ছিনতাই আড়াল করতে শুধুই হারানোর জিডি

ঢাকার বিভিন্ন থানায় ভুক্তভোগীদের ছিনতাই মামলা করতে নিরুৎসাহিত করছে পুলিশ

১৪ মার্চ ২০২০

বকুল আহমেদ

দক্ষিণ রাজারবাগ থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি ভোরে রিকশায় কমলাপুর রেলস্টেশনে যাচ্ছিলেন সিলেটের তারিনা বেগম লিপি। একই রিকশায় তার ১৫ বছর বয়সী ছেলেও ছিল। পেছনের রিকশায় ছিলেন তার স্বামী ও মেয়ে। মুগদা স্টেডিয়ামের কাছে রিকশা পৌঁছামাত্র একটি প্রাইভেটকার থেকে ছিনতাইকারী লিপির হাতে থাকা ভ্যানিটিব্যাগ টান দেয়। লিপি ছিটকে পড়েন রাস্তায়। এতে মাথায় আঘাত পেয়ে প্রাণ হারান তিনি।

শুধু লিপি নন; রাজধানীতে প্রায় প্রতিদিন ঘটছে ছিনতাইয়ের ঘটনা। সাধারণত ছিনতাইকারীর হাতে প্রাণহানি ঘটলে বা বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিলেই আলোচনায় আসে ছিনতাইকারীদের বেপরোয়ার বিষয়টি। এর বাইরে মোবাইল ফোন, মানিব্যাগ, স্বর্ণালংকারসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস ছিনতাই হলে অধিকাংশ ভুক্তভোগী পুলিশের কাছে আইনি প্রতিকার চাইতে যান না। কেউ কেউ গেলেও ছিনতাইয়ের মামলা করতে পুলিশ নিরুৎসাহিত করে। অনেক ক্ষেত্রে চাপ প্রয়োগ করেই হারানোর জিডি করতে বাধ্য করা হয়। এতে নগরীতে প্রতি মাসে কত সংখ্যক ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে তার সঠিক চিত্র ধামাচাপা পড়ছে। আসল ঘটনা আড়াল করলে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরাও একধরনের কৃত্রিম স্বস্তির মধ্যে থাকার আনন্দ পান। অপরাধ আড়াল করে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও প্রতি মাসে জবাবদিহি করতে হয় না মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যদের।

সচিবালয়ের সামনে থেকে বাসে ওঠেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক (অর্থ) জুলফিকার আলী তালুকদার। বাসটি সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে মতিঝিল শাপলা চত্বরে গিয়ে আটকা পড়ে যানজটে। মাঝখানের সিটে বসে ছিলেন তিনি, জানালা খোলা। হাতে মোবাইল ফোন। সড়ক বিভাজকের ওপর থেকে এক ছিনতাইকারী জানালা দিয়ে থাবা মেরে তার মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় তিনি মতিঝিল থানায় যান মামলা করতে। থানার ডিউটি অফিসার তাকে ছিনতাইয়ের মামলা করতে নিরুৎসাহিত করে জিডি করতে বলেন। অবশেষে তিনি হারানো জিডি করেন। জিডি নম্বর ১৬৬০। এ ঘটনা গত ২৪ ফেব্রুয়ারির। গত ১ মার্চ মিরপুর ১ নম্বরের চায়নিজ এলাকায় এক রিকশাযাত্রীর মোবাইল ফোন থাবা মেরে ছিনিয়ে নিয়ে মোটরসাইকেলে পালিয়ে যায় দুই ছিনতাইকারী। ওই ঘটনায়ও থানা পুলিশ মামলা নেয়নি। মিরপুর মডেল থানা পুলিশ ছিনতাইয়ের ঘটনা আড়ালে রেখে তাকে হারানো জিডি করতে বাধ্য করে। মতিঝিল ও মিরপুর থানায় পৃথক দুটি জিডিতে উল্লেখ করা হয়েছে- 'মোবাইল ফোন রাস্তায় হারিয়ে গেছে।' অথচ দুটি ফোনই দিনের আলোয় থাবা মেরে ছিনিয়ে নিয়েছে ছিনতাইকারীরা।

