পররাষ্ট্রনীতি

বঙ্গবন্ধুর দেশ গঠন ও কূটনীতি

মুজিববর্ষ

০৮ মার্চ ২০২০ | আপডেট: ০৮ মার্চ ২০২০

মোহাম্মদ জমির

১৯৭২ সাল-পরবর্তী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিচক্ষণ কাণ্ডারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে বিভিন্ন চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে একটি বিধ্বংসী যুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থা থেকে যে নৈপুণ্যে বাংলাদেশ নামক তরণীকে নিরাপদ তীরে নোঙর করাতে সমর্থ হন, লেখার শুরুতে আমি ইতিহাসের উজ্জ্বল সেই ঘটনাগুলোকে স্মরণ করতে চাই। আর আমি এটা করতে চাই, কারণ বর্তমানে আমরা অনেকেই গণতন্ত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরিতে তার গুরুত্বপূূর্ণ ভূমিকার কথা ভুলতে বসেছি।

১৯৭২ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের বন্দিশিবির থেকে মুক্তির পর ১০ তারিখে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ফেরেন। সেদিন লাখ লাখ জনতা তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। পাকিস্তান থেকে দেশে ফেরার পথে তিনি লন্ডন ও নয়াদিল্লিতে যাত্রাবিরতি করেন। পাকিস্তান থেকে বঙ্গবন্ধু যখন লন্ডন আসেন, সৌভাগ্যবশত সে সময় আমি সেখানে থাকায় তার সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ মেলে। আমাদের দেখা হয় লন্ডনের হোটেল ক্লারিডজে। তখন আমি আমার আগের কর্মস্থল মিসরের কায়রোয় অবস্থিত পাকিস্তান দূতাবাস থেকে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়ে লন্ডনে এসেছি। আগেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার বহুবার সাক্ষাৎ হয়েছে; তবে এবারের ঘটনাটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন; যা ছিল আমার জন্য দারুণ এক অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে সদ্য ভূমিষ্ঠ বাংলাদেশ ঘিরে তার চিন্তা ও পরিকল্পনাগুলো শুনতে পাওয়া। এরপর তিনি যখন আমার কাছে জানতে চাইলেন, আমি লন্ডনের বাংলাদেশি মিশনে অবস্থান করতে আগ্রহী নাকি দেশে ফিরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠনে তাকে সহযোগিতা করতে চাই? সঙ্গত কারণেই আমার দ্বিধাহীন উত্তর ছিল, ঢাকায় ফিরে বঙ্গবন্ধুর গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শের আলোকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গঠনে কাজ করতে পারাটা আমার জন্য দারুণ সম্মানজনক হবে। তিনিও অবিলম্বে রাজি হয়ে গেলেন এবং আমার ঢাকা ফেরার যাবতীয় বন্দোবস্ত করার নির্দেশ প্রদান করলেন। ১৯৭২ সালের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ নাগাদ আমি আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগদান করি।

একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতা, যিনি কিনা দেশের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দিল্লির পালাম বিমানবন্দরে বাংলাদেশ ঘিরে তিনি তার লক্ষ্যের কথা ব্যক্ত করেন। পাকিস্তানের বন্দিশালা থেকে স্বাধীন বাংলাদেশে পৌঁছানোর সময়গুলো উলেল্গখ করে তিনি বলেন, তার এ ভ্রমণ ঠিক অন্ধকার থেকে আলো, বন্দিদশা থেকে স্বাধীনতা আর হতাশা থেকে আশার পথে যাত্রার শামিল। তিনি আরও পুনরাবৃত্তি করে বলেন, কারও প্রতি ঘৃণা কিংবা বিদ্বেষমিশ্রিত অনুভূতি নিয়ে নয়, বরং মানসিক উন্মত্ততার বদলে সৎ বিবেচনা, কাপুরুষতার স্থলে সাহস, অশুভের জায়গায় শুভ এবং বিচারহীনতার বিপরীতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মিথ্যাকে হারিয়ে শেষ পর্যন্ত সত্যের যে জয় হয়েছে, চিত্তে সে সন্তুষ্টি নিয়ে তিনি তার স্বাধীন ভূমিতে ফিরছেন। এ আশাবাদ ব্যক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণের ওপর বঙ্গবন্ধু তার উদারতা ও আস্থার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। একই সঙ্গে এটি ছিল তার প্রেরণার জায়গাও, যেটি তাকে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যেতে শক্তি জুগিয়েছে।

