবেলার খেলার সাথী। একসঙ্গে বড় হয়েছেন তাঁরা। পড়েছেনও একসঙ্গে। সেই প্রসঙ্গ টেনে বলেন, তোমার বাবার সঙ্গে আমার কেমন হৃদ্য ছিল, তা বলে বোঝাতে পারব না। শুধু এটুকু বলি, ক্লাসের সবাই আমাদের ডাকত মানিকজোড়।

তিনি আরও জানালেন, তাদের বাড়িতে প্রতি পুজোয় যে যাত্রাপালা হতো, সেখানে অংশগ্রহণ করত আমাদের পরিবারের সবাই। গ্রামের হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সব ধরনের মানুষ উপচে পড়ত তাদের বাড়িতে। বেশ আনন্দের দিন ছিল তখন। 

তাঁর বাবা রামশংকর বণিক ছিলেন আমোদপ্রিয় ও সংস্কৃতিমনা লোক; মানুষকে সাহায্য করতেন উদারহস্তে; এগিয়ে যেতেন যে-কারও বিপদে; জাত-ধর্মের কোনো রকম তোয়াক্কা করতেন না; লোকজনও তাকে বেশ মেনে চলত।

বলতে বলতে হরিশংকর বাবু যেন ফিরে গেছেন তাঁর যৌবনের সেই উচ্ছল সোনালি দিনগুলোতে। চোখেমুখে তার আভাস আমি টের পাচ্ছি। মনোযোগী শ্রোতা পেয়ে কিছুতে থামতে চাচ্ছেন না।

কথায় কথায় বুঝতে পারি, আমাদের প্রতিবেশী মফিজ উকিলের বাড়িটি ছিল তাঁদের। কী যে বিশাল বাড়ি! আম-জাম-কাঁঠাল-লিচু-তাল-চালতা-নারকেল- কী গাছ নেই পাঁচিল-ঘেরা বাড়িটিতে! সামনের বিশাল পুকুরটিতে সব সময় ফুটে থাকে রংবেরংয়ের শাপলা আর পদ্ম; যেন বোটানিক্যাল গার্ডেন। আমাদের এলাকার দর্শনীয় স্থান বলা যায় বাড়িটিকে।

ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি, এক সময় এটি ছিল বেশ অবস্থাপন্ন একটি হিন্দুবাড়ি। তাদের ছিল স্বর্ণের ব্যবসা। দেশবিভাগের পরপর তারা ভারতে চলে গেছেন। বাড়িটির নাম এখন মফিজ উকিলের বাড়ি। অবশ্য বয়োজ্যেষ্ঠরা কেউ কেউ এখনও একে বণিকবাড়ি বা স্থানীয় ভাষায় বাইন্যাবাড়ি বলে ডাকে। ব্যস, এটুকু, এর বেশি কিছু জানতাম না। তবে বাড়িটিকে ঘিরে বেশ কিছু কল্পকাহিনি আমাদের ওখানে মানুষের মুখে মুখে এখনও ফেরে; অনেকটা কিংবদন্তির মতো। 

পুকুরের পশ্চিমপাড়ে একটি পরিত্যক্ত মন্দির আজও দৃশ্যমান। মন্দিরের ভেতরে একটি প্রতিমা অযত্নে-অবহেলায় পড়ে ছিল দীর্ঘদিন। এখন অবশ্য আর নেই; কেউ হয়তো সরিয়ে ফেলেছে। ওই কালী-মূর্তিটি নাকি পুকুরে ভেসে উঠেছিল! পরে মন্দির বানিয়ে প্রতিমা প্রতিস্থাপন করা হয়। অনেকে এখনও এসব বলাবালি করে; এমনকি সাধারণ গ্রামবাসী এসব বিশ্বাসও করে। 

