রাজনীতি নিয়ে তিন প্রত্যাশা

প্রকাশ: ০১ জানুয়ারি ২০ । ০১:৫৪ | প্রিন্ট সংস্করণ

হোসেন জিল্লুর রহমান

রাজনীতি নিয়ে মিশ্র বিদায়ী বছর ২০১৯ পার করেছে বাংলাদেশ। একাদশ জাতীয় সংসদ
নির্বাচন সামনে রেখে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হওয়ায় ২০১৮ সালের ডিসেম্বর
আমাদের অনেকের মধ্যে আশা জাগিয়েছিল। কিন্তু ওই নির্বাচনে যেভাবে 'ভোট
গ্রহণ' করা হয়েছে, তা নাগরিকদের বড় অংশকে হতাশ করেছে। ফলে বিদায়ী বছর চলে
গেছে এক রাজনৈতিক দোলাচলে। ক্ষমতা না সুশাসন, আন্দোলন না আপস, সংগ্রাম না
সংসদ- এই দোলাচলে।


রাজনীতি নিয়ে যদি চিন্তা করি- এর তিনটি দিক রয়েছে। বাংলাদেশ শুধু নয়,
বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ধ্রুপদি রাজনীতির ক্ষেত্রে এই তিনটি দিক
গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রথমটি হচ্ছে, জনগণের প্রতিনিধিত্বের বৈধতা।
রাষ্ট্রক্ষমতায় যে কোনো পক্ষ যে কোনোভাবেই আসতে পারে এবং নিজেদের জনগণের
প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করতে পারে। কিন্তু সেই ক্ষমতা বা প্রতিনিধিত্বের
বৈধতা তৈরি হতে হয় নাগরিকদের দিক থেকে।


রাজনীতির দ্বিতীয় দিকটি হচ্ছে 'রাজনৈতিক সুশাসন'। সার্বিক অর্থে আমরা যে
সুশাসন বা গুড গভর্ন্যান্স বুঝি, তার বাইরেও রাজনৈতিক সুশাসন ভিন্ন বিষয়।
এতে দেখা হয়, রাষ্ট্রের কার্যক্রম ঠিকমতো পরিচালিত হচ্ছে কিনা। অর্থনৈতিক
ব্যবস্থাপনা নিয়মের মধ্যে চলছে কিনা। উপযুক্ত জায়গায় যোগ্য রাজনীতিক রয়েছেন
কিনা। রাষ্ট্রকাঠামোতে যোগ্য ব্যক্তি যোগ্য জায়গায় রয়েছেন কিনা। যেমন একজন
হয়তো নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য হয়েছেন। সেদিক থেকে তিনি অর্থ
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেতেই পারেন। কিন্তু দেখতে হবে, ওই ব্যক্তি অর্থ
মন্ত্রণালয় ভালোভাবে চালাতে পারেন কিনা।


রাজনীতির তৃতীয় দিকটি হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনায় নাগরিকের
প্রাত্যহিক অধিকার ও মর্যাদা সংরক্ষিত হচ্ছে কিনা। নাগরিকদের কণ্ঠস্বর
ক্ষমতাসীনদের বিবেচনায় থাকছে কিনা। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত
রাজনীতিকদের প্রতিনিধিত্বের বৈধতা থাকতে পারে; শাসক বা প্রশাসক হিসেবেও
তারা দক্ষ হতে পারেন; কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিবেচনার বিষয় হচ্ছে, তারা
রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনায় নাগরিক অধিকারের গুরুত্ব ও মর্যাদা দিচ্ছেন
কিনা। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে
রাষ্ট্রীয় কার্যক্রমের গতি ও অভিমুখ সম্পর্কে সাধারণ বা সংখ্যাগরিষ্ঠ
নাগরিকদের উপলব্ধির মধ্যে ঐক্য তৈরি হচ্ছে কিনা।


