এক পরিবার থেকে পুরো ওয়ারীতে করোনা

২৭ জন শনাক্ত

প্রকাশ: ১৭ এপ্রিল ২০ । ০০:৩৮ | আপডেট: ১৭ এপ্রিল ২০ । ০০:৪৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

জয়নাল আবেদীন

পুরান ঢাকার অন্যান্য এলাকার মতো ঘনবসতি নেই ওয়ারীতে। প্রশস্ত রাস্তা ঘিরে ছিমছাম গোছানো পরিবেশ। ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণার পর রাস্তায় মানুষের আনাগোনাও কম। সেই ওয়ারীতেই করোনাভাইরাসের সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি। গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ওয়ারীতে কভিড-১৯ শনাক্তের সংখ্যা ২৭ জন। প্রতিদিনই বাড়ছে সংক্রমণ। এর কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, মূলত একটি পরিবার থেকেই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাস।

পুলিশের ওয়ারী জোনের একটি সূত্র জানায়, হেয়ার স্ট্রিটে এক ব্যক্তি মারা গিয়েছিলেন করোনায় আক্রান্ত হয়ে। কিন্তু মারা যাওয়া ব্যক্তি কভিড-১৯ সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন ছিলেন না। এমনকি মৃত্যুর দু'দিন আগেও তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজং উপজেলার কনকসারে ত্রাণ বিতরণ করতে যান তিনি। মারা যাওয়ার পর নমুনা পরীক্ষা করে তার করোনা নিশ্চিত করে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)। মূলত ওই ব্যক্তির পরিবার থেকেই ওয়ারীতে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। ইতোমধ্যে তার সংস্পর্শে আসায় ছেলে, দুই ভাইসহ ১৩ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।

পুলিশের ওই সূত্র জানায়, সেই মৃত ব্যক্তির আরও দুই ভাই পাশাপাশি বাড়িতে বসবাস করেন। গত ৬ এপ্রিল তার মৃত্যুর পর হেয়ার স্ট্রিটের ওই গলিটি লকডাউন করা হয়। দু'দিন পর তার অন্য দুই ভাইয়ের শরীরে কভিড-১৯ শনাক্ত হয়। এই তিন পরিবারের সংস্পর্শে আসায় কাজের মেয়ে, ডিশের বিল নিতে আসা তরুণ থেকে শুরু করে স্থানীয় এক ফার্মাসিস্ট পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছেন।

জানা গেছে, সেই মৃত ব্যক্তির ছোট ভাইয়ের বাসা হেয়ার স্ট্রিটে, বড় ভাই থাকেন নিকটস্থ বনগ্রাম রোডে। ৮ এপ্রিল অসুস্থ হয়ে পড়েন ছোট ভাই। তার নমুনা পরীক্ষা করে করোনা শনাক্তের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপর তার সংস্পর্শ থেকে স্ত্রী এবং কাজের মেয়েও আক্রান্ত হন। ওয়ারী থানার এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি ওই বাড়িতে ডিশের বিল সংগ্রহ করতে গিয়েছিলেন এমন এক তরুণেরও করোনা শনাক্ত হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ছেলেটি ওই পরিবারের সংস্পর্শে যাওয়ায় সংক্রমিত হয়েছেন।

অন্যদিকে, বনগ্রাম রোডের বাসিন্দা বড় ভাইয়ের পরিবারে আক্রান্তের সংখ্যা চারজন। ইতোমধ্যে ওই বাড়ির নিচে একটি ফার্মেসির বিক্রয়কর্মীরও করোনা শনাক্ত হয়; যিনি আক্রান্ত ওই পরিবারের সংস্পর্শে এসেছিলেন বলে ধারণা করছে পুলিশ।

গত ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা শনাক্ত হয়। এরপর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় করোনা শনাক্ত হলেও ওয়ারীতে পাওয়া যায় ৬ এপ্রিল। সেদিন হেয়ার স্ট্রিটে নিজের বাসায় মারা যান ওই বাসিন্দা। তার আগে ৩ এপ্রিল তিনি গ্রামে গিয়ে কয়েকটি পরিবারের মাঝে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেন।

পুলিশ বলছে, ঢাকায় ফিরে জ্বর, সর্দি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলেও ওই ব্যক্তি করোনার বিষয়টিকে পাত্তা দেননি। ৬ এপ্রিল সকালে মারা যাওয়ার পর খবর পেয়ে আইইডিসিআরের প্রতিনিধি তার নমুনা সংগ্রহ করেন। সন্ধ্যায় তার করোনা আক্রান্তের বিষয়টি নিশ্চিত হলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়ম মেনে মরদেহ দাফন করা হয়। তবে মৃত্যুর আগে ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে আসেন তার দুই ভাইসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও।

পুলিশের ওয়ারী জোনের উপকমিশনার হান্নানুল ইসলাম সমকালকে বলেন, পারিবারিক বন্ধন পুরান ঢাকার অন্যতম ঐতিহ্য। এখানে অনেকের গোড়াপত্তন। ফলে একটি পরিবারের একাধিক বাড়ি রয়েছে। ওয়ারীতে সর্বোচ্চ সংক্রমণের অন্যতম কারণও এটি। ৬ এপ্রিল মারা যাওয়া ব্যক্তির উদাহরণ টেনে তিনি জানান, ওই ব্যক্তির সংস্পর্শে গিয়ে প্রথমে তার দুই ভাই আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মাধ্যমে তিন পরিবারেই ভাইরাসটি ছড়িয়েছে। ওয়ারীতে বুধবার পর্যন্ত শনাক্ত ২৬ জনের অধিকাংশই এই পরিবারের মাধ্যমে সংক্রমিত। সরকারের ঘরে থাকার যে নির্দেশনা, সেটি যথাযথভাবে মেনে চললে এই অবস্থা হতো না।



© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৭১৪০৮০৩৭৮ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com