কেউ মন্দিরটি ভাঙার সাহস করে না। মফিজ উকিলের বড় ছেলে আলাউদ্দিনের ইচ্ছায় কয়েক বছর আগে দুলাল নামে এক দিনমজুর ওটা ভাঙার চেষ্টা করেছিল; কিন্তু পারেনি। তার হাত থেকে কুঠারটি বারবার পড়ে যাচ্ছিল; কোনোভাবে নাকি সে ধরে রাখতে পারছিল না। অবশেষে ভয়ে সে ইস্তফা দেয়। ওই রাতে দুলালের দশ বছর বয়সী ছেলে গণেশকে কারা যেন মেরে ফেলে; লাশ পাওয়া যায় বাড়ির পেছনে বাঁশবাগানের ভেতরে। জনশ্রুতি আছে, স্বয়ং মা-কালী গণেশকে গলা টিপে মেরেছে। তার পর থেকে কেউ আর মন্দিরের ওদিকে পা মাড়ায় না। 

এমন গুজবও আছে যে, ওই বাড়িতে প্রতি অমাবস্যার রাতে অশরীরীরা ঘুরে বেড়ায়। কেউ কেউ বলে, হরিশংকরের বাবা রামশংকর বণিকের আত্মা এখনও ওই বাড়ি থেকে বিদায় নেয়নি। তার প্রেতাত্মা এসে চারপাশের লোকজনকে ভয় দেখায়। কাকে যেন একবার ঘাড় মটকে তালগাছের ওপরে তুলে রেখেছিল; সাপের রূপ ধরে কার পায়ে যেন দংশন করেছিল এক বর্ষণমুখর রাতে। এসব ঘটনার অবশ্য কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। তবু ওই রাতগুলোতে কেউ বাড়ি থেকে পারতপক্ষে বের হয় না। আমাদেরও ছোটবেলায় গা ছমছম করত এসব ভৌতিক গল্প শুনে। দুষ্টুমি করলে বুড়োবুড়িরা রূপকথার মতো এসব গল্প বলে বাচ্চাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করে এখনও।

কিছুক্ষণ পর তিনি জানতে চান- মফিজ কাকা কি বেঁচে আছেন?

না। তিনি তো খুন হয়েছেন। আপনি জানেন না?

বিস্ময় ঝরে পড়ে তাঁর চোখেমুখে- না। আসলে ওদিকের কারও সঙ্গে আমার কোনোরকম যোগাযোগ নেই।

কেন?

আমি ইচ্ছে করে যোগাযোগ রাখি না। অনেক অভিমান জমে আছে বুকের মধ্যে। থাক, সেসব কথা। তো তিনি খুন হলেন কীভাবে?

নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে। নিজ দলের সন্ত্রাসীরা তাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারে।

কবে?

তা-ও তো অনেক বছর হয়ে গেল। মানুষ এখনও সেসব ভুলতে পারেনি। 

কথাটা শুনে খানিক নিশ্চুপ থাকেন তিনি; তাঁর চোখের কোণ যেন আবার ভিজে ওঠে। এই ব্যাপারে আর কথা বলেন না। একটু সংযত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, মফিজ কাকার ছেলেরা কেমন আছে?

একদম ভালো নেই। মফিজ উকিলের মৃত্যুর কয়েক বছর পর থেকে তার দু'ছেলের মধ্যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ শুরু। সেই বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, বছর পাঁচেক আগে আলাউদ্দিন কাকা নাসির উদ্দিন কাকাকে ভাড়াটে গুন্ডা দিয়ে খুন করায়; তবে বাঁচতে পারেনি। আলাউদ্দিন কাকা এখন জেলে; সম্ভবত ফাঁসি হয়ে যাবে। আর তা না হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। দুটি পরিবারের আর্থিক অবস্থা এখন শোচনীয়। সব সম্পত্তি গেছে। ঋণভারে তারা এখন জর্জরিত। বাড়িটিও বোধ হয় আর ধরে রাখতে পারবে না।

পাপ! পাপ! মহাপাপ! ভগবানের বিচারের হাত থেকে কেউ রেহাই পায় না। ক্ষীণস্বরে বলেন হরিশংকর বাবু।

এলাকার লোকজনও তা-ই বলে। আমি সমর্থন দিয়ে জানাই।

তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, তারা সবাই আমাদের বিলোনিয়ার বাড়িতে অনেক দিন ছিলেন।

কখন? 

