মধ্যপ্রাচ্য কোন পথে

 ইরানের ঘটনায় বাড়ছে উদ্বেগ

প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০ । ০২:১৮ | আপডেট: ০৫ জানুয়ারি ২০ । ০২:২৩ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমকাল ডেস্ক

ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও দেশটির অভিজাত কুদস ফোর্সের কমান্ডার কাসেম সোলাইমানিকে ড্রোন হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করার পর মধ্যপ্রাচ্যে বিরাজ করছে উত্তেজনা। ফ্লোরিডায় নিজের প্রমোদকেন্দ্রে ছুটি কাটানোর সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার গভীর রাতে হুট করে তাকে হত্যার নির্দেশ দেন। জনপ্রিয় সমরকৌশলবিদ হিসেবে পরিচিত কমান্ডারকে হারিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছে ইরান ও বিশ্বের শিয়া সম্প্রদায়। একই সঙ্গে চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এ হামলার সমালোচনা করে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে। কারণ, 'উপযুক্ত সময়ে, যথাস্থানে' এই হত্যাকাণ্ডের চরম প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। ওয়াশিংটনের তুলনায় তেহরানের সামরিক শক্তি সামান্য হলেও খামেনির এই হুঙ্কার বাস্তবে রূপ নিলে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী বলে মনে করেন সামরিক বিশ্নেষকরা। খবর বিবিসি, এএফপি, দ্য গার্ডিয়ান ও সিএনএনের।

উপসাগরীয় অঞ্চলে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান। সৌদি আরব বরাবরই নাকের ডগায় শিয়াদের আধিপত্য মানতে নারাজ। সামরিক ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকা ইসরায়েল কখনও চায় না ইরান এগিয়ে যাক। এ দুই দেশের বিরুদ্ধে সামরিকভাবে তেহরানের বিস্তৃতি ঘটে সোলাইমানির  হাতে। ১৯৭৯ সালে ইরান বিপ্লবের পর সোলাইমানিই প্রথম কমান্ডার যিনি প্রতিবেশী দেশ ও পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের কৌশলগত সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করেছেন। যে কারণে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতার পরই সরকারপ্রধানের চেয়েও তাকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বলা হয়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র সৌদি-ইসরায়েলের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, ফিলিস্তিনে ইরানকে সমর কৌশলে এগিয়ে নেন তিনি। ফলে তার মৃত্যুতে ইরান মানসিকভাবে কিছুটা আঘাত পেলেও এর জবাব তারা যে কোনোভাবেই দেবে।

কমান্ডার সোলাইমানির মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি। সোলাইমানির পদে স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন ইরানের প্রভাবশালী কুদস ফোর্সের জেনারেল ইসমাইল ঘানি। দায়িত্ব নিয়েই তিনি বলেছেন, 'আমরা সবাইকে বলছি ধৈর্য ধরুন এবং মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মরদেহ দেখতে থাকুন।' এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অতিরিক্ত তিন হাজার সেনা পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগন। আগে থেকে ওই অঞ্চলে ১৪ হাজার সেনা রয়েছে দেশটির। ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যেখানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সেনা প্রত্যাহারের অঙ্গীকার করেছিলেন, এখন তার কারণেই নতুন করে সেখানে সেনা-রসদ পাঠাতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। এ নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তুমুল বিতর্ক তৈরি হয়েছে। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টি থেকে এগিয়ে থাকা সম্ভাব্য প্রার্থী জো বাইডেন, বার্নি স্যান্ডার্স ও এলিজাবেথ ওয়ারেন সোলাইমানির হত্যা মিশনকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন যুদ্ধে জড়ানোর শামিল বলে মনে করেন। তবে শুক্রবার থেকে এ পর্যন্ত ট্রাম্প ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও হামলার পক্ষে সাফাই গেয়ে চলেছেন। তারা বলেছেন, যুদ্ধ বাধাতে নয়, বরং থামাতে সোলাইমানিকে হত্যা করা হয়েছে। কারণ, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ ও স্থাপনায় হামলার পরিকল্পনা করছিলেন।

ইরাকের রাজধানী বাগদাদে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় সোলাইমানিকে হত্যার পর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে রয়েছে ভেদাভেদ ভুলে ইরাকি ও ইরানিদের এককাতারে চলে আসা। এ হামলায় সোলাইমানি ছাড়াও ইরাকের ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাসহ সাতজন নিহত হন। তাদের মরদেহ নিয়ে বাগদাদের রাজপথে শোকযাত্রায় যুক্ত হন লাখো মানুষ। তাতে 'যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংস' কামনা করে স্লোগান দেওয়া হয়। এই বারুদগর্ভ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও স্থাপনায় রাষ্ট্রীয়ভাবে ইরান ছাড়াও তাদের সমর্থকরা হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এমন কি ঘোর শত্রু ইসরায়েলও সুযোগ নিয়ে হামলা চালিয়ে তার দায় ইরানের ঘাড়ে বর্তাতে পারে। যুদ্ধের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে বিশ্বে তেল সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ রুট ইরানের হরমুজ প্রণালি। এর আগে এই প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে হামলা নিয়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধাবস্থা তৈরি হয়েছিল। উপসাগরে আধিপত্য বিস্তারে উদগ্রীব আরেক শক্তি সৌদি আরবও জড়িয়ে যেতে পারে সম্ভাব্য যুদ্ধের চিত্রনাট্যে। সেক্ষেত্রে তেহরানের পাশে দাঁড়িয়ে যাবে লেবাননের শিয়াপন্থি গেরিলা গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুতি, ফিলিস্তিনের হামাস। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের পক্ষে লড়াই করা শিয়াগোষ্ঠীও তার পক্ষে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

