সমাজকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছি

সমকালীন প্রসঙ্গ

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০ । ০১:২২ | প্রিন্ট সংস্করণ

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ

রাজনৈতিক নেতারা তো বটেই, আমরাও বলে যাচ্ছি, আমাদের জিডিপি বা জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি শতকরা আট ভাগের বেশি, যা এতদঞ্চলে সর্বাধিক এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর কাছে ঈর্ষণীয়! কিন্তু প্রবৃদ্ধিটা কাদের? নাগরিক-জনসাধারণের নাকি শতকরা দু-চার ভাগ অসাধারণ ধনীদের। তাদের মধ্যে কতজন স্বাভাবিক উদ্যোক্তা আর কতজন লুণ্ঠনকারী, সে পরিসংখ্যান আমাদের জানা নেই। গবেষণা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে জনগণের ধারণা সুস্পষ্ট। আজ সে কথা থাক।

বছরের ৩৬৫ দিনই জাতীয় গণমাধ্যমে অনেক সংবাদ প্রকাশিত হয়, যা সমাজের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। বছরের মাত্র একটি দিনে ২০২০ সালের ২৫ জানুয়ারি তারিখের জাতীয় দৈনিকগুলোর মধ্যে মাত্র একটিতে (সমকাল) প্রকাশিত তিনটি সংবাদের প্রতি নাগরিক সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

পত্রিকাটির দশম পৃষ্ঠায় খবর হলো, 'বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল ছেলে'। বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলায় বদিউজ্জামান মিঠু তার বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বাবা-মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। হাড় কাঁপানো তীব্র শীতের মধ্যে মা-বাবার ঠাঁই হয়েছে বাড়ির সামনে খোলা আকাশের নিচে। সম্পত্তি লিখে না দেওয়ার কারণে একমাত্র ছেলে তাদের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন বাবা শেখ আব্দুল মমিন (৭৫) এবং মা রিজিয়া বেগম (৬৫)। খবরটি বিশ্নেষণ করলে দাঁড়ায়, অর্থের অভাবে নয় বরং সম্পত্তির লোভে ছেলের এই কাণ্ড। স্বল্পকাল আগে এ ধরনের আরেকটি খবর পড়েছিলাম একসঙ্গে কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে। এক বুড়িমাকে গোয়ালঘরে শুতে দিয়ে ছেলে পৈতৃক ঘরেই থাকে। রাতে শিয়াল এসে গোয়ালঘরের মাটিতে শুয়ে থাকা বৃদ্ধার পা কামড়ে ধরে টানাটানি করতে থাকে। বৃদ্ধার চিৎকারে ছেলে না এলেও পাড়া-পড়শিরা এসে বৃদ্ধাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। বৃদ্ধার তিন ছেলে- সবাই কাজকর্ম করে, উপার্জন করে; কিন্তু মাকে কাছে রাখতে নারাজ। ঘটনা দুটি থেকে কী প্রকাশ পাচ্ছে! ৫০ বছর আগের বাংলাদেশে এমনটা কল্পনার বাইরে ছিল। যে মা সন্তানকে আদর-যত্নে বড় করেছেন, যে মায়ের পায়ের নিচে বেহেশত, সেই মাকে ঘর থেকে বাইরে বা গোয়ালঘরে রেখে আসবে, আমি এ সমাজে এমনটা আগে দেখিনি তখন। তখন মানুষ অনেক দরিদ্র ছিল এবং মাতৃছায়াতেই অবস্থান করত। জাতীয় আয় বেড়েছে। মাথাপিছু গড় আয় বেড়েছে। তবু কেন মা-বাবাকে অবজ্ঞা? মাতৃভক্তি বাদ দিলাম, মায়ের প্রতি সামান্য কর্তব্যবোধ কোথায় গেল? সাম্প্রতিক সময়ে মা-বাবার দেখাশোনার জন্য আইন প্রণীত হয়েছে। কিন্তু আইন না থাকার সময়ে যা হয়নি, এখন তো আইন অমান্য করেই তেমনটা হচ্ছে। কারণ খুঁজতে অনেক গভীরে যেতে হবে।

