রোমান সাম্রাজ্যে ফারিয়া

পায়ের তলায় শর্ষে

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০ । ১৪:৩৩ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০ । ১৪:৫৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

নুসরাত ফারিয়া

নুসরাত ফারিয়া

অভিনয়ের জগতে যাদের চলাফেরা, তাদের অনেকেরই এক দেশ থেকে আরেক দেশে ছুটে বেড়াতে হয়। কাজের প্রয়োজনে এই ছোটাছুটি লেগেই থাকে। নিজের কথাই বলি, আমার প্রথম ছবি 'আশিকী' দিয়ে শুরু হয়েছিল পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়ানো। লন্ডনের অলিগলি চষে বেড়াতে হয়েছে 'আশিকী' ছবির গানের দৃশ্যধারণের জন্য। ব্রিটিশ রাজের এই দেশ নিয়ে কল্পনায় অনেক ছবি আঁকা ছিল। ছোটবেলা থেকে পড়া নানা ধরনের গল্প, ইতিহাস আর বিভিন্ন ছবিতে দেখা ইংল্যান্ডের একটি অবয়ব মনের মধ্যে গেঁথে গিয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়। একুশ শতকে দেখা ইংরেজদের দেশটা একটু অন্যভাবে ধরা দিয়েছিল চোখে। তাই কল্পনার সঙ্গে খুব একটা মেলাতে পারিনি। কিন্তু এটাও সত্যি যে, আধুনিকতার ছোঁয়া লন্ডন শহরের খোলস পুরোপুরি বদলে দিতে পারেনি। ঐতিহ্যের ছাপ নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

ব্রিটিশ মিউজিয়াম, চিড়িয়াখানা, লন্ডন টাওয়ার, উন্ডসর ক্যাসেল, অ্যাবে ক্যাথেড্রাল, ট্রাফালগার স্কয়ার, সামারসেট হাউস তার বড় প্রমাণ। ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনে বেশ কয়েকবার যাওয়া হয়েছে। 'বাদশা' ছবির শুটিংও করেছি লন্ডনে। শুটিংয়ের ফাঁকে যতটুকু সময় পেয়েছি, ঘুরে বেড়িয়েছি সেখানে। টেমস নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকা, লন্ডন আইয়ের চক্রযানে উঠে শহরজুড়ে ব্যস্ত মানুষের ছুটে বেড়ানো দেখার অনুভূতি বলে বোঝানো যাবে না।

ব্রিটিশদের অনেক আগে পৃথিবী শাসন করেছেন রোমানরা। যদিও তাদের অনেক কিছু কালের গর্ভে হারিয়ে গেছে। কিন্তু কিছু চিহ্ন এখনও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে নানা দিকে। রোমান সাম্রাজ্য দেখা এবং ভ্রমণের জন্য ইতালিকে বেছে নিতে চাই যে কোনো সময়। ২০১৭ সালে পরিচালক আশোক পাতির 'ইন্সপেক্টর নটি কে' ছবির শুটিংয়ের জন্য ইতালি গিয়েছিলাম। ব্যস্ততার কারণে প্রিয় অনেক জায়গা ঘুরে দেখার সুযোগ পাইনি। হয়তো এ কারণেই এই দেশটি বারবার আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। প্রাচীন রোমের দ্য কলোসিয়াম অ্যাম্ম্ফিথিয়েটারের দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকলেও কখনও ক্লান্তি ভর করবে বলে মনে হয় না। কারণ একটাই- সম্রাট ভেসপাশিয়ানের ছেলে তিতুসের নির্মিত এই অ্যাম্ম্ফিথয়েটার কালের সাক্ষী হয়ে কীভাবে রোমের বুকে দাঁড়িয়ে আছে তা প্রতিনিয়ত বিস্ময় জাগায়।

একই রকমভাবে বিস্ময় জাগায় জলের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা ইতালির আরেক শহর ভেনিস। কত শতাব্দী কেটে গেছে, তবু এই শহরের সৌন্দর্য্য এতটুকু ম্লান হয়নি। সমুদ্রকূলে দাঁড়িয়ে থাকা অনেকে সুন্দর শহর আছে। কিন্তু ভেনিস সেসব শহর থেকে যেন একেবারেই আলাদা। আর এই আলাদা হয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে চারটি ব্রিজ দিয়ে ঘেরা গ্র্যান্ড ক্যানেলের জন্য। ভাবলে অবাক লাগে, বিশাল এই ক্যানেল ছাড়াও দেড়শ'র বেশি খাল রয়েছে শহরজুড়ে। তাই তো নৌকায় ভ্রমণ ভেসিনের অন্যতম আকর্ষণ। জলের বুকে ভেসে বেড়ানো যে কী আনন্দের তা ইতালির এই শহরে এলেই নতুন করে বোঝা যায়।