রাজনীতি বিষয়ে তাত্ত্বিক এই আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের দিকে যদি
দৃষ্টি ফেরাই তাহলে দেখা যাবে- আমাদের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় দুর্বলতা
রয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনীতিকদের প্রতিনিধিত্বের যে বৈধতা নাগরিকদের
দিক থেকে থাকতে হয়, বিদায়ী বছর সে ক্ষেত্রে দুর্বলতার মধ্য দিয়ে কেটেছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সব দলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে
বটে; দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা বলতে পারছি না যে, সেই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে
প্রতিনিধিত্বের সর্বাঙ্গীণ বৈধতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিরোধী দলগুলো ছাড়াও
নাগরিকদের একটি বড় অংশ মনে করে, ওই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি। অথচ রাজনীতিতে
প্রতিনিধিত্বের বৈধতা নির্ভর করে ওই সরকারের ব্যাপারে নাগরিকদের আস্থার
ওপরই।


আমি প্রত্যাশা করি, নতুন বছরে বর্তমান সরকার তাদের প্রতিনিধিত্বে বৈধতার
ব্যাপারে নাগরিকদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আন্তরিকভাবে কাজ করবে। নতুন বছরের
শুরুর মাসেই ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই
নির্বাচন যদিও স্থানীয় সরকার বেছে নেওয়ার, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বের
হেরফের হওয়ার সুযোগ নেই; তবুও নির্বাচনী বৈধতার ব্যাপারে বিদায়ী বছরে যে
স্থবিরতা দেখা দিয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কাজে
লাগাতে পারে সরকার। জাতীয় সংসদের দুটি আসনে উপনির্বাচন করতে হবে নতুন বছরে।
সেখানেও সরকার সদিচ্ছার প্রমাণ দিয়ে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন
করতে পারে। এর মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে ও নাগরিকদের মধ্যে নতুন বার্তা দিতে
পারে সরকার।


দ্বিতীয় বিষয় বা রাজনৈতিক সুশাসনের ক্ষেত্রে বিদায়ী বছরে যোগ্য ব্যক্তিরা
যোগ্য জায়গা পেয়েছেন- এমন বলা যাবে না। স্বীকার করতে হবে, প্রধানমন্ত্রী ও
তার মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা 'পলিটিকস ম্যানেজমেন্টে' দক্ষতা দেখাতে সক্ষম
হয়েছেন। যে কারণে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিরোধীদলীয়
রাজনীতি দানা বাঁধতে পারেনি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনায় নতুন
বছরে প্রয়োজন হবে বাড়তি দক্ষতা। বিশেষত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের
দায়িত্বপ্রাপ্তরা নিজেদের দক্ষতার প্রমাণ দিতে পারেননি। ব্যাংকিং খাতসহ
অর্থনীতিতে একটা অব্যবস্থাপনা বিরাজ করেছে বিদায়ী বছরে। নতুন বছরে এই
অদক্ষতা কাটিয়ে উঠতে হবে- এটাই আমার প্রত্যাশা। আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার
ক্ষেত্রে আরও চৌকস হতে হবে। যেমন ডেঙ্গু মোকাবিলায় বা পেঁয়াজের বাজার
নিয়ন্ত্রণে এর দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনীতিকরা যেমন আগাম প্রস্তুতি নিতে
পারেননি, তেমনই সংকট তৈরি হওয়ার পর দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিতে পারেননি। নতুন
বছরে এসব ঘাটতি কাটিয়ে ওঠা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।


