সাঈদ কোথায়

১৪ জানুয়ারি ২০২০ | আপডেট: ১৪ জানুয়ারি ২০২০

বকুল আহমেদ

মমিনুল হক সাঈদ

আসন্ন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থী হলেও প্রকাশ্যে দেখা যাচ্ছে না এ কে এম মমিনুল হক সাঈদ ওরফে 'ক্যাসিনো সাঈদ'কে। একটি পত্রিকার খবরে বলা হয়, নির্বাচন সামনে রেখে সাঈদ দেশে ফিরেছেন। অবশ্য তাকে ঢাকায় দেখেছেন এমন কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। নির্বাচনী প্রচারেও দেখা যায় না তাকে। বৈধপথে তিনি যে দেশে এসেছেন ইমিগ্রেশনে এরকম কোনো তথ্য নেই বলে জানা গেছে। ফলে তার অবস্থান নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। ভোটারদের প্রশ্ন- কাউন্সিলর প্রার্থী সাঈদ কোথায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাঈদের স্ত্রী ফারহানা আহম্মেদ বৈশাখী গতকাল রাতে ফোনে সমকালকে বলেন, 'আমার স্বামী দেশে আসেননি। তিনি অসুস্থ, সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন।' পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) বিশেষ পুলিশ সুপার শাহরিয়ার আলম (ইমিগ্রেশন) সমকালকে বলেন, সর্বশেষ সাঈদ গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর বিদেশে গেছেন। এরপর ২৩ অক্টোবর তার বিদেশে গমনাগমন নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ইমিগ্রেশন রেকর্ড অনুযায়ী এরপর থেকে স্থলবন্দর, নৌবন্দর এবং বিমানবন্দর দিয়ে তিনি বাংলাদেশে আসা-যাওয়া করেননি।

মমিনুল হক সাঈদ ২০১৫ সালে ডিএসসিসির ৯ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তবে ক্যাসিনোকাণ্ডে তার নাম উঠে আসায় কাউন্সিলর পদ থেকে গত অক্টোবরে বরখাস্ত করা হয় তাকে। এবার নির্বাচনে একই ওয়ার্ডে ফের কাউন্সিলর প্রার্থী হন। এ ওয়ার্ডে তার স্ত্রী ফারহানা আহম্মেদ বৈশাখীও কাউন্সিলর প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মতিঝিল, আরামবাগ, ফকিরাপুল, দিলকুশা ও বঙ্গভবন এলাকা নিয়ে ৯ নম্বর ওয়ার্ড। এবার আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাননি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের বহিস্কৃত যুগ্ম সম্পাদক সাঈদ। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন। এই ওয়ার্ডে মোট কাউন্সিলর প্রার্থী পাঁচজন।

স্থানীয় লোকজন জানিয়েছেন, ওয়ার্ডের কোথাও নির্বাচনী প্রচারে সাঈদের পোস্টার-ব্যানার নেই। মাঠেও তিনি অনুপস্থিত। নির্বাচন থেকে তিনি সরে দাঁড়ালেন কিনা তাও নিশ্চিত নয় এলাকাবাসী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন বলেন, সাঈদ এক সময় বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। মতিঝিল এলাকার গাড়ির চোরাই তেলের ব্যবসা করতেন। বিএনপি ক্ষমতা হারালে ডিগবাজি দেন। 'তেল সাঈদ' হিসেবে পরিচিতি পাওয়া সাঈদ হয়ে ওঠেন যুবলীগ নেতা। ধীরে ধীরে মতিঝিল এলাকায় গড়ে তোলেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। নিয়ন্ত্রণে নেন পুরো মতিঝিল এলাকা। সাঈদ এবং তার ক্যাডার বাহিনীর কারণে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেন এলাকাবাসী। অবশ্য ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের আগে তার বিরুদ্ধে কারও কথা বলার সাহস ছিল না।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর ক্যাসিনোবিরোধী ও শুদ্ধি অভিযানে নামে র‌্যাব। ক্যাসিনোর ঘটনায় ওই দিন র‌্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হন ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। গ্রেপ্তারের পরই তাকে দল থেকে বহিস্কার করা হয়। খালেদ মতিঝিলের ইয়ংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনো নিয়ন্ত্রণ করতেন। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে র‌্যাব ক্যাসিনো-সংক্রান্ত বিস্তর তথ্য পায়। ক্যাসিনোর সঙ্গে কারা জড়িত, ক্যাসিনোর টাকার ভাগ কারা কীভাবে পান সেসব তথ্যও উঠে আসে র‌্যাবের কাছে। ফলে পর দিন ১৯ সেপ্টেম্বর যুবলীগের আরেক প্রভাবশালী নেতা ও ঠিকাদার জগতের মাফিয়া জি কে শামীমকে নিকেতনের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। দু'জন গ্রেপ্তার হওয়ার পর ক্যাসিনো-সংক্রান্ত বিষয়ে আলোচনায় আসে দক্ষিণ যুবলীগের বহিস্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, সহসভাপতি আরমান, সোহরাব হোসেন স্বপন, সরোয়ার হোসেন মনা, এ কে এম মমিনুল হক সাঈসহ অনেকের নাম। এরপর থেকেই মমিনুল হক সাঈদ পরিচয় পান 'ক্যাসিনো সাঈদ' হিসেবে। অভিযানের আগেই ২ সেপ্টেম্বর হকি দল নিয়ে মালয়েশিয়ায় যান সাঈদ। অভিযান শুরুর পর গ্রেপ্তার আতঙ্কে তিনি আর দেশে ফেরেননি। সিঙ্গাপুরে আত্মগোপন করেন বলে সে সময় জানা গিয়েছিল।

ডিএসসিসির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, সাঈদ সিটি করপোরেশনেও প্রভাব খাটাতেন। কাউন্সিলর হয়েও তিনি সিটি করপোরেশনের বোর্ড সভায় যেতেন না নিয়মিত। ক্যাসিনো কারবার ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। এসব কারণে গত অক্টোবরে তাকে কাউন্সিলর পদ থেকে বহিস্কার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা দায়ের করেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ক্যাসিনোবিরোধী ও শুদ্ধি অভিযানে সম্রাট, খালেদ, জিকে শামীমসহ ১১ জন গ্রেপ্তার হওয়ার পর অভিযান অনেকটা শিথিল হয়ে যায়। তবে গতকাল সোমবার গেণ্ডারিয়া থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি এনামুল হক ওরফে এনু ভূঁইয়া ও তার ভাই যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রুপন ভূঁইয়াকে গ্রেপ্তার করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। গতকাল অভিযানের পর ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িতদের মধ্যে আবার গ্রেপ্তার আতঙ্ক ভর করেছে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)