শুধু এই দুটি ঘটনা নয়, রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ছিনতাইকারীদের অপতৎপরতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। প্রায় প্রতিদিনই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। কিন্তু বেশিরভাগ ঘটনায় মামলা হচ্ছে না। ছিনতাইয়ের বাস্তব চিত্র ও পুলিশের খাতা-কলমের পরিসংখ্যানের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত- প্রমাণ মিলেছে তার। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পরিসংখ্যান বলছে, গোটা ঢাকায় জানুয়ারি মাসে ছিনতাই হয়েছে মাত্র পাঁচটি। আর ফেব্রুয়ারিতে হয়েছে ৯টি। মূলত অপরাধপ্রবণতা কম দেখাতে ছিনতাইয়ের ঘটনা আড়াল করে হারানোর জিডি করতে বাধ্য করেন সংশ্নিষ্ট থানার পুলিশ সদস্যরা। ছিনতাইয়ের শিকার অধিকাংশ লোকই পুলিশের কাছে তাদের ঘটনায় আইনি প্রতিকার চাইতে যান না।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, মোবাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ মালপত্র ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনায় অল্প কিছুসংখ্যক জিডি হলেও তার তদন্তে গড়িমসি ভাব পুলিশের। অধিকাংশ ঘটনায় ছিনিয়ে নেওয়া মালপত্র উদ্ধার করতে পুলিশ আগ্রহ দেখায় না।

ছিনতাই বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান সমকালকে বলেন, 'ছিনতাইকারী চক্রকে গ্রেপ্তার করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।'

খোঁজ-খবর নিয়ে জানা গেছে, 'টানা পার্টি', 'সালাম পার্টি, 'বন্ধু পার্টি' 'গামছা পার্টি' নামে রাজধানীতে দাপিয়ে বেড়ায় ছিনতাইকারী চক্র। ডিবি পরিচয়ে গ্রেপ্তার ও মামলার ভয় দেখিয়েও ছিনতাই হচ্ছে। তাদের কবলে পড়ে হতাহত হচ্ছে মানুষ। রিকশা থামিয়ে, চলন্ত রিকশা, বাসের জানালা, প্রাইভেটকারের খোলা জানালার মধ্যে থাবা মেরে ও পথচারীকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ছিনতাই করা হচ্ছে। বিভিন্ন মার্কেটে ভিড়ের মধ্যে এবং জনসমাগমস্থলে কৌশলে নারীদের ব্যাগ কেটে কিংবা ব্যাগের চেইন খুলে মোবাইল ফোনসহ টাকা-পয়সা লুটে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। নারীর শরীর থেকে গহনা হ্যাঁচকা টানে নিয়ে যাচ্ছে। এতে কান ছিঁড়ে রক্তাক্ত হচ্ছেন ভুক্তভোগী নারী। ছিনতাইকারী চক্র ছিনতাই কাজে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস ব্যবহার করছে। চলন্ত গাড়ি থেকে তাদের থাবায় রাস্তায় পড়ে মানুষের প্রাণহানিও ঘটছে।

গত ৬ মার্চ নববধূ দোলা দেবনাথকে সঙ্গে গিয়ে পুরান ঢাকার গোপীবাগের বাসা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘুরতে যান শিশির বালা। ঘোরাঘুরি শেষে রাত ৮টায় টিএসসির সামনে থেকে রিকশায় ওঠেন স্বামী-স্ত্রী, উদ্দেশ্য বাসায় ফেরা। রাত ৮টায় রিকশাটি বাংলা একাডেমির সামনের সড়কে আসামাত্র একটি চলন্ত মোটরসাইকেল রিকশার পাশে গতি কমায়। এরপরই পেছনে থাকা তরুণ দোলার ডান কানের স্বর্ণের দুল ধরে হ্যাঁচকা টান দেয়। এতে তার কানের লতি ছিঁড়ে রক্তাক্ত হয়। দুল ছিনিয়ে নিয়ে মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে পালিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় শিশির বালা থানায় কোনো অভিযোগ করতে যাননি।

৭ মার্চ রাত দেড়টায় হাতিরঝিল রাস্তা সংলগ্ন মেরুল বাড্ডায় ছিনতাইয়ের শিকার হন নোমান ছিদ্দিক নামে এক তরুণ। এ ঘটনায় তিনি বাড্ডা থানায় মামলা করতে গেলে পুলিশ তাকে জিডি করতে বাধ্য করে। নোমান সমকালকে জানান, ৭ মার্চ রাত দেড়টার দিকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থেকে সাইকেল চালিয়ে মেরুল বাড্ডার বাসায় ফিরছিলেন তিনি। হাতিরঝিল রাস্তা-সংলগ্ন মেরুল বাড্ডায় পৌঁছলে দুই মোটরসাইকেলে চারজন তাকে ঘিরে ধরে মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় তিনি মামলা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ তা নেয়নি। জিডি করতে বাধ্য করেছে।

