চট্টগ্রামে পাহাড় দখলের 'আগুন-পানি' কৌশল

১৪ মার্চ ২০২০

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

শীতে আগুন লাগিয়ে পাহাড়ের গাছ পোড়ানো (ইনসেটে) আর বর্ষায় ধসেপড়া মাটি সরিয়ে নেওয়া এখন চট্টগ্রামের দখলবাজদের নতুন কৌশল। ছবিটি বন্দরনগরীর পশ্চিম খুলশীর - মো. রাশেদ

দিন-দুপুরে পাহাড় কাটতে ঝুঁকি বেশি। তাই অভিনব এক পদ্ধতি বের করেছে দখলদাররা। প্রথমে পেট্রোল ঢেলে পাহাড়ের গাছপালা পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। বাগান করার কথা বলে এর পর মাটিতে আটকে থাকা পোড়া গাছের শিকড় উপড়ে ফেলছে। এমনভাবে এটি করা হচ্ছে, যাতে বৃষ্টি এলেই ন্যাড়া করা সেই পাহাড়ে নামে ধস। এর পর শ্রমিক লাগিয়ে রাতের আঁধারে সরিয়ে নেওয়া হবে মাটি। এতে বর্ষার শুরুতেই এর সুফল পায় দখলদাররা। পাহাড়ে আগুন লাগার বেশ কয়েকটি ঘটনার নেপথ্যে অনুসন্ধান চালিয়ে জানা গেছে এসব তথ্য। ভয়াবহ এ ঘটনায় পাওয়া গেছে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার যোগসাজশের প্রমাণও।

গত বছর জঙ্গল সলিমপুরে কয়েকটি পাহাড়ে খণ্ড খণ্ডভাবে আগুন লাগে। সর্বশেষ গত সপ্তাহে এমন আগুন লাগার ঘটনা ঘটে পশ্চিম খুলশীতে নীলাচল হাউজিংয়ের পাশের এক পাহাড়ে। এখানে ছিল ৩৩ কেভির বিদ্যুৎ সঞ্চালনের একটি টাওয়ার। দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে না আনলে ঘটত ভয়াবহ বিপদ।

অভিযানে থাকা কাট্টলী সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তৌহিদুল ইসলাম বলেন, আগুন লাগিয়ে পাহাড় দখল করার এ অপকৌশলটি নতুন। পাহাড়ে পরপর বেশ কয়েকটি আগুন লাগার ঘটনার পর নেপথ্যে এমন কারণই পেয়েছি আমরা। পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা আবাসিকে বিদ্যুৎ যাওয়া, রাস্তা হওয়া ও ভবন তৈরির অনুমোদন পাওয়ার ঘটনায়ও বিস্ময় প্রকাশ করেন তিনি।

আগুন লাগায় কারা :জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটির বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা এসএম শাহআলম জানান, আশপাশের পাহাড় যার দখলে আছে তারাই নতুন পাহাড়ে আগুন দেয়। পুরো পাহাড়ে একসঙ্গে আগুন লাগানো হয় না। পেট্রোল ঢেলে খণ্ড খণ্ডভাবে লাগানো হয় আগুন। সবজি চাষ কিংবা নতুন গাছ রোপণ করার অজুহাতে পরে তুলে ফেলা হয় পোড়া গাছের শিকড়। নীলাচল হাউজিংয়ের পাশের পাহাড়ে আগুন লাগানো হয় প্রথমে উত্তর পাশে। পরে এটি বিস্তৃত আরও ৫ থেকে ৬ স্পটে। তিনি জানান, পাহাড় কেটে নীলাচল হাউজিং গড়ে তুলেছে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি সিন্ডিকেট। কিন্তু এখন এই আবাসিকে একচ্ছত্র আধিপত্য খাটায় পাঁচজন। এদের কথাই এখানে আইন। আবদুর রশিদের ছেলে ফয়েজ আহমদ, আশরাফ মিয়ার ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান, আবদুল আজিজের ছেলে সফিয়র রহমান, আবু মিয়া সওদাগরের ছেলে ওমর আলী, জাগির মিয়ার ছেলে আহমদ কবিরই এখন নিয়ন্ত্রণ করছে এই আবাসিক। মদিন উল্লাহ চৌধুরীর ছেলে মোরশেদ আলম চৌধুরী ও প্রমোদ রঞ্জন দত্তের মেয়ে সবিতা দত্তও আছে নীলাচল হাউজিংয়ের সঙ্গে। কিন্তু এ দু'জন থেকে পাওয়ার অব অ্যাটর্নিমূলে পাঁচজনের ওই সিন্ডিকেট মালিকানা নিয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। সম্প্রতি পাহাড়ে আগুন লাগানোর পেছনেও পাঁচজনের মদদ আছে বলে ধারণা করছে ভূমি অফিস ও পরিবেশ অধিদপ্তর। ২০১৮ সালে পাহাড় কাটার অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তর যে ১০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল, তাদের মধ্যেও আসামি হিসেবে আছে এই পাঁচজন।

