বাড়ি ফেরা

০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

আফরোজা সোমা

গোরস্তানের গেট থেকে বাড়ির সীমানা শুরু...

এর্নস্ট বার্খোল্‌স বাড়ি ফিরেছিল। বহুদিন পর। যুদ্ধের ময়দান, বুলেট ও মৃত্যুর লড়াই শেষে বাড়ি ফিরেছিল তার মতো আরও অনেকে। কিন্তু ফিরলেই কি বাড়ি ফেরা হয়? ঠিক এই প্রশ্নের মুখেই দাঁড় করিয়ে দেয় এরিক মারিয়া রেমার্কের উপন্যাস 'দি রোড ব্যাক'।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে বাড়ি ফেরা সৈনিকরা কেউ আর আগের মানুষটি নেই। যারা রয়ে গিয়েছিল বাড়িতে, তারাও নেই আর আগের তারা। যুদ্ধের অভিজ্ঞতা দু'পক্ষকেই পাল্টে দেয়। তাই 'বাড়ি ফিরে'ও ফেরা হয় না। জীবন বিষণ্ণ ঠেকে। প্রিয়জনদের সাথেও মেলে না বোঝাপড়া। এই বদল দুই পক্ষকেই ভাবায়; কাঁদায়। ফেরা-না ফেরার দোলাচল ভেতরকে রিক্ত করে দেয়। হ্যাঁ। দেয়। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি। থাক। যুদ্ধফেরত সৈনিকের সাথে নিজের এই মামুলি জীবনকে একই পঙ্‌ক্তিতে না বসানোই হতে পারে সৈনিকের প্রতি যথার্থ সম্মান।

মানুষ মিলনকাতর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে দূরদেশে লড়াই শেষে পুনর্মিলনের আনন্দ বুকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছিল তিন মার্কিন যোদ্ধা- ফ্রেড, হোমার এবং এল। কিন্তু স্নায়ু টান-টান করে বাঁচতে-বাঁচতে বদলে যাওয়া মানুষের পক্ষে আগের 'শান্ত' জীবনে ফিরে যাওয়া সহজ নয়। আর বদলে যাওয়া মানুষকে গ্রহণ করাটাও সহজ নয়। সেই গল্পই বলেছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত সিনেমা 'দি বেস্ট ইয়ার্স অব আওয়ার লাইভস'।

ফেলে যাওয়া জীবনের কাছে ফিরে লেনা-দেনা বুঝে নেয়ার বেলায় পাই-টু-পাই হিসেব না কষে আগেই ছাড় দিয়ে দেয়া ভালো। এই আমার অভিমত। বিভূতিভূষনের অপু সাক্ষী। বহু বছর পর, জীবনের অনেক চড়াই-উতরাই শেষে, কলকাতার মতন ব্যস্ত-ত্রস্ত নগর থেকে শান্ত ইছামতীর তীরে, একদিন পুরনো ভিটায় ফিরে এলেও সেই ভূমি আর কখনোই অপুকে ফিরিয়ে দিতে পারে না দুর্গার সাথে কলহ-কাতর সুমধুর দিন। ফিরিয়ে দিতে পারে না পিতা হরিহর আর মাতা সর্বজয়ার দারিদ্র্যপীড়িত সংসারের মায়া। পুরনো জীবনের কাছে ফেরা না গেলেও মানুষ বাড়ি ফেরে। বাড়ি একটা মায়া। বাড়ি একটা ঘোর। বাড়ি মানে নিজের কাছে ফেরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার সময় প্রথম আমার বাড়ি ছাড়া। প্ল্যাটফর্মে ট্রেন। একটা কালো ঢাউস ব্যাগ। তার ভেতরে কয়টা গল্প-কবিতার বই। জামা-কাপড়। কয়েক জোড়া জুতো। সেই ব্যাগটা ট্রেনে তুলে দিতে, নিজের কাঁধে বয়ে নিচ্ছেন শীর্ণদেহী বছর পঞ্চাশের কাঁচাপাকা চুলের একজন। ভারী ব্যাগ। তিনি বইছেন। মেয়ের ব্যাগ তো! কুলিকে দিয়ে নয়, বাবা নিজে বইছেন।