একজন রাষ্ট্রনায়ক, একজন প্রতিভাধর বক্তা বঙ্গবন্ধু যেদিন স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম পা রাখেন, স্বাভাবিকভাবেই ভীষণ আবেগাপল্গুত হয়ে পড়েন। ১০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে (দেশে ফেরার কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে) বাংলাদেশের বিজয়ী জনগণের উদ্দেশে তিনি যে ভাষণ দিয়েছিলেন, তাতে রাষ্ট্রশাসন-সংক্রান্ত প্রগতিশীল দৃষ্টিভঙ্গির স্পষ্ট প্রকাশ ঘটে। প্রথমবারই তিনি সবাইকে সতর্ক করতে সফল হন এই মর্মে যে, অবাঙালিদের ওপর কেউ যেন কোনো ধরনের বিরোধী তৎপরতা না চালায়। একইভাবে সে সময় পাকিস্তানে বসবাসরত চার লাখ বাঙালির নিরাপত্তা ঘিরেও তিনি তার উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এ দেশে আশ্রিত পাকিস্তানিদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করার পাশাপাশি তিনি স্পষ্টভাবে এটিও উলেল্গখ করেন যে, যারা নির্দয়ভাবে আমাদের লোকদের হত্যা করেছে, তাদের অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। সেদিন তিনি তার ভাষণে আরও যে গুরুত্বপূর্ণ বিবৃতিটি তুলে ধরেছিলেন তা হলো, মুসলিম বিশ্বের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে বলেছিলেন, ইন্দোনেশিয়ার পর বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম রাষ্ট্র। পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেছিলেন, ইসলামের নামে পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের নিরীহ নাগরিকদের হত্যার পাশাপাশি নারীদের লাঞ্ছিত করেছে।

বঙ্গবন্ধুর উপরোক্ত মতামতগুলো পরস্পর সম্পর্কিত; যার মাধ্যমে শুধু বাংলাদেশে সংগঠিত যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবি নয়, এর সঙ্গে ইসলামিক প্রজাতান্ত্রিক একটি রাষ্ট্র হিসেবে পাকিস্তান যেভাবে ইসলামের অবমাননা করছে, সেসবের বিরুদ্ধে তার দৃঢ়তা প্রকাশ করে। এছাড়া তার এ দৃষ্টিভঙ্গিটি পরবর্তীকালে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সে সময়ের ওআইসির মহাসচিব টুংকু আবদুর রহমানের কাছে বার্তা প্রেরণপূর্বক এই মর্মে তিরস্কার করা হয় যে, গত নয় মাস ধরে (১৯৭১ সাল) যখন পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাসদস্যরা ৩০ লাখ বাঙালিকে ঠান্ডা মাথায় একের পর এক নির্বিচারে হত্যা করেছে, তখন আপনি অপ্রত্যাশিত নির্লিপ্ততায় নিরুত্তর থেকেছেন। এ সময় আপনি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তর মুসলিম রাষ্ট্রের নিরীহ মুসলিম নাগরিক এবং সেখানে বসবাসরত অন্যান্য সম্প্রদায় ও গোষ্ঠীর লোকদের ওপর চালানো নির্যাতনের বিরুদ্ধে আপনার কণ্ঠ তোলেননি।