আগুন লাগল থানার দুই কিলোমিটারের মধ্যেই

পাহাড়ে আগুন লাগার উৎপত্তি হয়েছিল জঙ্গল সলিমপুরে। এটি গহীন অরণ্যে হওয়ায় প্রশাসন সরেজমিন এর কারণ উদ্‌ঘাটন করতে পারেনি। কিন্তু এবার যে পাহাড়ে আগুন লেগেছে, সেটি খুলশী থানা থেকে দুই কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে জালালাবাদ হাউজিং সোসাইটিতে। এই সোসাইটিরই পূর্ব পাহাড়তলী মৌজায় আছে নীলাচল হাউজিং। নগরীর জাকির হোসেন সড়ক থেকে মুরগির ফার্মের পাশ দিয়ে উত্তর-পশ্চিমে গেছে বিআইডিসি সড়ক। এই সড়ক থেকে একটু এগোলে সামনে পড়ে একটি মসজিদ। এই মসজিদের পাশে আছে কৃষ্ণচূড়া আবাসিক। সেখান থেকে আরেকটু সামনে গেলে পড়ে নীলাচল হাউজিং। স্থানীয়রা বলছেন, পাহাড় কাটার সুবিধার্থেই প্রথমে এ মসজিদটি গড়ে তোলে দখলদাররা। এর পর পাহাড় কেটে এ হাউজিংয়ে ৫০ থেকে ৬০টি প্লট তৈরি করে তারা। প্লটের সংখ্যা আরও বাড়াতে হলে কাটতে হবে পাশের পাহাড়। তাই আগুন লাগিয়ে এ পাহাড়টি ন্যাড়া করতে চেয়েছিল দুর্বৃত্তরা। ২৯ ফেব্রুয়ারি পাহাড়ে আগুন লাগার খবর পেয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলে যান ভূমি অফিসের কর্মকর্তারা। তারা আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে স্থানীয়দের এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। স্থানীয়রা জানান, আবাসিকের প্লট বাড়াতেই এ পাহাড়ে আগুন লাগানো হয়েছে। এতে সহযোগী হিসেবে আছে খুলশী থানা পুলিশের একটি অংশ। এই থানার সাবেক এক ওসির বেনামে প্লটও আছে পাহাড়ি এই এলাকায়। জানতে চাইলে খুলশী থানার বর্তমান ওসি প্রণব চৌধুরী বলেন, 'এমন কিছু আমার জানা নেই। একই স্থানে পাহাড় কাটার অভিযোগে আগে মামলা থাকার বিষয়টিও তার জানা নেই বলে মন্তব্য করেন ওসি।

