আবারও দেড় ডজন বিতর্কিত কাউন্সিলর

০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ | আপডেট: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০

অমিতোষ পাল

বিতর্কিত যারা কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন, তারা অনেক অর্থবিত্তের মালিক। মনোনয়নও বাগিয়েছেন তারাই। পরে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে কাউন্সিলরও হয়েছেন- ড. বদিউল আলম মজুমদার ,সম্পাদক, সুজন

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. শফিকুল ওরফে গোল্ডেন শফিক এবারও আওয়ামী লীগ থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে বিমানবন্দরে স্বর্ণ চোরাচালান, কার পার্কিং স্পেস দখলে রাখা, কোরবানির পশুর হাটের দখল, অবৈধ পশুর হাট স্থাপন, চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। আর স্বর্ণ চোরাচালানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ থাকায় এলাকাবাসী তাকে গোল্ডেন শফিক হিসেবে ডাকেন। তার পরও তিনি সম্প্রতি ডিএনসিসির নির্বাচনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। কেবল গোল্ডেন শফিকই নন, এ রকম নানা অভিযোগে অভিযুক্ত ও আলোচনা-সমালোচনার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক ডজনের বেশি এবারও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে মো. শফিক সমকালের কাছে দাবি করেন, তার এলাকায় আওয়ামী লীগের তিন-চারজন নেতা আছেন। তারাই এসব তার বিরুদ্ধে বলে বেড়ান। এলাকাবাসীর কাছে খোঁজ নিলে জানতে পারবেন আসলে তিনি কতটা ভালো মানুষ। এ কারণেই এবার কাউন্সিলর পদে রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন। ৯ হাজার ১৫৬ ভোট পেয়ে তিনি বিজয়ী হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ৫৭০ ভোট। কারণ যারা মসজিদের টাকা চুরি করে খায়, এলাকাবাসী তাদের চিনে ফেলেছে। তাদের ভোট দেয়নি।

একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ২ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর আনিসুর রহমানের বিরুদ্ধেও অভিযোগের অন্ত ছিল না। বনশ্রী-গোড়ান এলাকায় ঝিল ভরাট করে দখল, অন্যের জায়গা দখল, সন্ত্রাসী বাহিনী লালন, মাদক ব্যবসা, কিশোর গ্যাং পালনের মতো অভিযোগ থাকলেও এবারও তিনি আওয়ামী লীগ থেকে সমর্থন পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। এমনকি নির্বাচনের প্রচার চলাকালে এক প্রার্থীর ওপর হামলারও অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ প্রসঙ্গে আনিসুর রহমান সমকালকে বলেন, এবার তিনি সাত হাজার ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। প্রদত্ত ভোটের তুলনায় গতবারের চেয়ে আরও অনেক বেশি ভোট পেয়েছেন। ডিএসসিসির কোনো কাউন্সিলরই এত ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হতে পারেননি। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে তার সম্পর্কে যা লেখা হয়েছে, তার সবই মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

ডিএসসিসির ৬ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সিরাজুল ইসলাম ভাট্টির বিরুদ্ধেও অভিযোগের অন্ত ছিল না। তিনিও এবার সরকারি দলের সমর্থনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। কারণ সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম ভাট্টি বলেন, যারা নেতিবাচক চরিত্রের মানুষ, যারা বিএনপি-জামায়াত থেকে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী, যারা এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক, কিশোর গ্যাং, জমি দখলসহ নানা অপকর্ম-কুকর্মের সঙ্গে যুক্ত, তারাই এসব কথা বলে তার বিরুদ্ধে। তারাই এসব কথা বলে কিছু সাংবাদিককে দিয়ে নির্বাচনের আগে রিপোর্ট করিয়েছে। কিন্তু বুকে সাহস রেখেছিলেন। এ জন্য সাধারণ মানুষেরও প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। কোনো অপশক্তি তাকে দমাতে পারেনি। এ জন্যই গতবারের চেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন বলে দাবি তার।

বিতর্কিতদের আবারও কাউন্সিলর নির্বাচিত হওয়া সম্পর্কে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সমকালকে বলেন, এ রকম বিতর্কিত যারা কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন, তারা অনেক অর্থবিত্তের মালিক। মনোনয়নও বাগিয়েছেন তারাই। পরে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করে কাউন্সিলরও হয়েছেন। অল্প ভোটে কাউন্সিলর হওয়ার কারণে তাদের আরও সুবিধা হয়েছে। অল্পসংখ্যক ভোটারকে কব্জায় রেখে তাদের দিয়ে ভোট দিয়েছেন। ইতোমধ্যে কোনো কোনো জায়গায় তো অভিযোগও উঠেছে। এরা আবার কাউন্সিলর হওয়ার কারণে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবেন। কিন্তু কিছু করার নেই। এটাই আমাদের নিয়তি।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ বলেন, যাদের বিতর্কিত বলা হয় তারা তো জনগণের ভোটেই নির্বাচিত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সমর্থন দিলেও জনগণ তাদের তো প্রত্যাখ্যান করেনি। জনগণের বিচারে তারা জনপ্রতিনিধি হওয়ার যোগ্য নিশ্চয়ই।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, কাউন্সিলরদের বিষয়টি বেশ আলোচিত। তবে যতক্ষণ পর্যন্ত বিতর্কিত কাউন্সিলরদের অপরাধ প্রমাণিত হবে না, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের নির্বাচনের বাইরে রাখার এখতিয়ার নির্বাচন কমিশনের নেই। রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ তাদের সমর্থন না দিলেও পারত। এটি নৈতিক হয়নি।