পরবর্তীকালে ১৯৭৩ সালের ১৭ এপ্রিল পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের সংঘটিত অপরাধের তদন্তের পর ১৯৫ জনকে গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ ও মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে জেনেভা কনভেনশনের ৩নং অনুচ্ছেদের উল্লিখিত খুন, ধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের অপরাধের শাস্তি অনুযায়ী তাদের শাস্তির বিধান করা হয়। পাশাপাশি আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়া সর্বজনীন স্বীকৃত বিচার বিভাগীয় নিয়ম অনুযায়ী সম্পন্ন হবে। ১৯৭৫ সালের আগস্টে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার আগ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট বিচার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছিল। দুর্ভাগ্যক্রমে তার মৃত্যুর মাধ্যমে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করার গোটা প্রক্রিয়া ক্রমে ঢাকা পড়ে যায়। বর্তমান সরকারের অধীনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া সক্রিয় ও সম্পন্ন হচ্ছে। লাখো শহীদ যারা স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারগুলোর পাশাপাশি হাজারো লাঞ্ছিত নারী, যারা সে সময় অবর্ণনীয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, তাদের প্রতি এটি আমাদের দায়বদ্ধতা। ১৯৭৫-এর প্রেক্ষাপট-পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতাকারীরা ভারতের সঙ্গে তার ও আওয়ামী লীগের সম্পর্কের সূত্র ধরে তাদের হাতে বাংলাদেশের স্বার্থগুলো তুলে দেওয়ার মিথ্যা চিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন, যা ছিল সম্পূর্ণ অসত্য।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম আবদুস সামাদের ভারত সফরে যাওয়ার পর ৯ জানুয়ারি নয়াদিল্লি থেকে যৌথভাবে একটি সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয় (বঙ্গবন্ধুর ঢাকায় পদার্পণের আগে)। সে সময় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানোর জন্য ভারতকে ধন্যবাদ দেওয়ার পাশাপাশি তিনি জোর দেন, 'বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের ভিত্তিতে আমাদের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে ভারতের যে সেনাসদস্যরা যোগ দিয়েছেন, তাদেরকে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের চাওয়ামাফিক প্রত্যাহার করে নিতে হবে।'

ঢাকায় ফিরে বঙ্গবন্ধুও প্রকাশ্যে ভারতকে তাদের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে তাদের সেনাবাহিনী ফিরিয়ে নেওয়ার অনুরোধ জানান। ভারত অবিলম্বে তাদের সেনাসদস্যদের ফিরিয়ে নেয়; তবে সে সময় পাকিস্তানের পক্ষ থেকে মিথ্যা দাবি তোলা হয় এই মর্মে যে, অচিরে বাংলাদেশ ভারতের উপনিবেশে পরিণত হতে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু ও তার সরকারের আরও একটি অনন্য অর্জনের মধ্যে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে নাগরিক এবং ভারতে আশ্রিত এক কোটি শরণার্থীর মধ্যে নতুন করে এগিয়ে চলার সাহস জাগিয়ে তোলা।

বঙ্গবন্ধু দৃঢ়ভাবেই সব জাতিসত্তার সার্বভৌম ও সমতায় বিশ্বাসী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারতবিষয়ক পরিচালক হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতিতে তাকে খুব কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। বিশেষ করে ভারত বাংলাদেশের সম্পর্কের ভিত্তিতে যে বাণিজ্য ও উন্নয়ন কাজের উদ্যোগগুলো নেওয়া হয়েছে, সেখানে যেন সমতা ও পারস্পরিক উপকারের বিষয়গুলো নিহিত থাকে, সে সম্পর্কে তিনি সবসময় সচেষ্ট থাকতেন। তাছাড়া তিনি সহযোগিতায় বিশ্বাসী ছিলেন। ক্রমাগত উন্নয়নের এবং সম্পদ ব্যবহারের মাধ্যমে এ অঞ্চলের জনগণের কল্যাণের ওপর জোর দিতেন। তার এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি স্থায়ী ভিত্তিতে ভারতকে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ নদী কমিশন প্রতিষ্ঠা করতে সম্মতি আদায় করে নেয়। এর ফলে বাংলাদেশ ও ভারত দু'পক্ষের বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে দুই দেশের নদীব্যবস্থার ওপর একটি বিস্তৃত জরিপ পরিচালিত হয়। উভয়পক্ষ থেকেই বন্যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ বাংলাদেশ ও ভারত দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে যে যৌথ ঘোষণা প্রকাশ হয়, তাতে ভারতের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ গ্রিড সংযোগের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রসঙ্গ উলেল্গখ করা হয়। এছাড়া পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে পরামর্শ ও তথ্য বিনিময়ের প্রস্তাবনাও রাখা হয়। আজ চার দশক পেরিয়ে। আমরা আজ দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিকভাবে বিদ্যুৎ গ্রিড এবং জল ব্যবস্থাপনার প্রস্তাবনা করতে সমর্থ হয়েছি। অনেক বছর আগে বঙ্গবন্ধুর দেখা স্বপ্নের সঙ্গে প্রস্তাবনাটির সামঞ্জস্য রয়েছে।

পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রেও গভীর মনোযোগ প্রদর্শনের পাশাপাশি তিনি বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বীকৃতিপ্রাপ্তির পাশাপাশি ও কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উৎসাহিত করতেন। ফলে বাংলাদেশ ক্রমে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সদস্যপদ লাভ করতে শুরু করে। তিনি যখন বিদেশ ভ্রমণ করতেন, তখন পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়নের লক্ষ্যে সচেষ্ট থাকতেন। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতি বঙ্গবন্ধুর জোর নির্দেশনা ছিল যে, অন্যান্য রাষ্ট্রের সঙ্গে ভ্রাতৃত্ব ও ভালো প্রতিবেশী সম্পর্ক বজায় রাখার লক্ষ্যে বাংলাদেশ যেমন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তেমনি আমরা জোটনিরপেক্ষতার মৌলিক নীতিগুলো মেনে চলা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, পারস্পরিক সহযোগিতা, কারও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা এবং আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বকে যথাযথ সম্মানের লক্ষ্যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এ বিষয়গুলো তুলে ধরা।

এ জোরালো প্রচেষ্টা দ্রুত আমাদের আন্তর্জাতিক সম্পর্কোন্নয়নের লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে সক্ষম করেছে। ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ যখন আমরা আমাদের স্বাধীনতার প্রথম বছরপূর্তি উদযাপন করেছি, তখন বিশ্বের ৫৪টি দেশ আমাদের স্বীকৃতি প্রদান করেছে (বঙ্গবন্ধুর ঢাকায় পদার্পণের আগে এ সংখ্যাটি দশেরও কম ছিল)। তাছাড়া ১৯৭২ সালের শেষ হতে না হতে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশের সংখ্যাটা দ্রুতই বেড়ে যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এটি মূলত বঙ্গবন্ধুর ইতিবাচক পদক্ষেপের কারণে সম্ভব হয়েছে। তাছাড়া বাংলাদেশের ভূখণ্ড থেকে ভারতকে তাদের সৈন্য ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তার সফলতা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এরপর খুব অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশ জোটনিরপেক্ষ সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। যেমন- কমনওয়েলথ, আন্তর্জান্তিক শ্রম সংস্থা (আইএলও), বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ইত্যাদি। একই সঙ্গে কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে শুরু করে। তবে সে সময় পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী চীনের ভেটো প্রদানের জন্য আমরা জাতিসংঘের সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত না হয়ে পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলাম।