যখন ফোন ছিল না, না জানিয়েই, হুট-হাট বাড়ি যেতাম। মাঝে-মধ্যে গিয়ে দেখতাম, ওইদিন সকালেই আব্বি বাজার থেকে বিভিন্ন রকমের শাক এনেছে। বড়-সাইজের চ্যাপা এনেছে। এনে আম্মিকে বলেছে, 'মনে হয়, সোমা আসতাছে।' তারপর মোবাইল হলো। আব্বির সাথে দিনে কতবার কথা হতো? ২০ বার? ৩০ বার? ঠিক নেই। বাড়ি ফেরার সময় আব্বি বাড়ির সামনের রাস্তায় চা দোকানে বসে থাকত। চা খেত। অপেক্ষা করত। আমি দোকানের সামনে রিকশা বা গাড়ি থামিয়ে আব্বিকে তুলে নিতাম।

বাড়ি এখনো আছে। এখনো একই পথ ধরে যাই। শুধু চা দোকানে অপেক্ষার দিন ফুরিয়েছে। চা দোকানের ৩০-৪০ গজ দূরত্বে সরকারি গোরস্তান। যে এক সময় দোকানে বসে অপেক্ষা করত, সে ৩০-৪০ গজ এগিয়ে এসেছে। এখন সে অপেক্ষা করে গোরস্তানের ভেতরে। গেটের কাছেই তার কবর। সেইখানে ফুটে থাকে অনেক দোলনচাঁপা। বাড়ি ফেরার সময় প্রথমে সেই গেটে থামি। ভেতরে যাই। গোরস্তানের গেট থেকেই এখন আমার বাড়ির সীমানা শুরু।

আর কোনোদিন বাড়ি ফেরা হবে না...

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষে আমাদের ক্লাস নিতেন শিক্ষক রোবায়েত ফেরদৌস। মফস্বল থেকে আসা প্রথম বর্ষের একজন নবীনের জন্য তার ক্লাস মাদকতাময়। একদিন ক্লাসে কী একটা টপিক পড়াতে গিয়ে অন্য আরও কথা-বার্তার সঙ্গে তিনি বললেন, 'আপনারা কি জানেন, আপনাদের আর কোনোদিন গ্রামে ফেরা হবে না?' কেন ফেরা হবে না, কেন ফেরা হয় না, তা নিয়েও বলেছিলেন। এই কথাটা কী কারণে জানি না, আমার মধ্যে ঢুকে পড়েছিল।

গ্রাম মানে বাড়ি। বাড়ি মানে বাড়ির প্রতিবেশ। প্রতিবেশী। প্রতিবেশীদের ঘর-দোর, ফুল-ফলের গাছ, পুকুর, ক্ষেত-মাঠ-বিল। পথের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী। আমি বড় হয়েছি ঢাকার নিকটস্থ ছোটো একটি জেলা শহরে। আমাদের বাড়ি থেকে সদর হাসপাতাল, জজকোর্ট, কাচারি বাজার, কালীমন্দির রিকশায় ছিল ৫/৬ মিনিটের দূরত্ব। আমি যে স্কুল-কলেজে পড়েছি- সরকারি আদর্শ শিশু বিদ্যালয়, এস.ভি. সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, গুরুদয়াল সরকারি মহাবিদ্যালয়ের দূরত্বও ছিল এ রকম, রিকশায় ৭/৮ মিনিট। আমাদের শহরের মাঝখানে অলৌকিক রুপালি ফিতার মতন শুয়ে ছিল মায়াবী নরসুন্দা নদ। নরসুন্দা বয়েছে আমার বাড়ির সামনে দিয়ে। সে আমার আজন্ম সাথী। সূর্যের আলো পড়ে তার ঢেউয়ে-ঢেউয়ে হাজার প্রদীপ জ্বলত। আমাদের বাড়ির পুবে দেড়শ' গজের দূরত্বে ছিল শ্মশানঘাট। আর পশ্চিমে এ রকমই প্রায় দেড়শ' গজ দূরত্বে সরকারি গোরস্তান। শ্মশান আর গোরস্তানের ঠিক মাঝখানে খ্রিষ্টানদের কবরস্থান। পরে গির্জা উঠেছে। কিন্তু আমার ছোটোবেলায় কোনো স্থাপনা ছিল না। সবাই এটিকে বলত, খ্রিষ্টান মাঠ। সেই মাঠে ছেলেরা ঘুড়ি ওড়াত। আমিও ভিড়ে যেতাম তাদের দলে।

