বিশ্ব পানি দিবস আজ

চ্যালেঞ্জ বাড়ছে সুপেয় পানির

২২ মার্চ ২০২০ | আপডেট: ২২ মার্চ ২০২০

জয়নাল আবেদীন

আলকাতরা নয়, বুড়িগঙ্গার পানি। শনিবার বাবুবাজার সেতু থেকে তোলা ছবি- মামুনুর রশিদ

পানির অপর নাম জীবন। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে পানিই এখন প্রাণ ও প্রকৃতি ধ্বংসের অন্যতম কারণ। এর নেপথ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব। লবণাক্ত পানির কারণে একদিকে নিষ্প্রাণ হচ্ছে কৃষিজমি। অন্যদিকে বাড়ছে প্রাণঘাতী রোগের প্রাদুর্ভাব। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে উপায়ান্তর না দেখে অনেকে পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে। তবে বড় অংশই ঢুকছে দেশের বিভিন্ন শহরাঞ্চলে।

বিপদসংকুল পরিবেশ থেকে বাঁচতে শহরে এসেও তাদের রক্ষা নেই। এখানে পড়তে হয় সুপেয় পানির তীব্র সংকটে। দেশে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর বড় কারণ দূষিত পানি। আর্সেনিকযুক্ত পানি পানের হার কমলেও বিশ্বের সর্বাধিক আর্সেনিক দূষণে আক্রান্ত জনসংখ্যার তকমা এখনও বাংলাদেশের।

এ পরিস্থিতিতে আজ রোববার দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব পানি দিবস। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- 'পানি ও জলবায়ু পরিবর্তন'। পানির প্রাপ্যতার সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের যোগসূত্রই আলোচিত হচ্ছে এ বছর। দিবসটি উপলক্ষে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আলোচনা সভার পাশাপাশি আজ পানি ভবন উদ্বোধনের কথা রয়েছে।

ইউনিসেফের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৯৮ ভাগ মানুষের আওতায় কোনো না কোনোভাবে পানির উৎস রয়েছে। তবে সুপেয় পানি পাচ্ছে মাত্র ৫৬ শতাংশ। এখনও ১৩ ভাগ পানিতে  গ্রহণযোগ্য মাত্রার চেয়ে বেশি আর্সেনিকের উপস্থিতি রয়েছে। এ ছাড়া পাইপলাইন, টিউবওয়েল এবং পুকুরের পানিতে কোলাই ব্যাকটেরিয়ার মতো ক্ষতিকর অণুজীবের অস্তিত্ব থাকার কথাও বলা হয় বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে। নানারকম বর্জ্যের কারণেই মূলত পানি দূষিত হয়ে পড়ছে।

২০১৫ সালে দেশে প্রাণ হারানো নবজাতকের প্রায় ২০ শতাংশই পানিবাহিত জীবাণু সংক্রমণের কারণ বলে উঠে আসে ইউনিসেফের আরেক প্রতিবেদনে। এ ছাড়া গ্লোবাল অ্যালায়েন্স অন হেলথ অ্যান্ড পলিউশন (জিএএইচপি) জানায়, ২০১৭ সালে দেশে শুধু পানিদূষণের কারণে মারা যায় ৩৩ হাজার ৫৮৩ জন।

সরকারের হিসাব মতে, দেশে বর্তমানে ১৩ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানি পাচ্ছে না। তাদের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিতের লক্ষ্যে একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়েছে। ব্যয় হচ্ছে ৮৮৫০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। ২০২৫ সালে শেষ হবে প্রকল্প।

এ ছাড়া ৩৭ জেলা শহরে নিরাপদ পানি সরবরাহের আরেকটি প্রকল্প এখন শেষ পর্যায়ে। এ প্রকল্পের পরিচালক নূর আহাম্মেদ জানান, উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরাসহ উত্তরাঞ্চলের ৩৭টি জেলা শহরের মধ্যে ৩৪টিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হয়ে গেছে। বিভিন্ন উৎস থেকে গ্রাহক পর্যায়ে পৌঁছানো পর্যন্ত পানিকে নিরাপদ করতে শোধনাগার স্থাপন করা হয়েছে।

জানা গেছে, দেশে বর্তমানে নদনদীর দৈর্ঘ্য ২৪ হাজার কিলোমিটার। এখানে প্রচুর পানি প্রবাহিত হচ্ছে সারাক্ষণ। এ ছাড়া সারাদেশে রয়েছে অগণিত পুকুর। গভীর নলকূপের মাধ্যমেও উঠছে পানি। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থাও আছে নানা পর্যায়ে। তবে এসব উৎসের পানি নিরাপদ করার প্রক্রিয়ায় রয়েছে বিস্তর গলদ।

