নদীর এপার-ওপারেই দুস্তর ব্যবধান

সরেজমিন: বোয়ালখালী উপজেলা

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০ । ০৩:০৬ | আপডেট: ২০ জানুয়ারি ২০ । ০৩:৩২ | প্রিন্ট সংস্করণ

তৌফিকুল ইসলাম বাবর, বোয়ালখালী ঘুরে এসে

বোয়ালখালীর আহল্ক্কা কড়লডেঙ্গা-বৈদ্যানি সড়কের করুণ দশা- শাহীনুর কিবরিয়া মাসুদ

নদীর এপারে আলো ঝলমলে শহর, ওপারে 'অন্ধকার'। এমন দৃশ্য চট্টগ্রামের শহরতলি উপজেলা বোয়ালখালীর। স্রোতস্বিনী যে কর্ণফুলী এক সময় উপজেলাবাসীর আশীর্বাদ ছিল, সেটিই এখন 'অভিশাপ'। ফলে এখানকার মানুষ শহরের জৌলুসের দিকে তাকিয়ে কেবলই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।

এক সময় সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে পরিচিত কর্ণফুলী তীরে গড়ে ওঠা বোয়ালখালী অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকাও বটে। এখানে নদীর পাশাপাশি রয়েছে উঁচু-নিচু পাহাড়ের সারি। পুরো চট্টগ্রাম অঞ্চলে শিক্ষার জন্য সুখ্যাতি ছিল এলাকার। বিভিন্ন ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও উপাসনালয় থাকার কারণেও এই এলাকায় যাওয়া-আসা রয়েছে নানা ধর্ম-বর্ণের মানুষের। দিন দিন দেশের অন্যান্য এলাকা যেভাবে এগিয়েছে, চট্টগ্রাম শহরঘেঁষা জনপদটি সেভাবে এগোয়নি, বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিছিয়েছে। গত রবি ও সোমবার বোয়ালখালীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, জনপদটির পরতে পরতে অবহেলার চিহ্ন।

কালুরঘাট সেতু পার হলেই বোয়ালখালী। চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার ও বান্দরবানে চলাচলে এক সময় এটিই ছিল একমাত্র পথ।

কিন্তু কর্ণফুলী নদীর পশ্চিমে পটিয়া অংশে নতুন সেতু হওয়ায় সড়কটি দিয়ে একেবারেই অবহেলিত। তার পরও সড়কটির ওপর প্রচুর চাপ। বোয়ালখালী ও পটিয়ার একাংশের লাখ লাখ মানুষ এই সড়ক ও সেতুর ওপর নির্ভরশীল। কালুরঘাট রেল কাম সড়ক সেতু পার হওয়ার সময় দেখা গেল, সেতুটির চরম দুরবস্থা। সেতুর স্থানে স্থানে কার্পেটিং উঠে গিয়ে বেরিয়ে এসেছে দগদগে ঘা। সেতুর নিরাপত্তার সাইড চ্যানেলের নিচে কাঠগুলো পচে নষ্ট হয়ে গেছে। সেতুর ফিস প্লেটও ভেঙেচুরে একাকার। সব মিলিয়ে চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে সেতুটি। এ ছাড়া সেতুটি এক লেনের হওয়ায় দু'পাশে দেখা যায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি।

চট্টগ্রাম শহরে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন বোয়ালখালীর বেঙ্গুরা গ্রামের বাসিন্দা মো. শাহাজাহান। সোমবার চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে ভোট থাকায় রোববার দুপুরে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছিলেন তিনি। পথে সেতুর শহর অংশে যানজটে আটকে যান। এ সময় আলাপকালে তিনি বলেন, বোয়ালখালীর বেঙ্গুরা থেকে শহর খুব একটা দূরে নয়। প্রতিদিনই আসা-যাওয়া করা যায়। কিন্তু এক কালুরঘাট ব্রিজের কারণে বাড়ি ছাড়তে হয়েছে তাকে। প্রতিবার নির্বাচন এলেই প্রার্থীরা কালুরঘাটে নতুন সেতু নির্মাণের কথা বলেন। কিন্তু পরে সব ভুলে যান।