ছোটোবেলায় হাতে গোনা মোটে কয়টা 'ঘর' ছিল আমাদের পাড়ায়। ছোটোবেলা মানে, ধরা যাক, আমার ক্লাস ওয়ান। তখন ১৯৮৮ সাল। বন্যার বছর। বন্যায় নরসুন্দার দু'কূল ছাপিয়ে, রাস্তা ডুবিয়ে, খ্রিষ্টান মাঠ ভাসিয়ে, ঠাহ্রের ক্ষেত উপছে পানি তখন এসে ঠেকেছে সুনু ভাইদের বাড়ির গোড়ায়।

সুনু ভাইদের বাবার একটা গরুর গাড়ি ছিল। বাড়ির সামনে গাড়িটা থাকত। আর গরুগুলো অন্য কোথাও বিশ্রামে। আমরা 'পোলাপানের দল' গাড়িতে উঠে লাফালাফি ঝাঁপাঝাঁপি করতাম। এই বাড়ির পশ্চিমে বাক্কার দাদার বাড়ি, উত্তরে মাস্টার কাকাদের বাড়ি আর পুবে নাজিরের বাড়ি। নাজিরের বাড়ি বিরাট এলাকাজুড়ে। লোকজন কেউ থাকে না। তাই, সেটাই পাড়ার শিশু-কিশোরদের গোল্লাছুট, বউচিসহ সকল খেলার মাঠ। মাস্টারের বাড়ির উত্তরে ছিল 'মাইয়াদের বাড়ি'। তারপর কারিমাদের বাড়ি। এর পর আমাদের বাড়ি। আমাদের বাড়ির একপাশে মিডু দাদার বাড়ি, আরেক পাশে 'পড়া বাড়ি'। মানে পতিত ভিটা। পড়া বাড়ির পাশে পুকুর। পুকুরের পাড়ে রাস্তা। এই রাস্তাই পৌরসভার শেষ সীমা। রাস্তার ওই পাড় পৌরসভার বাইরে। ওই পাড়ে কন্ট্রাক্টর বাড়ি, কামার বাড়ি, কলু বাড়ি, 'জ্বলে'দের বাড়ি, দীনালির বাড়ি। কন্ট্রাক্টর বাড়ির দক্ষিণে পুকুর। পুকুরের সীমানা ঘেঁষে সরকারি গোরস্তান। গোরস্তানের একপাশে মসজিদ ও নদী। আরেক পাশে শামসুল হকের বাড়ি। সেখান থেকে অন্য পাড়া শুরু।

আবার ফিরে আসি সুনু ভাইদের বাড়ির সামনে। '৮৮র বন্যার সময় সেখানে এসে পানি ঠেকেছিল। বন্যার পানি বাড়ছে কি-না কাঠি দিয়ে বড়রা, ছোটরা সেখানে রোজ পরীক্ষা করত। বন্যার সময় 'পোলাপানদের' সে কী আনন্দ! কলার 'ভুরা' মানে ভেলা বানিয়ে তারা ক্ষেতে, মাঠে, রাস্তায় দৌড়ায়! আগেই বলেছি, সুনু ভাইদের বাড়ির সামনে নাজিরের বাড়ি। এর উত্তরে কাডুর বাড়ি। তার পশ্চিমে ঢুলি বাড়ি। ঢুলি বাড়ির পাশে 'ঐশ্বার ক্ষেত'। কাডুর বাড়ির সামনে রাস্তা। রাস্তার ওই পাড়ে কেরানীর বাড়ি। কেরানীর বাড়ি থেকে অন্য পাড়া শুরু।