১৯৭১ সালে। যুদ্ধের পুরোটা সময়ে। তখন মফিজ কাকা বারবার বলতেন, হরিশংকর, দেশ স্বাধীন হলে তুমি ফিরে যেও। বাড়িটি তোমাকে বুঝিয়ে দিয়ে আমার কথা রাখতে চাই। সেই দিনগুলোতে আমি মন্দিরে প্রতিদিন পুজো দিতাম; ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির, ভুবনেশ্বরী মন্দির- কোনোটা বাদ দিইনি। এখনও বেশ মনে আছে, ঠাকুরঘরে বঙ্গবন্ধুর ছবি রেখেছিলাম। ঠাকুরের কাছে তখন বারবার প্রার্থনা করতাম- শেখ মুজিবের যেন খারাপ কিছু না হয়; যেন দ্রুত স্বাধীন হয় পূর্ব পাকিস্তান; আমি যেন শিগগির বাড়ি ফিরতে পারি। 

পুরোনো দিনের কথা মনে করে জানালেন, বাড়িটি ঘিরে তাঁর কত স্মৃতি! ভাইবোন ও আত্মীয়স্বজনের কথা, নিজের বেড়ে ওঠা, বিয়ে-সংসার, বড় দুই ছেলেমেয়ের জন্ম, আরও কত কী! সব শেষে বলেন, পরের সাত ছেলেমেয়ের জন্ম ত্রিপুরায়।

প্রশ্ন না করে পারি না- তাহলে স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে যাননি কেন? 

আমার প্রশ্নটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চোখ ছলছল করে ওঠে; আমি যেন তাঁর গোপন অভিমানের জায়গায় হাত দিয়ে বিব্রত করছি। কিছুটা সংকোচ বোধ করলেন মনে হয়। পরক্ষণে স্বাভাবিক হয়ে পরশুরামের গল্পে ফিরে যান আবার। ৮৩ বছর বয়সেও কী সজাগ তাঁর স্মৃতিশক্তি! কোন পরিস্থিতিতে বাড়িটি ছেড়ে আসেন, সব বর্ণনা করেন সবিস্তারে। আমি তন্ময় হয়ে শুনি। 



দুই.

ডিসেম্বর ১৯৭১। পূর্ব পাকিস্তান সদ্য স্বাধীন হয়েছে; নতুন নাম বাংলাদেশ। হরিশংকরের আনন্দ আর ধরে না। যাকে পায় তাকে শুধোয়, আমরা এবার বাড়ি ফিরে যাব; তোমাদের এখানে কিছুদিন ছিলাম আর কি! আর একদিনও নয়। তাঁর কণ্ঠস্বরে তখন ঝরে পড়ছিল প্রবল আবেগ।

মাঝখানের ২৪টি বছর দুঃসময় ভেবে হরিশংকর জীবন থেকে মুছে ফেলতে চান। ভাবেন- আবার ফিরে যাবেন পূর্বপুরুষের ভিটেয়; নিশ্চয় পর্যাপ্ত টাকা পেলে মফিজ উকিল তাঁকে বাড়িটা ফিরিয়ে দেবেন। পরশুরাম ছেড়ে আসার সময় তিনি হরিশংকরকে বারবার বলেছিলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফিরে এসো। ততদিন বাড়িটি আমি দেখাশোনা করব। কথাগুলো সব সময় কানে ভাসে হরিশংকরের। এমনকি যুদ্ধের দিনগুলোতে তাঁদের বাড়িতে থাকার সময়ও মফিজ উকিল পুনরাবৃত্তি করেছিলেন ওই কথাটি। ছেলেরা না যেতে চাইলে না যাবে, তিনি ফিরে যাবেন; বিলোনিয়ায় তিনি আর একদণ্ডও থাকবেন না।