বিষয়টি বঙ্গবন্ধুর জন্য ছিল দারুণ হতাশার। যা-ই হোক, জাতিসংঘের সদস্য দেশ হিসেবে স্বীকৃতি না পেলেও পাকিস্তানের বিভিন্ন ক্যাম্পে বন্দি থাকা নিরপরাধ বাঙালিদের দেশে ফেরত আনার লক্ষ্যে সংস্থাটির মহাসচিব ড. কুর্ট ওয়াল্ডহেইমের কাছে সুপারিশ জানাতে বঙ্গবন্ধুকে নিবৃত্ত করা কারও পক্ষে সম্ভব হয়নি। তার মানবিক হস্তক্ষেপের কারণে ১৯৭২ সালের ২৭ নভেম্বর পাকিস্তানের ক্যাম্পে বন্দি থাকা বাঙালিদের সফলভাবে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তুতি নেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু এটি করেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, পাকিস্তান তাদের আত্মসমর্পণকারী যুদ্ধবন্দিদের ফিরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে বিষয়টির সংযোগ স্থাপনের পাশাপাশি এটিকে রাজনীতিকরণের চেষ্টা চালাচ্ছে। দেশের জনগণকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার জন্য তার এ উদ্বেগ, দেশবাসীর প্রতি তার ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

দেশের পররাষ্ট্র নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর সরাসরি সংযোগ ও তার সক্রিয় উদ্যোগ তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন, পূর্ব ইউরোপ, জোটনিরপেক্ষ দেশ এবং অন্যান্য কমনওয়েলথভুক্ত দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নে নেতৃত্ব দিয়েছে। এছাড়া ১৯৭৩ সালে ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে মিসর ও সিরিয়ার পক্ষে বাংলাদেশের অবস্থান নেওয়া ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু সরাসরি ভূমিকা পালন করেছেন। সে সময় খুবই স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি আমাদের সশস্ত্র বাহিনী থেকে মেডিকেল টিম গঠন (যারা গোলান হাইটসের কাছাকাছি অবস্থিত সিরিয়ার সেনাবাহিনীর সেবাসদনে গিয়ে আহতদের সাহায্য করেছেন) করে প্রেরণের পাশাপাশি এবং সিনাইয়ে অবস্থিত মিসরীয় সৈন্যবাহিনীর জন্য উপহার হিসেবে চা পাঠিয়েছিলেন। তার বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ এবং দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে সৌদি আরব, কুয়েত, মিসর, আলজেরিয়া ও সিরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে সফল হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে ওই দেশগুলো তাদের প্রভাব দিয়ে ১৯৭৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে লাহোরে অনুষ্ঠিত অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশনের (ওআইসি) সম্মেলনে বাংলাদেশকে আমন্ত্রণ জানাতে ওআইসি এবং পাকিস্তানকে রাজি করায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক ও আরবি ভাষার ওপর দখলের কারণে সরাসরি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকাটা আমার জন্য ছিল অত্যন্ত সম্মানের।

বঙ্গবন্ধু জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সাম্যবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। সাধারণ মানুষের কল্যাণে এবং সামাজিক বিপল্গবকে সফলতার চূড়ায় পৌঁছে দিতে এর প্রয়োজন রয়েছে। তিনি মনে করতেন, তার আদর্শের 'নতুন পৃথিবী' শোষণ ও অবিচার থেকে মুক্ত হবে, সম্পদের সমবণ্টন থাকবে এবং ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পোন্নয়নের মাধ্যমে বেকার সমস্যার সমাধান করা সম্ভব হবে। বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। তার কাছে এগুলোই ছিল বাঙালির বৈশিষ্ট্য, মূল্যবোধ, পরম্পরা, জাতীয়তা বোধের মূল ভিত্তি।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন দেশের তরে উৎসর্গীকৃত এক প্রাণ। তবে নিদারুণ দুঃখের বিষয় যে, তুলনামূলকভাবে কম বয়সে তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার মৃত্যু আমাদের শাসনব্যবস্থার অনেক দুর্বল ত্রুটিকে চিহ্নিত করে, এর মধ্যে জবাবদিহির অভাব অন্যতম। বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনপূর্বক বাংলাদেশকে একটি উন্নত দেশে পরিণত করার সর্বান্তঃকরণ চেষ্টা চালানো, প্রতিটি নাগরিকের সমান সুযোগ ও আইনের শাসন অনুশীলন নিশ্চিত করার জন্য আমরা তার কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।


সাবেক রাষ্ট্রদূত

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)