এ মুহূর্তে ইরানকে ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রকে খুঁটি বানিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ইরাকি নেতৃত্বের জন্য কঠিনই বটে। শনিবার সোলাইমানির মরদেহ ঘিরে জনসমুদ্র থেকে আওয়াজ উঠেছে, বিদেশি শক্তির হাতে তারা আর শাসিত হতে চান না। ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহাদিও বলেছেন, সোলাইমানিকে হত্যার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য এবং তার বাইরেও যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই আশঙ্কারই প্রতিফলন ঘটেছে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের প্রতিক্রিয়ায়। তিনি বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের আরেকটি যুদ্ধের ধকল সামাল দেওয়ার মতো অবস্থা বিশ্বের নেই। রাষ্ট্রনেতাদের প্রতি সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। শুরুর দিকে এ বিষয়ে নীরব থাকলেও যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ভয়ংকর মোরগ লড়াইয়ে নেমেছে। এই সংকটময় সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জোরালো কোনো অবস্থান নেয়নি। উপরন্তু তারা ইরাকে সহিংসতা বন্ধের মাধ্যমে উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। তবে পম্পেও বলেছেন, সোলাইমানি হত্যায় ইউরোপের সহায়তা যথেষ্ট ছিল না। অন্যদিকে রাশিয়া আগেই উদ্বেগ প্রকাশ করে সোলাইমানি হত্যাকাণ্ডকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি বলে উল্লেখ করেছেন। গতকাল ইরানের অবস্থানকে সমর্থন করে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর কমান্ডার থাকার সময়ে সোলাইমানির সমর্থনপুষ্ট বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক জেনারেল ডেভিড পেট্রাউস। তিনি দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছেন, 'আমার মতে, তিনি (জেনারেল সোলাইমানি) ছিলেন ইরানের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি এবং ইরানের আঞ্চলিক শক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ। এখন নিশ্চিতভাবেই যে প্রশ্নটি সামনে আসছে, সেটি হলো, ইরানি বাহিনী ও তাদের সমর্থক সামরিক গোষ্ঠীগুলো ওই অঞ্চলে এই হামলার প্রতিক্রিয়া কীভাবে দেখাবে?'

তেহরানের লেবাননভিত্তিক মিত্র হিজবুল্লাহও সোলাইমানি হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইরাকের আধাসামরিক বাহিনী বদর অর্গানাইজেশনের প্রধান হাদি আল আমেরি ইরাকের সব বাহিনীকে বিদেশি সেনা বহিস্কার করার আহ্বান জানিয়েছেন। সোলাইমানির ভূমিকার প্রভাব ছড়িয়ে পড়া গাজা ও ইয়েমেনেও তার হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধের ডাক শোনা গেছে। বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চল ও হিজবুল্লাহর শক্ত অবস্থান দাহিয়েহতে রাজপথে বিক্ষোভ হয়েছে।

এদিকে সোলাইমানির ওপর হঠাৎ হামলার লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এপিজে ক্রাউলি বলেছেন, ট্রাম্প কূটকৌশলে বিশেষভাবে দক্ষ নন। মুহূর্তে যে কোনো বিষয় বিশ্বাস করেন তিনি এবং সেই অনুভূতির মাধ্যমে চালিত হন। আমি অবাক হব, যদি তিনি পুরো ঘটনার পরে কী ঘটতে পারে, তা নিয়ে কোনো চিন্তা-ভাবনা করে থাকেন। ইরানের হাতে আধুনিক রকেট ও মিসাইল আছে। বিবিসির বিশ্নেষক জেরেমি বোওয়েন অবশ্য বলছেন, এসব অস্ত্র যদি তারা যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর ওপর প্রতিশোধমূলক হামলার জন্য ব্যবহার করে, তাহলে পরিস্থিতি বরং খারাপ হতে পারে। তারা যদি উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের জাহাজে আক্রমণ চালায়, সেটাও প্রচণ্ড পাল্টা হামলা ডেকে আনতে পারে। ইরানের তেল শোধনাগারগুলো পারস্য উপসাগরে উপকূলের পাশেই এবং যুক্তরাষ্ট্রের যে বিপুল সামরিক ক্ষমতা তাতে এগুলো খুব সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। বোওয়েন তাই মনে করছেন, ইরান 'সামনের দরজা দিয়ে নয়, বরং পাশের জানালা দিয়ে' প্রতিশোধ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তার মতে, এক্ষেত্রে তেহরান 'পরোক্ষ কৌশল' ব্যবহার করবে, যা জেনারেল সোলাইমানি নিজে ব্যবহার করতেন।

যুদ্ধ সত্যি বাধবে কিনা- তা একটা বড় প্রশ্ন। এ বিষয়ে বিবিসির বিশ্নেষক জোনাথন মার্কাস বলেছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো মনে করতে পারেন, একটি নাটকীয় পদক্ষেপ দিয়ে তিনি ইরানকে ভয় পাইয়ে দিতে পারেন। হয়তো তিনি আশা করবেন, তার মিত্র ইসরায়েল ও সৌদি আরবও এখন বুঝবে, যুক্তরাষ্ট্রের এখনও দাঁত-নখ আছে। তবে ইরান যে একটা কড়া জবাব দেবে না, এটা চিন্তা করা ভুল।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com