বড় ছেলে সঞ্জয় বাবার কথার প্রতিবাদ করে তখন। বলে, বাবা, স্বাধীন হলেও সে দেশে আমাদের আর স্থান হবে না। সাম্প্রদায়িকতার যে বিষবৃক্ষ ইংরেজরা রোপণ করে গেছে, তা এখন মহিরুহ। মানুষ তো রাতারাতি পাল্টে যায় না।

মেজো ছেলে অজয়ের কণ্ঠেও দাদার প্রতি সমর্থন। সে আরও যোগ করে- সেদিন বেণুদার কথা শুনে অবাক হলাম। তারা যুদ্ধের মধ্যে পালিয়ে এসেছে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে। বেণুদা বলেছে, তারা আর ফিরে যাবে না। তার মা চাইলেও বাবা আর ফিরতে চান না। তারা জেনেছে যে, যুদ্ধের সময় তাদের বাড়িঘর লুট করার পর জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। বেণুদার বাবা সেই পোড়া ভিটা আর দেখতে চান না। 

অজয় আরও বলে, বাবা, আমার মনে হয়, যারা এতদিন সম্পত্তিগুলো ভোগ করছিল, তারা তা কোনোভাবে ছাড়বে না; প্রয়োজনে আমাদের খুন করবে তারা। 

হরিশংকর প্রতিবাদ করেন- না না, মফিজ কাকা তেমন মানুষ নন। তিনি অনেক বড় নেতা, অনেক উদার, তিনি কথা রাখবেন। তোদের তো কোনোদিন বলিনি ১৯৪৭ সালের সেই ভয়াবহ দিনগুলোর কথা। কী অবস্থায় মফিজ কাকার কাছে বাড়িটি রেখে এসেছিলাম!

ছেলেরাও জানতে চায়নি কখনও সেসব।



তিন.

তখন হরিশংকর বণিকের বয়স মাত্র ২৫ বছর। টগবগে যুবক। বাপের টাকা-পয়সা থাকলেও বখে যাননি। বছর তিনেক আগে তাঁর বাবা ধরাধাম ছেড়েছেন; তিনি তখন পড়েছিলেন অথৈ সাগরে।

হরিশংকরের মনে আছে, সেদিন হাসতে হাসতে শামসুল বলেছিল, শংকরদা, পাকিস্তান তো কায়েম হয়ে গেল। যদি ওপারে চলে যান, আমাকে দিয়ে যাবেন বাড়িটা। ভালো দাম পাবেন। চাইলে ওপারের একটি বাড়ির সঙ্গে বিনিময় করিয়ে দিতেও পারি। অন্য কাউকে দিয়ে গেলে শ্মশানেও আপনাকে শান্তি দেব না।

প্রায় সমবয়সী শামসুল হকের এমন চেহারা তিনি আগে কখনও দেখেননি। সব সময় চোখ নামিয়ে কথা বলত শামসুল। সেই শামসুলের মুখে এমন কথা শুনে হরিশংকরের বুকের ভেতরটা হিম হয়েছিল সেদিন; রাগে জ্বলে উঠেছিল সর্বাঙ্গ। পিতৃপুরুষের ভিটে ছাড়তে হবে ভেবে কেঁপে উঠেছিল বুক। বেশ কয়েক দিন তিনি চুপ ছিলেন; কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারেননি। মুষড়ে পড়েন ভেতরে ভেতরে।