গত ১ মার্চ দুপুরে মিরপুর ১০ নম্বরে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কাছে সাজিয়া আফরিন নামে এক নারী ছিনতাইয়ের শিকার হন। তিনি রিকশায় হোপ স্কুলের গলির বাসায় ফিরছিলেন। এ সময় এক ছিনতাইকারী তার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় মামলা করার আগ্রহ প্রকাশ করেননি তিনি। গত ১১ ফেব্রুয়ারি খিলগাঁও থানা এলাকার কাজীবাড়ি পাওয়ার হাউস এলাকায় ডিবি পরিচয়ে নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে চার লাখ ১০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। নজরুল ইসলাম সেদিন বনশ্রীর একটি ব্যাংক থেকে চার লাখ টাকা উত্তোলন করেন। তার কাছে আরও ১০ হাজার টাকা ছিল। টাকা নিয়ে একটি বাসে ওঠেন। নামেন মেরাদিয়ায়। সেখান থেকে রিকশা নেন। তাকে বহন করা রিকশাটি কাজীবাড়ি পাওয়ার হাউসের কাছাকাছি পৌঁছলে একটি প্রাইভেটকার গতি রোধ করে। ডিবি পরিচয়ে নজরুলকে প্রাইভেটকারে তোলা হয়। টাকা ছিনিয়ে নিয়ে তাকে হাতিরঝিলে ফেলে দেয় ছিনতাইকারীরা। গত ১৩ জানুয়ারি সিনকো বিডি লিমিটেডের মার্কেটিং সেলসম্যান নাজমুল হুদা পুরান ঢাকার আনন্দবাজার এলাকায় ডিবি পরিচয় দেওয়া ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। তার কাছ থেকে ১ লাখ ১১ হাজার ৫শ' টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। এ ঘটনায় তিনি শাহবাগ থানায় মামলা করেন। সোয়ারীঘাটের বাসিন্দা আসাদুজ্জামান গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের সামনে ছিনতাইয়ের শিকার হন। এ সময় তিনি শাহবাগ থেকে রিকশায় সোয়ারীঘাটে ফিরছিলেন। শামসুন্নাহার হলের সামনে পৌঁছলে তার রিকশা থামিয়ে ছিনতাইকারীরা মোবাইল ফোন কেড়ে নেয়। তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে এক ছিনতাইকারীকে আটক করে। পরে তাকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এ ঘটনায় আসাদুজ্জামান শাহবাগ থানায় মামলা করেন।

গত ১ মার্চ বিকেল সাড়ে ৩টায় মিরপুর ১ নম্বর থেকে বাজার করে রিকশায় আনসার ক্যাম্পের বাসায় ফিরছিলেন খন্দকার মো. রিয়াজ মাহমুদ নামে এক যুবক। রাস্তা ছিল প্রায় ফাঁকা। রিকশাটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টের সামনে এলে একটি মোটরসাইকেল গতি কমায় তার পাশে। কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই মোটরসাইকেলের পেছনে বসে থাকা যুবক থাবা মেরে রিয়াজের হাতে থাকা মোবাইল ফোনটি ছিনিয়ে নেয়। রিয়াজ রাস্তার মাঝখানে পড়ে যান রিকশা থেকে। চিৎকার করেন 'ছিনতাইকারী' 'ছিনতাইকারী' বলে। এর আগেই ছিনতাইকারীরা এলাকা ত্যাগ করে। ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা নেয়নি মিরপুর মডেল থানা পুলিশ। মোবাইল ফোন রাস্তায় হারিয়ে গেছে উল্লেখ করে জিডি করতে বাধ্য করা হয়েছে তাকে। জিডি নম্বর ৫২।

ছিনতাইয়ের অন্যরকম সংজ্ঞা দিলেন ওসি :ছিনতাইয়ের ঘটনায় মামলা না নিয়ে জিডি কেন নেওয়া হলো জানতে চাইলে মিরপুর থানার ওসি মোস্তাজিরুর রহমান গত সোমবার সমকালকে বলেন, 'থাবা দিয়ে কিছু ছিনিয়ে নিলেই ছিনতাই বলা যায় না। ভয়ভীতি ও বল প্রয়োগ করে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে ছিনতাই হিসেবে গণ্য করা হয়। কেউ যদি অবচেতন মনে থাকেন এবং থাবা দিয়ে তার কাছ থেকে কেউ কিছু কেড়ে নেয়, তবে সেটি গণ্য করা হয় চুরি হিসেবে।'

'যদি তাই হয়, তাহলে চুরির মামলা নিলেন না কেন?'

এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, 'ঠিক আছে, পাঠিয়ে দিন। মামলা নেওয়া হবে।'













© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)