মনে রাখতে হবে, নতুন বছর বাংলাদেশের জন্য বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক
ইস্যু সামনে নিয়ে আসবে। যেমন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন। ইতোমধ্যে
দুই বছর চলে গেছে, এ ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্তরা বিষয়টি দক্ষতার সঙ্গে
সামলাতে পারেননি। এ ছাড়া প্রতিবেশী ভারতে এনআরসি ও নাগরিকত্ব সংশোধন আইন
নিয়ে নতুন বছর আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়বে। সেখানে বাংলাদেশ একটি বিশেষ
অবস্থানে রয়েছে। আসছে দিনগুলোতে বৈশ্বিক ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক অস্থিরতারও
আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আগামী বছর যাতে করে এসব সংকট দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা
করা যায়, সে জন্য দক্ষ ও দূরদর্শী রাজনীতিকদের দায়িত্ব দিতে হবে।


বিদায়ী বছরে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে নাগরিকদের প্রাত্যহিক অধিকার ও
মর্যাদা কি রক্ষা হয়েছে? এর সদর্থক উত্তর দেওয়া কঠিন। অনেক সময় রাজনৈতিক
হিসাব থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে ব্যবহার করা হয়। তখন দেখা
যায়, বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের মৌলিক নাগরিক অধিকারও লঙ্ঘিত হচ্ছে। কেবল
রাজনীতিতে যুক্ত নাগরিকরা নয়, সাধারণ নিরীহ নাগরিকদেরও আমরা নানাভাবে
পুলিশি ও প্রশাসনিক হয়রানির মুখে পড়তে দেখেছি। নতুন বছরে এর পুনরাবৃত্তি
দেখতে চাই না।


সরকারকে নাগরিকদের কণ্ঠস্বরও বুঝতে ও বিবেচনা করতে হবে। উন্নয়নের প্রশ্নে
সরকার যখন বলছে প্রবৃদ্ধির হার, রিজার্ভ প্রভৃতি দিয়ে হিসাব করছে, নাগরিকরা
তখন হিসাব করছে বেকারত্ব, মূল্যস্ম্ফীতি দিয়ে। ফলে উন্নয়ন উপলব্ধির
ক্ষেত্রে সরকার ও নাগরিকদের বিবেচনা মিলছে না। নতুন বছরে সরকারের উন্নয়ন
সূচক ও ভাষা এমন হতে হবে, যা নাগরিকদেরও বোধগম্য হবে।


রাজনীতির উৎকর্ষ সাধনে যেমন সরকার, তেমনই বিরোধী দলেরও দায়িত্ব থাকে।
কিন্তু বিদায়ী বছরে আমরা দেখেছি, বিরোধী দলগুলো রাজনীতির তিন দিকের মধ্যে
কেবল প্রথমটি নিয়ে সোচ্চার থেকেছে। তারা শুধু প্রতিনিধিত্বের বৈধতা নিয়ে
কথা বলেছে। কিন্তু অপর দুই দিক রাজনৈতিক সুশাসন এবং নাগরিক অধিকার ও
মর্যাদা নিয়ে কথা বলেনি। নতুন বছরে বিরোধী দলের এই প্রবণতারও পরিবর্তন
প্রত্যাশা করি আমি।


নাতিদীর্ঘ এই নিবন্ধ শেষ করতে চাই এই কথা বলে যে, সমাজেরও দায়িত্ব রয়েছে।
নাগরিকদের মধ্যে বিশেষত তরুণদের মধ্যে আত্মশক্তির বিকাশ ক্রমে সংকুচিত হয়ে
পড়ছে। পুঁজিবাদী এই ব্যবস্থায় তরুণদের জন্য নানা চমক এবং কথিত 'মোটিভেশন'
দেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজের যে আত্মশক্তি, যার ওপর ভিত্তি
করেই শত শত বছর ধরে আমাদের দেশ রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এগিয়ে গেছে, সেটাই
যেন মরে যাচ্ছে। নতুন বছরে আমি এই আত্মশক্তির পুনরুদ্ধার দেখতে চাই। সমাজের
চিরায়ত আত্মশক্তি বেগবান দেখতে চাই।


অর্থনীতিবিদ; সাবেক তত্ত্বাবধায়ক


সরকারের উপদেষ্টা

© সমকাল ২০০৫ - ২০২৩

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com