বড়দা উদয়শংকর তখন কলকাতায় চাকরি করতেন। চিঠি লেখেন দাদাকে; দাদা কিছু বলেন না স্পষ্ট করে। উদয়শংকর নিজেও তখন হয়ে পড়েছিলেন মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন। কারণ তাঁর খিদিরপুরের বাড়িটিও আক্রান্ত হয়েছিল কয়েক দিন আগে; আগুনে পুড়েছিল বাড়ির একাংশ। পাকিস্তান কায়েমের জন্য মরিয়া এক দল মুসলমান-চাড্ডি আগুন দিয়েছিল তাঁর বাড়িতে। সেদিন প্রাণে বেঁচেছিলেন নেহাত সময়মতো পুলিশ এসে পড়ায়। কিন্তু তাঁর ছেলে শ্যামল মারাত্মক জখম হয়েছিল রাস্তায়; দু'দলের দাঙ্গার মধ্যে পড়ে।

হরিশংকরের স্ত্রী যোগমায়া একেবারে ভেঙে পড়েছিলেন তখন। সর্বক্ষণ থমথমে অবস্থা, যেন ভয়ংকর কিছু ঘটবে; প্রায় প্রতি রাতে বাড়ির টিনের চালে বড় বড় ঢিল পড়ত। অশুভ ইঙ্গিত। তিনি বেশ বুঝতে পারেন, সরাসরি বলে ফল না পাওয়ায় ভয় দেখানোর এই কৌশল। 

অনেক ভেবেচিন্তে স্থানীয় নেতা মফিজ উকিলের কাছে যান হরিশংকর; সব খুলে বলেন। মফিজ উকিল চতুর মানুষ; মুখ দেখে মনের ভাব বোঝার উপায় নেই। রাজনীতিতে সফল হতে হলে এমন চরিত্র বোধ হয় অর্জন করতে হয়। অথবা এটা রাজনৈতিক লোকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। 

মফিজ উকিল তাঁকে আশ্বাসবাণী শোনান- বোঝো তো, দিনকাল যা পড়েছে। তোমাদের বাঁচাতে পারব কি-না বুঝতে পারছি না। বরং ভালো হয় কিছুদিনের জন্য চলে যাও।

কিছুদিন বলতে কতদিন, তা মফিজ উকিল স্পষ্ট করে বলেন না। তবে মফিজ উকিলের আশ্বাসে হরিশংকর কয়েক দিন পর বাড়ি ছাড়েন। অল্প কিছু টাকা নিয়ে বিলোনিয়া শহরের এক পাশে, প্রায় সীমান্তের কাছে তিনি ছোট একটি বাড়ি কিনে নিয়ে এলেন পরিবারকে। 

তারপর মাঝে মাঝে খোঁজ নিতে যেতেন পরশুরামে। বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকতেন অপলক; ভেতরে যেতেন না। তাঁর বাবা বাড়িটি বানিয়েছিলেন কত যত্নে! মাত্র দুই মাইলের ব্যবধান; তবু যেন কত দূর! কেবল ভাবতেন, আর কোনো কালে কি ঘুচবে এই দূরত্ব?



চার.

সব শোনার পর আমি জিজ্ঞেস করি, স্বাধীনতার পর পরশুরামে যাননি?

গিয়েছি। দেখলাম মফিজ কাকার অন্য রকম চেহারা। তিনি বললেন, তা কী করে হয়? আমি দিতে চাইলেও আমার ছেলেরা তো দেবে না। আমি দশ গুণ টাকা ফেরত দিতে চেয়েছিলাম; কিন্তু কোনো ফল হয়নি। 

কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে মফিজ কাকা উত্তেজিত হয়ে বললেন, বেশি বাড়াবাড়ি করো না হরিশংকর। লাশ পড়ে যাবে কিন্তু। মালাউনের বাচ্চা। তোকে যেন আর কখনও পরশুরামে না দেখি।

একটু দম নিয়ে তিনি বলেন, মফিজ কাকার এমন ভয়ংকর রূপ আমি দেখিনি; আর এমন কদর্য ভাষায় কথা বলতেও আমি শুনিনি আগে কখনও। 

তাঁর কথায় বুঝতে পারি, সেক্যুলার দলের নেতার মুখে এমন ভাষা শুনে তিনি যারপরনাই বিস্ময় বোধ করেন তখন; ভাবেন, তাহলে ধর্মের ভিত্তিতে সৃষ্ট রাষ্ট্র পাকিস্তানের সঙ্গে সাংবিধানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র বাংলাদেশের পার্থক্য রইল কোথায়! 