সমকাল পত্রিকার শেষ পৃষ্ঠায় খবর বেরিয়েছে- 'নোয়াখালীতে মায়ের পিটুনিতে মেয়ের মৃত্যু'। নোয়াখালীর চাটখিলে অষ্টম শ্রেণির স্কুলছাত্রী মারিয়া আখতারকে পিটিয়ে হত্যা করেছে তার মা মনি আক্তার। মা সকালে মেয়েকে নাশতার জন্য রুটি তৈরি করতে বলে। মেয়েটি তা করেনি। ক্ষিপ্ত হয়ে মা তাকে লাঠিপেটা শুরু করলে মাথায় আঘাত লেগে মেয়ে অচেতন হয়ে পড়ে এবং সহসাই তার মৃত্যু ঘটে। স্বল্পকাল আগে পত্রিকার খবরে জেনেছিলাম, একজন মা তার দুই শিশুসন্তানকে গলাটিপে মেরে ফেলেছিল। পরে জবানবন্দি দিতে গিয়ে মায়ের বক্তব্য ছিল, তিনি কেন নিজ সন্তানদের মেরে ফেললেন, তা তিনি জানেন না। পত্রিকায় লেখা হয়েছিল, মা সম্ভবত ঈষৎ অপ্রকৃতিস্থ। বড় সন্তানটির বয়স ছিল ৭ বা ৮, ছোটটি ৩-৪ বছর। এত বছরে স্নেহ-মমতার যেমন অভাব হয়নি, তেমনি এত বছর পর এই নির্মমতার কারণ কী? পরিবারটি দারিদ্র্য ছিল না। মনোমালিন্যও নাকি ছিল না পরিবারে। তাহলে কারণ কী? কারণ খুঁজতে অনেক গভীরে যেতে হবে।

তৃতীয় খবরটি বেরিয়েছে পত্রিকার সপ্তম পৃষ্ঠায়- 'বগুড়ায় চুল কাটার সিরিয়াল নিয়ে যুবক খুন'। বগুড়া সদরের নুনগোলা এলাকায় দুর্বৃত্তরা আবু সাঈদ নামক একজন ব্যবসায়ীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে। নুনগোলা বাজারের একটি সেলুনে আগে-পিছে চুল কাটার সিরিয়ালকে কেন্দ্র করে দুই যুবকের বাগ্‌বিতণ্ডা হয়। সেখানে উপস্থিত আবু সাঈদ উভয়কেই বাগ্‌বিতণ্ডা না করে বরং অন্যত্র যেতে বলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে ঝগড়ালিপ্ত দু'জনের একজন বেরিয়ে যায় এবং কিছুক্ষণ পর দলবলসহ এসে আবু সাঈদকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করতে থাকে। তার চিৎকারে স্থানীয়রা ছুটে এলে আঘাতকারীরা পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত আবু সাঈদ পরে মারা যান। ঝগড়া তো হতেই পারে। হয়েও থাকে; কিন্তু এই ঘটনাটির কারণ এবং পরিণতি কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? সেলুনে যে আগে আসে, সেই তো আগে চুল কাটবে। পরে এসে আগে চুল কাটাতে চাইলে মনোমালিন্য হতে পারে, বিবাদ থেকে ঝগড়াও হতে পারে। উপস্থিত অন্য কেউ ঝগড়া না করার অনুরোধ করতেই পারে। অতঃপর বাইরে থেকে গুণ্ডা এনে ঝগড়াকারীকে নয়, বরং তৃতীয় ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাত করার ঘটনাটি কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? 