আমাদের ঘরের পেছনে ছিল ফাঁকা জায়গা। সবাই বলত 'ডুইল্যার ক্ষেত'। তার উত্তরে লাগোয়া আরেকটা বড় ক্ষেত। কন্ট্রাক্টর বাড়ির। এতে আখ হয়। দুই-চার বার চুরি করে ক্ষেত থেকে আখ খেয়েছি। খবর জানতে পেয়ে আব্বি-আম্মি বলেছে, 'জিহ্‌বা কেটে ফেলব।' জিহ্‌বা কাটার ভয়ে আর চুরি করিনি। আখ ক্ষেতের পরে বজলুর ক্ষেতের সীমানা শুরু। ক্ষেতের শেষে বাড়ি। বাড়িতে বিরাট পুকুর। আম্মির চোখ ফাঁকি দিয়ে পোলাপানের সাথে দল বেঁধে 'বজলুর পুস্কুনি'তে গোসল করতে যাই। পুকুরে গোসল করতে যাওয়া মানে ওই দিন কপালে 'মাইর'। বাড়িতে 'কল' মানে টিউবওয়েল রেখে 'আওয়াড়া পোলাপানের মতন' পুকুরে যাবার শাস্তি ছিল কড়া। বাড়িতে অনেক বছর একটি ইঁদারাও ছিল। ইঁদারার ভেতরে মুখ নামিয়ে চিৎকার করতাম। আওয়াজ নিজের কাছে ফিরে আসে বলে চিৎকার করতে ভালো লাগত।

আমার মাকে আমার দাদু বলত, 'মিলিটিরি'। আমার 'মিলিটিরি' মা আমাকে কড়া মাঞ্জা দেয়া ঘুড্ডির সুতার মতন সব সময় 'ডলার উপরে' রাখত। মাঠে ঘুড্ডি উড়াতে গেছি... কন্ট্রাক্টর বাড়ির পুকুরে গোসল করতে গেছি...পোলাপানের সাথে নরসুন্দা নদে হয় সাঁতরাতে গেছি নয় শাপলা-শালুক তুলতে গেছি... নয় বাড়ি থেকে অনেক দূরে হিমাগার ছাড়িয়ে মাকখোয়ার বন্দে ঘুরতে গেছি... নয় পড়া বাড়িতে শিমুল গাছতলায় একা-একা ঘুর-ঘুর করেছি... নয় পড়া বাড়িতে তেঁতুলগাছে উঠেছি.... নয় বিকেলে খেলতে গিয়ে বাড়ি ফিরতে সন্ধ্যার আজান হয়ে গেছে... নয় কাঁঠালগাছে উঠেছি... নয় ঐশ্বার আখ ক্ষেতের ভেতরে কারা ফিসফিস করে তা দেখতে আখ ক্ষেতের ভেতরে ঢুকেছি... নয়তো ভোরে কন্ট্রাক্টর বাড়ির দেউড়ির কোনায় সবুজ ঘাসের উপর পড়ে থাকা শিউলি ফুল চুরি করে কুড়াতে গিয়েছি... নয়তো এমন কিছু একটা করেছি যা আমি জানি না... এই রকম শতেক অপরাধে আমার মা আমাকে 'ডলা দিত'। ঘরের পেছনে থাকা বাঁশের ঝাড় থেকে নিজের হাতে কঞ্চি কেটে, চেঁছে রাখত। বড় হয়ে কবিতায় পড়েছি, 'রাবণ শ্বশুর মম মেঘনাদ স্বামী, আমি কি ডরাই সখী ভিখারী রাঘবে'! এই কবিতা না পড়েও ছোটোবেলায় জানতাম, 'কিসের কাঁচা কঞ্চি আর কিসের সন্ধি বেৎ! আমার আছেন দুরন্ত রক্ষক!' আম্মিকে কঞ্চিটা হাতে নিতে দেখলেই আমি 'দাআআআদুউউউ' বলে আকাশ কাঁপিয়ে একটা চিৎকার দিতাম। আর আমার দাদু, সৈয়দ বানু, চিলের মতন ছোঁ মেরে আমাকে নিয়ে যেত।