তারপর রাগে ক্ষোভে অভিমানে তিনি আর কোনোদিন পরশুরাম যাননি।

হরিশংকর বাবুর কথা শেষ হওয়ার পর আমি কিছুক্ষণ নির্বাক থাকি; কী বলব কথা খুঁজে পাই না।

এমন সময় প্রাণজিৎ এসে তাড়া দিতে থাকে। ফ্লাইটের সময় হয়ে গেছে, উঠতে হবে এবার।

 

পাঁচ.

বিদায় নেওয়ার সময় হরিশংকর বাবু আমার হাত ধরে বলেন, ভালো লাগল তোমার সঙ্গে কথা বলে। 

আমারও ভালো লেগেছে। আপনাকে ধন্যবাদ।

পলাশ, আমার একটা কথা রাখবে। আকুতিভরা কণ্ঠ হরিশংকর বাবুর।

বলুন। অবশ্যই রাখব।

দেশে ফেরার সময় আমার বাড়িতে একবার ঘুরে যেও। খুশি হবো। বাড়িটি বাসস্ট্যান্ডের পাশে। বিলোনিয়ায় আমার নাম বললে যে কেউ দেখিয়ে দেবে। দরকার হলে ফোন দিও- এই বলে মোবাইল নম্বর দিলেন।

আমি তাঁকে আশ্বস্ত করি- আমি যাব। ততদিনে আপনারা ফিরে আসবেন তো?

আমরা এক সপ্তাহের মধ্যে ফিরে আসব বলে আশা করছি।



ছয়.

ফেরার সময় সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার আগে ভাবি যে, হরিশংকর কাকুর বাড়িটি একটু ঘুরে যাই। ফোন দিলাম। রিসিভ করলেন তাঁর পুত্রবধূ। অজয়দার স্ত্রী। তাঁকে চাইতে বউদি আগে আমার পরিচয় জেনে নিলেন; তারপর বললেন, তিনি তো নেই।

নেই মানে! কোথায় গেছেন?

তিনি তো মারা গেছেন।

কখন? কীভাবে?

এই মাসের ৭ তারিখে। ভেলোরে অপারেশনের সময় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে; কোনোভাবে তা বন্ধ হচ্ছিল না। ব্লাড সুগারও কন্ট্রোলের বাইরে ছিল। 

আমার বুকটা কেঁপে ওঠে। এক মাসের মধ্যে এমন জলজ্যান্ত একজন মানুষ নাই হয়ে গেল! অস্টম্ফুটে বলে উঠি, হায় রে মানুষের জীবন! 

মনে পড়ে তাঁর শেষ কথাটা- মন চায় না পৃথিবী ছেড়ে যেতে।



সাত.

খুঁজে খুঁজে বাড়িটি বের করি। 

আরে! এ আমি কী দেখছি! ছবির মতো বাড়িটি যে পরশুরামের মফিজ উকিলের (বণিক) বাড়ি। একই রকম ঘর। একই রকম বাড়িটির প্রতিটি গৃহের কারুকাজ। একই রকম পুকুর। পুকুরের ঘাট। গাছগাছালি। বাড়ির পাঁচিল। প্রবেশের গেট। পার্থক্য কেবল এটি- বাংলাদেশে নয়, ভারতের ত্রিপুরায়।

আমি থমকে দাঁড়াই; বাড়ির গেটের এক পাশে দেয়ালে লাগানো ছোট একটি নেমপ্লেট দেখে। া

বণিকবাড়ি

প্রযত্নে :হরিশংকর বণিক 

পিতা :স্বর্গীয় রামশংকর বণিক 

আদি নিবাস :পরশুরাম, ফেনী মহকুমা, নোয়াখালী জেলা

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: [email protected] (প্রিন্ট), [email protected] (অনলাইন)