ছেলেকে খোঁজ করেই অচেতন জান্নাত

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০ । ২১:১৭ | আপডেট: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০ । ২২:১৬

সমকাল প্রতিবেদক

মগবাজারে বাড়িতে লাগা আগুন কেড়ে নিয়েছে জান্নাত-রনি দম্পতির একমাত্র ছেলে রুশদিকে। তারা দু'জনও লাইফ সাপোর্টে। -ফাইল ছবি

'আমি কোথায়? আমার ছেলে কই? রনিকে (স্বামী) দেখছি না কেনো?', রাজধানীর মগবাজারে বাড়িতে লাগা আগুনে দগ্ধ জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত (৩৮) হাসপাতালের বেডে জ্ঞান ফেরার পর মৃদুস্বরে খালাত বোনের কাছে এভাবেই ছেলে ও স্বামীর কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন। মিনিট দুয়েকের মধ্যে আবার অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। আর জ্ঞান ফেরেনি। তাকে তার স্বামী শহিদুল কিরমানি রনিকে রাখা হয়েছে লাইফ সপোর্টে। 

বৃহস্পতিবার ভোরে রাজধানীর মগবাজারের দিুলরোডের একটি বাড়িতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে তাদের চার বছরের ছেলে এ কে এম রুশদিসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এ আগুনে তারা স্বামী-স্ত্রী দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। জান্নাতের শরীরের ৯৫ শতাংশ ও রনির ৪৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের অবস্থা সঙ্কটাপন্ন। 

এখানে পুড়ে কয়লা হয়ে যায় জান্নাতের ছেলে রুশদিসহ তিনজন। ছবি: সমকাল

মারা যাওয়া অপর দু'জন হলেন- এইচএসসি পরীক্ষার্থী আফরিন জাহান যুঁথী (১৭) ও আব্দুল কাদের লিটন (৪০)। এ অগ্নিকাণ্ডে ধোঁয়ায় অসুস্থ হয়েছেন ওই বাড়ির আরও চার বাসিন্দা। তারা হলেন- কাঁচামাল ব্যবসায়ী মনির হোসেন (৪০), তার স্ত্রী সুমাইয়া আক্তার (৩০), ছেলে মাহমুদুল হাসান (৯ মাস) ও মাহাদি হাসান রিফাত (৯)। মনির হোসেন পরিবার নিয়ে পাঁচতলায় থাকেন। 

জান্নাতের মামাত বোন রেশমি জানান, সকাল সাড়ে ১০টায় জান্নাতের জ্ঞান ফেরে। এরপরই তিনি ছেলে ও স্বামীর খবর জানতে চান। ছেলের মৃত্যু এবং স্বামীর দগ্ধ হওয়ার কথা তাকে জানানো হয়নি। মিনিট দুয়েকের মধ্যে আবার অচেতন হয়ে পড়েন জান্নাত। আর জ্ঞান ফেরেনি। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। দুপুর একটার দিকে জান্নাতের স্বামী রনি স্বজনদের কাছ থেকে ছেলের মৃত্যুর খবর পান। সোয়া একটার দিকে রনিও অচেতন হয়ে পড়েন। দেড়টার দিকে তাকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়। 

এর আগে রনি স্বজনদের জানিয়েছেন, আগুনের খবর পেয়ে স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে তিনি নিচে নামার চেষ্টা করেন। ছেলে রুশদি তার কোলে ছিল অন্ধকার সিঁড়িতে তিনি পা পিছলে পড়ে যান। এসময় রুশদি কোল থেকে ছিটকে পড়ে। হামাগুড়ি দিয়ে ছেলেকে খোঁজার চেষ্টা করেন। কিন্ত ছেলেকে পাননি। এরই মধ্যে স্বামী-স্ত্রী ও দগ্ধ হন।

বাড়িটির তৃতীয় তলায় জান্নাত-রনি দম্পতি ভাড়া থাকেন। আফরিন জাহান যুঁথী পাঁচতলায় বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকতেন এবং আব্দুল কাদের লিটন থাকতেন ভবনের নিচতলার একটি কক্ষে। তিনি ওই ভবনের ২য় তলার ক্লাসিক ফ্যাশন ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি বায়িং হাউসের অফিস সহকারী ছিলেন।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, ভোর ৪টার দিকে দিলুরোডের ৪৫/এ নম্বর ছয়তলা বাড়ির নিচতলার গ্যারেজ থেকে প্রথমে আগুন লাগে। পরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে উপরতলায়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০ টি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এর আগেই আগুনে পুড়ে শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়। দগ্ধ জান্নাত ও তার স্বামী রনিসহ ছয়জনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। 

তাদের মধ্যে জান্নাত ও রনির অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাড়িটির গ্যারেজে থাকা পাঁচটি প্রাইভেটকার ও দুইটি মোটরসাইকেল একেবারে পুড়ে গেছে। আগুনের সূত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারেনি ফায়ার সার্ভিস। তবে প্রত্যক্ষদর্শী বাড়িটির দারোয়ান লুৎফর রহমান জানিয়েছেন, বৈদ্যুতিক সুইচ বোর্ড থেকে তিনি আগুন লাগতে দেখেছেন।

রনির স্বজনরা জানান, রনির গ্রামের বাড়ি নরসিংদি শিবপুর উপজেলার ইটনা গ্রামে। তিনি ভিআইভিপি এসেড ম্যানেজমেন্ট নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ফিন্যান্স ম্যানেজার ও পাশাপাশি আইসিএমএ এর লেকচারাল ছিলেন। তার স্ত্রী জান্নাত বেক্সিমকো'র অ্যাকাউন্ট অফিসার। তাদের একমাত্র ছেলে রুশদি দিলুরোডের একটি স্কুলে পড়ত।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com