ঘটনা তিনটি একসঙ্গে উপস্থাপনের উদ্দেশ্য হলো পাঠকদের চিন্তাশক্তি জাগ্রত করা। কেন এমনটা ঘটছে? এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যায় না। কারণ ঘটনা তিনটি একটিমাত্র জাতীয় দৈনিকে এক দিনেই বেরিয়েছে। ঘটনাগুলো ঘটছে। অহরহ ঘটছে। যুক্তিহীনভাবে ঘটছে। আস্বাভাবিকভাবে ঘটেই যাচ্ছে। যদি এক মাস ধরে জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত এ ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনাগুলো একত্র করা যায়, তাহলে সামাজিক অস্থিরতার ব্যাপকতা এবং গভীরতা ফুটে উঠবে।

ঘটনাগুলো যে দারিদ্র্যের জন্য নয় এবং অর্থাভাবে হয়নি, সে তো পরিস্কার। ব্যক্তিগত বিরোধের কারণেও ঘটেনি। অসুস্থতার জন্যও ঘটেনি। কেউ বলবেন, সমাজে পচন ধরেছে। কেউ বলবেন, সমাজ পাল্টে গেছে। কেউ বলবেন, দেশীয় নৈতিকতা-নীতিবোধ শিথিল হয়ে পড়েছে। কিন্তু কেন? অস্বাভাবিক পরিবেশে মানুষ অস্বাভাবিক আচরণ করে। দোষটা আচরণের নয়, বরং পরিবেশ-পরিস্থিতির। আগে আমরা যখন সবাই কমবেশি দরিদ্র ছিলাম, তখন বৈষম্য ছিল কম। তাই দারিদ্র্য আমাদের স্নেহ-ভালোবাসা, সহানুভূতি, মানবতা কেড়ে নিতে পারেনি। কিন্তু যখন জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হলো, মাথাপিছু গড় আয় দাঁড়াল প্রায় দুই হাজার ডলারে অর্থাৎ দেড় লাখ টাকার ওপর, তখন সমতা ভেঙে গেল। ধরা যাক, দু'জন পথশিশু একসঙ্গে রাস্তায় থাকে। একসঙ্গে খায়। একসঙ্গে উপোস করে। ওদের একজন লুটপাট করে 'মূলধন' জোগাড় করল। তারপর ব্যাংক লুট করে এবং কন্ট্রাক্টরিতে কাজ না করেই ঘুষ দিয়ে বিল নিয়ে বিরাট বড়লোক হয়ে গেল। ওদের বন্ধুত্ব কি আর থাকবে? দু'জনের 'মূল্যবোধ' কি একরকম হবে? যে ধনী হয়েছে, সে আরও ধনী কী করে হবে, কার মাথা ফাটাবে, কার সম্পদ লুট করবে- এ চিন্তাই তার থাকবে। অন্যজনের মধ্যে 'অবিচার' দেখে হিংসা-বিদ্বেষ জেগে উঠবে, হিংস্রও হয়ে উঠতে পারে। এটি একটি উপমা মাত্র। জাতীয় আয়ের প্রবৃদ্ধিতে স্টম্ফীত হয়েছেন শতকরা দু-চারজন। বাকি ৯৬ বা ৯৮ জনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে সামান্যই। একটি বড় অংশের ক্ষেত্রে মুদ্রাস্টম্ফীতির সমান বা একটু ওপরে। অনেকে মুদ্রাস্টম্ফীতি সামাল দিতে পারেনি। জনপ্রতি গড় আয় কারও প্রতিই প্রযোজ্য নয়। এটি একটি ধাঁধা মাত্র। এটাকেই বলা হয় অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মানুষ অস্বাভাবিক আচরণ করছে। বলা যেতে পারে, মানুষের হাতের পাঁচটা আঙুলও তো সমান নয়। ঠিক কথা। এ কথাও তো ঠিক যে, একটি আঙুল ২৫ ইঞ্চি লম্বা এবং চারটি আঙুল তিন-চার ইঞ্চি- এমন অস্বাভাবিক ঘটনা প্রকৃতিতে নেই। মানুষ যখন প্রকৃতিবিরোধী আচরণ করে, তখন সমাজ অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশে এখন সেটাই ঘটছে। বঙ্গবন্ধুর অর্থনীতির সমতাভিত্তিক সুষম আয়-সম্পদ বণ্টন ব্যবস্থা প্রবর্তিত না হলে, বাংলাদেশ হয়ে উঠবে অশান্তির বাংলাদেশ।

সাবেক ডেপুটি গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com