চট্টগ্রাম-কক্সাবাজার রোডের বোয়ালখালীর গোমদণ্ডী ফুলতল উপজেলা সদরে ঢুকেছে কানুনগোপাড়া সড়ক। সড়কটি দিয়ে উপজেলা সদরে ঢুকতেই যে কারোই গা শিউরে উঠবে। সমকালের বোয়ালখালী প্রতিনিধি শাহীনুর কিবরিয়া মাসুদকে নিয়ে সড়কটি ঘুরে দেখা গেছে, দুই লেনের সড়কটি ভাঙতে ভাঙতে এখন এক লেনে পরিণত হয়েছে। পদে পদে খানাখন্দ। স্থানীয়রা জানালেন, সড়কের এমন দুরবস্থার মাশুল গুনতে হচ্ছে তাদের। সড়ক প্রশস্তকরণের কাজ শুরু হলেও দীর্ঘদিনেও তা শেষ হচ্ছে না। আর যেভাবে কাজটি চলছে, তাতে বেশিদিন টিকবে বলে মনে হয় না। সড়কটি নিয়ে কথা হয় স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানালেন, সন্ধ্যা হলে যানবাহন পাওয়াই মুশকিল। ভাড়াও গুনতে হয় অতিরিক্ত। কালুরঘাট সেতুর বিড়ম্বনা ও এই সড়কের যন্ত্রণা থেকে রেহাই পেতে অনেকেই বাড়ি ছেড়ে শহরে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

একই অবস্থা শাকপুরা-বেঙ্গুরা-দাশের দীঘিপাড় সড়কের। দাশের দীঘি থেকে বেঙ্গুরা এবং বেঙ্গুরা থেকে শাকপুরা পর্যন্ত ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ সড়কটি যানবাহন চলাচলের প্রায় অযোগ্য। সড়কজুড়ে কেবলই খানাখন্দ। উপজেলার কালুরঘাট-ভাণ্ডালজুড়ি সড়কসহ অন্য গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর অবস্থাও ভালো নয়। শহরের সঙ্গে প্রত্যেক উপজেলায় বাস সার্ভিস থাকলেও সিএনজি অটোরিকশাই হচ্ছে এখানকার প্রধান বাহন।

চাকরির কারণে শহরে থাকেন বেঙ্গুরার বাসিন্দা শ্রমিকনেতা মুহাম্মদ এয়াকুব। তিনি বলেন, 'বোয়ালখালী কতটা পিছিয়ে, তা জানতে এখানকার কানুনগোপাড়া সড়ক ও বেঙ্গুরা সড়কটি দেখলেই বোঝা যায়। বোয়ালখালীবাসীর দুঃখ দেখার কেউ নেই। এবারও চট্টগ্রাম-৮ আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থীরা কালুরঘাটে নতুন সেতু নিমাণ এবং সড়কসহ এলাকার সার্বিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আমরা আশা করে আছি, যিনি নির্বাচিত হয়েছেন, এবার অন্তত কথা রাখবেন।'

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও চাষাবাদের অবস্থাও ভালো নয় বোয়ালখালীর। প্রায় ১৫ বছর ধরে নষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক্স-রে মেশিন। কড়ডেঙ্গা ও জ্যৈষ্ঠপুরা পাহাড়ে নানা ধরনের ফসল উৎপন্ন হলেও এগুলো সংরক্ষণে কোনো হিমাগার নেই। পাহাড় ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনা থাকলেও সেদিকে নজর নেই। চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের পরই প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রামের অন্যতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কানুনগোপাড়া স্যার আশুতোষ কলেজ। এই কলেজটিও এখন নানা সমস্যায় জর্জরিত। বোয়ালখালীতে একটি পৌরসভা থাকলেও নেই তেমন নাগরিক সুযোগ-সুবিধা। বোয়ালখালীর আরেক সমস্যা জলাবদ্ধতা। বর্ষা মৌসুম ছাড়াও অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোয়ারে ভেসে যায় এখানাকার প্রত্যন্ত এলাকা।

এসব বিষয়ে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চট্টগ্রাম-৮ উপনির্বাচনে সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য মোছলেম উদ্দিন আহমদ বলেন, 'এলাকার বাসিন্দা হিসেবে আমি নিজেই অনেক সমস্যার ভুক্তভোগী। ফলে সমস্যাগুলো সমাধানে নিজেকে উজাড় করে দিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাব। বোয়ালখালীর প্রধান সমস্যা কালুরঘাট সেতু। এক বছরের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা নিয়ে এই সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু করতে চাই। অন্যান্য সমস্যাও পর্যায়ক্রমে সমাধান করা হবে।'

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com