আম্মি আমাকে 'কড়া মাঞ্জা দেয়।' কিন্তু আমি 'কুত্তার লেজ'। 'সোজা' হওয়া মুশকিল। ঘরের ভেতরে আমাকে ভরে বাইরে থেকে শিকল তুলে দেওয়া হয়; পড়ার টেবিলের সামনে চেয়ারে বসিয়ে দড়ি দিয়ে হাত বেঁধে রাখা হয়। কিছুতেই কিছু হয় না। বাড়ির চারপাশে দেয়া টিনের বেড়া, বেড়ার গেটের তালা আমাকে আটকাতে পারে না। জবা ফুলের গাছ বেয়ে আমি বেড়া টপকে যাই।

সেই দিন আর নেই। আমিও 'বড়' হয়ে গেছি। বড় হতে-হতে নাইন-টেনে ওঠার আগেই ঘরকুনো হয়েছি। ঘরকুনো হতে-হতে একদিন ঘরছাড়া হয়েছি। একবার কিছু ছেড়ে এলে সেখানে যে আর ফেরত যাওয়া যায় না, আমার তা জানা ছিল না। যেমন জানা ছিল না এর্নস্ট বার্খোল্‌স-এর। জানা ছিল না ফ্রেড, হোমার আর এল-এর। জানা ছিল না অপুর। কিন্তু জীবনই মানুষকে হাতে ধরে শেখায়। এর্নস্ট, ফ্রেড, অপুকে জীবনই শিখিয়েছে। আজ আমিও জানি, ছেড়ে আসা সেই নরসুন্দার সাথে, রেখে আসা বাড়ির আঙিনায় ফুটে থাকা দোলনচাঁপার সাথে কোনোদিন আর হবে না দেখা।



'ভাঙা কুঞ্জবনে'...

আমাদের বাড়ির পেছনে কন্ট্রাক্টর বাড়ির বিরাট ক্ষেতের আখ কাটা হয়ে গেলে ফাঁকা জমিতে খেলাধুলা আর কাপড় বা বিভিন্ন জিনিস শুকানো হতো। রোজার মাসে ক্ষেত ভরে পাড়ার নারীরা লাল-নীল-হলুদ-সবুজ গোলাপি রঙের সেমাই পিঠা, পাপড়া পিঠা, সিরিঞ্জ পিঠা, বাঁশপাতা পিঠা বানিয়ে রোদে শুকাতে দিত। ক্ষেতের শেষে ছিল একটা ঝোপ। সেই ঝোপে শেয়ালের বাস। শেয়ালগুলো সকালে ও সন্ধ্যায় সমস্বরে হুক্কা-হুয়া ডাকে। কখনও কখনও আমরাও শেয়ালের সাথে ডাকি।

শেয়ালের ঝোপসহ ক্ষেতের সীমানাজুড়ে ছিল এক সারি আম গাছ। সেইখানে জিন-ভূতের বাস বলে ছেলে-বুড়ো সকলে জানত। আমগাছে পেত্নীরা থাকে। দুপুরে পুকুরে গোসল করে তারা ওই ক্ষেতের ফাঁকা জমিতে শুয়ে শুয়ে চুল শুকায়। ওদের চুলে যার পা পড়বে তার মহাবিপদ। তাই, ভর দুপুরে বাচ্চা-কাচ্চা বা মেয়ে-বউদের ওইদিকে যেতে সাবধান।

আমাদের পাড়ায় বিদ্যুৎ ছিল না। সন্ধ্যা হলেই বাঁশঝাড়ে, পাতার ফাঁকে, ক্ষেতের উপর, ঝোপের ভেতর, নদীর পাড়ে, পেত্নীঘেরা আমগাছের নিচে-নিচে জোনাক পোকা জ্বলত। আর আমাদের উঠোনে নারিকেলগাছের মাথার ওপর 'হাজারে-বিজারে তারার ফুল' ফুটত।