ভেনিস ছাড়াও আমালফি উপকূল, পোর্টোফিনো সমুদ্রবন্দর, ইউফিজি গ্যালারি, পিসার হেলানো টাওয়ার ছাড়াও অনেক কিছু আছে দেখার মতো। শুধু ইতালি নয়, ইউরোপজুড়ে আছে ভাষা, সংস্কৃতি, উৎসব, ঐতিহ্য রকমারিতা। যদিও বেশিরভাগ দেশে সফরটা ব্যয়বহুল, তবু যা আছে ইউরোপে, তা অন্য দেশে নেই। তাই তো সুযোগ পেলে সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, জার্মানিসহ ইউরোপের যে কোনো দেশে ভ্রমণের জন্য বেরিয়ে পড়তে প্রস্তুত।

শুধু যে ইউরোপ ভ্রমণের প্রতি দুর্বলতা আছে, তা নয়। পাশের দেশ ভারতে ঘুরে বেড়াতেও দারুণ লাগে। একবার তো পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভারতের গোয়ায় বেড়াতে গিয়েছিলাম। ভারত এমন একটি দেশ, যেখানে অনেক ভাষাভাষীর মানুষ থাকে। যাদের সংস্কৃতি, ধর্মীয় রীতিনীতি, সামাজিক জীবনযাপন সবই অন্যদের থেকে একেবারে আলাদা। তাই তো পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়েছে, তার সঙ্গে দক্ষিণ ভারত, মধ্য প্রদেশ, মহারাষ্ট্র ভ্রমণের অভিজ্ঞতার সঙ্গে মেলানো যায় না।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব দেশের সঙ্গে এখানেই ভারতের অমিল। ঋতুবৈচিত্র্যেও ভারত অনেকটাই আলাদা। এ দেশে আপনি মরুভূমির দেখা যেমন পাবেন, তেমননি পাবেন বরফ ঢাকা পাহাড় চূড়ার দেখা। দার্জিলিং, সিকিম ভ্রমণে যে অভিজ্ঞতা হবে, তার সঙ্গে কেরালার নৌপথে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ কোনোভাবেই মেলানো যাবে না। তাই তো শুটিং ছাড়াও যখন তখন ভারত ভ্রমণে বেরিয়ে পড়ার নেশায় পরিণত হয়েছে।

ভ্রমণ শুধু যে আনন্দ দিয়েছে তা নয়, কিছুটা মন খারাপও করিয়ে দিয়েছে। জন্মদিন ও ঈদের মতো আনন্দের মুহূর্তগুলো শুটিংয়ের জন্য ভিন দেশে কাটাতে হয়েছে। তাও একবার নয়, বেশ কয়েকবার। তারপরও সেই কষ্ট মেনে নিয়েছি, ভালো কিছু করে দেখানোর জন্য। অভিনয়শিল্পী হিসেবে এটুকু ত্যাগ স্বীকার না করলেই নয়। এ কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি বলেই কাজের মাঝেই দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ খুঁজে নিয়েছি।

মনে আছে জাকির হোসেন রাজুর 'প্রেমী ও প্রেমী' ছবির শুটিংয়ে বান্দরবান থাকার মুহূর্তগুলো। অসুস্থতা নিয়েও দিন-রাত শুটিং করেছি। কিন্তু যখনই সবুজের বুকে তাকিয়েছি, তখন শরীরের কষ্ট উধাও হয়ে গেছে। আমাদের দেশটা যে কত সুন্দর তা ঘুরে না দেখলে জানা হবে না কারও। বান্দরবান ছাড়াও কক্সবাজার, সেন্টমার্টিন, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, সুন্দরবনসহ অনেক জায়গা আছে যেখানে গেলে মন আপনা-আপনি ভালো হয়ে যায়। তাই পৃথিবীর যে প্রান্তেই যাই না কেন মন পড়ে থাকে আপন দেশে।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com