পানি বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী ম. ইমামুল হকের মতে, উৎস যা-ই হোক, পরিশোধনের পর্যায়ে পানির মানমাত্রা ঠিকই থাকে। সরবরাহ লাইন খারাপ থাকায় ভোক্তার ঘরে যাওয়ার পর্যায়ে তা দূষিত হয়ে পড়ে। এর বড় কারণ শহরের যাবতীয় ময়লা আবর্জনা ও দূষিত পদার্থ। সরকারের উচিত মানুষের নিরাপদ পানি নিশ্চিত করা। কারণ, এই দূষিত পানি খুবই বিপজ্জনক এবং নীরব ঘাতক।

জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে শতভাগ নাগরিকের জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। সংশ্নিষ্টরা বলছেন, এই লক্ষ্য অর্জনে হিমশিম খেতে হচ্ছে সরকারকে।

তবে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের কারণে বিশেষ করে শহরে নিরাপদ পানির সংকট মোকাবিলায় সরকারকে বেগ পেতে হবে বলে জানান ইনডিপেন্ডেন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জের পরিচালক ড. সালিমুল হক। এই পরিবেশবিজ্ঞানী বলেন, নানারকম দুর্যোগের কারণে শহরমুখী হচ্ছে মানুষ। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার ২৮ শতাংশ শহরে বসবাস করছে। চারটি শহরেই বসবাস করছে অর্ধেক। সামগ্রিকভাবে যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৯৭৬ জনের বাস, শহরের ক্ষেত্রে তা তিন হাজার ৭৮৫ জন। অর্থাৎ গ্রাম থেকে শহরে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় পৌনে চারগুণ।

তিনি আরও বলেন, নিরাপদ পানি নিশ্চিতের ক্ষেত্রে বাকি পরিকল্পনা ঠিক থাক। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনে উপকূলের যে বদলে যাওয়া পরিবেশ, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে সুপেয় পানির নিশ্চয়তা আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

'বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিবাসন' (ক্লাইমেট চেঞ্জ রিলেটেড মাইগ্রেশন ইন বাংলাদেশ) শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১১ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত জলাবায়ু পরিবর্তনের কারণে ৯৬ লাখ অভিবাসী তৈরি হবে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অভিবাসী বাংলাদেশে অস্থিতিশীলতা ডেকে আনতে পারে।

অবশ্য দেশের চার কোটি মানুষকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকার তথ্য দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবে ১৯টি উপকূলীয় জেলার ৭০টি উপজেলার অন্তত চার কোটি মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়বে। এদের বড় অংশই শহরমুখী হতে পারে। ফলে ওই পরিস্থিতিতে সবার জন্য নিরাপদ পানি নিশ্চিতের বিষয়টি আরও কষ্টসাধ্য হতে পারে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তর্জাতিক কনভেনশন) মির্জা শওকত আলী বলেন, চট্টগ্রামের উপকূলে প্রতিবছর সমুদ্রের উচ্চতা ১১ থেকে ২১ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। এ ছাড়া দেশের অন্যান্য উপকূলীয় এলাকাগুলোতে কৃষিকাজের ধরন বদলে গেছে। শুধু লবণাক্ত পানির কারণেই প্রতিবছর এক শতাংশ কৃষিজমি হারিয়ে যাচ্ছে।

কৃষিতে প্রভাবের বিষয়টি উঠে এসেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) প্রতিবেদনেও। এতে বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অনেক কৃষিজমি চাষের যোগ্যতা হারিয়েছে। ফলে ওই অঞ্চলের মানুষের কাছে অভিবাসনই এখন বেঁচে থাকার একমাত্র কৌশল। অবশ্য কেউ কেউ লবণাক্ত পানির প্রভাবে চাষাবাদের কৌশল বদলে ফেলাসহ লবণ সহিষুষ্ণ ধান উৎপাদনের পথেও হাঁটছেন।

© সমকাল ২০০৫ - ২০২০

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মুস্তাফিজ শফি । প্রকাশক : এ কে আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ (প্রিন্ট), +৮৮০১৮১৫৫৫২৯৯৭ (অনলাইন) | ইমেইল: samakalad@gmail.com (প্রিন্ট), ad.samakalonline@outlook.com (অনলাইন)