পুরনো দিন ফুরিয়েছে। একেকটা ক্ষেতে ৮টা ১০টা প্লট হয়েছে। ভূত-পেত্নীর আর থাকার জো কই! ঝোপ-ঝাড়ও উধাও। রেড ইন্ডিয়ানদের মতই পিছু হটতে হটতে জোনাকিরা কোথায় নিয়েছে আশ্রয়, সেই ঠিকানা আমাকে দিয়ে যায়নি। অথবা হয়তো ঠিকানা দিতে আমার বাড়ি গিয়ে তারা আমাকেই খুঁজে পায়নি।

১৯৮৮ থেকে ২০১৯। ৩১ বছর। যেই সুনু ভাইয়ের বাড়ির সামনে এসে ৮৮'র প্লাবনের পানি থেমেছিল; আমার চেয়ে ১০ বছরের ছোটো আমারই আপন বোন সুনু ভাইদের সেই বাড়িই দেখেনি। বন্যার পরে তারা বাড়ি বিক্রি করে দিয়েছিল। সবই পাল্টে গেছে। আমাদের বাড়ির পেছনের সেই দুইটা মাত্র ক্ষেতেই এখন ২৫/৩০টা প্লট। পাড়ায় অনেক বাড়ি উঠেছে। গায়ে গা লাগানো দালান। 'ভিন দেশের মানুষেরা' বসতি গেড়েছে। আমি পুরোনোদের চিনি। কিন্তু গত প্রায় পৌনে দুই দশকে যারা এসেছে, আমি এদের কাউকে চিনি না। এরাও আমাকে চেনে না।

রাস্তায় হাঁটতে বেরিয়ে কোনো বাচ্চা বা কিশোর বা কলেজে পড়ুয়া কাউকে চিনতে হলে আমি তার বাবা বা মায়ের নাম জিজ্ঞেস করি। আর আমিও এখন আমার পরিচয় দিই এইভাবে, 'অমুকের বড় বোন'। এমন পরিচয় দিতে গিয়ে প্রথম-প্রথম বুকের মধ্যে কেমন ধ্বক করে উঠত। এখনও কখন -কখনও আহসান হাবীবের কবিতাটা মনে হয়: 'আসমানের তারা সাক্ষী/ সাক্ষী এই জমিনের ফুল এই/ নিশিরাইত বাঁশবাগান বিস্তর জোনাকি সাক্ষী/ সাক্ষী এই জারুল জামরুল, সাক্ষী/ পূবের পুকুর, তার ঝাকড়া ডুমুরের পালে স্থিরদৃষ্টি/ মাছরাঙা আমাকে চেনে/ [...] আমি কোনো আগন্তুক নই'।

মাস কয়েক আগে বাড়ি গিয়ে একদিন সকালে হাঁটতে বেরিয়ে কৌতূহলের বশে এলাকার বাড়িগুলো দেখতে আর গুনতে বেরিয়েছিলাম। এগোতে-এগোতে এক পর্যায়ে, শর্টকাটে পাড়ার অন্যান্য বাড়ির ভেতর দিয়ে, ফেরার পথ হারিয়ে শেষে মূল সড়ক ধরে বাড়ি ফিরেছি। আর নরসুন্দা! যেই নরসন্দার পানিতে সিঁদুর ঢেলে দিয়ে অবর্ণনীয় সুন্দর টুকটুকে লাল গোল একটা বড় থালা রোজ আকাশে উঠতো আর ডুবত, সেই নদীটাই আর নেই। এর পাড়ে এত দোকান-দালান দেখে অচেনা কারও বোঝারই উপায় নেই- এখানে একদা নদী ছিল।

বাড়ি গেলে ভোরবেলায় উঠে হাঁটতে বের হই। দূর পর্যন্ত যাই। অন্তত যেখানে নদীর বুকে একটুখানি জলের রেখা আছে, সেই পর্যন্ত। সেখানে যাবার আগেই হাতের ডানে সরকারি গোরস্তান। এখানে গেটে দাঁড়াই। চা দোকানে অপেক্ষার ইতি টেনে যে এগিয়ে এসেছে আরও ৩০/৪০ গজ, তার কাছে চাই। তার কবরের ওপরে দোলনচাঁপা ফুল। নরম বাতাস বয়। সুবাস আসে। গোরস্তানের দেয়ালের কাছ ঘেঁষে বেড়ে ওঠা বড় গাছের ওপর বসে থাকা এক বা একাধিক ঘুঘু ডাকে। ডাকতে থাকে। আমি চোখ বন্ধ করি। করেই থাকি।