সহযোগী সরকারি সংস্থাও

পশ্চিম খুলশীর যে জায়গায় পাহাড় কেটে নীলাচল হাউজিং গড়ে উঠেছে সেটির অনুমোদন দিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনও পাহাড়ের মাঝে তাদের রাস্তা তৈরি করে দিয়েছে। অথচ ২০১৮ সালের ২৮ জানুয়ারি যখন এ আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা হচ্ছিল তখন এখানে অভিযান চালিয়ে পাহাড় কাটার প্রমাণ হাতেনাতেই পেয়েছিল জেলা প্রশাসন। ২৭ নম্বর দাগে থাকা সাড়ে ৫ একর পাহাড়ের প্রায় আড়াই একর কেটে ফেলায় ১০ জনকে আসামি করে তখন মামলাও করেছিল পরিবেশ অধিদপ্তর। জব্দ করা হয়েছিল পাহাড় কাটার নানা সরঞ্জাম। অথচ এমন মামলা হওয়ার কথা জানেনই না আগুন লাগার পর এবার ঘটনাস্থলে যাওয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক আবুল মনসুর মোল্লা। তিনি বলেন, 'নীলাচল হাউজিংয়ের মালিকরা এই আগুন লাগাতে পারে বলে আমাদের ধারণা।' ২০১৮ সালে দায়ের করা মামলা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, আগে কোনো মামলা হয়েছে কিনা আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে দেখব। আমি আসলে অন্য এলাকার দায়িত্বে আছি।

প্রশাসনের এমন নিষ্ফ্ক্রিয়তার কারণেই পাহাড় কাটার প্রমাণ হাতেনাতে পাওয়ার পরও এটিকে আবাসিক এলাকায় রূপান্তর করতে সক্ষম হয় দখলদাররা। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষও (চউক) তাদের দেয় প্লট ও ফ্ল্যাট করার অনুমোদন। জানতে চাইলে চউকের অথরাইজেশন অফিসার মোহাম্মদ শামীম বলেন, 'ভুল তথ্য দিয়ে কেউ যদি ফ্ল্যাট করার অনুমোদন নেয় তবে তা বাতিল করার এখতিয়ার রাখে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। আর চউকের কেউ যদি অপরাধীর সঙ্গে যোগসাজশ করে; তার বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে কর্তৃপক্ষ।'

অভিযানের পর পাল্টে গেছে নাম, পাল্টে যাচ্ছে খতিয়ানও

২০১৮ সালে লোহাগাড়া সমিতি লোহাগাড়া হাউজিংয়ের নামে কাটছিল পাহাড়। অভিযানের পর মামলা হলে লোহাগাড়া হাউজিং নাম পাল্টে হয় নীলাচল হাউজিং। প্রশাসনের সবাইকে ম্যানেজ করে গত দুই বছরে ৫০টিরও বেশি প্লট তৈরি করে তারা। খতিয়ানেও পরিবর্তন করে ফেলে তারা জমির শ্রেণি। জমির শ্রেণিতে আগে পাহাড় উল্লেখ থাকলেও নব্বই দশকের শেষদিকে খতিয়ানে জমির শ্রেণি উল্লেখ করে তারা 'ছনখোলা'। এক পর্যায়ে মূল খতিয়ান থেকে উঠে যায় 'ছনখোলা' শব্দটিও। এর পর 'টিলা' লিখে চলতে থাকে প্লট বেচাকেনা। প্লটের পরিমাণ আরও বাড়াতেই পাশের পাহাড়ে আগুন দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা প্রশাসনের।

নীলাচল হাউজিংয়ের অন্যতম স্বত্বাধিকারী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'পাহাড়ে আগুন লাগার কোনো ঘটনা আমার জানা নেই। আমাদের কেউ পাহাড়ে আগুন দেওয়ার ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। ওখানে দারোয়ান ও ম্যানেজার ছাড়া আমরা কেউ থাকি না।' পাহাড় কেটে আবাসিক এলাকা ও রাস্তা করা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, 'আমাদের এটি পাহাড় নয়; টিলা। সিটি করপোরেশনকে অনেক কষ্টে রাস্তা করাতে রাজি করিয়েছি আমরা। চউক থেকে অনুমোদন নিয়ে কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার দিকে কিছু ভবন হচ্ছে। আমরা এখনও ভবন নির্মাণের কাজ শুরু করিনি।' প্লট বেচাকেনার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, 'ক্রয়সূত্রে যারা মালিক, কেবল তারাই এখানে বসবাস করবে। আমরা বাইরের কোনো মানুষের কাছে প্লট বিক্রি করি না। তবে অন্য কেউ যদি বিক্রি করে, সেটি আমরা কিনে নিই।' পাহাড় কাটার অভিযোগ প্রথমে অস্বীকার করলেও ২০১৮ সালে তাদের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা করেছে বলে পরে স্বীকার করেন তিনি।





© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)