করোনা কি 'পুরুষালি' রোগ

প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০ । ০০:০০ | আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০ । ০০:১৯ | প্রিন্ট সংস্করণ

মোহাম্মদ কামরুজ্জামান ও নূসরাত খান

কভিড-১৯ কি একটি 'পুরুষালি' রোগ? বিশ্বব্যাপী কভিড-১৯ রোগটির বিস্তার, আক্রান্ত ও মৃত্যুহার ইত্যাদির সর্বশেষ তথ্য-উপাত্ত বিশ্নেষণ করলে এ রকম একটি ধারণাই পাওয়া যায়। আমরা যদি বিশ্বব্যাপী পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই, তাহলে দেখি নারীর তুলনায় পুরুষরা বেশি এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। রোগটি বিস্তারের মাঝামাঝি সময়ে, এ বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চে চীনে ৩৬ শতাংশ নারীর বিপরীতে পুরুষের আক্রান্ত হওয়ার হার ছিল ৬৪ শতাংশ। পরবর্তী সময় ইউরোপে যেমন- ইতালি, স্পেন, ফ্রান্সেও এ রকম প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। ইতালিতে মৃত্যুহারের ক্ষেত্রে ৭১ শতাংশ ছিল পুরুষ এবং ফ্রান্সে এ হার ৫৭ শতাংশ। চীনে প্রথমদিককার পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১.৭ শতাংশ নারীর বিপরীতে পুরুষের মৃত্যুহার ছিল ২.৮ শতাংশ। যেহেতু এ মহামারি এখনও চলমান, তাই এখনই চূড়ান্ত পরিসংখ্যান পাওয়া যাবে না। তবে এটি মোটামুটি পরিস্কার যে, নারীর তুলনায় পুরুষ এ রোগে বেশি নাজুক কিংবা আক্রান্ত এবং তাদের বেশি সতর্ক থাকা দরকার। কিন্তু পুরুষরা কেন বেশি নাজুক? বিশেষজ্ঞরা শারীরিক কিছু কারণ ছাড়াও আচরণগত কিছু কারণ চিহ্নিত করেছেন। যেমন- পুরুষরা ধূমপান ও অ্যালকোহল গ্রহণের কারণে এবং বাইরে বেশি ঘোরাঘুরি করার কারণে সহজেই আক্রান্ত হতে পারে। তবে গুরুত্বর্পূণ বিষয় হলো, পরিবারে একজন পুরুষ আক্রান্ত হলে সেই পরিবারের নারীও কিন্তু আক্রান্তের আশঙ্কায় থাকে।

