দুই নিরাপত্তাকর্মীসহ আটক ৩

তেজগাঁওয়ে বাসায় ঢুকে ব্যবসায়ীকে খুন করল মুখোশধারীরা

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ১৯ । ২১:৪৪

সমকাল প্রতিবেদক

শাহ মো. তবারক হোসেন -ফাইল ছবি

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের শান্তিনিকেতন এলাকায় বাসায় ঢুকে ব্যবসায়ী শাহ মো. তবারক হোসেনকে (৭০) ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা। বুধবার ভোরের এ ঘটনায় তার পালিত ছেলে সাইফুলও আহত হয়েছেন।

তবারক মহাখালীর মার্কেট মামা প্লাজার মালিক। তিনি চট্টগ্রামের শফি মাইজভাণ্ডারীর অনুসারী ছিলেন। কে বা কারা কেন এ খুন করেছে, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ব্যবসায়িক বা মতাদর্শিক বিরোধের জের ধরে তাকে হত্যা করা হতে পারে বলে ধারণা পুলিশের। এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই নিরাপত্তাকর্মীসহ অন্তত তিনজনকে আটক করা হয়েছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার বিপ্লব বিজয় তালুকদার সমকালকে বলেন, বাসার স্টিলের আলমারি ভেঙে কিছু টাকা-পয়সা লুট করা হয়েছে। তবে সে উদ্দেশ্যেই তাকে হত্যা করা হয়েছে কি-না, তা স্পষ্ট হওয়া যায়নি। সার্বিক বিবেচনায় মনে হয়েছে, খুনটি পরিকল্পিত। তদন্তে খুনের নেপথ্যের কারণ বেরিয়ে আসবে এবং খুনিরা শিগগির ধরা পড়বে বলে আশা করছেন তিনি।

শান্তিনিকেতন এলাকার মসজিদ গলির একটি বাসার চতুর্থ তলায় নিজ ফ্ল্যাটে থাকতেন তবারক হোসেন। তার স্ত্রী পারভীন ইসমত আরা ডিওএইচএস এলাকায় দুই মেয়ের সঙ্গে আলাদাভাবে থাকেন। তাদের আরেক মেয়ের বিয়ে হয়েছে। আর ছেলে শাহাদত হোসেন তুষার যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। শান্তিনিকেতনের বাসায় তবারকের সঙ্গে তার পালিত ছেলে সাইফুল ছাড়াও বিভিন্ন সময় তিন-চারজন থাকতেন। প্রায় প্রতিদিনই মাইজভাণ্ডারীর অনুসারী অনেক লোক তার বাসায় যাতায়াত করতেন। অনেকেই তাকে 'বাবা' বলে ডাকতেন। বুধবার তার মৃত্যুর খবর পেয়ে বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ বাসার নিচে এসে কান্নাকাটি শুরু করেন। মামা প্লাজার ব্যবসায়ীরাও আসতেন তার বাসায়।

ভবনের একাংশের মালিক এমএ করিম চৌধুরীর গাড়িচালক হুমায়ুন কবির জানান, সকাল ৭টার দিকে তিনি নিচতলার ঘরে শুয়ে ছিলেন। এ সময় সাইফুল রক্তাক্ত অবস্থায় এসে তাকে ডেকে তোলেন। তিনি জানান, দুর্বৃত্তরা বাসায় ঢুকে তবারককে কুপিয়ে টাকা লুট করে নিয়ে গেছে। এর পর অন্যরাও ঘটনাটি জানতে পারেন। প্রতিবেশী জালাল বিষয়টি পুলিশকে ফোন করে জানান। পুলিশ পৌঁছে খাটের ওপর থেকে তবারকে অচেতন দেহ উদ্ধার করে মহাখালীর মেট্রোপলিটন হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এর পর ময়নাতদন্তের জন্য লাশ নিয়ে যাওয়া হয় শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে।

ঘটনা সম্পর্কে পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, সকাল ৬টার দিকে তবারকের ফ্ল্যাটের কলিংবেল বাজায় কেউ। তখন সাইফুল দরজা খুলে দিলে চার-পাঁচজন তাড়াহুড়ো করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। তাদের মধ্যে দুই-তিনজন ছিল মুখোশ পরা। তারা তবারককে ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করে। এর পর টাকা-পয়সা লুট করে পালিয়ে যায়। ঘটনার সময় নিরাপত্তাকর্মী রুহুল আমিনের দায়িত্ব পালন করার কথা। তবে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি দাবি করেন, ওই সময় মসজিদে ছিলেন। নামাজ পড়ে ফেরার পর তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। তাকে ও আরেক নিরাপত্তাকর্মী শাহ আলমকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। আহত সাইফুলকেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনাস্থলের আশপাশে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকায় ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

নিহতের ভাগ্নে হোসেন মো. কামরুল মর্গে জানান, তার মামা বস্তায় ভরে বাসায় টাকা রাখতেন। টাকা লুটের উদ্দেশ্যে তাকে খুন করা হয় বলে ধারণা স্বজনদের। তবারকের গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে।

মামা প্লাজার একাধিক ব্যবসায়ী জানান, অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ ছিলেন তবারক। তার সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ ছিল না।

সরেজমিন দেখা যায়, চতুর্থ তলার সিঁড়ি ও ফ্ল্যাটের ভেতর ফোঁটা ফোঁটা রক্তের দাগ। ফ্ল্যাটের চার কক্ষের মধ্যে দুটি ছিল শোবার ঘর। বাকি দুটি ড্রয়িং ও ডাইনিং রুম হিসেবে ব্যবহূত হতো। যে বিছানায় তবারক শুয়ে ছিলেন, সেটিতে ধস্তাধস্তি করার চিহ্ন ও রক্তের দাগ রয়েছে। স্টিলের আলমারি ভাঙা অবস্থায় ছিল। এলোমেলো ছিল অন্যান্য জিনিস।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি আলী হোসেন খান জানান, এ ঘটনায় এখনও কোনো মামলা হয়নি। খুনের খবর পেয়ে বুধবার সকালেই পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিটের সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান।

সিআইডির এএসআই গোবিন্দ দাস জানান, হত্যায় ব্যবহূত তিনটি ছুরি জব্দ করা হয়েছে। সেগুলো ধুয়ে রাখা হয়েছিল। মোট পাঁচটি ছুরি কেনার একটি রসিদও পাওয়া গেছে।

সন্দেহভাজন এক খুনির মোবাইল ফোন পড়ে ছিল ঘরের ভেতর। টাকাসহ মূল্যবান সামগ্রী লুটের আলামত পাওয়া গেছে। ঘটনাস্থল থেকে হত্যায় জড়িতদের হাত-পায়ের ছাপ সংগ্রহ করা হয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, একাধিক ব্যক্তি হত্যায় জড়িত ছিল।

ভবনের একাংশের মালিক ও পঞ্চম তলার বাসিন্দা এমএ করিম চৌধুরী জানান, খুনের সময় কোনো চিৎকার শুনতে পাননি। পরে তিনি ঘটনাটি জানতে পারেন। খুনের কারণ সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা নেই।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২১

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com