এরপর সৈয়দ বানুর কাছে যাই। কবরস্থানের শেষ মাথায় তার ঠিকানা। দেখা হয়। কিন্তু তাকে বলা হয় না, সেই 'মিলিটিরি' রহিমা বেগম এখন একটা ছোট্ট মেয়ে। সেই ছোট্ট মেয়েকে এখন তার নাতির নামের সাথে মিলিয়ে ডাকা হয় 'বড় তিয়ান'।

কিছুই আগের মতন থাকে না। কিন্তু সব বদল এক নয়। বদলের ভার বুঝেছিল এর্নস্ট বার্খোল্‌স। ভার বুঝেছিল অপু। তবু, মানুষ ফেরে। বাড়িতে। পুরোনো ভিটায়। নিজের কাছে। যেমন, আমার বাবা হঠাৎ-হঠাৎ তাদের পুরোনো ভিটায় যেত। সেখানে তার বাবার কবর। এমনকি যাদের আর ফেরার সাধ্য নেই, তারাও ফেরে। সশরীরে না হোক, অন্তত কল্পনায়। যেমন সৈয়দ শামসুল হকের উপন্যাসের চরিত্র বাবর আলী। দেশভাগের সময় ভারতে ফেলে আসা সেই কানা ফকির, সেই লেবুগাছটার কথা তার মনে পড়ত; জাগরণে, স্বপ্নে। নিজের বাড়ি নিজেরই অংশ। তাই, মানুষ ফিরতে চায়। যেমন জীবনানন্দ। মানুষ না হোক, 'শালিক' অথবা 'ভোরের কাক' হয়ে হলেও ফেরার আকুলতা জানিয়েছেন। ফিরতে না পেরে মধুসূদন কপোতাক্ষকেই মিনতি করেছেন- 'রেখো মা দাসেরে মনে'। ফিরতে না পেরে 'ফুটি যেন স্মৃতি-জলে' বলে মধুকবি জানিয়েছেন ফেরার বাসনা।

কিন্তু 'ভাঙা কুঞ্জবন' শাঁখের করাত। 'এরে পরতে গেলে লাগে, এরে ছিঁড়তে গেলে বাজে'। তবু, ভালোবাসি বাড়ি ফেরা। এখন সব সময় গোরস্তানের সামনের পথ ধরেই ফেরার চেষ্টা করি। বিশ্বরোডে নরসুন্দার ওপরে ছোট্ট সেতুটা পার হয়েই ডানে অপেক্ষাকৃত ছোটো রাস্তা। রাস্তার ডান পাশে সমান্তরালে বয় মৃত নরসুন্দা। পথের পাশে ছোটো বাঁশঝাড়, গাছ-গাছালি। এই পথে থেকে থেকে ঘুঘু ডাকে। ঘুঘুর ডাক শুনলেই আমার অবশ লাগে। নাভির গোড়ায় চিড়বিড়িয়ে ওঠে। কেমন একটা এই-আনন্দ এই-বেদনা লাগে। ঘুঘু জানে না, তার এই ডাকও আমার বাড়ি। নির্জন পথে প্রায় নিরালা দুপুরে ঘুঘুর ডাকে 'ধড়ফড়' করে ওঠে আমার একটা জীবন। এই ডাকই আমার বাড়ি ফেরার আবহ সঙ্গীত। ফেরার পথে গোরস্তানের গেটে থামি। বুকের মধ্যে দোলনচাঁপা ফুল নিয়ে এখানে একজন আছেন অধীর অপেক্ষায়। গেট খুলে ভেতরে ঢুকি। কারণ কবরস্থানের গেট থেকেই আমার বাড়ির আঙিনা শুরু।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: [email protected] (প্রিন্ট), [email protected] (অনলাইন)