বাংলাদেশের চিত্রটি কেমন? এটি সত্য যে, বিশ্বব্যাপী প্রবণতার মতো আমাদের এখানেও নারীর তুলনায় পুরুষ বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতিদিনের প্রেস ব্রিফিংয়ে এ রকম ধারণা দেওয়া হয়। ধারণা দেওয়া হয় এ জন্য বলছি যে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনা সংক্রান্ত যে ওয়েবসাইট রয়েছে, সেখানে এ বিষয়ে কোনোই তথ্য-উপাত্ত নেই (করোনা ড্যাশবোর্ড http://103.247
.238.81/webportal/pages/covid 19.php)|১৯.ঢ়যঢ়)। প্রতিদিন কত জন শনাক্ত এবং মৃত্যু হয়, তার একটি সর্বশেষ পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয় সেখানে। কিন্তু সেটি দেখে কারও বোঝার উপায় নেই সেখানে নারী আক্রান্তের সংখ্যা কত! তথ্য-উপাত্ত না থাকার এই বিষয়টি খোদ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তৈরি করা জেন্ডার ইকুইটি কৌশল ২০১৪ এবং জেন্ডার ইকুইটি কৌশলপত্র বাস্তবায়ন কর্মপরিকল্পনা ২০১৪-২০২৪-এর সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ। সেই জেন্ডার ইকুইটি কৌশলপত্রে স্পষ্টভাবেই একটি নারীবান্ধব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নারীবান্ধব নীতিমালা, কৌশলপত্র ও কর্মপরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়ন, স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নারীর জন্য সমসুযোগ নিশ্চিতকরণ, নারীর প্রতি সংবেদনশীল ও প্রশিক্ষিত মানবসম্পদ নিশ্চিতকরণ, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সব কর্মকাণ্ডে জেন্ডার মেইনস্ট্রিমিং ইত্যাদি। নারী ও পুরুষের আলাদা তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনাও এ কৌশলপত্রে বলা আছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মপরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য এ রকম তথ্য-উপাত্ত নিশ্চিতকরণের ওপর বেশ জোর দেয়, কিন্তু কভিড-১৯-এর ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য-উপাত্তে সেই বিষয়ের প্রতিফলন নেই। যেমন ৭ এপ্রিলের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে মোট মৃতের সংখ্যা ১৭। কিন্তু এই ১৭ জনের মধ্যে নারী কতজন, এই সংখ্যাটি ওয়েবসাইটে পাওয়া যাবে না। এমনকি ৮ মার্চের পর (যেদিন সরকার প্রথম করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী পাওয়া নিশ্চিত করে) শনাক্ত হওয়া, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যাওয়া, হোম কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশনে থাকা ইত্যাদি সংখ্যার কোনো নারী-পুরুষ তুলনামূলক চিত্র সেখানে নেই। যদি না থাকে, তাহলে সরকার কিসের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী সময় সিদ্ধান্ত নেবে, তা একটি প্রশ্ন বটে। এটি যদি জেন্ডার সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের কোনো বিষয় হয়, তাহলে বলারই অপেক্ষা রাখে না। আমরা গণমাধ্যমে অন্যান্য দেশের যে পরিসংখ্যান দেখি, সেখানেও নারী-পুরুষ তুলনামুলক চিত্র নেই, শুধু মোট সংখ্যাটি দেখি।

যদিও করোনাভাইরাসে পুরুষ বেশি আক্রান্ত, তবে আমরা দেখি, নারীর ঝুঁকিও প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এ সময় অনেক মাত্রায় বেড়েছে। যেমন- এই বিশেষ সময়ে হাসপাতালে নারী রোগীর স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে দারুণভাবে। অনেক হাসপাতালে বহির্বিভাগসহ জরুরি প্রসূতি সেবাদান স্থগিত বা বন্ধ হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতির সরাসরি শিকার নারী নিজেই। উদাহরণস্বরূপ, একটি প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গাইবান্ধায় গত ৬ এপ্রিল একজন প্রসূতি নারী স্থানীয় মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে ভর্তি হতে না পেরে সড়কেই সন্তান প্রসব করেন। বিশ্বব্যাপী বিশেষজ্ঞরা একটি জেন্ডার সংবেদনশীল তথ্য-উপাত্ত ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিচ্ছেন, যাতে করোনা-পরর্বতী সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষের প্রকৃত অথচ ভিন্ন চিত্রটি পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশে এটি আদৌ সম্ভব হবে কিনা সেই সংশয় থেকেই যায়। সরকারের জাতীয় স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা সেই রকমই ইঙ্গিত দেয়। এটি জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০১১-সহ সরকারের স্বাস্থ্যবিষয়ক সংশ্নিষ্ট কৌশলপত্র ও পরিকল্পনাগুলোর সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

লেখকদ্বয় যথাক্রমে জনস্বাস্থ্যকর্মী

ও উন্নয়নকর্মী

© সমকাল ২০০৫ - ২০২২

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : মোজাম্মেল হোসেন । প্রকাশক : আবুল কালাম আজাদ

টাইমস মিডিয়া ভবন (৫ম তলা) | ৩৮৭ তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ঢাকা - ১২০৮ । ফোন : ৫৫০২৯৮৩২-৩৮ | বিজ্ঞাপন : +৮৮০১৯১১০৩০৫৫৭, +৮৮০১৯১৫৬০৮৮১২ | ই-মেইল: samakalad@gmail.com