দেখা গেছে, এ রকম নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও একজন প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি হলেন ডিএসসিসির ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আরিফ হোসেন ছোটন। তার বিরুদ্ধে বাড়ি দখল, নীলকুঠির জায়গায় দোকান বানিয়ে বরাদ্দ, বাংলাবাজার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজিসহ আরও অনেক অভিযোগ ছিল। তিনিও নির্বাচিত হয়েছেন। যদিও তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ওঠে নির্বাচনের মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রার্থী নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র দাখিলের আগের দিন নিখোঁজ হয়ে যান। পরে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থেকে তাকে উদ্ধার করে পুলিশ। অবশ্য এ প্রসঙ্গে আরিফ হোসেন সমকালের কাছে দাবি করেছিলেন, বিষয়টির সঙ্গে তিনি একেবারেই জড়িত নন। তিনি জানতেনও না।

এ ছাড়া ডিএসসিসির ৫১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান হাবুর বিরুদ্ধেও বিস্তর অভিযোগ ছিল। ২০১৬ সালে ডিএসসিসি সায়েদাবাদে অবৈধ ট্রাকস্ট্যান্ড উচ্ছেদ করতে গেলে তিনি বাধা দেন ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে লাঞ্ছিত করেন। ওই ঘটনায় স্থানীয় সরকার বিভাগ তাকে কাউন্সিলরের পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। এবারও তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে পরিবহনে চাঁদাবাজি ও সায়েদাবাদ-শ্যামপুর এলাকায় দখলের অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

গুলিবর্ষণের মধ্য দিয়ে নিজের বাড়িতে নববধূকে বরণ করে নেওয়ায় আলোচনায় আসা ও বিমানবন্দর এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত ডিএনসিসির ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনিসুর রহমান নাঈম এবার নিজ দল আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পাননি। তার পরও দলের বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে তিনি জয়ী হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে দখল বাণিজ্য; বিমানবন্দর, কাওলা, শিয়ালডাঙ্গা, গাওয়াইরসহ আশপাশের এলাকায় দখল ও চাঁদাবাজি, পাবলিক টয়লেট, মসজিদ কমপ্লেক্স, ফুটপাত, রাস্তা, সাইনবোর্ড, খাসজমি ও সাধারণ মানুষের জমি দখলসহ বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

ডিএনসিসির ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ফরিদুর রহমান খান ইরানের বিরদ্ধে ইন্দিরা রোডে পরিবহনে চাঁদাবাজি, কোচিং বাণিজ্য, তেজগাঁও কলেজে আধিপত্য বিস্তার, বাড়ি দখল, সন্ত্রাসী বাহিনী লালনসহ অনেক অভিযোগ ছিল। এবারও তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থনে বিজয়ী হয়েছেন। অনেকে তাকে ফার্মগেট এলাকার 'অঘোষিত রাজা' হিসেবেও উল্লেখ করেন।

ডিএনসিসির ৩৭ নম্বর ওয়ার্ডের জাহাঙ্গীর আলমের বিরুদ্ধে জলাশয় ভরাট, চাঁদাবাজিসহ আরও অনেক অভিযোগ ছিল। ক্যাসিনোকাণ্ডের পর থেকেই তিনি থাকতেন সাবধানে। এবারও তিনি সরকারি দলের সমর্থনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।

এ ছাড়া ডিএনসিসির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী জহিরুল ইসলাম মানিকের বিরুদ্ধে বাড়ি ও জমি দখল, চাঁদাবাজিসহ অনেক অভিযোগ ছিল। এসব অভিযোগের কারণেই এবার আওয়ামী লীগ তাকে সমর্থন দেয়নি। দলীয় সমর্থন না পেয়ে বিদ্রোহী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়ে যান। একইভাবে ডিএনসিসির ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের আলোচিত-সমালোচিত কাউন্সিলর হুমায়ুন রশিদ জনিও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে কাউন্সিলর হয়েছেন। ২৯ নম্বর ওয়ার্ডের সলিম উল্লা সলুও বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে কাউন্সিলর হয়েছেন। এ ছাড়া ডিএনসিসির ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের ফোরকান হোসেন, ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুর রউফ নান্নু, ৬ নম্বর ওয়ার্ডের তাইজুল ইসলাম, ডিএসসিসির ৪৩ নম্বর ওয়ার্ডের আউয়াল হোসেন, ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডের আবু সাঈদ, ৫৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাইদুল ইসলাম, ৫৯ নম্বরের আকাশ কুমার ভৌমিক কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)