রোহিঙ্গা শিবিরে এনজিওর ব্যয়ে স্বচ্ছতার অভাব: টিআইবি

০৫ ডিসেম্বর ২০১৯

সমকাল প্রতিবেদক

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান -সমকাল

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা শিবিরে আন্তর্জাতিক এনজিওগুলোর ব্যয়ের হিসাবে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং দুর্নীতি হচ্ছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। বৃহস্পতিবার ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।

'বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের বাংলাদেশে অবস্থান: সুশাসনের চ্যালেঞ্জ ও উত্তরণের উপায়' শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। 

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের গুরুত্ব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে এবং মানবিক সহায়তা অনুদানও ক্রমাগত কমছে। এর ফলে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের ওপর আর্থিক ঝুঁকির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তার কাজে নিয়োজিত এনজিওগুলো নিজেদের পরিচালন ব্যয়ের যে হিসাব দেয়, প্রকৃত ব্যয় তার চেয়ে বেশি। প্রাপ্ত তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাতিসংঘের যে সংস্থাগুলো কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করছে, সেগুলোর মধ্যে ইউএন উইমেনের পরিচালন ব্যয় সবচেয়ে বেশি। তাদের মোট ব্যয়ের ৩২ দশমিক ৬ শতাংশই খরচ হচ্ছে পরিচালন ব্যয় হিসেবে। বাকি ৬৭ দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ মানবিক সহায়তা কর্মসূচিতে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যে ইউনিসেফের পরিচালন ব্যয় সবচেয়ে কম, তাদের মোট ব্যয়ের ৩ শতাংশ। বাকি ৯৭ শতাংশ টাকাই তারা সত্যিকারভাবে কর্মসূচিতেই ব্যয় করছে।

এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করা এনজিওগুলোর বেসরকারি অংশীজনদের তথ্য প্রদানে অনীহা রয়েছে। ফলে প্রকৃত তথ্যও পাওয়া দুরূহ হয়ে পড়ছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, ত্রাণের মান ও পরিমাণ যাচাই করতে ডিসি অফিসের সংশ্লিষ্ট কমিটিকে গাড়িপ্রতি আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা ঘুষ দিতে হচ্ছে। প্রকল্প শেষ হলে তার ছাড়পত্র পেতে ইউএনও অফিসের কর্মকর্তাদের দিতে হচ্ছে ২০ থেকে ৫০ হাজার টাকা। এই কাজে ডিসি অফিসের সংশ্লিষ্টদের দিতে হয় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। মানব পাচারের ক্ষেত্রে দালালদের প্রাথমিকভাবে ১০-২০ হাজার টাকা এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর পর দেড় থেকে দুই লাখ টাকা দিতে হয়। এ ছাড়া ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গারা বের হতে চাইলে দালাল ও টমটম ড্রাইভারদের ২৫০-৩০০ টাকা দিতে হয়।

এক প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার অন্তত দুই হাজার ৩০৮ কোটি টাকা ব্যয় করেছে রোহিঙ্গাদের পেছনে। পরোক্ষ ব্যয় আরও অনেক বেশি। 

তিনি বলেন, রোহিঙ্গা সংকট ঘিরে এখন স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সহায়তাকারীরা মিলে একটি 'সিন্ডিকেট' গড়ে তুলেছে। বিভিন্ন পর্যায়ে সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে 'অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ঝুঁকি' সৃষ্টি হয়েছে। জনবল ঘাটতির কারণে এনজিওগুলোর কার্যক্রমে তদারকি ব্যাহত হচ্ছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রোহিঙ্গাদের কারণে কপবাজারের স্থানীয় অধিবাসীরাই এখন 'সংখ্যালঘু' হয়ে গেছে এবং স্থানীয় অধিবাসীদের মধ্যে মানসিক চাপের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এই ঝুঁকি সম্পর্কে সরকার যথেষ্ট সচেতন বলে প্রতীয়মান হচ্ছে না, কিন্তু এ ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণা প্রতিবেদনে শরণার্থী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ সরকারের আর্থিক ব্যয়সহ বিভিন্ন নেতিবাচক প্রভাব নিরূপণ করে তা মোকাবেলার জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা গ্রহণ করার সুপারিশ করা হয়। এতে বলা হয়, এ সংকটের যত ধরনের নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করতে হবে। এর বর্তমান এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে ভাবতে হবে। এ ধরনের প্রভাব থেকে রক্ষার জন্য বিস্তারিত কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: [email protected] (প্রিন্ট), [email protected] (অনলাইন)